একগুচ্ছ গদ্য-আলেখ্য

মাসুদ খান



ভূমাতৃক

শীতের দেশ। পাহাড়ি জঙ্গল। জঙ্গলের এক পাশ দিয়ে চলে গেছে সরু একটি সড়ক। তারই পাশে কাঠের তৈরি বেশ কয়েকটি বাড়ি, কিছুটা দূরে দূরে। কারা থাকে বাড়িগুলোতে?

শীত আর তুষারের বেদম চাবুকে জব্দ হয়ে আছে সমগ্র জঙ্গল। বরফ জমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গড়ে উঠেছে বহুবিচিত্র স্ফটিকস্থাপত্য, নাঙা নিষ্পত্র গাছপালার শাখাপ্রশাখায়। পশুপাখিপতঙ্গেরা কোথায় যে চলে গেছে, কোন সর্বনাশা শীতনিদ্রায়! জমে গেছে ক্ষীণকায়া পাহাড়ি নদীটাও। কেবল উঁচু থেকে ঝিকিয়ে ঝরে পড়ছে এক ক্ষীণ, আঁকাবাঁকা, উল্লম্ব জলরেখা। পাহাড়ের পায়ের কাছে মৃদু ক্যাচক্যাচ শব্দ করে ঘুরে চলেছে ছোট-ছোট ওয়াটার টারবাইন। টিলা ও পাহাড়ের ওপর ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে উইন্ড টারবাইন। প্রতিটি জল-তুরবিন ও বায়ু-তুরবিনের সঙ্গে যুক্ত ছোট ছোট বিদ্যুৎ-জননযন্ত্র।

শহর গ্রাম জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন, নীরব নিঝুম বাড়িগুলো ভিজে চলেছে অবিরাম ধীর তুষারধারায়। একবারে ঝাপসা, জবুথবু ও কাল্পনিক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। হেলানো ছাদে সার-সার সৌরবিদ্যুতের প্যানেল। ওপরে বরফের পুরু আস্তর। আহা, আলোভুক প্যানেলগুলো এখন অনাহারে স্তব্ধ, মুমূর্ষুপ্রায়।

--সর্বনাশ! এই নিষ্ঠুর নিদারুণ শীতে মানুষেরা কোথায় পাবে আলো উত্তাপ উষ্ণতা!
--কেন, ওই বায়ুবিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ ওসব থেকে।
--হয় তাতে?
--না, সব তো হয় না।
--তাহলে?
--ক্ষমাহীন শীতে যেখানে আলো হাওয়া জল পর্যন্ত জব্দ, বিপর্যস্ত, সেখানে কে আর
যোগাবে উত্তাপ, শক্তি-সাহস! তবু যতটুকু পারে যোগায়।
--তারপর?
--যেখানে এসে ইতি হয় আলো হাওয়া জলের প্রয়াস, সেখান থেকে শুরু ভূমিমাতার
আপ্রাণ প্রযতœ, সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার। নিজের গর্ভের উষ্ণতা তখন বিলাতে থাকে ঘরে ঘরে।
সন্তানেরা ভূগর্ভে বিছিয়েছে প্লাস্টিকের প্রচুর শিরা-উপশিরা, তাপবাহী তরলে ভরা। সেইসব
শিরা-উপশিরার ভেতর দিয়ে, এক অবিশ্বাস্য অপত্য স্নেহে ভূমাতা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় তার গর্ভের উত্তাপ।


গগনবিহারী

আকাশপথেই দুর্ঘটনা, দুই বিমানের--
সপাং করে সংঘর্ষ লেজে লেজে।
মুহূর্তের মধ্যে বিমানের ছিঁড়ে-যাওয়া পুচ্ছদেশের গহ্বরপথে
সিটবেল্ট ছিঁড়ে ছিটকে বেরিয়ে আসে মা আর কোলে-বসা শিশু।

এভাবেই
জখম-হওয়া হুঁশ-হারানো বিমান
গর্ভ থেকে সবেগে সন্তানদের ছুড়ে দেয় শূন্যের ভেতর।

একবার শুধু শূন্যে পাক খাওয়া, মুহূর্ত খানিক...
তারপর সহজ পতন--
হাজার হাজার ফুট উঁচু থেকে-- নিশ্চিন্ত নির্ভার।

শিশু তো আনন্দে খিলখিল, কিছুটা ধাতস্থ হয়ে মা-ও।


স্থিরচিত্র

এক হালকা কুয়াশা-মোড়ানো সকালে ট্রেন আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেছে এক পাহাড়ি স্টেশনে। সেও অনেকক্ষণ আগে।

তুমি-আমি চুপচাপ মুখোমুখি। নিস্তব্ধ টেবিল। সামনে দু-কাপ চা, ছাগদুগ্ধের। তরল সোনার রং ধরেছে চায়ে। পাহাড়ি শিশির ও কুয়াশার ফিল্টারে পরিস্রুত সকালের রোদ-- মিহি ও মসৃণ, তদুপরি সোনালি। সে-রোদ এসে মিশছে সোনালি তরলে। চায়ের উপরিভাগে ফুটে উঠেছে কস্টিক কার্ভ, মনোরম রুপালি রংধনু। অদূরে দুটি তরুণী ওড়না উড়িয়ে উড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে ঘনরোম পাহাড়ি ভেড়ার পাল।

এই নিঃসীম মহাশূন্যের ভেতর ক্ষুদ্রস্য ক্ষুদ্র দুটি বিন্দু হয়ে, পাক খেতে খেতে, ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলেছি আমরা দুজন। তার চেয়েও ছোট বিন্দুকণিকা হয়ে ছুটছে চায়ের পেয়ালা দুটিও। যে-গতিতে ছুটছ তুমি, একই গতিতে হয়তো আমিও। টেবিল ও কাপ দুটিও। গ্রহটিও।

তুমি-আমি তাই আপেক্ষিক গতিশূন্য, বসেই রয়েছি মুখোমুখি পূর্বাপর, টেবিলটি স্তব্ধ, পেয়ালা দুটি স্থির কিন্তু উচ্ছল, মেষ ও মেষপালিনীরা কিছুটা এগিয়ে। আর আচমকা ঢুকে-পড়া একটি বসন্তবাউরি পাখি, ফ্রেমের ভেতর।

অনন্তর ধেয়ে চলা এক ছোট্ট স্থিরচিত্র, অনন্তের মধ্যে।


প্রেম

সেই এক উদ্ভ্রান্ত বিদ্যুৎ যা মানুষকে মুহূর্তে পরিণত করে পরাক্রান্ত চুম্বকে।
আর ওই সেই চুম্বক যা পুনরায় বানায় বিদ্যুৎ, আর তা চমকিয়ে চলে মানুষে মানুষীতে।


প্রেম

কাঠ আর লোহা-- দুজনেরই বসবাস ডাঙায়।
একদিন প্রেমে পড়ল তারা পরস্পরের
তারপর ঠিক করল, থাকবে না আর এই খটখটে নীরস ডাঙায়।
লোহা বলে-- প্রিয়, আমি তো ভাসতে জানি না
কাঠ বলে-- আমি আছি-না!
জড়াজড়ি করে ভেসে বেড়াব দুজনে, যুগলমিথুনে,
বন্দর থেকে বন্দরে, দেশ-দেশান্তরে।
ভাসলে ভাসব দুজনে, ডুবলেও ডুবব যুগলে,
অগাধ সলিলে, সান্দ্র সহমরণে...
এক মরণে দুজন মরে, এমন মরা মরে কয়জনে?

তখনই সম্ভব হয় প্রেমের তুরীয় পর্যায়
যখন প্রেমিক-প্রেমিকা মিলে
তাচ্ছিল্যভরে পুড়িয়ে দিয়ে চলে যায় অনাগত ঘরসংসার
যেদিকে দুচোখ যায়...