সম্পাদকীয়

তমাল রায়

ভালোয় থাকা,আলোয় থাকা


'আমার গৃহকোণের জন্য যদি একটি প্রদীপ আমাকে জ্বালিতে হয়, তবে তাহার জন্য আমাকে কত আয়োজন করিতে হয়--সেটুকুর জন্য কতলোকের উপর আমার নির্ভর। কোথায় সর্ষপ-বপন হইতেছে, কোথায় তৈল-নিষ্কাশন চলিতেছে, কোথায় তাহার ক্রয়-বিক্রয়--তাহার পরে দীপসজ্জারই বা কত উদ্‌যোগ--এত জটিলতায় যে আলোকটুকু পাওয়া যায় তাহা কত অল্প। তাহাতে আমার ঘরের কাজ চলিয়া যায়, কিন্তু বাহিরের অন্ধকারকে দ্বিগুণ ঘনীভূত করিয়া তোলে।

বিশ্বপ্রকাশক প্রভাতের আলোককে গ্রহণ করিবার জন্য কাহারও উপরে আমাকে নির্ভর করিতে হয় না,--তাহা আমাকে রচনা করিতে হয় না, কেবলমাত্র জাগরণ করিতে হয়। চক্ষু মেলিয়া ঘরের দ্বার মুক্ত করিলেই সে আলোককে আর কেহ ঠেকাইয়া রাখিতে পারে না।

যেমন এই আলোক, তেমনি ধর্ম। তাহাও এইরূপ অজস্র, তাহা এইরূপ সরল। তাহা ঈশ্বরের আপনাকে দান,--তাহা নিত্য, তাহা ভূমা, তাহা আমাদিগকে বেষ্টন করিয়া আমাদের অন্তরবাহিরকে ওতপ্রোত করিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিয়াছে। তাহাকে পাইবার জন্য কেবল চাহিলেই হইল, কেবল হৃদয়কে উন্মীলিত করিলেই হইল। আকাশপূর্ণ দিবালোককে উদ্‌যোগ করিয়া পাইতে হইলে যেমন আমাদের পক্ষে পাওয়া অসম্ভব হইত, তেমনি আমাদের অনন্তজীবনের সম্বল ধর্মকে বিশেষ আয়োজনের দ্বারা পাইতে হইলে সে পাওয়া কোনোকালে ঘটিয়া উঠিত না।

আমরা নিজে যাহা রচনা করিতে যাই, তাহা জটিল হইয়া পড়ে। আমাদের সমাজ জটিল, আমাদের সংসার জটিল, আমাদের জীবনযাত্রা জটিল। এই জটিলতা আপন বহুধাবিভক্ত বৈচিত্র্যের দ্বারা অনেক সময় বিপুলতা ও প্রবলতার ভান করিয়া আমাদের মূঢ়চিত্তকে অভিভূত করিয়া দেয়। যে দার্শনিক গ্রন্থের লেখা অত্যন্ত ঘোরালো, আমাদের অজ্ঞবুদ্ধি তাহার মধ্যেই বিশেষ পাণ্ডিত্য আরোপ করিয়া বিস্ময় অনুভব করে। যে সভ্যতার সমস্ত গতিপদ্ধতি দুরূহ ও বিমিশ্রিত, যাহার কলকারখানা আয়োজন-উপকরণ বহুলবিস্তৃত, তাহা আমাদের দুর্বল অন্তঃকরণকে বিহ্বল করিয়া দেয়। কিন্তু যে দার্শনিক দর্শনকে সহজ করিয়া দেখাইতে পারেন, তিনিই যথার্থ ক্ষমতাশালী, ধীশক্তিমান; যে সভ্যতা আপনার সমস্ত ব্যবস্থাকে সরলতার দ্বারা সুশৃঙ্খল ও সর্বত্র সুগম করিয়া আনিতে পারে, সেই সভ্যতাই যথার্থ উন্নততর। বাহিরে দেখিতে যেমনই হউক, জটিলতাই দুর্বলতা, তাহা অকৃতার্থতা,--পূর্ণতাই সরলতা। ধর্ম সেই পরিপূর্ণতার, সুতরাং সরলতার, একমাত্র চরমতম আদর্শ।'

উল্লিখিত অংশ ধর্ম প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি। বলাবাহুল্য ধর্ম নয়,মানুষের হস্তক্ষেপে ও তার ব্যবহারিক প্রয়োগে ধর্ম আজ কলুষিত। অদ্ভুত! যা মানুষকে ভালো রাখার,বিভেদ নয় সম্প্রীতি ও শান্তির কারণে নির্মিত হল,স্বার্থান্ধ মুষ্টিমেয়র হস্তক্ষেপে তা আজ ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইন! আসলে মানুষই তো সেই কালিদাস। যে নিজ হিতার্থে নিজ অমঙ্গল ডেকে আনে।

সময়টা খুব গোলমেলে! উগ্র সম্প্রদায় চেতনা,দেশভক্তি ও জাতি ও ধর্ম বিদ্বেষে টুকরো টুকরো হতে চলেছে আমাদের মানবতা বোধটূকূও। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে আমরা সেই সব আঙিনায় প্রবেশ করব,যেখানে দলমত নির্বিশেষে সকলেই স্বাগত। আর তা হল আমাদের লোকায়ত উৎসব। ঈদ, দুর্গাপূজা বা বড়দিন আজ আর শুধু নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের নয়,বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীর। যারা কেউ মুসলিম,হিন্দু বা খ্রিষ্টান নয়,মানুষ। আসুন উৎসবে মাতি। আনন্দ ও শান্তির সহাবস্থানে আরও বেধে বেধে থাকি। উৎসবের আলো যেন দুর্বল,অসহায়ের কাছ অবধি পৌঁছয়।
ঈদ মুবারক। দুই বাংলার প্রিয় লেখকরা নিজেদের ব্যস্ততা,ও প্রায় একমাসব্যাপী নিত্যকার সংযমের মাঝেও,যে ঐহিক কে সময়ে লেখা দিতে ভোলেননি,আমরা তার জন্য কৃতজ্ঞ।

ধর্ম যার যার উৎসব সবার।

আসুন ভালো থাকি,আলো হয়ে সর্বাঙ্গীণ ভালোয় থাকি।

প্রকাশিত হল ঐহিক উৎসব সংখ্যা।