গরম, পান আর রাজপথের গল্প......

দ্বৈপায়ন মজুমদার

গরম পড়ছে ঘামছেন প্রচুর, ‘এমন গরম নাকি জীবনে পড়েনি’ । হতে পারে ঠিকই বলছেন । অবশ্য এই কথাটা আপনার শেষ না হওয়া হোল লাইফে ঠিক কত বার বলেছেন মনে আছে ? আপনি কেসি নাগের ‘ম্যাথস চ্যাম্পিয়ন’ হতে পারেন অথবা ‘রায়-মার্টিনের’ একনিষ্ঠ ভক্ত, তবুও বলতে পারবেন না, এ অধমের গ্যারেন্টি ।
তাহলে কি করবেন ? সুখ স্বপ্নে একবার পাহাড় দর্শন করে নিন, কারণ সুযোগ থাকলেও তো আর আপনি পাহাড় যাবেন না । ট্রেনের টিকিট বুকিং, হোটেল বুকিং, অফিসে ছুটির আবেদন, তারপর কুলিকে আপনার অনবদ্য স্টাইলে বলা, ‘তুম ইতনা যাদা কিউ লেতে হো’, তারপর মশাই পাহাড়, আর পৌঁছে গেলেই তো হল না । রাতের বেলা হোটেলে বেগুন ভাজা, ফুলকপির ডালনা যদি না পেয়েছেন তাহলে অমন হতচ্ছাড়া হোটেলে থাকার কোনো দরকার নেই । তাছাড়া সাতদিনের তো ঠাসা প্যাকেজ, আজ এই পাহাড়, তো কাল ওই লেক । সে মশাই টিক দেওয়া টুর, রেগুলার ফেসবুক আপডেট, আপনার সদ্য কেনা তেরো মেগার ইয়া বড় মোবাইলে তেরা-ব্যাঁকা ছবির আবর্জনা । আর কয়েক পিস মাঙ্কিক্যাপকে বাই বাই করা ডিপি । ব্যাস, লাইকের ফ্লাস ফ্লাড, কমেন্টের ডায়রিয়া । তারপর ফিরে এসে সে কি গল্প, কত বরফ, আর ধস তো আপনার নাকে চুমু দিয়ে চলে গেছে, না হলে এজন্মে আর কলকাতা দর্শন হত না । তা এত সব কী আর হুট করে হয়, একটা প্রিপারেশন তো লাগে, তাই না ।

তাহলে কী আর করবেন, গরমকে গালমন্দ করে বাড়ি ফেরার সময় গলায় দু’পাত্তর ঢেলে, বিল গেটস থেকে ইলেকট্রিক বিল, খুনি ডাক্তার থেকে মোদী-রাহুল তর্কে ভোকাল কর্ডের বারোটা বাজিয়ে বাড়ি ফিরবেন । তা আমি বলি কী, একটা কাজ করেন কত্তা, পান করে তো অনেক ঠাণ্ডা হলেন, না গেলেন পাহাড়, না দেখলেন কলকাতা । হ্যাঁ মশাই, ঠিক শুনছেন, ক্যালকাটা মানে কলকাতা, যে ভাবে বলবেন । এটা দেখার শহর, বোঝার শহর, যে শহরে আপনি অক্সিজেন নেন আর দীর্ঘশ্বাস ফেলেন । এক জন্মে এ শহর পুরোটা দেখা, বোঝা বেশ কঠিন । যত সহজ ভাবছেন অত্ত সহজ নয় মশাই । মিলেনিয়াম পার্ক, সায়েন্স সিটি, তন্ত্রা, গোল্ডেন পাবের কলকাতা কইছি না । এ কলকাতা জানতে হলে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে হয়, গলিতে ঢুকতে হয়, ঘামে ভিজতে হয়, লম্বা এক গ্লাস লেবুচা খেতে হয়, তাপ্পর আবার হাঁটতে হয় যতক্ষণ না কুলপিওয়ালার দেখা মিলবে । এ পাগলের শহর দেখা আজও শেষ হয়নি, কোনো দিন হবে কিনা তাও জানি না । তবে এই গরমে একটা ছোট্ট টোটকা দিচ্ছি, একবার ট্রাই করতে পারেন ।

ধর্মতলা চত্তরে বেশ কয়েকটা পানের দোকান আছে । যেমন আমিনিয়ার সামনে, বিগ-বাজারের পাশে, বেশ ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা পান পাওয়া যায় ওখানে । তবে কোনো মতেই কলেজ স্ট্রিট বা খিদিরপুরের ফেমাস পানের সঙ্গে তুলনায় যাচ্ছি না, তুলনা ‘ইস নট মাই কাপ অফ টি’ । আর এমন ভাবার কোনো কারণ নেই আমি পান প্রেমিক । বেনারসি পান আর লক্ষ্ণৌ পানের তর্যার মধ্যে কোন মতেই নাক গলাবো না, ঠোঁট লাল করে থাকার কোনো প্যাশনও আমার নেই । তাছাড়া ‘সবুজ’ চিবিয়ে ‘লাল’ তৈরির রাজনৈতিক ইচ্ছেও এ মক্কেলের নেই । কিন্তু তাও বলছি ট্রাই করতে, কারণ ‘কাহানী আভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত’ । তাই প্রথমে ‘ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা পান’ কিনুন, একখান মিষ্টি পান বেশ জমিয়ে মুখে প্রবেশ করুক । কারণ এর পর কিছুটা হাঁটাব আপনাকে, মিষ্টি রস গলা দিয়ে নামছে, আস্তে আস্তে মুখের মধ্যে ঘোরাতে ঘোরাতে হাঁটতে থাকুন ।

ওই যে, যে রাস্তাটা ধর্মতলা থেকে সোজা আকাশবাণীর দিকে যাচ্ছে সেটা ধরে হাঁটা দিন । ডানদিকে ট্রামডিপো, আর ট্রাম ছাড়া কী কলকাতা ভাবা সম্ভব । একবার দেখে আসতে পারেন, একটা ভাঙা ট্রাম বিশ্রাম নিচ্ছে, প্রেমিক পথিকের অপেক্ষায় । ওই ডানদিকের ফুটপাথ ধরেই হাঁটুন, রাস্তার উল্টোদিকে বড্ড ভিড় । শিলিগুড়ি, বাঁকুড়া বাসগুলোর জন্য খুব হাঁকা-হাঁকি । এরপর রাস্তা পেরিয়ে আকাশবাণী, তার গা দিয়ে ইডেন, এখন আবার চারদিকে কেকেআর । এইবার রাস্তাটা ক্রস করে উল্টোদিকে আসুন । মানে ওই মোহনবাগান মাঠের দিকে । চাইলে একবার ভিতরে ঢুকে দেখে আসতে পারেন সবুজ-মেরুন মোহনবাগান, ফুটবলে অ্যালার্জি থাকলে অবশ্য যাবার দরকার নেই, তবে ‘গুণ্ডে’ সিনেমাটা মনে আছে, বাঙালির ফুটবলে অ্যালার্জি কিন্তু মহা পাপ, তবে অ্যালার্জি মোহনবাগানে হলে মাঠ-দর্শন এবারের মত বাদ দিতে পারেন ।

এতক্ষণে একটা গা জুড়ানো হাওয়া আসতে শুরু করেছে, এসে গেছে ডেসটিনেশন, কী ভাবছেন নদীর কাছে নিয়ে যাব । ধুর, সে তো কতই গেছেন, বন্ধু অথাবা বিশেষ বান্ধবীর সাথে । না কত্তা না, আর রাস্তা পেরোতে হবে না । মোহনবাগান টেন্ট টপকে একটা সবুজ গালিচা পাবেন, আর কিছু বড় গাছ । মুখের পান এতক্ষণে শেষ । আপনি হয়ত ঘামছেন, তবে এই সবুজ ঘাস, পাখির ডাক, আর নদীর হাওয়া, সব মিলিয়ে একটা ম্যাজিক । জানেন তো বিকেলের এই হাওয়া নিয়ে ইডেনে একটা মিথ আছে, সেটা এই আইপিএল নামক মশলার অনেক অনেক আগের, যখন সাদা জামা-প্যান্ট ছিল প্লেয়ারের ড্রেস কোড, চা-পান বিরতির পর টেস্ট ম্যাচে এই হাওয়াতে নাকি পেস বোলারদের বলে কামাল করা সুইং আসত, অনেক রথী-মহারথী ঘায়েল হয়েছেন তাতে ।

যাই হোক, একটা ভালো গাছ দেখে বসে পড়ুন । পকেট থেকে বের করুন আপনার ‘স্মার্ট ফোন’ । তারপর মোবাইলের নেটে আপনার ছোটবেলার প্রিয় বইগুলো, পছন্দের গান নিয়ে নানান লেখা পাবেন, ব্যাস পড়তে শুরু করে দিন । আর যে হেতু প্ল্যানটা আমার কাছে আগেই ফ্রি জেনে গেছেন, সব থেকে ভালো হয় যদি আস্ত বই নিয়ে যেতে পারেন, আমার পছন্দ কিন্তু আস্ত একখানা বই । হ্যাঁ, এই পছন্দে আমার কপিরাইট আছে বলতে পারেন । বই পড়ার ওই ফিলিংটা ঠিক ই-রিডিং এ আসে না । এখন প্রশ্ন কী বই । যা খুশি, সেটা টিনটিন হতে পারে, অবন ঠাকুরের রাজকাহিনী হতে পারে, ফেলুদা হতে পারে, আবার বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড়ও হতে পারে ।

ভাবছেন ওনার জন্মদিন আসছে কয়েক মাস পর, ওনার কোনো বই বলছি না কেন, কারণ ওরকম ক্রিয়েটিভ ক’জন হয়েছে বলুন তো ? আপনার হাতে বই দেখলেই মনে হয় আনন্দ পাবেন, এই বিশ্বাস রাখতে পারেন । তাছাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ট্রাফিক সিগন্যাল, সবেতেই ‘ঠাকুর’ আর তার গান বিরাজমান । কিন্তু পড়ছে ক’জন, তাই আপনার হাতে যে কোনো বই দেখলেই কবিগুরু হয়ত হ্যাপি হবেন, সেটা ২১ ফেব্রুয়ারি হোক বা ২৫ শে বৈশাখ, অথবা বছরের অন্য যে কোনো দিন । তাই যা হোক কিছু হাতে নিয়ে পড়তে থাকুন সবুজের কোলে, দেখবেন শহরে কখন নিয়ন জ্বলে উঠল টেরও পাবেন না ।


বিশ্বাস করে দেখুন, এই বিকেলে এক লাফে ফিরে যাবেন সেই ফেলে আসা স্কুলের রঙিন দিনগুলোতে, যে সময় অকারণে বলতে হত না, ‘এমন গরম এ জন্মে দেখিনি’ ।