চাঁদ ও চকোর

তিলোত্তমা বসু


#
এমনই সে অন্ধকার যেখানে জমাট বেঁধে আছে কথারা। নাড়ির স্পন্দন বয়ে কোটিজন্ম স্মৃতি ধাক্কা দিচ্ছে মস্তিষ্কের কোষে।মনে পড়ে যাচ্ছে জল ও
বাতাসের ইঙ্গিত।ভূমির আশ্বাস।অগ্নি ও আকাশের ইশারা। পঞ্চভূত এসে যে দেহ গঠন করে দিলো তাদেরই মিলিত আলো আমাকে টেনে নিলো গর্ভের বাইরে।সে আলোই
সর্বভূতে বিরাজমানা স্বরস্বতী।বাক ও সত্যে জাগ্রত
হলেন শুভ্রবর্ণা জ্যোতি।সেই
আমার ভাষা।ক্ষুধা,ক্রোধ,বেদ া,আদর
জানানোর ভাষা।

#
ভাষা বয়ে নিয়ে চলল আমাকে
আয়ুপথ ধরে ।আর আলাপ করিয়ে দিতে লাগলো বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে। আমার ভিতরে যে প্রশ্ন উঠতো ,যে আবেগ প্রকাশিত হত,যে সেতু
নির্মিত হতে চাইত তা সাড়া পেত প্রকৃতির কাছ থেকেই।আগুনের ভাষা আমাকে বারবার সাবধান করেছিলো। একটি নদী আমাকে ভাটিয়ালি গান কাকে বলে শিখিয়েছিল ।
ভোরের রোদ প্রতিদিন আশা আর সম্ভবনা তৈরি করে দিত।
মা- বাবা- ভাই-দাদুভাই,ঠাকুরের আসনের গোপালঠাকুর চিনিয়ে ছিলো
সম্পর্কের ভাষা। তার মূল্য। ধীরে সময় বলল জীবনের স্বর
ও ব্যঞ্জনবর্ণেরা আসলে এভাবেই
প্রকট হয়... মহাপৃথিবীর নানা রঙ দিয়ে। এমনকি নীরবতা। ভাষা তো আছে তারও।
রোগা নদী বয়ে চলেছে।তার ওষ্ঠ ছুঁতে চেয়ে ঝুঁকে পড়েছে
সহস্র শাখাপ্রশাখা নিয়ে গ্রামের
বটবৃক্ষ।গোধূলির ম্লান আলো তখনো দিগন্তরেখায় দিয়ে চলেছে তুলিটান । পাখিরা ফিরে এলো
বৃক্ষকোটরে।অঘোরবোষ্ট মী আসনশুদ্ধি করতে করতে ধ্যানের
গভীরে প্রবেশ করলেন।দুটি কলহরত নেউল প্রাচীন দেউলের
আগাছাবৃত আঙিনায় অদৃশ্য হয়ে গেল।আর বাঙ্গালাভাষায় রচিত হল এই দৃশ্য।“কেবলই দৃশ্যের জন্ম।“ অন্তরে।বাহিরে।দৃশ্যে রই
অভিঘাত।ভাষা ও প্রকৃতি
যেন চাঁদ ও চকোর।

#
মাতৃভাষা। যে ভাষায় প্রথম ডেকেছি তোমাকে জননী।ডেকেছি
কাতর। আর ভুবনের অন্তরের স্নেহসুধা এসে আমাকে পুষ্ট করেছে। বাঁচিয়েছে।কৃতজ্ঞতা। তোমাকে সপুষ্প বিল্বপত্রান্জলী—
জীবনের অর্জিত সত্য মন্ত্র হয়ে উঠছে।কঠিন থেকে ঝরে পড়ছে মধু । বেদনার দোয়াতে
খাগের কলম দিলো ডুব।শ্লোক রচনা করি তবে ?যেন মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে পারি।পারি যেন সংযম।প্রকৃতিকে
খোদাই করে করে নির্মাণ করতে
পারি দেখা ও বোঝা। শিব ও সুন্দর। যা সত্য তাই ভূমি।যা ধৈর্য্য তাও তো ভুমিই।তারই পরে রয়েছি ।ভাষা ও প্ৰকৃতির সহঅবস্থান করছি নিয়ত অনুভব। পর্যবেক্ষণ
করছি ধ্বনিকে।ধ্বনির মধ্যে লুকিয়ে আছেনই তো প্রকৃতি।ব্রিংহতি থেকে যদি পাই “উ” কার, হ্রেস্বা থেকে “ই” কার তো পেতেও পারি। কে বলতে পারে ঝড়ের শব্দ থেকে চন্দ্রবিন্দুর সৃষ্টি কিনা আর বৃষ্টি পতনের শব্দ থেকে “র” ধ্বনি ছন্দিত হল কিনা । ব্যাখ্যা তো দশদিক অবধি। তবু এমনি ভাবনা জুড়ে
দেয় মনন। ভাষা ও প্রকৃতির নিয়ত জুড়ে থাকা যত টের পাই
তত বিস্তৃত হতে থাকেন মহাপৃথিবী। প্রসারিত হতে থাকে আয়ু।অমৃতের পুত্রকন্যারা বন্ধনে
জড়ায় । ধন্য হই।শ্বেতহংসের পৃষ্ঠদেশে উপবিষ্টা সর্বাত্মসাধিকা দেবী, আপনি
এ বিশ্বপ্রকৃতির ভাষার সঙ্গে আমাকে পরিচয় করে দিয়েছেন, পেয়েছি বর্ণপরিচয় , আমি ধন্যা।