বৈরিগাথা

পিয়াল রায়


আমার ভাষা মৃত।
গলায় তার অন্ধ কোতল ছাপ
দুষ্টু নষ্ট হাত
মুচড়ে দিয়ে গেছে শ্যামল অঙ্গ
দলাপাকানো ঘাড় লতপতে
নড়বড়ে

এ কোন্ বসন্ত আমার চারপাশে আজ
খন্ড খন্ড ছিন্নভিন্ন
ভিতর থেকে ফুলেফেঁপে ওঠা দগ্ধঘ্রাণ
ভারি হয়ে উঠছে ক্রমশ

ভাষাকে এত নিষ্ঠুর দেখিনি আগে
হাতে কর্কশ তলোয়ার কমলার ঘনবনে
যেন আজ্ঞাকারী দানব এক
আড়াল ভেঙে হঠাৎই বেরিয়ে পড়েছে
দিগ্বিজয়ে
কচি নড়মুন্ড চাই তার
চাই মাংসল নিরেট সাদা ঘিলু
ধোঁয়াচ্ছন্ন পেশির যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
যুদ্ধের দামে

দিকে দিকে আয়োজন নরমেধ শিশুহত্যার
বদরাগী হাওয়ার দাপট শত কুশ্রীতা
কিছুতেই তাকাতে দেবে না
দেখাবে না একদা প্রতিবেশীর আহত হৃদয়
চোখ তুলে প্রার্থনারত
চোখে তার মুহুর্মুহু জল

এখানে একদিন
বসন্তের রক্তিম বিকেল
ভাষাযুদ্ধ মেখেছিল গায়

আজ দেখি বসন্তশরীর জুড়ে
রক্তবিভীষিকার বেয়ারা ইচ্ছে
অঙ্কুরিত হচ্ছে যুদ্ধের ভাষায়

হলুদ জ্যোৎস্না সম্বলিত
খোলা মাঠে শুয়ে আমার
জড়োসড়ো পৃথিবী

মাথা তোলার সাহস নেই তার



গতকাল ইউ টিউবে কোনো একটি বাংলাদেশি চ্যানেলে দেখছিলাম একজন তরুণ সাংবাদিক কয়েকজন তরুণ- তরুণীর সাক্ষাতকার নিচ্ছেন। ভারী মজার সে সাক্ষাতকার। ভিডিওটি সম্ভবত গত বছরের একুশে উৎসবের। সকলেই সুবেশী, সহাস্যমুখ। মেয়েদের মিষ্টি মুখগুলি মাথায় গোঁজা ফুলের মুকুটে আরো বেশি জাজ্বল্যমান মিষ্টতায় ভরপুর। যেহেতু দিনটা ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বভাবতই সাক্ষাতকারের বিষয়ও ছিল তদনুরূপ। প্রশ্নগুলি ছিল, অমর একুশে কী? কত সালে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়েছিল? কে করেছিল? সেই দিনটি বাংলার কোন্ মাস ছিল? ' আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানটি কে লিখেছিলেন? একুশে শহীদদের কয়েকজনের নাম, ইত্যাদি ইত্যাদি। মজার বিষয় হল মাত্র একজন ছাড়া আর কেউ প্রশ্নগুলির সঠিক জবাব দিতে পারেননি। বিষয়টা মজার লেগেছে এ কারণেই যে উত্তরগুলো ছিল ভারী মজার। কেউ কেউ তো আবার ইংরিজি 'ব্যান' করার কথা বলছিলেন ইংরিজি ভাষাতেই ! আমি হলফ করে বলতে পারি এপার বাংলার ছবিটাও খুব বেশি অন্যরকম হবে না। সাহিত্য চর্চাক্ষেত্রের বাইরে অগণিত মানুষ রোজ কোনো না কোনো অসাম্যের শিকার হতে হতে ভুলে যাচ্ছে নিজেদের কৃষ্টি,সংস্কৃতিকে। আর বিপদটা এখানেই। ওপর ওপর দেখলে যা আসলে ভীষণ অপরিণত একটি মজার বিষয়, গভীরে ডুব দিলেই তার চরিত্র বদলে যায় অনেকখানি। যেখানে প্রতিমুহূর্তে ছ'হাজার ভাষা বিপন্ন হয়ে পড়ে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দৌড়ে, প্রতি দু'সপ্তাহে একটি করে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায় তাদের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্য সহ, যেখানে মাত্র কয়েকহাজার ভাষা জায়গা পায় শিক্ষাব্যবস্থায়, এবং একশোরও কম ভাষা ব্যবহৃত হয় ডিজিটাল দুনিয়ায়, সেখানে বাংলার মতো এমন উৎকৃষ্ট ও প্রভাবশালী ভাষার উত্তরাধিকারির এ দুর্দশা মেনে নেওয়া যায় না। এখনও পৃথিবীর চল্লিশ শতাংশ মানুষ তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অবসরটুকু পান না। নির্ভর করতে হয় অন্যের ভাষার উপর। সেখানে বাংলা ভাষার শক্তি তো পরীক্ষিত ও সর্বজনস্বীকৃত। বাংলা আমাদের গর্বের ভাষা। অহংকারের ভাষা।


ভাষা সংক্রান্ত এই আলোচনাকে যদি বাংলার শ্যামল প্রান্তরে সীমাবদ্ধ না রেখে আরো একটু সুদূরপ্রসারী করা যায় তাহলে দেখা যাবে, ভাষা কখনোই শুধুমাত্র মানুষের সাথে মানুষের সংযোগস্হাপনের শুষ্ক মাধ্যম হয়েই আটকে থাকেনি। একটি জাতির সম্পূর্ণ পরিচয় হয়ে উঠতে ভাষার গুরুত্ব চিরকাল, এ কথা অনস্বীকার্য। ভাষা আসলে শক্তপোক্ত এমন একটি বাঁধন যার দ্বারা মানুষের ঐতিহ্য, পরম্পরা বাহিত হয় পূর্বপুরুষ থেকে উত্তরপুরুষের দিকে। যা একটি সংগঠিত মতধারা প্রবর্তন করে বয়ে চলে যুগ থেকে যুগে। আমাদের সমস্ত হৃদয়বৃত্তি,মানুষের প্রতি মানুষের হিতচেষ্টা পরিবারের সংকীর্ণ গন্ডি অতিক্রম করে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে বৃহৎ বিশ্বমানবসংসারে। জ্ঞান, কর্ম, আচারব্যবহার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আমাদের সভ্যতা নব নব উন্মোচনে হয়ে ওঠে অমূল্য। সব মিলিয়ে বলা যায় চিরায়ত লোক জীবনচর্চা ও যাপনের এক বৃহৎ গৌরব শ্রেষ্ঠতর রূপ পায় দেশিয় ভাষাশিক্ষার প্রচার ও প্রসারের মহিমায়।
এ ব্যাপারে ইউনেসকোর ডিরেক্টর জেনারেল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তাঁর দেওয়া বক্তৃতায় কী বলেছেন দেখা নেওয়া যাক --

"Indigenous people have always expressed their desire for education in their own languages, as set out in the United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples. Since 2019 is the International Year of Indigenous Languages, the theme of this year's International Mother Language Day will be indigenous languages as a factor in development, peace and reconciliation. "
[ Audrey Azoulay
Director -General of UNESCO ]

এই মুহূর্তে তিনশো সত্তর মিলিয়ন জনসংখ্যা পিছু মাত্র সাতহাজার দেশিয় ভাষা কার্যকর। এর অর্থ বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনো মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত। আর আমাদের দুর্ভাগ্য জেনে অথবা অজান্তে মাতৃভাষার বুকে বসিয়ে দিচ্ছি জল্লাদের ছুরি। নিজের ভাষার প্রতি ঔদাসীন্য, অবজ্ঞা, সুযোগ পেলেই ত্যাগ করে যাবার প্রবণতা ভাষাকে ক্রমশ দুর্বল , পীড়িত করে চলেছে। ভিতরে ভিতরে ঘু্নপোকা ফোঁপড়া করে চলেছে। এবং ভাষা যদি কোনো জাতির সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক হয় তাহলে বলতেই হয় এভাবেই একটি জাতির মেরুদন্ড ভেঙে পড়তে বাধ্য। ভগ্ন ভাষা চিরকালই ভগ্ন জাতির জন্মই দেবে। সমাজে তার আর কিছুই দেওয়ার থাকবে না। বাংলা ভাষা নিয়ে এ আশঙ্কা আমার মনে মাঝেমধ্যে চাগিয়ে যাচ্ছে আজকাল। খুবই সুখের বিষয় বাংলা শুধুমাত্র কলকাতার ভাষা নয়, কলকাতার বাইরেও রাজ্যের বৃহৎ অংশ বাংলাকে বাঁচিয়ে রেখেছে নিজের মতো। তাহলে এত গোলযোগ কেন? সমস্যাটা হল আঞ্চলিক বাংলা আর প্রমিত বাংলা নিয়ে। আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি এবং বিস্তৃত ঐশ্বর্যসমূহ উপস্হাপিত হয় প্রমিত বাংলার মাধ্যমেই, এ কথা অস্বীকার করা যায় না। তাই বর্তমান ভাষা আলোচনার ক্ষেত্রে কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা ভাষাকেই আমরা ধরে চলব। বাংলা ভাষার ভিতর অত্যধিক হিন্দি এবং ইংরিজির অধীগ্রহনের সাম্প্রতিক যে বাতাবরণ আমরা দেখি তা যে ভবিষ্যতে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব সংকটের কারণ হয়ে উঠবে না, একথা জোর দিয়ে বলা চলে না। ইতিহাস সাক্ষী পরশব্দ গ্রহনে বাংলা ভাষার কোনো শুচিবাইগ্রস্ততা কোনো দিনই ছিল না। তার শব্দভাণ্ডার এভাবেই সমৃদ্ধ হয়েছে, আগামীতেও হবে, এ বিশ্বাস পোষন করাই শ্রেয়, বিশেষত ভাষা যখন কোনো বদ্ধ জলাশয় নয়, প্রবহমান নদীর সাথেই বেশি তুলনীয়। কোনো ভাষাই দেশ-কাল নিরপেক্ষ নয়। গতানুগতিক জীবনস্রোতের প্রভাব ভাষার উপর পড়তে বাধ্য। আমাদের দেখার বিষয় হল এই চলমানতার সঙ্গী হতে গিয়ে বাংলা ভাষা কোনক্রমেই যেন তার শিকড়চ্যুত না হয়ে পড়ে। আস্ত একটি বাংলা বাক্য ব্যবহার না করা এখনকার যেন একটি সফল 'ট্রেন্ড' হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলার সাথে অজস্র হিন্দি এবং ইংরিজি অদ্ভুত একটি জগাখিচুড়ি ভাষার জন্ম দিচ্ছে। তাতে না হচ্ছে বাংলার হিত সাধন না হচ্ছে হিন্দি এবং ইংরিজির প্রতি সুবিচার। বাংলা ভাষা ক্রমাগতই সম্মুখীন হচ্ছে আশঙ্কা এবং অনিশ্চয়তার। ভাষা যেহেতু অচলায়তন নয়, তার বাঁক পরিবর্তন অপরিহার্য। কিন্তু বাঁক পেরিয়েই যেন খাদে পড়তে না হয়। অতিরিক্ত নিয়মনিগড়ে বাঁধা হয়েছিল বলে সংস্কৃত আজ মৃত ভাষা। বাংলা ভাষা এদিক থেকে সমস্ত সংস্কার মুক্ত। আন্তর্জাতিক তাৎপর্যময় আমাদের ভাষা পেরিয়ে এসেছে অনেক সামাজিক, রাষ্ট্রনৈতিক, তাত্ত্বিক ও মনোবিজ্ঞানের অসমতল পথ। কিছু গঠনগত পরিবর্তন তাকে আজকের জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। কালের মুকুরে বাংলা ভাষার উৎকর্ষই প্রতিবিম্বিত হয়েছে চিরকাল। ভিন্ন ভাষার গ্রাসে চলে যাওয়ার মতো অন্যতর সংকটে পড়তে হয়নি আগে কখনও। অতি আধুনিক হয়ে উঠতে চাওয়ার এই খেলা যতই বিস্তৃত হচ্ছে ততই বাংলা ভাষা বিপন্ন হয়ে পড়ছে কিনা এর উত্তর রয়েছে একমাত্র সময়ের হাতেই।
মুক্ত সঞ্চরণশীল বাংলা ভাষার অবরোহণ কোনোমতেই ইপ্সিত নয়।