গান্ধার,জেরিন আর অর্কেস্ট্রা

তমাল রায়

আপাতত বলি, জেরিনের নাম আমি শুনি, রাসেল স্ট্রীটের আড্ডায়। জেরিন কে সে কথায় পরে আসা যাবে। সুধীনের ব্যালকনির এই আড্ডায় প্রায়ই এসে উপস্থিত হন এলিয়ট। তখন এ শহরে হয়ত সন্ধ্যে নেমেছে। জীবনানন্দ অন্ধকার বুকে নিয়ে হাঁটছেন, ল্যান্সডাউনের রাস্তায়। মুখ নীচু। পাছে কেউ দেখেন মুখ, পাছে কথা বলতে হয়! সুধীনের আড্ডাঘরে একে একে উদয় হচ্ছে সত্যেন, বিষ্ণু। আমি শুনছি জেরিনের গল্প। বলছেন যিনি তিনিও এক অদ্ভুত রহস্যঘেরা সুন্দরী। সুন্দরী মাত্রই রহস্যময়ী। এ ধারণা আমার সেই কৈশোর থেকেই। স্বাভাবিক ভাবেই জেরিন ও রহস্যময়ী।
কর্ণোয়ালিস স্ট্রিটে সুধীনদের বাড়িতে আরও অনেকের সাথে আমিও থাকতাম। বাড়ির বিশাল লোহার গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে লোহার তৈরি প্রহরী। দালান পেরিয়ে,বৈঠকখানা ঘরে ঢুকতে গেলে বোঝা যেত বৈভব আর রুচির এক অদ্ভুত মিশেল। এলাহি আয়োজন। লুচি, আলুরদম, মিষ্টি। আড্ডা ঠিক নয়। জ্ঞানের বিনিময়, বাট এট দ হায়েস্ট লেভেল। রাসেল স্ট্রীটের বাসাটা অবশ্য অন্যরকম।ভাব গম্ভীর। আন্তরিক কিন্তু অত খোলামেলা নয়। সুধীনের প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য শ্রদ্ধা জাগায়। তবে রাজেশ্বরীর উপস্থিতিও কিন্তু বহু মানুষকে টানে। বিষ্ণুই তো কেন জানি মনে হয় রাজেশ্বরীর জন্যইআসে। সকাল এগারোটা থেকে রাত আটটা,নটা। যেন বাড়ি ফিরতে ইচ্ছেই করে না। আড্ডাঘরে প্রণতির ফোন বাজতেই ক্ষিতিশ হাসে। বলে ওই প্রণতির ফোন এলো। কবিতা পত্রিকায় বুদ্ধদেব তরুণ কবিদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নামী কবিদের স্নেহধন্য হতে চাওয়ার প্রবণতাকে ধিক্কার জানিয়ে সম্প্রতি একটি নিবন্ধ লিখেছে। তা নিয়েই বিষ্ণু ও সুধীন তুলকালাম করছে। আমি অবশ্য ওসবে নেই। রাজেশ্বরীর সাথে কথা বলছিলাম ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। পরিচয় করিয়ে দিলো জেরিনের সাথে, সেই প্রথম। আকাশে তখন তৃতীয়ার চাঁদ, কর্পোরেশনের ম্লান হলুদ আলোকে ছাপিয়ে যাচ্ছে... প্রথম দেখা, খুব স্বাভাবিকভাবেই অত্যাগ্রহে কিছুটা এগিয়েই আমি থমকে দাঁড়াই। হাসছে। নারীর স্মিত হাস্য সকলে টের পায়না। এর জন্য অনুশীলন প্রয়োজন! কি করে জানি, আমার মধ্যে এই গুণটি বরাবরই আছে। অবশ্য পঁয়ত্রিশের এই আমি, এত বুঝি বলেই হয়ত তেমন কোনো নারী আমার প্রতি তেমন আগ্রহী হননি। সে যাই হোক। এক দেখাতেই আমি কেমন প্রেমে পড়ে গেলাম জেরিনের। বাইরে ফাল্গুনের চাঁদেরআলো, মৃদুমন্দ বসন্ত বাতাস বইছে, মন তো আর জড় পদার্থ নয়। তারও বিবিধ রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটেই। আপাতত রাজেশ্বরীও নেই। সে জলখাবারের আয়োজন করতে গেছে। আমি আর জেরিন,জেরিন ও আমি। হু! দুজনেই। রেলিং গুলোর অদ্ভুত নকশার ছায়া পড়েছে বারান্দায়। জেরিনের গা থেকে ভেসে আসছে প্রবল এক সুগন্ধ। কেমন যেন অবশ লাগছে। একটা দলছুট পাখি কিকরে যেন ঢুকে পড়েছিল ব্যালকনিতে। চুপ করে বসেছিল এতক্ষণ বাতিস্তম্ভের পেছনে। খেয়াল করিনি। ডানা ঝাপটাতেই ভয় পেয়ে গেছি। এক দৌড়ে নেমে এসেছি পেছনের সিঁড়ি বেয়ে... গায়ের রোমখাড়া! শীত করছে খুব। জেরিনের হাস্যরত ছবিটা চোখ বুজলেই মনে পড়ছে। উফফ! বাড়ি ফিরেই দরজা বন্ধ করে খানিকটা হাঁফালাম। জল খেয়ে শুয়ে পড়লাম। আজ আর খেতে ইচ্ছে করছিলো না।বাইরে থেকে বোন মানসী ও মা ডাকছিলো। সাড়া দিইনি। ঘুমনো দরকার,কিন্তু কেন এমন হল,কারণ তো নেই! অস্বস্তি খুউব...সুধীন ফোন করেছিল। কি হল না বলে চলে আসার মত! সে কথা জানতে।আমারতো পাগল পাগল লাগে। কথা বলব কি হাঁফাই, ঘুম আসছে, দু চোখ জুড়ে। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই জেরিন আর জেরিন...

পরিচয় দপ্তরের শুক্রবারের আড্ডাই বল বা সুধীনের বাড়ির আড্ডা,জমে যেত মূলত সুধীন আর বিষ্ণুর তর্কে। সাথে যামিনী, জ্যোতিরীন্দ্র কত কে। আমার ওদের সঙ্গ ভালো লাগে। তাই যাই। কিন্তু মনভালো নেই। কেমন যেন বিস্বাদ। অথচ জ্বর নেই। আজ যাবোনা স্থির করেছিলাম। কিন্তু বিকেলের পর এমন বাতাস বইতে শুরু করলো। অস্থির লাগে। অগত্যা ট্রাম থেকে নেমে দ্রুত পা চালিয়ে চললাম রাসেল স্ট্রিট। আজ এখনও তেমন কেউ আসেনি। কেবল সত্যেন বোস বসে আছেন। এমনি খুব রাশভারী ওপর ওপর। ভেতরে রসের সাগর। তবু সে ঘরে আর ঢুকিনি। ব্যালকনিতেই সোজা, কারণ জেরিন টানছিলো খুব। চুপচাপ তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। জেরিন কাছে আসতে বলছিলো। পা দুটো কেমন যেন অসার। তবু অজান্তেই সে'দিকে গড়ালাম। কতক্ষণ এভাবে মুখোমুখি জানি না। ঘোর ভাঙলো রাজেশ্বরীর কথায়-
এই তো প্রেম, প্রেমিকের এমন নিঃশর্ত সমর্পণ না থাকলে, প্রেমিকই কেন সাড়া দেবে!
চমকে উঠে যে কথাটা প্রথম বলি,তা হল সম্মতি দিন, আমি ওকে নিয়ে যাই।
রাজেশ্বরী প্রবল আহত। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ফ্যাকাশে মুখ। একটাও শব্দ করেন নি। বেরিয়ে গেলেন ব্যালকনি থেকে। আমি এক পা এক পা করে এগোলাম। কোলে তুলে নিলাম। এক দৌড়েবেরিয়ে এসেছি। সম্মত যদি না হন, আমি বাঁচবো কী করে! ব্যালকনি থেকে রাজেশ্বরী বলছিলেন। -হেমেন বাবু,দিজ ইজ নট ফেয়ার... অস্পষ্ট কানে এলো। আর ফেয়ার। নাথিং ইজ আনফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার। আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়ি পৌঁছতে সময় লেগেছিলো ৪৫ মিনিট। মনে হচ্ছিল যেন বিশাল সময়। এখন চুপি চুপি বেড রুমের জানলার সামনেটায় তাকে বসিয়ে শান্তি। দু চোখ ভরে তাকেদেখছি...

পেল স্ট্রবেরি কালারের মাঝে ব্লাড রেডের ছিটে। আহা। সুগন্ধে ভরে গেছে গোটা ঘর। কতটুকুই বা দৈর্ঘ্য। কিন্তু পুরোটা শরীর জুড়ে,অজস্র সংখ্যায়। এই গন্ধে এক অদ্ভুত মাদকতা,টেবিল ল্যাম্পটাজ্বালিয়ে ডায়েরি খুলে বসলাম। শব্দ আসছে। শব্দের পর শব্দ। কবিতার আকার নিচ্ছে। কি অদ্ভুত এক অনুভব...আহা!
জেরিনের জন্মস্থান মধ্যপ্রাচ্য। শান্তিনিকেতনে প্রাচ্যতত্ত্ব পড়াতে এক ইরানি অধ্যাপক এসেছিলেন,এ তার নিজ হাতে করেই আনা। একটি গুরুদেবকে তিনি দেন। অন্যটি রাজেশ্বরীকে। জেরিন,এখানেজ'র উচ্চারণ আসলে 'হ' আসলে ইউ। হু জেরিন শব্দের অর্থ ইউ। মানে তুমি। মানে আমি। আমার জন্য জেরিন কষ্ট করে সুদূর মধ্যপ্রাচ্য থেকে শান্তিনিকেতন ও গুরুদেব ছুঁয়ে রাসেল স্ট্রিট ঘুরেআপাতত আমর্হাস্ট স্ট্রিটের বাড়িতে। বাকিটা না জানলেও চলে। কেবল এটুকু জেনেছি রাজেশ্বরী জেরিনকে হারিয়ে প্রবল ক্ষুব্ধ। রাসেল স্ট্রিটের আড্ডা আমার গেল! আর মা সকাল হতেইজানিয়েছে,আমাদের আদরের মিনি না'কি আজ কাল সারা রাত আমার ঘরের দরজায় বসে কেঁদেছে। এবং সকালেই নিরুদ্দেশ! এবং যথারীতি তর্জন গর্জন,ওয়ারিন কে যেখান থেকে নিয়ে এসেছ ফিরিয়েদিয়ে এসো। আর, আমি নবাব খাঞ্জা খাঁ কবিতা লিখতে বসে গেছি। কি অদ্ভুত ভাবেই কবিতা জুড়ে কেবল দর্শন খেলছে, সুফি হয়ে উঠছি না'কি আমি?

যাদবপুরে সকাল থেকেই না'কি সুধীন ও প্রণতি আমার অদ্ভুত কাজকম্মো নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত ছিল। ইংরেজি বিভাগের পড়াশুনো লাটে উঠে,বাকি অধ্যাপকেরাও সে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।আজ,সুধীন ডেকেছে আমায়,কেন জানিনা! অগত্যা যেতেই হবে। মুখ কাঁচুমাচু করে জেরিনের সম্মতি নিতে যেতেই দেখলাম সে বেঁকে বসেছে। সুগন্ধও ম্লান। অগত্যা কি আর করি, গায়ে মাথায় হাতবোলাতে গিয়েই স্তম্ভিত! যেন কারেন্ট মারলো। ছিটকে পড়ে গেছিলাম প্রায়! উফফ! এ বেটিতো সাংঘাতিক! মধ্যপ্রাচ্যের নারী ও তার রহস্যময়তা নিয়ে ক'দিন আগেই একটা আর্টিকেল পড়েছিলাম দগার্ডিয়ান এ। কিন্তু এতটা বুঝিনি। অগত্যা আমি খানিকক্ষণ তড়িদাহতর মত বসেইছিলাম। এখন উঠে দাঁড়াতেই মাথা ঘুরে গেল! তবে কি জেরিন রাগ করেছে? কিন্তু যেতেও তো হবেই। উপায় কী! বিরস মুখে বের হলাম!

সত্যেন বোসের সাথে সুধীনের খুব লেগেছিলো। কারণ স্তালিন হিটলারের সাথে হাত মিলিয়েছে। এখন অবশ্য সে বিদ্বেষ অতিক্রান্ত! শান্তির বাতাবরণ! আজ অবশ্য সত্যেন বাবু এসেছেন ফুল ও তারঅত্যাশ্চর্য ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করতে। খানিকক্ষণ শোনার পর জলবিয়োগ করার নাম করে উঠে গেছিলাম ব্যালকনিতে। যেখানে জেরিন থাকতো। একটু পর রাজেশ্বরী সেখান দিয়ে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো। বিশ্রী কথা শোনাবে ভেবে আমি মুখ ঘুরিয়ে রেখেছি, ওমা উল্টে সে দেখি আমায় ধন্যবাদ জানায়!
- হেমেনবাবু,আপনি অজ্ঞাতে আমার যে কি উপকার করলেন,নিজেই জানেন না! তা জেরিন ওখানে আছে কেমন! এসব ব্যক্তিগত প্রেমের কাহিনী বন্ধুপত্নী কে শেয়ার করার মত উদার আমি নই! তাইহাসলাম। বলতে গেলাম কিছু মনে করবেন না,বড় লোভ করে ফেলেছিলাম! রাজেশ্বরী তীব্র কটাক্ষ হেনে বললো, ওই লোভ, বুঝলেন, লোভের জন্যই ওকে আমায় সরাতেই হত! ভাগ্য ভালো,আপনি নিজেই তা করে দিলেন! বুঝিনি! কি বললেন রাজেশ্বরী। খানিক অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। বিষ্ণু হাঁক পাড়লো। বসলাম ফের আড্ডায়। আজ প্রণতিও এসেছে। সে মজার ছলেই জিজ্ঞেস করলো,সুস্থ আছেন তো,হেমেন?
হাসলাম। মন অস্থির,কেন জানি মনে হয় কেবল জেরিন ডাকছে। সম্মতি নিয়ে বেরিয়ে আসার সময়, যামিনী হঠাৎ বলল হেমেন, তোমায় একটা ঘটনার কথা বলব। একটু স্থিত হও। সুধীন যামিনীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, গাঁজাখুরিতে কান দিও না,হেমেন। বেরিয়ে এসেছি তখন। জেরিনের কথা ভাবছি। এত গরম পড়েছে, আমার কিন্তু বেশ ফুরফুরে লাগছে, তবু। মাথায় একটা প্রেমের কবিতা ঘুরছে। গিয়েই লিখে ফেলতে হবে।
সারাটা রাত জেরিনের সাথে কথা হয়েছে। গতরাতে যে কবিতা লিখেছিলাম তা পড়ে শোনাতেই জেরিনের মুখ লাল। আসলে জেরিনের শরীরের বর্ণনায় ভরা সে কবিতা। না এরোটিকা নয়। তবু তো নারী!তারপর রাত যখন অনেক গল্প বলতে শুরু করলো সে। আমি তখন। মৃদু আলো জ্বেলে দিয়েছিলাম ঘরে। গল্প করতে করতে হেঁটে যাচ্ছিলাম পারস্য উপসাগরের পাশ দিয়ে,এখানে আকাশ সবুজ।জেরিনের হাত আমার হাতে ধরা,আশপাশে অনেক সিগালদের ইতস্তত জটলা। দুজনের মুখেই কোনো কথা নেই! তেমন মুগ্ধ মুহুর্তে কথা হয় নীরবতার ভাষায়,সামুদ্রিক বালুতে জেরিন লিখছিলোকবিতা,তখন ভোরের আলো এসে পড়েছে, ওর মুখে। পেল স্ট্রবেরিতে রক্তিমাভার এই বিকিরণ কি করে,সেও এক কবিতা। কে বলল,কবিতা কেবল শব্দে লেখা হয়! এই নিষ্পাপ মুহুর্তে কেমন জানি মনেহচ্ছিল মরেই যাই! আমি জেরিনের প্রেমিক। হয়ত আরও অনেকেই,আমাদের যৌথ মুগ্ধতা জন্মদিক এক ভাষার,চুপ কর শব্দহীন হও!
ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম মুখের কাছে এক পীর বাবা আমার সামনে মুখ নীচু করে বসে। মা চোখ খুলতেই বলল,খোকা সারাটা দিন ভুল বকছিস কেবল। বাধ্য হয়ে মাজার থেকে এই পীর বাবাকে ধরেনিয়ে এসেছে তোর বাবা। কী কুক্ষণে,এই ডাইনিকে এনে ঘরে ঢোকালি। যতসব অলক্ষুণে কারবার! বিদেয় কর একে।
পীর বাবা দেখলাম জেরিন কে ধরতে এগোচ্ছে। আমি রুখে দাঁড়াতে গেলাম। পড়ে গেলাম দুম করে। তারপর আর মনে নেই, দেখলাম রাত প্রায় দুটো। ঘরে সেই সুগন্ধটা আবার বইছে। উঠে বসতেই জেরিন আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি মাথা রাখলাম বুকে। শরীর জুড়ে কেমন এক অদ্ভুত শিহরণ,আর বয়স কমে যাচ্ছে ক্রমশ। গায়ের চামড়া মসৃণ। গলার স্বর মিহি! মধুপুর এসে পৌঁছেছে ট্রেন। এখান থেকে টাট্টু চড়ে রওয়ানা হবো গিরিডি। উশ্রি নদীর পাশে দাসবাবুর বাড়ি,সেখানেই থাকার ব্যবস্থা। চারদিক জুড়ে অজস্র পলাশ ফুটে। গান ভেসে আসছে,তাকিয়ে দেখি মা রবিবাবুর গান গাইছেন। বাবা মিটি মিটি হাসছেন। বোন মানসী এলোমেলো দৌড়ে বেড়াচ্ছে। অমিত্রাক্ষর বাবু এসেছেন,ওরা ব্রাহ্ম। সাথে ওনার দুই কন্যা। ওদের শাড়ি পরার ধরণ দেখলেই বোঝা যায়,একটা বিশেষত্ব আছে ওদের চলনে বলনে, কতগুলো প্রজাপতি উড়ছে। সাঁওতাল পরগণার এই সব অঞ্চলে, আসলেই কেন জানি মন ভালো হয়ে যায়। মানসী্র অমিত কাকুর বড় মেয়কে মনে ধরেছে। তার হাত ধরে বায়না করছিলো,প্রজাপতি ধরবে বলে। সেই মেয়েটি কিছুক্ষণ রাশভারী ভাব বজায় রাখতে চাইবার পর দুম করে,তার ছদ্ম গাম্ভীর্য খসে পড়লো। এবার সেও দৌড়চ্ছে, চোখে চোখ পড়তেই তার মুখ কেন জানি লাল হয়ে উঠলো। ওমা,জেরিন না? সে এখানে কি করে এসে পৌঁছলো? আমার শরীরটা কেমন জানি হাল্কা এখন অনেকটা। গায়ে পাখির ডানা লাগলো যেন,আর আমি আর অমিত কাকুর বড় মেয়ে,না’কি জেরিন উড়তে শুরু করলাম। আপাতত আমরা টাইগ্রিসের ধারে। জেরিন দেখাচ্ছে কোথায় মেসোপটেমিয়ান সভ্যতার সময় ওদের বাড়ি ছিল। আমি আর জেরিন টুপ করে ঢুকে পড়লাম ওদের সেই বাসায়। আম্মু খুব খাতির করে বসালেন। আখরোট আর কাজু হাতে তুলে দিয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কি যেন বললেন...একটু ঝাপসা লাগছে,কিন্তু কেন? হে মহান পবিত্র আল্লাহ এদের দোয়া কর...কেমন যেন অসুবিধে, আমর্হাস্ট স্ট্রিটের রাস্তায় কখন আমি হাঁটছি খেয়াল করিনি। সিটি কলেজ পেরিয়ে এলাম। কিন্তু জেরিন?

আড্ডায় যেতে আর ভালো লাগেনা। সেদিন বুদ্ধদেব ডেকে পাঠিয়েছিলেন। গেছিলাম,যেতে হয় তাই। এই তো জীবন,তার আর ভালো লাগা মন্দ লাগা। বোন মানসী মানসিক ব্যধি আক্রান্ত হয়েছে। তাঁকে সামলাতে হয়। মা চোখে ভালো দেখেন না। কেবল শাপ শাপান্ত করেন জেরিনকে। জেরিনকে অবশ্য আমি ছাড়িনি। সে আমার নেশার মত...বাঁচতে গেলে বাঁচার উপাদান লাগে। হেয়ার স্কুলে পড়িয়ে ক’পয়সাই বা পাই,যা দিয়ে সংসার চলবে। এই দুঃখের সংসারে জেরিন আমার একমাত্র উজ্জ্বল উদ্ধার। তার সাথে রাত ঘনালে এদিক ওদিক পাড়ি দিই। গতকাল গেছিলাম ডেড সি তে। সে বলছিলো সে বলছিলো ডুব দিতে, আমি দিলাম। ভেসে রইলাম হাত পা না ছুঁড়েই, আর ওর কি হাসি...জানি আমি কি’সে কি হয়,কেন হয়! সে কথা বলিনি। ওর এই খেলার আমি নিতান্ত এক উপকরণ! ফেরার সময় আমি জানতে চেয়েছিলাম, তুমি কি মরা বাঁচাতে পারো? সে বললো হ্যাঁ। তাই? ওর পেল স্ট্রবেরি মুখে এক অদ্ভুত হাসি,আর সেই ব্লাড শেডগুলো আরও স্পষ্ট। অবাক হয়ে তাকিয়েই ছিলাম। বললাম বোনকে ভালো করে দিতে পারো? শুনেছি আরব মহিলারা ব্ল্যাক ম্যাজিক জানে,এ কথা বলার পরই দেখলাম তার মুখ গম্ভীর। সে বললো এগুলো ইহুদীদের অপপ্রচার! আমি ফিলিস্তিনি। আমরা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন কাটাই। কারোকে বাঁচিয়ে তুলতে না পারি,মারিনা। ইজরায়েল কে দেখো না,কেমন আমাদের জায়গা দখল করে বসে,মানবতার কথা বলে...ক্ষনিকের জন্য অনমনস্ক হয়েছিলাম,বিষ্ণুর কবিতাটা মনে পড়ে গেল,
তুমিই মালিনী, তুমিই তো ফুল জানি ।
ফুল দিয়ে যাও হৃদয়ের দ্বারে, মালিনী,
বাতাসে গন্ধ, উৎস কি ফুলদানি,
নাকি সে তোমার হৃদয়সুরভি হাওয়া ?
দেহের অতীতে স্মৃতির ধূপ তো জ্বালি নি
কালের বাগানে থামে নি কো আসা যাওয়া
ত্রিকাল বেঁধেছ গুচ্ছে তোমার চুলে,
একটি প্রহর ফুলহার দাও খুলে,কালের মালিনী ! তোমাকেই ফুল জানি,
তোমারই শরীরে কালোত্তীর্ণ বাণী,
তোমাকেই রাখী বেঁধে দিই করমূলে
অতীত থাকুক আগামীর সন্ধানী –
তাই দেখে ঐ কাল হাসে দুলে দুলে


জেরিন দেখি হাসছে...

বহুদিন শরীর ভালো যায় না সুধীনের। রাজেশ্বরী গান ছেড়েছে প্রায়। যে গানের লোভে এত ভ্রমর গুণ গুণ করত,তাদের সংখ্যাও কমছে। আমিও স্বার্থপর জেরিন কে পেয়ে ওদের ভুলেছি। সন্ধ্যে নামার আগেই রওয়ানা হতে গিয়ে দেখি-
কুলফি মালাই বলে হেঁকে যাচ্ছে,রাস্তা দিয়ে,দেখলাম জেরিন কান পেতে শুনছে। আমি কুলফি কিনে নিয়ে এসে মানসীকে দিলাম। বলা হয়নি মানসী আগের থেকে সুস্থ। কি জানি জেরিন কি করেছিল। জেরিনকে কুলফি দিতেই সে সারা শরীরে মাখলো, আমাকেও মাখালো, আমি হাসতে হাসতেই বেরিয়ে পড়ি। খেয়াল করিনি কিছুই। প্রেমে পড়লে তো এমন হয়! যামিনী আঙুল তুলে দেখালো, আমার শরীরে তার না’কি ছবি আঁকতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু হঠাৎ এ কথা! আজ বুদ্ধদেব ও প্রতিভাও এসেছিলো তাদের মেয়ে জামাই নিয়ে। ওরাও দেখি হাসছে। খেয়াল করলাম সারা জামা সাদা হয়ে আছে, কুলফি ছিটনোর চোটে। অবশ্য আলোচনা মুহুর্তেই ঘুরে গেল,যামিনীর শ্রী শ্রী হরি সহায় নিয়ে। চিঠির ওপর কেন লেখে এ কথা যামিনী? তর্ক এখন সুধীন আর জ্যোতির মধ্যে হচ্ছে। বুদ্ধদেব প্রাজ্ঞ মানুষ। চুপচাপ শুনছেন। বিষ্ণু জানালো সে নতুন পত্রিকা করতে চলেছে সাহিত্য পত্র। তার না’কি আমাকে লাগবে। আমি কিছু বলিনি। প্রেমে পাগল মানুষের তেমন কিছু বলা মুশকিল,সারাদিন সে কেমন ঘোরগ্রস্ত থাকে। আমিও তাই। হ্যাঁ না বলেই কাজ সারি। এরপর প্রণতির চাপাচাপিতে কবিতা বলতে শুরু করলাম…
চাই চাই, আজও চাই তোমারে কেবলই,
আজও বলি,
জন শূন্যতার কানে রুদ্ধ কণ্ঠে বলি, আজও বলি-
অভাবে তোমার
অসহ্য অধুনা মোর, ভবিষ্যৎ বদ্ধ অন্ধকার
কাম্য শুধু স্থবির মরণ।
নিশার অসীমে আজও নিরপেক্ষ তব আকর্ষণ
লক্ষ্যহীন বৃক্ষে মোরে বন্দী করে রেখেছে, প্রেয়সী;
গতি অবসন্ন চোখে উঠিছে বিকশি
অতিতের প্রতিভাস জোতিষ্কের নিঃসার নির্মোকে।
আমার জাগর স্বপ্নলোকে
একমাত্র সত্তাতুমি, সত্য শুধু তোমারই স্মরণ
রাজেশ্বরী মিটিমিটি হাসছে,সুধীনও। পরে খেয়াল পড়লো আরে আমি’তো সুধীনের অর্কেস্টা থেকেই আওড়াচ্ছি...লজ্জার একশেষ। উঠে বেরিয়ে এসেছি। একা একা হাঁটছি,রাসেল স্ট্রিটের বাড়ি থেকে হাসির হল্লাটা যেন আমায় পিছু ধাওয়া করেছে,পথ চলতি শেষ ট্রাম,যা আমার মধ্যে মাদকতা ঢুকিয়ে দিত, দেখছি না। রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে থাকা রাধাচূরা ফুলে ছেয়ে গেছে আমি দেখছিনা,কেমন ঘোরগ্রস্ত আমি কেবল মাথার মধ্যে জেরিনকে পুরে এগিয়ে চলেছি আমর্হাস্ট স্ট্রিট। এই সেন্ট পলস পার হলাম। এবার বাড়ি। উফফ! শান্তি।
আমি আর জেরিন, জেরিন আর আমি! সম্পর্কটা ঠিক কেমন জানেন, সাদা পাতা আর অক্ষরের মত। একজন আর একজনে সম্পৃক্ত! হল না ঠিক। সত্যি বলব,ধরা যাক একটা নীল আকাশ,আর একটাই তারা... না হল না। সমুদ্রে আমার আসক্তি নেই,পাহাড়েও। নদী আমার আর মনোলোভা নয়, এমন’কি ঝর্ণাও। কেবল একটা উগ্র গন্ধ আমায় টানে। এ কি ঠিক কুকুর আর তার প্রভুর সম্পর্ক! কুকুর তো গন্ধ স্মেল করেই চেনে সব কিছু! প্রভুর গন্ধ সে আলাদা করেই চেনে,কিন্তু জেরিন তো আমার ঠিক প্রভু নয়। তাহলে কী! রবি বাবু নিশ্চিত এই দশার কথা লিখেছেন। কাল বিষ্ণুকে জিজ্ঞেস করতে হবে। হবেই। আপাতত রাতের কলকাতা শহরে নিভে যাচ্ছে এক একটা করে আলো। আমি আর জেরিন জানলার ধারে। মানসী শুয়ে পড়েছে। মা তো সেই কোন সন্ধ্যেতেই শুয়ে পড়ে। এবার আমাদের গল্প শুরু হবে। আজ আমরা কোথায় যাবো? বেথেলহেম? যেখানে তারার দেখানো আলো খুঁজে খুঁজে পৌঁছয় সন্ত সাধুর দল...না’কি ইস্তাম্বুল যাবো? উত্তর কর জেরিন...জে..রি..ন,জে...রি....ন ...কি হল,শরীর কি খারাপ,কোনো সাড়া শব্দ নেই কেন? কি হল এনসার মি প্লিজ....নাইট ইজ স্টিল ইয়াং... আমাদের এখন তো গল্প করার সময়! ভয় হল খুব,খেয়াল করে দেখলাম ঘরে ঢোকার সময়ও তেমন সেই সুগন্ধটা পাইনি,তাহলে? আলো জ্বাললাম। কই নেই তো...তাহলে? কোথায়? কোথায় তুমি জেরিন...আনসার মি সুইট হার্ট। উফফ পেয়েছি অবশেষে। কিন্তু দরজার বাইরে এইখানে কি করে? রাগ হয়েছে বুঝি,দেরি করে ফিরেছি বলে! প্রণতি যেমন রাগ করে বিষ্ণুর ওপর,বলে সুধীনকেই বিয়ে করলে পারতে,খামোখা আমাকে কেন কষ্ট দাও! কোলে করে নিয়ে এসে বসিয়ে দিলাম, জানলার ধাপটায়। মুখ গোমড়াই। কথা বল ডার্লিং। কথা দিচ্ছি কোত্থাও আর যাবো না। চাকরিতেও। স্মাইল প্লিজ। কেন জানি মনে হল,একটু ম্লান হাসছে ! ওকে বেবি টেক রেস্ট। রাতে শুয়ে কত কী মনে আসে,বিষ্ণু তার গুরুদেব কে নিয়ে কাজ শুরু করেছে। সুধীন ও একটা প্রবন্ধের বই এর মকশো করছে। সুধীন বড় একরোখা। অত ভালো কলম,কেন যে এত অল্প লেখে,কে জানে! যে রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে চারদিক জুড়ে এত্ত মাতামাতি,সুধীন তার সাথে বিদেশ ভ্রমণ ও করে এসেছে,অথচ একটাও শব্দ লেখেনি কোথাও। এ কথা বললেই অবশ্য,আমায় চেপে ধরে লোক। আমার তো একটাও কবিতার বই নেই। অবশ্য সত্যি বলতে বিষ্ণু সুধীনের মাঝে পড়ে আমি স্যান্ডুইচ। এবার জেরিন এসেছে। এবার হবে বই! সুধীন পরিচয় থেকেই করতে চেয়েছিলো আগেই। আমি আবার খুব গেঁতো। বইটার নাম ভেবেছি,গান্ধার ও অর্কেস্ট্রা। জেরিন...জে..রি..ন!
জেরিন আর আমার সম্পর্কটা কি তাহলে ফুল আর মালির? আমিই সেই বনমালী! কিন্তু জেরিন কি শুধুই ফুল! না’তো! এ অনেকটা আলো আর আঁধারের মতন। একজন আর একজন কে কমপ্লিমেন্ট করে। নইলে দিন রাতই মুছে যেত। থেমে যেত আহ্নিক চলন! কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিনা। টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভাঙলো। সুধীন খুব অসুস্থ। একবার জলদি যেতে হবে। যুগান্তর হাতে নিতেই চোখে এলো পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা। ঢাকায় দুর্গাপুজোর দশমীতেই ৭০০ বাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে। রাজশাহীতে একের পর এক বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। দলে দলে রিফিউজি আসতে শুরু করেছে এই বাংলায়। মনটা খারাপ হয়ে গেল। অস্ফুটে জেরিন কে বাই ডার্লিং বলেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। স্কুল অল্প করেই যেতে হবে পিজি হাসপাতালে একবার। ওখানে সবাই অপেক্ষা করছে।
রাতে বাড়ি ফিরে জেরিনকে দেখতে গিয়েই দেখি আবার নেই। সারা দিন খোঁজ নিতে পারিনি। তন্ন তন্ন করে খুঁজছি...মা চোখে দেখতে পায়না ঠিকই,কিন্তু সন্তান তো বুঝেছে ঠিকই। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে বললো – কাকে খুঁজছো খোকা? সে নেই।
- নেই মানে?
- নেই। আপদ বিদেয় হয়েছে। মারা গেছিল কালই। আজ মানু টান মেরে ফেলে দিয়ে এসেছে ডাস্টবিনে।
- কেন?
- ও ধরতে গেছিল। গায়ে কাঁটা ফুটেছিল তাই!
- জেরিন বলে কি মানুষ নয়! কী বলছো মা! ( শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমার)
- কোথায় ফেলেছে ?
- পাড়ার ডাস্টবিনে।
শুনেই দৌড়েছি। না, পেয়েছি। তবে নেড়ি কুত্তাগুলো তাকে নিয়ে কামড়া কামড়ি করছে। অমন পেল স্ট্রবেরির জেরিন এখন কালচে লাল। কত রক্ত ক্ষরণ হয়েছিল নিশ্চিত। আহারে। কুকুরগুলোকে সরিয়ে তাকে ফের নিয়ে এসে বসাই,জানলা নয় আর বিছানায়। না, মনে হয় প্রাণ নেই। আমার শরীরের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে তা’র প্রাণ ফেরানোর চেষ্টা করি। আর খেয়াল নেই,কেবল চোখ বন্ধ করা মাত্রি দেখছিলাম শেকড়হীন জেরিন হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে যাচ্ছে হিন্দুকুশ পর্বত পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে....
এখন সকাল। পিজি হাসপাতালে আমায় ঘিরে অনেক চেনা মুখ। সুধীনের পাশের বেডেই কি করে জানি আমি! চোখ খুলতেই রাজেশ্বরী হেসে বললো হেমেন বাবু ,সুধীন বলছে আপনার কবিতার প্রথম বই বের হবে পঁচিশে বৈশাখ। নাম রাখা হয়েছে গান্ধার জেরিন আর অর্কেস্ট্রা। এই প্রথম রাজেশ্বরীকে এত অসুন্দর লাগলো। পাশ ফিরে শুলাম।