জড়ের ভাষা, অজড়ের ভাষান্তর

প্রবুদ্ধ ঘোষ


পরিযায়ী এসেছিল কিছু, উড়ালের অক্ষরবৃত্তে আকাশে জ্যামিতি শিখিয়েছিল, দেখেছিল এই শহরের ঝিলগুলোর জলছবি বদলে বদলে যায় কেমন। ন্যাড়া গাছগুলো কুসুমরোদ আর পেলবহাওয়ায় গা মুছে নিতে নিতে পরিযায়ীদের ‘আদিওস’ বলেছিল। তখন বেলা বিকেলের দিকে। বিকেলের একটা নির্দিষ্ট নিজস্বমুহূর্ত আছে, যখন হঠাৎ লোকচলাচল কমে যায়, শব্দেরা কিছু পড়ে বেড়ে যাবে বলে সামান্য বিশ্রাম নেয়, রঙগুলো একে অপরের মধ্যে মিশে যায় আর স্কুলফেরত বিকেলগুলোর গন্ধ ঝলসে ওঠে- পড়ন্ত বিকেলের ভাষা স্বগতোক্তির মতো কিন্তু তীব্র খুব। এই পড়ন্ত বেলা আমাকে খেয়ে নেয়। এই শীতফুরনো বিকেলের নরম রঙ আমার পাথুরে হৃৎপিণ্ড, যাকে হৃদয় বলে কাব্যভাষা দেওয়া হয়, তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে দেয়। পাথর ফাটিয়ে যেন কোনও নিভৃত সতেজ চারা জন্মিয়ে দেবেই। রোদের ভাষায় তেজ নেই, মায়ারঙ ভরে আছে কিছু বিষাদবিলাসী আদুরে বিড়ালভঙ্গিতে, হাওয়ার ভাষায় বহুদূর অথবা পাশের পাড়া থেকে ভেসে আসা লাল ফুলের গন্ধ, যাকে গোলাপ বলে কাঁটা আড়াল করা হয়; সময়ের ভাষায় এইসব মিশে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে দেয় আর স্মৃতির মলাট টেনে টেনে ছিঁড়তে ছিঁড়তে ওলোটপালোট কী যেন খোঁজে। কী খোঁজো তুমি, ভাষা? কাকে?
স্ট্রিটলাইটের ভাষায় লেখা হতে থাকে সমস্বর, লেখা হতে থাকা জড়ো হওয়া মানুষের যাপন, আড্ডার দিনলিপি। সন্ধ্যে রাতের দিকে গেলে বিলেদের বাড়ির ভাড়াটে বৌ-এর সঙ্গে তুমুল ঝগড়ার পরে একটা বিড়ির প্যাকেট নিয়ে দাঁড়ায়, তারও ছবি লেখা হয়, গম্ভীর শব্দে। সেই বিড়ির অভিমানী আগুন আর ধোঁয়ার বিষণ্ণ ভালবাসা ওই পথবাতির মতো কে বুঝেছে? বেশ কয়েক বছর আগে নাকি ওই লাইটপোস্টে বেঁধে রাখা হয়েছিল স্যান্ডো গেঞ্জি, বারমুডা পরা একজনকে, অভিযোগ চুরির। জয়দের বাড়ি এসে ধরা পড়েছিল, পাড়ার প্রায় সবাই চড়-থাপ্পড়-জুতো মেরে যাচ্ছিল ভোর থেকে। বেলা বাড়তে পুলিশ এসে নিয়ে যায়। কানাগলির লাইটপোস্টের ভ্যাপসা হলুদ আলো কি আরও খানিক ম্লান হয়ে ছিল? সে ভাষা বোধহয় বুঝত ভেলি। ওই পথবাতির নিচেই জন্মেছিল ভেলি, গরমকালে দুপুরে ওখানে বসেই জিভ বের ক’রে লালা ঝরাতো। ওরও কি সখ্য ছিলনা এই কানাগলির একমাত্র পথবাতিটির সঙ্গে? ভেলির নিম্নাঙ্গ থেকে হঠাৎই রক্ত ঝরতে শুরু করে, পচে গেছিল অনেকটা, খবর দেওয়া হয় কর্পোরেশনের কুকুর-ধরা গাড়িতে; ভেলিকে বেঁধে রাখা হয়েছিল ওই পথবাতির সঙ্গে। গাড়ি এরপর নিয়ে যায় ভেলিকে, আর ফেরেনি। কী এক অদ্ভুত কারণে গলিটা অন্ধকার ছিল, পরের দিন ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি এসে ঠিক করে, ভেতরের কোনও একটা তার নাকি আলগা হয়ে গেছিল। মাঝরাতে ঋতমকে নামিয়ে দিয়ে অফিসের গাড়ি যখন ফিরে যায়, ঋতমকে তখন বাড়ি অবধি সঙ্গ দেয় রেডি, ভোলা আর লাড্ডু, ল্যাজ নাড়তে থাকে। এই চারজনের ছায়া কে এঁকে দেবে একলা স্ট্রিটলাইট ছাড়া? ছায়া এঁকে এঁকে ক্লান্ত স্ট্রিটলাইট দেখে রঙ লেগেছে আকাশে, আজানের প্রলম্বিত স্বর শোনে- এবার নিবে যাবে, ঘুমোবে সে।

#
ভাষা বেঁচে উঠবে বসন্তে। শুধু এটুকু বিশ্বাস নিয়ে গাছ পাতা ঝরিয়ে ফেলে। রুখু রুখু স্পর্শে শুকিয়ে যায় ঠোঁট। হিম-হিম সময়ে কথোপকথন কমে আসে, তবু বরফের ভেতরে মাছেদের মতোই জিইয়ে রাখতে হয় ইচ্ছে। একটা গোটা জনপদ, আরও বৃহত্তর জনপদেও এর’ম বরফভাব চলতে থাকে। তখন মানুষে মানুষ মরার মতো ঠাণ্ডা হ্যান্ডশেক করে, দু’জন পাশে পাশে হাঁটে কিন্তু দেয়াল গাঁথতে গাঁথতে এমনকি চোখের মণিতে ভীষণ ঠাণ্ডা চাউনি নিয়ে একে অপরকে মেপে নেয়। সাপের মতো ঠাণ্ডা হতে থাকে রক্ত ভাঙা ভাঙা বিচ্ছেদসময়ে শীত বাড়তে থাকে আরও। হৈহল্লাবীভৎসমজার ভাষা ঘিরে ধরে শীত তাড়ানোর ভান করে, তবু শীত-শীত... এই শব ভাষা জনপদে থাকে, আমাদেরও থাকে। যাপনে সঙ্গোপনে এ ভাষা ছড়িয়ে যায় নিজস্ব স্বরধ্বনি ব্যঞ্জনধ্বনি নিয়ে। এ ভাষায় অসহ্য শীত এক বসন্তকে পিছিয়ে দেয় ক্রমেই, দেরি করিয়ে দেয়, নদীতে শুকিয়ে দেয় জল আর অন্নের ভেতরে রাখে সংশয়। তবু, ওই, গাছেদের বিশ্বাস থেকে যায়। জবুথবু পাখিদের বিশ্বাস থাকে শিসের সুরে। শীতঘুম ঝেড়ে চোখ খোলার বিশ্বাস জানে কোনও প্রাণ। ঠোঁট জানে বসন্তে ঠিক ফাটা শুকনো ঠোঁট জুড়ে যাবে চুমুতে, উচ্চারণে।
তখনও নাকি সাইরেন বেজে উঠত, ত্রস্ত সাইরেন। বিপদঘন্টি। সেই ভাষার অনুবাদ আত্মরক্ষা। যুদ্ধবিমান মাথার ওপরে এলে সংকেতে জানানো হত আসন্ন বিপদ। বহুক্ষণ ভয় উগরে থামত সাইরেন। জনপদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সেই একটানা আর্তনাদ থামলে। সাইরেনের ধ্বনিতে যে ভয়, তাতে উজাড় হয়ে যায় শহর, বিপন্ন হয় স্থাপত্য, ডানা গুটিয়ে রাখে শিল্প। আর, সেই যে ছোটবেলায় শুনতুম সাইরেন বাজছে, ন’টার সাইরেন। সে এক আশ্চর্য ঘড়ি, জেগে ওঠার কর্মপ্রাচুর্যের ভাষা। আমদের বাড়ির কাছেই ছিল যে বিশাল কারখানা, তাতে ভোঁ বাজত, কারখানার ভোঁ। বইতেও তো পড়েছি কত, বি টি রোডের ধারে যখন বেজে উঠত সাইরেন। তিস্তাপারের কারখানায় যখন বেজে উঠত সাইরেন। কী এক উচ্ছল মিছিলভঙ্গিতে প্রাণ পেয়ে নড়েচড়ে বসত জনপদ। তারপর কখন যেন বাড়ির কাছের কারখানায় তৈরি হয়ে গেল প্যান্টালুন্স। বি টি রোডের ধারে কোনো এক ধোঁয়াটে ভোরে ময়দানবের আশ্চর্য ক্ষমতায় গড়ে উঠল রিয়াল এস্টেট, কমপ্লেক্স আর বহুতল। খেয়ে নিল রডকল, জুটমিল, বসতির ব্যস্ততা সব... থেমে যেতে লাগল সাইরেন। থেমে গেল। সেই ভাষা শোনা যেত না আর। অন্য অনেক ভাষা, দখলদারির ভাষায় ভোঁ গেল চাপা পড়ে। এখনও শ্রমিকরা শ্রমে যায়, কখনও দল বেঁধে কখনও একাকী। কারখানার পুরনো খোলস কিছু পড়ে আছে, বেশিরভাগ পাল্টে গেছে অর্থনীতির উদারনীতির ছোঁয়ায় ছোঁয়ায়। শ্রমভাগ পাল্টেছে, শ্রমিকদের স্তরভাগ পাল্টেছে। চকচকেআরোচকচকে বহুতলে অভিযোজিত শহরে শ্রমের ভাষাও বোধহয় অন্য। আর, প্রয়োজন নেই কাজ শুরুর ভাষারম্ভ- ন’টার ভোঁ। অন্য কোনও যন্ত্রের ভাষায় জেগে উঠতে, ঘুমিয়ে পড়তে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমরা। শুধু মরে যাওয়া সেইসব সাইরেন, চুপ হওয়া কারখানা আর লড়তে লড়তে যুগান্ত পার করা সেইসব বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের দীর্ঘস্বাস এক অন্য ভাষার দিকে নিয়ে গেছে আমাদের জনপদকে, সভ্যতাকে।
আমাদের ভাষাকাঠামোর বাইরেও তো কত ভাষা আছে। আলোর ভাষা আছে, অন্নের এবং অন্নগ্রহণের নিজস্ব ভাষা এবং বসন্তের নিজস্ব ভাষ্য। মানুষী ভাষার আলাপন বাদ দিলে এই ভাষাই তো তৈরি করে এক সেতুপারাপার; এক ছবি থেকে অন্য ছবি তৈরি করে নেওয়া। কোনও ভেঙে পড়া সময়ে এই সেতুটাই সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে রাখে আমাদের, আরও নিবিড় জীবনবোধে।

#
অপ্রয়োজনীয় সংযোজন
তবু, ভাষার লেখা শেষে ক’টি কথা পড়ে থাকে বিপন্ন সময়ের ভাষা নিয়ে। ক্রমশঃ কী মুছে যাচ্ছে আমাদের যোগাযোগের ভাষা? হিংসার ভাষা পেয়ে যাচ্ছে সর্বসম্মতি, পেয়ে যাচ্ছে বিস্তারের আবেগজাল। মতাদর্শের, বাস্তবতা থেকে দূরে সরানো বা বিভ্রমের যে মায়াকথন তৈরি করে রাখে রাষ্ট্র তাকে মান্যতা দিতেই তো গণহিংসার ভাষা নির্মাণ করা হয়। সেই ভাষায় সমষ্টি ঘর থেকে টেনে বার করে একককে, তাকে দমন করে। সে ভাষায় সমষ্টির প্রবহমান বোধ ভেঙ্গেচুরে দিয়ে ক্রূর, মূঢ় গণআবেগ চারিয়ে দেওয়া হয়। এই ভাষায় বিচ্ছেদ আর দেয়াল তুলে তুলে অভিযোগ, অপমান, হননোল্লাস। এই ভাষারও তো ইতিহাস রয়েছে, লালন-পালন এবং শব্দ অক্ষর রয়েছে। সেই অন্ধ ভাষা বন্ধ ভাষা যখন জনমানসের মনোভূমি দখল করে নেয়? প্রকৃতির ভাষা ভুলে, সহজাত বোধ ভুলে হিস্টিরিয়ার গণভাষায় মেতে উঠে ছুটে যায় সবাই। আরোপিত বিবেক এবং চাগিয়ে তোলা অন্ধভক্তি ভুলিয়ে দেয় বন্ধুতার ভাষা, প্রতিবেশের ভাষা। কিন্তু, আমাদের হাতে হাত রাখার, ওষ্ঠে অধর রাখার, জুড়ে জুড়ে থাকার যে ভাষাবোধ, সেই ভাষা দিয়েই বোধহয় রোখা যায় গণহিংসার ভাষাকে। ভাষার অনন্ত সেতুপারাপার চলতে থাকুক বুকের থেকে বুক থেকে বুকে।