একজন মনোচিকিৎসক এবং একটি ভুলে যাওয়া স্মৃতি

নভেরা হোসেন

যার কথা বলছি তিনি একজন মনোচিকিৎসক। রোজ নিয়ম করে রোগী দেখেন, প্রেসক্রিপশন লেখেন, চেম্বার বন্ধ করে রাত করে বাড়ি ফেরেন । সন্ধ্যায় গোলাপি কাপে কফি পান করেন, স্ত্রীর সাথে বিবিসির মেইন হেডিংগুলো দেখেন । এই নিয়ে দ্বাদশতমবার তার সাথে দেখা হলো । এবারও তিনি অপরিচিতর মতো হাসলেন । হল ভর্তি অপরিচিত অতিথীর মাঝে তাকে দেখাচ্ছিল একজন অভ্যাগতের মতো । মনে হলো এখনই সময় । এবার নিশ্চয়ই তিনি চিনতে পারবেন । এতো উজ্জ্বল আলোতে নিশ্চয়ই আমাকে এড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগ থাকবে না । যত ব্যস্ততাই থাকুক লাল গদিমোড়া সোফা থেকে সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকে তাকাতে হবে । এটা এমন একটা মুহূর্ত যখন চেনা কেউ কাউকে অস্বীকার করতে পারে না । ঈসা মসীহ বলেছিলেন যখন মোরগ ডেকে উঠবে পিতর তুমি আমাকে তিনবার অস্বীকার করবে; আমি তাকে চিনি না , আমি তাকে চিনি না, আমি তাকে চিনি না । আমি তাকে চিনি না । কিন্তু সেই তিন হাজার বছর আগে যে ঘটনা ঘটেছিল আবার যে তারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে এটা মেনে নেয়া যায় না । গাড়ি বারান্দায় নেমে কয়েক পা এগোতেই প্রহরীরা কুর্নিশ করে এগিয়ে নিয়ে গেল । ঢোকার মুখেই ঝাকড়া চুলের শিক্ষক এবং সাংবাদিক বন্ধুদের সাথে দেখা , তারা সব মুখে এমনভাবে লাল রুজ মেখেছে যে মনে হচ্ছিল আস্ত একটা সিঁদুরের কৌটো মুখে ঢেলে দেয়া হয়েছে। বন্ধুদেরপরিমিত হাসি আর হাত নাড়ার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল না কোনোকালে এদের সাথে হৃদয় সংশ্লিষ্ট কথা-বার্তা হয়েছিল বা এরা কোনোকালে
বন্ধু ছিল । অনুষ্ঠানস্থলে বহু কবি , সাহিত্যিক , সাংবাদিক লাল উর্দি পরা ওয়েট্রেস সকলেই চমৎকারভাবে সজ্জিত । একজন সচিবের স্ত্রী মাথায় ময়ূরের পেখম লাগিয়ে এসেছেন । দূর থেকে তাকে বর্ষার মেখম তোলা ময়ূরের মতো লাগছিল । সারা হল ঘরে জেসমিনের একটা মৃদু সুগন্ধি ভেসে বেড়াচ্ছিল । দূর থেকেই তাকে দেখতে পেলাম সাদা পাঞ্জাবি, চোখে সোনালি রিম দেয়া চশমা । দুজন কোটপরা ভদ্রলোক মনোচিকিৎসককে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল । তার সাথে প্রথম দেখা হওয়ার দৃশ্যটা চোখে ভাসছিল । টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে রায়েরবাজারের সুলতানগঞ্জ রোড থেকে মগবাজার । তখনকার দিনে এতোটা পথ রিকশায় চলার মতো অবস্থা ছিল ঢাকা শহরে । লোকজনের ভীড় থাকলেও গাড়ির চাপ কম ছিল আর বড় রাস্তাগুলো রিকশা চলার জন্য উন্মুক্ত ছিল । বন্ধুটি অল্প বয়স থেকেই মানসিক নানা সমস্যায় ভুগছিল । খাটে শুয়ে থাকা অবস্থায় বিছানার পাশে বাবা বা ছোট ভাইকে হেঁটে যেত দেখলে বন্ধুটি কেঁপে কেঁপে উঠত । তার সারা শরীর জ্বরগ্রস্থ রোগীর মতো শীতে কাঁটা দিয়ে উঠত । একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে মনোচিকিৎসকের ঠিকানা আর নামটা জোগার করতে পেরেছিলাম । আসলে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনের পাতায় তার নামটি প্রথম চোখে পড়ে । খুব সাদামাটা নাম কিন্তু চোখ আটকে গেল , তখন হন্য হয়ে খুঁজছিলাম একজন মনোচিকিৎসককে । বন্ধুর অবস্থা দেখে মনে ভীষণ অস্থিরতা ভর করল। তাকে নিয়ে মনোচিকিৎসকের বাড়ির গেটে উপস্থিত হলাম । একটা অ্যালসেশিয়ান আমাদের দেখে দৌড়ে এলো । গেটের মুখ থেকে আমরা দশ হাত ছিটকে পড়লাম । দাড়োয়ান হা হা করতে করতে এসে বাদামী কালো ছোপের বিশাল দৈত্যকে সরিয়ে নিয়ে গেল । আমরা এক পা দু-পা করে সাদা গেট পেরিয়ে রিসিপশনে
পৌঁছালাম । সেখানে রোলিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছিল কালো শাড়িপরা মধ্য পঞ্চাশ বয়স্ক এক নারী । তার চেহারায় একটা অসুস্থতার ছাপ ।
কালো শাড়ি বহু কষ্টে মুখ হা করে রোগীর নাম জানতে চাইল ।
সাদিয়া ইসলাম ।
বয়স ? ১৭ ।
পেশা ? ছাত্রী ।
ফাইল বন্ধ করে কালো শাড়ি ডক্টরের রুমে ঢুকে পড়ল । অ্যালসেশিয়ানটা আবার বিকট শব্দে ব্রি ব্রি করতে করতে বারান্দার পাশ দিয়ে আরেকবার গেল । বন্ধুটি নীল গদি আটা সোফায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে ছিল । মনে হচ্ছিল যেন একজন মৃত মানুষের সাথে বসে আছি । কতক্ষণ বসে ছিলাম জানি না । মাথার উপরের শাদা ফ্যান ঘট ঘট করতে করতে কয়েকবার বন্ধ হয়ে গেল , আবার চলল । বিকালের ভ্যাপসা গরমে কান দিয়ে যখন ধোঁয়া বেরোতে শুরু করল ভেতরে ডাক পড়ল । দরজার হাতল ঘোরোতেই ভেতর থেকে ঠাণ্ডা একটা বাতাস এসে স্পর্শ করল । নাকে ওডিকোলনের ঘ্রাণ । চেম্বারে ঢুকবার মুখেই দেখলাম মনোচিকিৎসক একটা সাদা ধবধবে তেয়ালে ঢাকা চেয়ারে বসে আছেন । ক্রিম কালারের সাফারি স্যুটে তাকে দেখাচ্ছিল গর্জিয়াস । অনেকটা খাপখোলা তলোয়ারের মতো ।
তিনি আমাদের দিকে একবার চোখ তুলে চেয়ে ইঙ্গিতে বসতে বললেন । কে রোগী ?
কিছুটা অস্বস্তির সাথে বল্লাম আমার বন্ধুর কিছু সমস্যা হচ্ছে ।
তিনি আমাকে হাত দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বল্লেন যার সমস্যা সে বলুক ।
বন্ধুটি মনোচিকিৎসকের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল । সে কিছুতেই মুখ খুলতে চাইছিল না । চোখে - মুখে ভয়ের অভিব্যক্তি ।
হ্যাঁ বলেন , আপনার কি সমস্যা হচ্ছে ?
হু
হ্যাঁ কি সমস্যা ?
হু ... ।
না বললেতো আমি বুঝবো না । একা বলতে চান ?
হু ...
বন্ধুর চোখ দিয়ে টপটপ কওে পানি গড়িয়ে পড়ছিল ।
এরকম কিছুক্ষণ চলার পর আমি বল্লাম , ডক্টর আমার বন্ধু কমিউনিকেট করতে চায় না , কথা বলতে চায় না , অকারণে ভয় পায় । নিজেকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখে এটাই ওর প্রব্লেম ।
মনোচিকিৎসক খস খস করে কলম দিয়ে প্রেসক্রিপশনে কয়েকটা ওষুধের নাম লিখে দিলেন ।
সেই ওষুধ খেয়ে আমার বন্ধু কিছুদিনের মধ্যে ইয়া মোটা হয়ে গেল আর সারাদিন ঘুমাতে লাগল । আগে কলেজে যেত সেটাও বন্ধ করে দিল । তার সাথে আমরা আরও কয়েকটি সিটিং দিলাম ।
তিনি প্রত্যেকবারই আমাদেরকে দেখে জানতে চাইতেন , কি সমস্যা ? রোগী কে ? বামের চেয়ারে বসুন ।
আমরাও রোবটের মতো তার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম । আর প্রতিবার তিনি ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে দিতেন । আর প্রতি ভিজিটে বন্ধুটি মুখে কুলুপ এটে বসে থাকত । নো স্পিক ।
পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে তিনজন নারী - পুরুষ নীল গদি আটা সোফায় বসে স্থির চলচ্চিত্রের রিহার্সেল করতে লাগলাম । এই ঘটনার অবসান হলো বন্ধুটি যখন পালিয়ে গিয়ে মামাত ভাইকে বিয়ে করল । আমারও মনোচিকিৎসকের কাছে যাওয়া বন্ধ হলো । ততদিনে জল গড়িয়ে অনেক দূও চলে গেছে । দজলার জল ফোরাত ছাড়িয়ে ব্রহ্মপুত্রে এসে পড়ল । একদিন বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম দেখলাম রাস্তায় ভীড় । একটা নীল রঙের প্রাইভেট কারকে ঘিরে লোকজন জটলা করছে । কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে দেখি গাড়ির পেছনের সিটে মনোচিকিৎসক বসা । তার ড্রাইভার একজন পথচারীর পায়ের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিয়েছে তাই নিয়ে হাঙ্গামা ।
অনেক কষ্টে গাড়ির কাছে পৌঁছে বললাম , আমাকে চিনতে পারছেন স্যার ?
গাড়ির ভেতর থেকে তিনি শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন ।
মনে হলো এ জন্মে তো দূরে থাক ভূত - ভবিষ্যৎ কোনো জন্মেই তার সাথে আমার দেখা হয় নাই । তবু তার বিপদে ঝাপিয়ে পড়লাম । গাড়ি থানায় নেয়া হল সেখানেও উপস্থিত থাকলাম । মনোচিকিৎসক কৃতজ্ঞতার চোখে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন এবং ভদ্রতা করে বাসার সামনের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে গেলেন আর হাতে গুঁজে দিয়ে গেলেন তার চেম্বারের কার্ডটি, যেন এই প্রথম তার সাথে আমার পরিচয় হল । আমি যতবারই বললাম আপনার সাথে আমার অনেকবার দেখা হয়েছে , বন্ধুর চিকিৎসার জন্য আপনার কাছে গিয়েছি বহুবার ।
তিনি মুখে হাসি ফুটিয়ে বলতে লাগলেন হ্যাঁ বলো । তাই ? তাই ? বাহ । কিন্তু তার চেহারায় এমন কোনো লক্ষণ ফুটে উঠল না যাতে করে আমি বুঝতে পারব তিনি আমাকে চিনতে পারছেন ।

এরপর বেশ কয়েক বছর পার হয়ে গেল । মনোচিকিৎসকের মতো আমিও তাকে প্রায় ভুলতে বসেছিলাম । হঠাৎ একটা ইনভাইটেশন পেলাম অফিসের সূত্রে । একটা মেন্টাল হেলথ ডেভেলপমেন্ট সেশনের । ছোট অফিস , এনজিও । সেখান থেকে এসব ইন্ভাইটেশনে একজনকে পাঠানো হয় । আমাকে সিলেক্ট করা হল । আমিও একদিন অফিসের বাইরে কাটানোর লোভে খুব আগ্রহ নিয়ে সকাল আটটার মধ্যে মোহাম্মদপুর সেন্ট্রাল কলেজের পাশে অবস্থিত ওয়াই এম সি এর একটা ব্রাঞ্চে পৌঁছালাম । হল রুমে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল মনোচিকিৎসক হালকা ছাইরঙা স্যুট পড়ে ঘোরাঘুরি
করছেন । সকলকে একটা নির্দিষ্ট চেয়ারে বসতে হল । সেখানে প্রত্যেক পার্টিসিপেন্টের সাথে একজন করে মনোচিকিৎসক ছিলেন । মনোচিকিৎসক পার্টিসিপেন্টের সামনে বসার পর সেশন শুরু হল । খুবই কাকতালীয় বিষয় । তাকিয়ে দেখি আমার মেট করা হয়েছে তাকেই । হা ঈশ্বর ! তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম । কেমন আছেন স্যার ? চিনতে পারছেন ? ঐ যে আপনার চেম্বারে বন্ধুকে নিয়ে যেতাম , তারপর সেই গাড়ি এক্সিডেন্ট ।
মনোচিকিৎসক হা হয়ে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন এবং মৃদু হাসলেন । বললেন তাই নাকি ? বাহ । তার চেহারায় এমন কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না যে তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন । প্রায় তিন দিন ব্যাপী এই মেন্টাল ডেভেলপমেন্ট সেশনে আমরা অনেক কিছুই করলাম । তিনি আমাকে নানা সেনসাস ফর্ম পূরণ করতে দিলেন , ইন্টারভিউ করলেন , অবজার্ভেশন করলেন এবং শেষ পর্যন্ত রেজাল্ট জানালেন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ একজন ব্যক্তি , আমার কোনো মানসিক ট্রমা নেই , নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি যেতে পারি । সেশনটির শেষ দিন একটা আইটেম ছিল প্রত্যেক জুটিকে পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে । আই মুভমেন্ট করা যাবে না । আমি এবং মনোচিকিৎসক প্রায় পনের মিনিট হালকা আলো - আঁধারীময় ঘরে পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম , মনে হচ্ছিলো তিনি আমার মাথার ভেতর ঢুকে পড়েছেন , সম্পূর্ণ আমাকে দেখতে পাচ্ছেন দূরবীনের মধ্যে দিয়ে , আমিও তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম একেবারে স্ফটিকের মতো । এক সময় চোখে পানি চলে এলো , টপটপ করে চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করল দুজনের । শেষ অংশে পরস্পরকে আলিঙ্গনের বিষয়টি ছিল । আমরা একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরলাম এবং কাঁদতে লাগলাম । জাপানী ট্রেইনার একটা কাপ করে সেশনের সমাপ্তি টানলেন । ঐ তিনদিনের সেশন আমার মনে গভীর দাগ কেটেছিল , বিশেষ করে মনের মধ্যে মনোচিকিৎসক সম্পর্কে একটা বন্ধুসুলভ মনোভাব তৈরি হল । তারপর নিয়মিত অফিস করছি , বিয়েও করলাম হুট করে খুব জাকজমকের সাথে । নতুন কাপল হানিমুনে কক্সবাজার গেলাম , উঠলাম লং সি বিচ মোটেলে । সারারাত জার্নিও পর গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম , ঘুম থেকে উঠলাম প্রায় মধ্যাহ্নে । সমুদ্র - স্নানের উদ্দেশ্যে হোটেলের দরজা খুলতেই ভৌতিক কাণ্ড । পাশের দরজা দিয়ে মনোচিকিৎসক এবং আরেকজন ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন ।
আমি স্বভাবতই খুব উৎসাহ নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম । ভাল আছেন স্যার ?
মনোচিকিৎসক কিছুটা বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন সরি আপনি বোধহয় ভুল করছেন , আপনার সাথে কখনো কি পরিচয় হয়েছিল ? আমি বল্লাম জী। ঐ যে আপনার চেম্বারে , তারপর তাকে বিস্তারিত বল্লাম ।
আমার স্বামী এবং মনোচিকিৎসকের সঙ্গী ভাবলেশহীন চেহারা নিয়ে ধৈর্য ধরে আমাদের কথা শুনছিলেন ।
মনোচিকিৎসক মুখে একটু মৃদু হাসি ফুটিয়ে বল্লেন তাই নাকি ? তাই নাকি ? বাহ । তখনও তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর দেখলাম না । এ ঘটনায় আমি খুব শকড হলাম ।
আমার হাসব্যান্ড বলতে লাগলেন , উনি বিখ্যাত মানুষ , প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সাথে পরিচয় হয় , সকলকে মনে রাখা সম্ভব না । তুমি মন খারাপ কোরো না , টেক ইট ইজিলি । লাইফ ইজ লাইক দ্যাট , ইয়ো ক্যানট চেঞ্জ দ্যা ইনার মাইন্ড অফ এনিথিং ।
কক্সবাজারে যেক’দিন ছিলাম হোটেলে বহুবার তার সাথে দেখা হল , একবারও তিনি আমার দিকে ফিরে তাকালেন না এবং সৌজন্য বিনিময়ও করলেন না । এই ঘটনার পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আর কখনো মনোচিকিৎসকের সাথে দেখা হলে আগ বাড়িয়ে কথা বলব না । তিনি নিজের থেকে কথা বললেই শুধুমাত্র তার সাথে কথা বলব , নচেৎ নয় । দেখতে দেখতে দেশে রাজাকারদের মামলার রায় দেয়া শুরু হল এবং শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হলো । এদিকে ফেব্রুয়ারিতে একুশের বইমেলা চলছে । বই মেলায় যাওয়ার জন্য মনটা আনচান করতে লাগল । একদিন অফিস থেকে সুযোগ বুঝে চারটার সময় বেড়িয়ে পড়লাম । মোহাম্মদপুর থেকে সি এন জি - তে সোজা শাহবাগ । যাদুঘরের পাশের গণজাগরণ মঞ্চ ছাড়িয়ে সামনে আগাতেই সোনালি রিমের চশমা ঝলকে উঠলো । তিনি । মাথাটা একটু ঘুরে উঠল । সোজা হেঁটে যাচ্ছেন । আমি জানি তার সাথে আর কোনোদিন কথা বলব না তবু পা যেন আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে
যাচ্ছে , কিছুতেই স্থির থাকতে পাছি না । নিজেকে খুব বোঝালাম কি দরকার তার সামনে যাওয়ার যে আমাকে মানুষ হিসেবে নূন্যতম গ্রাহ্য করছে না , যার কাছে একটা রাস্তার লোকের সাথে আমার তফাৎ নেই । কিন্তু জানিনা মনের মধ্যে কেন এতো উচাটন , কথা বলার আগ্রহ । ভাবলাম উনি আমাকে না চেনার ভান করলে করবেন , তাতে আমার কি ? হু কেয়ারস ? এতো ব্যস্ত মানুষ , তার পিছনে এতো হাজার হাজার পেশেন্ট এটেন্ডেন্স , ভক্ত ঘুরছে । কাকে ছেড়ে উনি কাকে মনে রাখবেন ?
প্রায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে তাকে ধরে ফেললাম।
পিছন থেকে ডাকলাম স্যার ভাল আছেন ?
তিনি পায়ের গতি একটু শ্লথ করে ঘাড় নাড়ার ভঙ্গি করলেন ।
আমিও তার পাশে পাশে হাঁটতে লাগলাম । স্যার কোথায় যাচ্ছেন ? বইমেলায়?
তিনি সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন ।
স্যার বোধহয় এবারও আমাকে চিনতে পারেন নি ?
কথাটি শুনে তিনি চমকে সরাসরি আমার মুখের দিকে তাকালেন কিন্তু তার চোখে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না ।
আমার মনে জিদ চেপে গেল , পিঁছন পিঁছন হাঁটতে লাগলাম । সে বছর বইমেলায় একটা অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল , দুজনে হাঁটতে হাঁটতে সেদিকেই গেলাম । তিনি আমাকে চিনতে পারছেন না ঠিকই কিন্তু বলছেন না ঠিক আছে বা আসি ।
বাংলা একাডেমির পুকুর পারের অনেকখানি জায়গা জুড়ে পোড়া বইয়ের স্তুপ। দেখে মনেই হচ্ছে না এখানে থরে থরে সাজানো ছিল ঝকঝকে নতুন বই । একজন লেখকের , কবির স্বপ্ন – দুঃস্বপ্ন ।
মনোচিকিৎসক গভীর বিষন্ন চোখে ধ্বংস্তূপের দিকে তাকিয়ে রইলেন । মনে হল ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোল । বললাম স্যার এভাবে মেলাকে পুড়িয়ে দেয়ার অধিকার কারো নাই । তিনি হা হা করে উঠলেন না না মেলাকে কেন পোড়াবে ? কেউ হয়তো ভুলে কয়েল জ্বালিয়ে রেখে গিয়েছিল তা থেকেই আগুনের সূত্রপাত অথবা শর্ট সার্কিট । আমি হা হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে । তিনি ধীরে ধীরে সন্ধ্যার ফিঁকে আলোতে মেলার মধ্যে হারিয়ে গেলেন । তার সাথে যে আমার কোনোকালে দেখা হয়েছিল , পরিচয় হয়েছিল তা তিনি বিস্মৃত হয়েছেন । অথবা জানিনা পুরোটা পাকা অভিনয় কিনা ? একজন স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষের চিন্তা করতে করতে বাড়ির পথ ধরলাম । হয়তো আবারও কখনো তার সাথে দেখা হয়ে যাবে । আর আমি যখন বলব স্যার কেমন আছেন ? চিনতে পারছেন আমাকে ?
স্বভাবসুলভভাবে তিনি বলে উঠবেন তাই ? আপনার সাথে আগে দেখা হয়েছিল ?
তাই ? পরিচয় হয়েছিল ? বাহ ।