একটি কাল্পনিক অভিজ্ঞতা

স্বপন রায়



.........
তারপর যা যা হওয়ার ছিল, কল্পনাতীত, হল।
#
একটু আগে বাইক চলতে শুরু করেছে। বাইক এবং চে। অঙ্গাঙ্গী। আমার বিপ্লব মেলায় হারিয়ে গেছে। বিপ্লব আমার যময ভাই ছিল। সে কথা বলত না। ভাষা ছিলনা। আমি তার হয়ে বলতাম। আর আমার হয়ে স্বদেশ সেনঃ
‘ব্রীজ পার হয়ে যাবো- সুদূর অক্ষরে কাঁপা পথ
ঝুমকা থামো, আমি সাইকেলে চড়েছি
দূরে যাবো বলে। দুষ্টু পাতা কেন
ডাকো? কী কারণে জল তুমি শিশিরের মত
নীরবতা!’
শহর পেরিয়েই যেতে হবে। চাওয়া শহর অব্দি, পাওয়া শহরের বাইরে। চে নয়, রিয়া বাইক চালাচ্ছে। সেই কবেকার রিয়া, মেরুপ্রদেশের। সময়টা ছিল বাস্তবের সমকোণে, আর সিঙ্গল রিয়া। ‘সিঙ্গুলারিটি’ সেই কল্পন-কালে অনিবার্য ছিলনা। রিয়া কিন্তু বলেছিল, তুমি কী ভাবো নিজেকে, রুস্তম? রিয়ার উপর আর নিচে পশুর ছাল। আমার শুধুই নিচে। আমরা নিজেদের ভেতরে পাশবিক শক্তি পেতাম, পরলে। আমরা শিকার করতাম। গোধুলির সন্নাটা চিরে বেরিয়ে যাওয়া বাইসন, হারিয়ে যাওয়া হরিণ। রিয়া শুধু আমার ছিলনা। রিয়া ছিল এই গোষ্ঠীর চালিকা। তো, ওর ইচ্ছেই ছিল শেষ কথা। কে যাবে ওর সঙ্গে, কে থাকবে। কিভাবে, কতদিন। আমরা পুরুষরা খুশি ছিলাম। পাথর আনতো কয়রকজন। বিশেষ পাথর। কয়েকজন কুঠার বানাতো। কাঠের গুঁড়ি কেটে আনতো কয়েকজন। আর পাথর পালিশের কাজে কেউ কেউ। রিয়ার কোনও নাম ছিল না। আমাদের ভাষা ছিলনা। রিয়া, আমার সঙ্গে ভাব আর উচ্চারণ মিলিয়ে কিছু বলতো। প্রথম দিকে শুধু আমার সঙ্গেই। ঈশারায় দেখাতো বর্ষার ফুলে ফেঁপে ওঠা নদী। মুখে বলতো সোঁ সোঁ। আমি রিয়ার নাম দিলাম সোঁ সোঁ। রিয়া একটা ভাষা গড়ে দিচ্ছিল। ভাব আর শব্দ দিয়ে। কয়েকবছর পরে আমরা শব্দ দিয়ে চিনতে আর চেনাতে আরম্ভ করলাম।আমরা সবাই রিয়াকে ডাকতে শুরু করলাম, সোঁ সোঁ। রিয়া সাড়া দিতে শুরু করল। রিয়ার প্রথম নাম। রিয়া আগুনের পাশে। সেই আগুন চেনার দিনগুলো। আমরা গোল হয়ে হাত পা ছুঁড়ছি। আজ জব্বর শিকার হয়েছে, ভাল্লুক। আমাদের গলার চিৎকার ধীরে ধীরে তালে পড়তে শুরু করেছে। আর রিয়া সেদিনই আমায় আমাদের নতুন ভাষায় বলেছিল, তুমি কী ভাবো নিজেকে, রুস্তম? আমি কেঁপে উঠলাম। গলায় স্বর ওঠা নামা করতে লাগল। পরে এসবই তো গান হবে। এরকম কোন গানঃ
‘সিয়াহাম্ব একুখান্যেন কওয়েনকস
সিয়াহাম্বা হাম্বা
সিয়াহাম্ব একুখান্যেন কওয়েনকস’ (একটি জুলু গানঃ https://youtu.be/Fi-zd2k8wgQ)
##
রিয়া বাইক চালাচ্ছিল। প্যাশনেট রিয়া। কোথায় যাবে?রিয়া নিরুত্তর। আমরা একটা বাঁকে। নিচে তিস্তা। জলের রং মরকত-সবুজ। সোঁ সোঁ শব্দটা হাজার হজার বছর পেরিয়ে। আমরা কফি নিলাম। রিয়া হাসছে। কফির কাপে লেখা, ‘last Christmas I gave you my heart, but the very next day, you gave it away’ (https://youtu.be/T4pTMZuAux4).
ওর হাসির ভেতরে বাষ্প ছিল। ব্যঙ্গ বা করুণার। সোঁ সোঁ। দোকানদার বলল, ম্যাডাম আউর কুছ? আমি কেউ না। রিয়াই সব। সেই কবে থেকে, রিয়াই সব। আমি হাবার মত তাকিয়ে। ‘রাতি কৈনু দিবস/দিবস কৈনু রাতি/বুঝিতে নারিনু সখি/ তোমার পিরীতি।’

#
রিয়াই বলল, কবিদের দুটো জীবন থাকে। তোমার সঙ্গে এরকম না বেরোলে বুঝতে পারতাম না। যাইহোক, অনন্যার খবর কী? এমনভাবে অনন্যার প্রসঙ্গে চলে এল রিয়া যে, আমি অপ্রস্তুত হওয়ার সুযোগটুকু পেলাম না। রিয়া সব জানে, বোঝা যাচ্ছে। কল্পনাতীত যা কিছু তাহলে হতে পারে, হচ্ছে তো! তবে এই রিয়াকে তো আমিও চিনিনা। এতদিন পরে দেখা। ও ডাকল আর আমি চলে এলাম। তুমনে পুকারা ঔর হম চলে আয়েঁ...একটা পৃথিবী যা আমার ছিল আগে। আর এখন আরেকটা পৃথিবী, আমার নয়। অনন্যার। অনন্যা কিছুটা ব্রহ্মাণ্ডের মত, ক্রমপ্রসারমান।আমি ওর বিছানায় যাই, নেমে আসি। অনন্যা তৃপ্ত গলায় মোবাইলে কথা বলে। ওপারে কখনো কাস্টমসের বিতান ব্যানার্জী বা এ.সি.পি রঘুবীরপ্রসাদ, কখনো বা বিজনেস ম্যাগনেট আরিয়ান দা্রুওয়ালা, কখনো মন্ত্রী গিরীন বিশ্বাস। হীরে থেকে মূর্তি, পেইন্টিং থেকে ফসিল অনন্যার নেটওয়ার্কে এপার ওপার করে। আমি, অনন্যার প্রেমিক এখন। আর কবিতা লিখিনা। বিপ্লব মায়ের ভোগে। আমি অনন্যার বিছানায় যাই, নেমে আসি। ওর যোগাযোগগুলোকে পুষ্ট করি। অনন্যা ভোলাপচুয়াস। আমি, ওর কাছে থাকি। ওর কেপ্ট। ও কিন্তু ভালবাসে আমায়। রিয়াকে আমি সরিয়ে দিলাম। অনন্যা এল আমার কাছে, ফিরল না। রিয়া, সোঁ সোঁ শুনছে এখন। আমরা তিস্তায় নেমে এসেছি। বললাম, রিয়া আরেকটা নদী, সুবর্ণরেখা, মনে পড়ছে?
-সেভাবে নয়, ওই ফেন্ট একটা স্মৃতি। ওয়ান লাইনার। তোমার মোবাইল নাম্বার অনন্যাই দিল। শী ইজ ইন শিলিগুড়ি নাও। তুমি জানো না? জানি। আমি জানবো না? বলা যাবেনা রিয়াকে। আমি তো এও জানি আমার একটা নদী ছিল, সুবর্ণরেখা। জামশেদপুর বা টাটানগরে তখন প্রচুর বাঙালি। নাটকের দল। পত্রিকা। আমি কবিতা লিখতাম। রিয়াকে দেখে। না দেখে। জল থেকে পানীয় নিয়ে মেশাতাম আমার ভাষায়। রিয়া নিতে শুরু করল। রিয়ার স্কুটি ছিল আর নাচের স্কুল। পিঠের ব্যাকপ্যাকে নুপূর পুষে রাখতো, আর নিত ভাষার জলে লেখা আমার রোগা দুর্বল কবিতাগুলো। এই নেয়াটা কিন্তু রিয়ার অভ্যাসে ছিলনা।বরং দিত। নানা সময়ের ভাগে রাখা জ্ঞান। আ্মি ওর ন্যাওটা। পাহাড়ের চাতালে শুয়ে আছি। সেই কবে। কালাহারি মরুভূমিতে এখনকার বোৎসোয়ানা অঞ্চলের ‘কুং বুশম্যান’, আমি আর রিয়া। রিয়ার নাম ছিল কুখু। খুকু নয়। ভাষায় ধ্বনির ছেঁড়া ছেঁড়া ভঙ্গী। (https://youtu.be/c246fZ-7z1w) কুখু আমায় ছায়াপথ দেখিয়ে বলত, টাঝু, ওটা হল আকাশের শিরদাঁড়া। রোজই দেখি ছায়াপথ। কালাহারি’র বোৎসোয়া্নায় প্রায়শই ছায়াপথ থাকে মাথার ওপরে। তবে আকাশের শিরদাঁড়া কখনো ভাবিনি।তখনকার রিয়া কুখু ভাবালো।এই যে সমান্তরাল বয়ে চলা আরেকটা দুনিয়া, সময় যেখানে কোনও ‘রক লজিক’ নয়, এগোয় পেছোয়, এটাই আমার জ্বালানি। কুখু আর আমার মাথার কাছে লোহার বর্শা নামানো।আমি ওকে বলি, আজ আমি তোমায় এমন কিছু দেবো, যা তুমি ভাবতেও পারবে না!
কুখু হাসে।
হাসলে আকাশের শিরদাঁড়া ছায়পথও হাসে। ঝিলিক দেয়। আমি বললাম, হাসছ কেন, এই দেখো!
উঠে বসেছে অবাক কুখু।
আমার হাতে জ্বলজ্বল করছে একটা পাথর।
-এটা কী?
- খসে পড়া তারা, তোমার জন্য!
-কোথায় পেলে?
-পেলাম কোথাও
-কী সুন্দর!তারাই তো মনে হচ্ছে। তুমি আমার জন্য এনেছ, টাঝু?
আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কুখু।
সেই লৌহযুগে আমি আর কুখু বুঝতেই পারিনি ১৯৬৭ সালে বোৎসোয়ানার ‘ওরাপায়’ প্রথম হীরে আবিষ্কৃত হবে। হীরেই হয়ে উঠবে বোৎসোয়ানার অর্থনীতির শিরদাঁড়া। এই হীরের জন্যই কালাহারি বুশম্যানদের বাস্তুচ্যুত করার চেষ্টা করা হবে। বুশম্যানরা শিখবে প্রতিবাদের ভাষা।পাশে পাবে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বিভিন্ন গোষ্ঠীকে।
'Save Bushmen' protest targets De Beers store
By Sally Pook
12:01AM GMT 22 Nov 2002
A protest was held outside the new De Beers diamond store in central London last night in protest at the eviction of tribesmen from their homeland in Botswana.
The demonstration was organised by the charity group Survival International, which alleges that De Beers is involved in the forceful removal of Bushmen from the Central Kalahari Game Reserve.
Celebrities attending the opening of the store in Old Bond Street were jeered as they arrived at the launch party. More than 30 protesters opposite the store held placards saying "Botswana, let the Bushmen live".
জীবন কতকিছু পেরোয়, দ্বিতীয় জীবন। আর যা যা হওয়ার ছিল, কল্পনাতীত ভাবে, হতে থাকে। আমি আর রিয়া সময়ের ফুটো দিয়ে এগোচ্ছি এখন। রিয়া থামল লেগশিপে এসে। কাপ্তান রিয়া বলেছে, একদিন দল বেঁধে গাইতে ক’জনে মিলে’ গাইতে। জোরথাং থেকে গাইতে গাইতে এসেছি। এখন রঙ্গীতের জলে ও নামছে। আমিও। ওর সঙ্গে এমনভাবে যেন ছা্যা ভাবে আমায়, যেন বুঝতে পারে রিয়া যে আমি কতটা অনুগত ওর। আমি কতটা লজ্জিত। আমি কেন জামশেদপুরে ভেবেছিলাম রিয়া ফ্রিজিড, জানিনা।ওকে জোর করে একদিন চুমু খাই। জুবিলি পার্কে। উষ্ণ ঠোঁট, তবে? ও আমায় ঘনিষ্ঠ হতে দেয়না কেন? কেন জোর করতে হয় আমায়? অনন্যা তো আমাকেই জোর করে। ওর বাবা, মা বেরিয়ে গেলে আমায় ফাঁকা কোয়ার্টারসে ডাকে। এইতো এখন সাড়া দিচ্ছে রিয়া। অন্ধকারের ঢাকনায় আমরা। আমার সেক্স ড্রাইভ চেগে উঠল। আমি ওর দুপাট্টা সরিয়ে বুকে হাত দিতে গেলাম। রিয়া কেঁদে ফেলল।
-একী, কাঁদছ কেন রিয়া?
-আনন্দে কাঁদছি, হাতটা সরিয়ে নাও, এরপরে যন্ত্রণায় কাঁদতে হবে!
‘হাত সে ছুঁ কে ইসে রিস্তোঁ কা ইলজাম নে দোও’- ষাট দশকের গান। রিয়াও, মনে হল ষাট দশকেরই। আমার হাত সরে গেল। শরীর মন, আস্তে আস্তে।
#
আমি বাঙালি। আমি জামশেদপুরের, আমি কী বাঙালি? এসব মনে হয়নি কখনো। আমার কয়েকজন বন্ধু ফুলের তোড়াকে বলত, গুলদাস্তাঁ। আমি কখনো বলিনি। সুবর্ণরেখা, গঙ্গা, তিস্তা, রঙ্গীত সাক্ষী। আর অনন্যা। ষাট দশকের মানসিকতা নিয়ে চলা, ছোঁয়া এড়ানো রিয়াকে আমিই এড়িয়ে যেতে আরম্ভ করি। অনন্যাকে বাইকের পেছনে বসিয়ে একদিন রিয়কে বলেও দিলাম, গুডবাই রিয়া, ভাল থেকো...
#
-পিকলুদা কী খাবে, থুকপা নিই?
পেলিং। আমি আর রিয়া রেস্তোঁরায়।
রিয়ার মনে আছে, থুকপা প্রিয় আমার। কোনও এক জামশেদপুরী সন্ধ্যায় বলেছিলাম ওকে। তার আগে সোঁ সোঁ , কুখু আর আমি। তার আগে আরো কে কে। কারা কারা। তাদের ভাষা। প্রেম। লড়াই। মৃত্যু। রিয়ার চোখেই শুধু জীবন। আমি তো যা তা কাজ করি। অনন্যার বিজনেস পার্টনার। পোষাকি একটা দোকান আছে, অ্যান্টিকের। পার্ক স্ট্রিটে। অনন্যাদের পারিবারিক। অনন্যার বাবা জামশেদপুরের কাজ ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় ফিরেছিল। অনন্যা বাবার পরে, একমাত্র সন্তান। আর আমি। সারা দুনিয়া জুড়ে নেটওয়ার্ক। বেআইনি লেনদেন। প্রাচীন মূর্তি থেকে, হীরে জহরত। পুঁথি। মুদ্রা আর মেয়ে। পাচার করে দিচ্ছি। রিয়া চলে যাওয়ার পরে আমি অনন্যায় জড়িয়ে গেলাম। না, বিয়ে করিনি। অনন্যা বিশ্বাস করেনা বিয়েতে। রিয়া অনেকদিন পরে মন খুলে হাসছে। কানে ফোন। আমারও ফোন বাজে। আমি বেরিয়ে আসি। বেশ ঠান্ডা বাইরে। আজ কী পূর্ণিমা? ধব ধব করছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। এদিকে ফোনে অনন্যা। চাপা স্বরে বলছে, রিয়াকে ওঠাও। ঘুমের ওষুধ মেশাও ওর গ্লাসে। আজ রাতেই। তোলো ওকে। দীপক রাই আর সরবজিৎ তোমায় সাহায্য করবে। ওরা যাচ্ছে ওখানে। মনে আছে তো, জয়সোয়াল একটা ফ্রেশ মেয়ে চাইছিল....
#
রুথলেস বিজনেস আর আমি। আর সোঁ সোঁ, কুখু, ছায়াপথ, শিরদাঁড়া। আমার আছে তো? আমি রিয়াকে কোন এক জয়সোয়ালের জন্য, নো , নেভার...
#
আইনস্টাইন ১৯১৫ সালে নির্মাণ করলেন, ব্যাপক অপেক্ষবাদ। এর আগে স্থান। কাল, পাত্র ছিল ঘটনা-নিরপেক্ষ একটি স্থির পশ্চাৎপট। অর্থাৎ স্থান, কাল, পাত্রের ভিতর দিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন পথ থাকতে পারে। তবে সেই বিভিন্নতা পশ্চাৎপটটিকে অস্থির করতে পারবে না। আইনস্টাইন প্রমাণ করলেন মহাকর্ষ স্থান, কাল, পাত্রের একটি বিকৃতি মাত্র। মহাকর্ষের ভেতরে ‘বল’ যেমন রয়েছে, রয়েছে ‘শক্তি’ও। আলো সাধারণত সরল রেখায় যায়। আবার স্থান আর কালের বক্রতা সূর্যের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আলোকে অসরল করে তোলে। বেঁকে যায় আলো। আলোর সরলরৈখিক সত্যটি ভেঙে পড়ে। আর আমি প্রস্তর যুগ থকে লৌহ যুগ হয়ে নিউক্লিয়ার এনার্জির যুগে যাতায়াত করি। বাঁকা শ্যাম হয়ে। কালের বাঁশি বাজাতে বাজাতে। আমি কবিতা লিখতাম। আমিই আবার পাচারকারী। কনট্রাস্ট। রিয়া আবার যেদিন বলল, চল পিকলুদা তোমায় আবার পেয়েছি যখন , পেলিং যাই। রিয়ার জিনস, জ্যাকেট, হেলমেটে আহ্বান। ফ্রিজিড, কেন ভেবেছিলাম ওকে?
#
ফিরে আসি রেস্তোরাঁয়। রিয়ার সামনে বসে আছে দীর্ঘদেহী সুদর্শন একজন। রিয়া মামার দিকে তাকিয়ে বলল, এসো পিকলুদা পরিচয় করিয়ে দিই। আকাশ মালহোত্রা। আমার বয়ফ্রেন্ড। এয়ার ফোর্সে, ক্যাপটেন। আমি ওর সঙ্গে এখনই চলে যাবো ইয়ুকসাম। আমি তোমায় এনেছি যাচাই করতে, হাউ ইজ হি, পিকলুদা? ভ্রু নাচিয়ে জিগগেস করে রিয়া।
#
‘...কড়ির মতন শাদা মুখ তার,
দুইখানা হাত তার হিম;
চোখে তার হিজল কাঠের রক্তিম
চিতা জ্বলেঃ দখিন শিয়রে মাথা শঙ্খমালা যেন পুড়ে যায়
সে আগুনে হায়।

চোখে তার
যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার!
স্তন তার
করুণ শঙ্খের মতো- দুধে আর্দ্র- কবেকার শঙ্খিনীমালার!
এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।‘ (শঙ্খমালা/ জীবনানন্দ দাশ)
এতটা ভাবিনি আমি। এত কাব্যিক ছিলনা ভাবনারা। রিয়া আমায় ‘গুডবাই’ জানিয়ে আকাশ মালহোত্রা’র সঙ্গে চলে গেল ইয়ুকসাম। কাল থেকে ওদের গোচালা ট্রেকিং।যেভাবে আমিও একদিন অনন্যাকে বাইকে বসিয়ে চলে গিয়েছিলাম, ‘গুডবাই’ করে রিয়াকে।
#
তবে আমি আর অর্থময় জীবনে ফিরে যেতে পারবো না। অনন্যা খুঁজবে আমায়। না, মারবে না। ও ভালবাসে আমাকে। বা মেরে ফেলবে ওই ভালবাসে বলেই। আমার আর কোনও পিছুটান নেই। বাবা, মা, রিয়া, অনন্যা।কেউ নেই। সোঁ সোঁ, কুখু কী পিছুটান? একটা অসম্ভব বাঁকের কথা আমি জানি। যেখানে কুয়াশা ময়াল হয়ে জড়িয়ে থাকে পাইনের গুঁড়ি। সেই বাঁকে আমি ছোট্ট একটা দোকান দেবো। চা, কফি, টোস্ট, অমলেট, নুডলস আর মো মো! সেই দোকান রোজই ডুবে যাবে কুয়াশার ভেতরে। তাকে টেনে তুলবে সময়ের বক্রতা থেকে চলে আসা কণিকা-কণিকা আলোগুলি। আমি এসবই দেখবো। আর বেঁচে থাকবো।
‘some say the ground is unstable
others the earth is round
for some it is a stone
I say the earth is pourous and we fall constantly’ (পিটার গিজ্জি)