উড়োপ্লেন

জিল্লুর রহমান সোহাগ


ভেঙ্গেচুরে যাওয়া রাস্তাঘাটের সংস্কারকার্যের পাশাপাশি এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট-বড় জঙ্গলা কেটে একেবারে সাফ সুতরো করে যেদিন বসতি নির্মাণ শুরু হলো সেদিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিলো অজোপাড়া গাঁ বলে খ্যাত পুরাতন বাখরবা গ্রামের দুর্নামটা এবারে ঘুচতে শুরু করছে। সেই পালে হাওয়া দিলো পল্লিবিদ্যুত ও পিচের রাস্তা। অথচ একসময় নাকি বর্ষাকালে এই এলাকাটা পুরোপুরিই অন্যান্য এলাকা থেকে হয়ে পড়তো বিচ্ছিন্ন; বড়ো বড়ো সব খুনে-অপরাধীরা অপরাধ করে এই গ্রামে এসে গা ঢাকা দিতো। কারণ পুলিশের সাধ্য ছিলো না এ্ই ভাঙ্গা-চোরা রাস্তাঘাট ও হাটুসমেত কাদাজল পার হয়ে অপরাধীকে খুঁজে বের করার। তবে এখানকার পলিবিদ্যুতের আসি আসি যাই যাই স্বভাবের সাথে এতোদিনে গ্রামবাসীদের সবাই মোটামুটি অভ্যস্ত হতে শিখে গেলেও লোডশেডিংয়ের রাতে গ্রামজুড়ে নেমে এলে বুনো মোষের মতো ঘন কালো অন্ধকার তারা বিকল্প আলো জ্বালবার আলসেমিটা কাটিয়ে উঠতে পারে না। সেকালের চেরাগে সলতে পরানো বিদ্যা কিংবা হারিকেনের কাচ মোছার বিদ্যাটা তো সেই কবেই তারা বিস্মৃত হয়েছে। অন্ধকারে তারা বরং পরষ্পর পরষ্পরের পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকে। আর যারা অন্ধকারের ভেতর একদন্ড স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না তারা তাদের শক্ত আন্দাজ ও পুরোনো অভ্যস্ততার উপর ভর করে বাইরে বেরিয়ে আসে হাওয়া খেতে।
লোডশেডিংয়ের রাতে গ্রামে ঢোকার মুখে রাস্তার তেমাথার খানিকটা নিচে মাসুদের দোকানের সামনে পেতে রাখা ক্যারামবোর্ডে ক্যারাম খেলতে আসা লোকজনও ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে বিদ্যুত কর্মকর্তার মা-বাবা চৌদ্দগুষ্টি তুলে গালি দ্যায়। বৃষ্টিপাতহীন শ্রাবন মাসের ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ লোকজন তখন খেলা থামিয়ে মেতে ওঠে খোশ-গল্পে। তাদের বিভিন্ন কথা প্রসঙ্গে তুফানের নাম বেশ কয়েকবার উচ্চারিত হয়। দোকানের ছোকড়া দোকানদার মাসুদের কণ্ঠে উঠে আসে তুফান বিষয়ক গুটিকয়েক স্মৃতিকথা। সবাই একবাক্যে স্বীকারও করে নেয় যে তারা তুফানের বয়সী এমন তুখোড় ক্যারাম খেলোয়াড় জীবনেও দ্যাখে নি।
তাদের মনে পড়ে যায় গতবছর শ্রাবণ মাসের বারো তারিখে পুরাতন বাখরবা গ্রামে ঘটে যাওয়া একটি বিশেষ ঘটনার কথা। তার ঠিক একদিন আগে দুপুরের কিছুটা আগে গ্রামের উপর দিয়ে বিকট শব্দ করে উড়ে যাওয়া একটা বড়োসড়ো উড়োপ্লেন দেখে সবাই আতংকিত হতে হতে ভাবছিলো নিশ্চিত এটা কোন গাছ-গাছালির সাথে ধাক্কা খেয়ে কারো না কারো বাড়ির উপর আছড়ে পড়বে। আর তাতে করে সংঘটিত বিস্ফোরণে বাড়িঘর পুড়ে যাবার সাথে সাথে ঘটতে পারে প্রানহানীর মতো দূর্ঘটনা। কিন্তু এসবের কিছুই ঘটেনা। শুধুমাত্র উড়োপ্লেনটা উড়ে দূরে চলে যাবার পর গ্রামের মানুষগুলোর কানে বহুক্ষণ ধরে লেগে থাকে সেই বিকট শব্দের অনুরণন। ধুকপুক করে বুক কাঁপে, পাশের জনের সাথে তারা তাদের সেই মুহূর্তের মানসিক অবস্থার কথা জানাতে গিয়ে পরক্ষণে আবার নিজেকে গুটিয়ে নেয় এই ভেবে যে এই দু:সহ অভিজ্ঞতার শিকার কোন বিশেষ ব্যক্তি নয় বরং গোটা গ্রামবাসীকে বাধ্য হয়েই হতে হয়েছে। ঐদিন তারা সবাই জড়ো হয়েছিলো রাশেদার বাড়ির উঠোনে। প্রতিবেশী মহিলাদের বেশীরভাগেরই ছাপা শাড়ির আঁচল মাথা ও মুখমন্ডল পেঁচিয়ে আটকে ছিলো তাদের প্রত্যেকের দু’পাটি দাঁতের মাঝখানে; তারা সবাই উঠোনের একেবারে মাঝখানে একটি কাঠের চৌকির উপর শোয়ানো তুফানের মৃতদেহ দেখে গোচরে-অগোচরে দু একফোটা জলও ফেলেছিলো। অথচ তুফানের মা রাশেদার চেহারায় ছেলে মরে যাবার জন্য কোন প্রকার শোকের চিহ্নও দেখা যাচ্ছিলো না। গ্রামবাসীদের কেউ কেউ উচ্চু-অনুচ্চ-ফিসফাস করে বলছিলো তুফানের প্রতি সত্যিকার অর্থেই রাশেদার কোন সন্তানসুলভ মায়া মমতা ছিলো না কেননা বেশীরভাগ দিনই তাকে দ্যাখা যেতো চেলা কাঠ কিংবা বাঁশের কঞ্চি হাতে নিয়ে তুফানকে রাস্তায় রাস্তায় তাড়া করে ফিরতে এবং ধরা পড়বার পর তাকে বেধড়ক মারপিঠ করতে;

আবার কেউ কেউ বলছিলো বেচারী এমনিতেই পাগলী, তার উপর ছেলের শোকে স্বাভাবিক বোধবু্দ্ধি হারিয়ে ফেলেছে, হয়তো তার ছেলে যে মারা গ্যাছে এটাই সে বিশ্বাস করছে না কিংবা হয়তো এমন মনে হচ্ছে যে তার কখনোই কোন ছেলেপুলে ছিলোনা।
কিন্তু হঠাৎ হঠাৎই তাকে দেখা যাচ্ছিলো পাথরের মতো স্থির চোখে বাড়িভর্তি লোকজনের দিকে ফিরে ফিরে তাকাতে। অনেকেই তখন স্বপ্রনোদিত হয়ে তাকে স্বান্তনা দেবার উদ্দেশ্যে এগিয়ে এলে তার চোখেমুখে ফুটে উঠছিলো ক্ষোভের সাথে সাথে তীব্র এক প্রকার বিরক্তির ছাপ। অথচ এইসব কৌতুহলপ্রিয় মানুষগুলো কিছুতেই বুঝতে পারছিলো না যে এই মুহূর্তে রাশেদার বাড়িতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারা কেবল রাশেদার বিরক্তিটাই বাড়িয়ে তুলছে। তুফানের জানাজা নিয়ে তখনো পর্যন্ত কোন সুরাহা হয় নি। গ্রামবাসীদের মনের ভেতর জেগে উঠতে শুরু করেছিলো বহুকাল ধরে সন্তর্পনে লুকিয়ে রাখা তুফানের জন্মবিষয়ক এক গোপন সংশয়। আকাশে লেগেছিলো বর্ষার কালো ছাই, একটু পর পর হাওয়ার সাথে ভেসে আসা বৃষ্টিকনা ও বুনোঘ্রাণ এই উঠোনজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে করে তুলছিলো বিছানা ও গরম কাঁথা অভিমুখী। গ্রামের লোকজন বলাবলি করছিলো মৃত্যুর আগে তুফান একজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই কথা বলা শুরু করেছিলো অথচ এর আগে কেউই তার কথার পুরোপুরি মর্মোদ্ধার করতে না পেরে তার কথার সাথে সাথে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইশারা মিলিয়ে মোটামুটি একটা অর্থ করে নিতো।
তুফানের মা রাশেদা জন্মগতভাবেই বাকপ্রতিবদ্ধী হওয়ায় গ্রামবাসীদের সম্ভাষণে তার রাশেদা নামটি এক প্রকার হারিয়েই গিয়েছিলো। সবাই তাকে ডাকতো ‘ঘুঙ্গি’ বলে। সুতরাং তুফানের জন্মের পর যারা মনে মনে কিঞ্চিৎ আশা করেছিলো যে তুফান তার মায়ের মতো বাকপ্রতিবদ্ধী হবে না তাদেরকেও একসময় হতাশ হতে হলো। অবশ্য তারা মনে মনে একটা সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিলো যে শিশুরা মুলত কথা শেখে মায়ের কাছ থেকে, এক্ষেত্রে রাশেদার ছেলে রাশেদার মতোই বাকপ্রতিবদ্ধী হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কয়েক বছর পরই দেখা গ্যালো তুফান তার মায়ের মতো শুধু বাকপ্রতিবদ্ধীই নয় বরং শ্রবণ প্রতিবদ্ধীও। রাশেদা তার ছেলেকে সম্মোধন করতো ‘তুপ্পান” বা কাছাকাছি কিছু একটা বলে। গ্রামবাসীরা তাদের শোনা এই ‘তুপ্পান’ নামের অর্থ বের করতে না পেরে অবশেষে একমত হয়েছিলো যে মুলত ‘তুফান’ নামটিই উচ্চারণ বিকৃতিতে শোনাচ্ছিলো ‘তুপ্পান’। তাছাড়া গ্রামের লোকজন যখন বেপরওয়া হয়ে উঠেছিলো তুফানের জন্ম বৃত্তান্ত জানার জন্য তখন এই নামকরণটাকে সেই প্রশ্নকাতর মানুষগুলোর শ্যেন দৃষ্টিকে রুখে দেবার রাশেদার একটা প্রতিকি প্রচেষ্টাও বলা যেতে পারে।
শরীরে মৃত্যুর ইঙ্গিতটা পুরোপুরি স্পষ্ট হবার সাত-আট মাস আগে তুফানের পাগলামীটা শুরু হয়েছিলো শরীরের জায়গায় জায়গায় পালক উঠে যাওয়া ও মোটামুটি বদসুরত এক ঘুঘু পাখিকে নিয়ে। এই ঘুঘু পাখিটাকে দেখলে মোটেও তার পালক নেড়ে চেড়ে দেখবার মতো আদিখ্যেতা করতে ইচ্ছে হবে না, উল্টো জ্বরের মতো এক ধরণের বিশ্রী অসুস্থতা চোখ দিয়ে ঢুকে ছড়িয়ে পড়বে সারা শরীরে। তুফানকে দিনের বেশীরভাগ সময়ই দেখা যেতো পাখিটিকে কাঁধে বসিয়ে টো টো করে এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বেড়াতে এবং হাতের মুঠোয় রাখা চাল-গম বা শস্যকনা একটু পর পর পাখিটির ঠোঁটে পুরে দিতে। পাখিটিও ঠিক পোষ মেনেছে কি না দূর থেকে ঠাওর করা যেতো না, তুফানকে আকার ইঙ্গিতে পাখিটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ করে অস্পষ্ট ভাষায় যা বলতো তার ছাইভস্ম কিছুই বোঝার উপায় ছিলো না। হতে পারে গ্রামবাসীদের এই প্রশ্নোত্তর এড়াতে সে ইচ্ছে করেই এসব করতো।




তারও ঠিক এগারো বছর আগের কোন এক দুপুরে ফুলে ওঠা একটা বড়োসড়ো ঢাউস পেট নিয়ে রাশেদা পুরাতন বাখরবা গ্রামে ফিরে এলে অনেকের মনেই কৌতূহল জাগে যে সে সন্তানসম্ভবা কি না। অনেকেই দফায় দফায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার আসল বৃত্তান্ত খুঁড়ে বের করার চেষ্টা করে কিন্তু রাশেদা এটাকে শুরু দিকে পেটের অসুখ বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও শেষমেশ সত্যটা ঠিকই নিয়ম মেনে তার স্ফিত পেটের সাথে সাথে প্রকাশিত হতে থাকে।
গ্রামবাসীরা শুধু এটুকু নিশ্চিত হতে পারে যে রাশেদা সন্তানসম্ভবা কিন্তু এর পেছনের কারণটা তাদের অজানায় থেকে যায়। তারা ভেবে নেয় যে হয়তোবা কোন বদমাশ ভুলিয়ে ভালিয়ে এই পাগলী মেয়েটার এমন সর্বনাশ করে পালিয়ে গ্যাছে। অথচ রাশেদাকে তা নিয়ে মোটেও বিচলিত হতে দেখা যেতো না। সে বেশ গর্ব করেই বলতে শুরু করেছিলো যে সে কিছুতেই তার পেটের বাচ্চাকে নষ্ট করবে না বরং তাকে বড় করে তুলবে পেলে-পুষে।
এরপরও কেউ অতি উৎসাহী হয়ে হাবে-ভাবে বাচ্চার জন্মদাতা প্রসঙ্গে কথা তুলতে গেলেই রাশেদার চোখের ভেতর জ্বলে উঠতো এক বুনো আগুন আর প্রশ্নকর্তারাও সেটির উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে মুহূর্তে কুলুপ এঁটে নিতো মুখে। কারন তারা জানতো যে পাগলের ভবিষ্যত ভাবনা নেই বলেই তারা যেকোন দূর্ঘটনা ঘটাবার অধিকার পায় প্রকৃতি থেকে।
এদিকে তুফানের ঘুঘু পাখিটিও পড়েছিলো বিপত্তিতে। সেবার পেটের ব্যথায় প্রায় সপ্তাহ দুয়েকের মতো বিছানায় পড়ে থাকতে হলে ঘুঘুপাখিটিও হয়ে পড়েছিলো অভিভাবকহীন। বাঁশ দিয়ে বানানো একটা ছোট খাঁচায় পাখিটিকে আটকে সেটাকে সারাদিন ঝুলিয়ে রাখা হতো রাশেদার টিনে ছাওয়া ঘরের লাগোয়া বারান্দার এক কোনায়। তুফানের চেঁচামেচিতে অতিষ্ট হয়ে রাশেদা হয়তোবা মাঝে মাঝে দু একমুঠো চাল, গম বা কয়েকদানা ভাত পাখিটির সামনে রাখতো, কিন্তু পাখিটার ভেতর সেসব খাবার জন্য কোনপ্রকার আগ্রহ দেখা যেতো না। গ্রামের সবেধন নীলমনি রফি ডাক্তারের চেষ্টায় শেষমেশ তুফানের পেটের ব্যথা সাময়িকভাবে দূর হলে সে এবার ঘুঘু পাখিটিকে নিয়ে নতুন আরেক খেলায় মেতে উঠলো। গ্রামের অনেকেই তাকে দেখতে পেলো যে সে বাড়ির উঠোনে কিংবা বারান্দায় বসে পাখিটাকে কথা শেখানোর আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছে, কথা বলতে অবশ্য তার নিজের নামটাই বারবার কসরত করে পাখিটার সামনে উচ্চারণ করছে। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে পাখিটার ঠোঁটে আঙ্গুলের টোকা দিচ্ছে কিংবা রেগে গিয়ে একহাতে পাখিটার একটা ডানা উচু করে ধরছে শূন্যে।
তুফানের জন্ম হয় শ্রাবণ মাসের কোন এক ছিঁচকাদুনে বৃষ্টির দুপুরে যেদিন এই গ্রামের বেশীরভাগ মানুষই মনে মনে প্রচন্ড রকমের বিরক্ত ছিলো, কেননা এমন বৃষ্টির ভেতর না যাচ্ছিলো ঘর থেকে বাইরে বেরুনো আবার না যাচ্ছিলো ঠুটো জগন্নাথ হয়ে ঘরে বসে থাকা। তুফানের পুরুষাঙ্গের ডগা দিয়ে সব সময় ফোটায় ফোটায় পড়তে থাকা প্রস্রাবে লেগেছিলো সেই ছিঁচকাদুনে বৃষ্টির চিহ্ন। রাশেদা কম ডাক্তার কবিরাজ করে নি কিন্তু কিছুতেই প্রস্রাব পড়াটা বন্ধ হয় নি। কেউ কেউ বলেছে খৎনা দিলে ঠিক হয়ে যাবে, রাশেদা সেই আশায় ঢাকঢোল পিটিয়ে খতনাও দিয়েও ফলাফল ছিলো ঠিক আগেরই মতোই।
সাধারণত পোষ মানাতে হয় বাচ্চা পাখিদের। একবার আকাশ চিনে ফ্যালা পাখিকে শত আদর দিয়েও পোষ মানানো যায় না। পাখিরা বোধহয় জানে ভালোবাসার চেয়ে স্বাধীনতা কিংবা অংশিদারিত্বের টানটা প্রবল। তুফানের পাখি পোষার এই প্রচেষ্টা তাই শুরুই থেকেই ছিলো অনিশ্চিত। পাখিটি কোথাও, কারো দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সৌভাগ্যক্রমে তুফানের হাতে পড়েছিলো। সে নিজে পাখিটিকে সেবা শ্রুশ্রুষা করে মোটামুটি সুস্থ করে তুলেছিলো।

উড়তে পারতো না বলেই হয়তো পাখিটি তুফানের কাঁধের উপর অমন পোষমানা পাখির মতো চুপ করে বসে থাকতো। একদিন তাই তুফানের গগন বিদারী চিৎকারে পাড়া-প্রতিবেশীরা তাদের বাড়ির উঠোনো জড়ো হলে জানতে পারে যে তুফানের পাখিটা হারিয়ে গ্যাছে। রাশেদাকে দেখা যায় একটু পর পরই ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে শক্ত পাটকাঠি হাতে তুফানের দিকে ছুটে এসে সপাট সপাট করে তার পিঠে আঘাত করতে। তা দেখে উপস্থিত অনেকেরই ছেলেটার জন্য মায়া হয়, তাদের ভেতর কেউ একজন রাশেদার হাতে থেকে পাটকাঠি কেড়ে নিয়ে নিষেধ করে ছেলের গায়ে হাত তুলতে। পাগল ছেলেটির অমন কান্না দেখে কেউ একজন স্বান্ত্বনা দেয় যে পোষা পাখি দু’একদিনের জন্য উড়ে যায় কিন্তু আবার মায়ার টানে ঠিকই ফিরে আসে। কিন্তু একদিন দু’দিন করতে করতে পাখিটিকে আর ফিরে আসতে দেখা যায় না। পাখির শোকে তুফান সারাদিন মনমরা হয়ে বসে থাকে। কেউ ডাকলে আগের মতো কথা বলে না।
একসময় স্থানীয় তাতের শাড়ির বিক্রেতা হিসেবে আশপাশের এলাকায় রাশেদার বেশ নামডাক ছিলো। গ্রামে গ্রামে ঘুরে সে মেয়ে ও বউঝিদের কাছে বিক্রি করতো তাতের শাড়ি। সে সময় তার চেহারার জেল্লার সাথে সাথে পোষাক-আশাকেও ঝরে পড়তো চমক। মুখ দিয়ে কথা বের হবার আগ পর্যন্ত জানার জো ছিলো না যে সে বাকপ্রতিবন্ধী। আচার আচরণে পাগলামীর ছাপ থাকলেও তার ব্যবসায়ী বুদ্ধি অন্যান্যদের থেকে কোন অংশে কম ছিলো না। কিন্তু তুফানের জন্মের পর পরই সে ব্যবসা ছেড়ে হঠাৎ করেই শুরু করলো ভিক্ষাবৃত্ত্বি। সেই সাথে তার মুখমন্ডলের উজ্জ্বলতা সরে গিয়ে সেখানে স্পষ্ট হতে শুরু করলো বয়স ও মলীনতার ছাপ। শুরুর দিকে সে তুফানকে সংগে করে নিয়ে যেতো। এরপর তুফানের বয়স যখন চার কি পাঁচ তখন গ্রামবাসীরা দেখলো রাশেদার চেহারায় সেই পূর্বাপর জেল্লাটা ফিরে আসতে শুরু করেছে কদিনের ভেতরই যা রুপ নিলো আগের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল ও প্রকট। অনেকেই তখন ঠারে-ঠুরে বলতে শুরু করলো যে কেবল নতুন বিয়ে হলেই মেয়ে মানুষের গা-গতর থেকে এমন সোনারং ঝরে পড়ে। তখন রাত বিরেতে গামছায় মুখ ঢেকে তার বাড়ির আশপাশ দিয়ে মানুষের আনাগোনা দেখা যেতো বলেও এমন গুজব বেশ কিছুকাল এ এলাকায় প্রচলিত ছিলো।
প্রতিদিন সকালে তুফানের কোমরের সুতোয় বড়োসড়ো চাবির গোছা বেঁধে দিয়ে এসময় নিয়মিতই তাকে একা বের হতে দেখা যেতো বাড়ি থেকে। তুফান তখন একা একা কিছুক্ষণ বাড়ি পাহারা দিতো, রাশেদার অনুপস্থিতি নিশ্চিত হবার পর পরই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঘুরে বেড়াতো এপাড়া -ওপাড়া। কখনোবা পুকুরের ধারে বসে একা জলপোকাদের নাচ দেখতো কিংবা কারো ফুটফরমায়েশ খাটতো, মাসুদের ক্যারামবোর্ডের দোকানে দিনভর ক্যারাম খেলতো কিংবা বাঁদরের মতো তরতর করে সুপারি গাছে উঠে সুপারি পেড়ে দিতো কারো।
একারণে জন্মগতভাবেই নাজুক দু’টি কিডনি একসময় সম্পূর্ণরুপে তার দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানালে তাকে যখন বাধ্য হয়েই ঘরবন্দি হতে হয় তখন শারিরীক যন্ত্রনার চেয়ে বাইরের মুক্ত পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতে না পারার অক্ষমতা তাকে করে তোলে আরও বেশী কাতর। রফি ডাক্তারের সমস্ত হাতুড়ে বিদ্যা তখন তার যন্ত্রনা নিরসনে হয়ে পড়ে অপারগ। তবে তুফানের জন্ম দিয়ে সংশয়ে ভুগতে থাকা গ্রামবাসীরাও কেন জানি এক অদ্ভুত কারণে তুফানের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করে না। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও আর্থিক সহায়তায় তুফানকে উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয় শহরের বড় হাসপাতালে। প্রকৃতিও তেমন তার চিরাচরিত রীতি ভেঙ্গে কোনপ্রকার মিরাকেল দেখাবেনা বলেই শামুকের মতো শক্ত খোলস এঁটে নিয়ে নির্বিকারে সরল সমাপ্তির পথটাকে ত্বরান্বিত করে।



গত বছরের এগারোই শ্রাবণ রাতে পুরাতন বাখরবা গ্রামে নামে এক অলৌকিক ঠান্ডা হাওয়া; সেই হাওয়ার তোড়ে রাশেদার বাড়ির সিমানা পেরিয়ে বাঁশবন, তার একটু সামনে পুকুর ও পুকুরের ওপাড়ের ছোটখাটো এক জঙ্গলা ফুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সোনালু গাছের এক প্রকান্ড ডাল হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে। রাশেদা মনে হয় এতোক্ষণে তার বুকে চেপে বসা প্রকান্ড পাথরের অসতিত্ব টের পায়। ঐ শূন্য উঠোন, উঠনের নাইলনের দড়িতে ঝুলানো তুফানের দুটো জামা ও একটি প্যান্ট দেখে হু হু করে ওঠে বুকের ভেতর। একটা সাদা রংয়ের বিড়াল মিউমিউ শব্দ তুলে বারান্দা পেরিয়ে চলে যায়, একটু পর পর গুড় গুড় করে মেঘ ডাকে, বাড়িময় ঘুরে বেড়ানো হাওয়ার ভেতর রাশেদা শুনতে পায় অনেক মানুষের ফিঁসফাঁস। রাশেদা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, কিন্তু তার কান্নার আওয়াজ বাড়ির সিমানা পেরোতে পারে না। ঐদিন দুপুরে গ্রামবাসীদের মাথার উপর দিয়ে বিকট শব্দে একটি উড়োপ্লেন উড়ে যাবার কিছুক্ষণ পরেই তুফানের মৃত্যু হয়। অনেকেই তখন বলে যে ঘুঘু পাখি উড়ে যাবার পরপরই তুফানের চোখে-মুখে ফুটে উঠতে শুরু করেছিলো মৃত্যুর নানা রকম উপসর্গ। একারণেই চেনা-পরিচিত জগত থেকে বোটা ছিড়ে সে ঢুকে পড়েছিলো সম্পর্ণ একক, জনবিচ্ছিন্ন এক জগতে।
শেষের দিকে চোখের ভেতর মৃত্যুর ভয়াবহতা নিয়ে তুফান বিছানা থেকে উঠে মাঝে মাঝেই চুপচাপ বসে থাকতো ঘরের বারান্দায় চেয়ার পেতে। তার পেটের সাথে পাল্লা দিয়ে ফুলে উঠতে শুরু করেছিলো চোখ ও মুখমন্ডল। ক্ষীণ আয়ুর প্রানিরা যেমন অল্প জীবদ্দশায় তাদের পূর্ণচক্রটা সম্পন্ন করে ফ্যালে তেমন তুফানের বয়সটাও বাড়তে শুরু করেছিলো ধাই ধাই করে। শেষদিকে তাকে দেখাতো একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মতো।
তুফানের মৃত্যুর ঠিক পরের দিন, মানে বারোই শ্রাবণ রাশেদার ডাকাডাকিতে প্রতিবেশীদের অনেকেই আগের দিনের মতো তার উঠোনে জড়ো হয় এবং তারা সবাই একযোগে রাশেদার শোবার ঘরে টিনের চালে শরীরের জায়গায় জায়গায় পালক উঠে যাওয়া এক ঘুঘু পাখিকে দেখতে পায় এবং তুফানের সেই ঘুঘু পাখিটিকে তাদের চিনতে মোটেও ভুল হয় না। রাশেদা তখন আকার ইঙ্গিতে তাদেরকে পাখি প্রসঙ্গে যা বলে তার ছাইভস্ম কিছুই তাদের মাথায় ঢোকে না। তবে পাখিটা দেখার পর উপস্থিত কারো কারো ভেতর অনুশোচনা, আবার কারো কারো চোখ মমতা ও সহানুভূতিতে আর্দ্র হয়। রাশেদাকে দেখা যায় একটু পর পরই তুফানের নাম ধরে বিলাপ করে কাঁদতে। প্রতিবেশীদের কারো কারো মনে হয় রাশেদার বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় তারা আচমকায় বেশ কয়েকবার ঘুঘু পাখিটাকে স্পষ্ট ভাষায় তুফানের নাম ধরে ডাকতে শোনে। কিন্তু তারা এটাকে হয়তোবা তখন মনের ভুল বলেই ধরে নেয়। এরপর গ্রামবাসীদের কেউ কোনদিন ঘুঘুপাখিটাকে কোথাও আর কোনদিন দেখেছে কি না সেটার স্পষ্ট কোন প্রমান না মিললেও তুফান যে শেষমেশ পাখিটাকে কথা শেখাতে পেরেছিলো অল্পসময়ের ভেতরই এটা একসময় গুজব থেকে সত্য এবং তা থেকে গ্রামবাসীদের বিশ্বাসে পরিণত হয়।
এর কিছূদিন পর এক সকালে গ্রামবাসীদের অনেকেই রাশেদাকে এগারো বছর আগেকার মতো রং চংয়ে শাড়ি পরে সেজেগুজে বাড়ি থেকে বের হতে দ্যাখে। তাদের ক্যানো জানি মনে হয় এবারো হয়তো তারা দেখবে রাশেদা আগের মতোই ঢাউস একটা পেট নিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছে।




বিদ্যুত চলে এলে মাসুদের দোকানের ক্যারামবোর্ড খেলা মানুষগুলো তাদের আলাপ-আলোচনা থামিয়ে আগের মতোই খেলায় লিপ্ত হয়। দোকানের ঠিক পাশের ডোবায় একটা কোলাবাঙ্গ ডেকে ওঠে শব্দ করে সেই সাথে ডোবার ওপর পাশের বাঁশবনের অন্ধকার থেকে ভেসে আসে হুতোম পেঁচার ডাক। ক্যারামবোর্ড ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকের ভেতর থেকে কেউ একজন হাই তুলতে তুলতে আক্ষেপের সুরে বলে যে শ্রাবন মাসে ব্যঙ্গ ডাকলেও আজকাল আর বৃষ্টি-বাদল হয় না।