দার্জিলিঙের রাত্রিগুলি

শিবু মণ্ডল


১।।
কুয়াশার পাকদণ্ডী থেকে বেরিয়ে এসে আলেখ্যরা কথা বলতে চায়
অনুমতি নিয়ে পাহাড়ের বিস্তারে উঠে যায় পাইনের সারি
ঘন থেকে ক্রমশ ঘনতর হয়ে ওঠে তার সবুজ ভালোলাগাগুলো
ভেজা সন্ধ্যার প্রস্তাবে মেঘ নেমে যায় চক্‌বাজারের ঢালে!

তুমি আছ বলে সাথে এখনো ষ্টেশন-রাস্তাটি যায়নি হোটেলের দিকে
প্রচলিত পথ ছেড়ে রাত্রি এগোয় ধীর পায়ে চড়াই নির্জনে
তুমি আছ বলে সাথে পাহাড়ি রাত সচেতনে ঘুমিয়ে পড়ে!

হিমকণার স্পর্শে কাঁপে তোমার আনোখা ইশারা
তখন যাপন ভাষাহীন,ধ্বনিমাঝে বিরতি, বিনীত সংরাগে
হোটেল রুমের বাতি ডাকে আয়…
আয় এখনো উষ্ণতা আছে বাকি- ফায়ার প্লেসের আগুনে!

আমরা কথা হারাই,হারিয়ে যাই। আমরা খুঁজে চলি, খুঁজে পাই
পথ ! পাকদণ্ডী পথ ! পথ ! বিগতভোরের স্বপ্নে দেখা পথ...

২।।
এখন রাত্রির সামুহিক নীরবতা।এখন শহরের ইচ্ছানুসারে
কোনও ভ্রমণবিলাসীর যাওয়া নেই,কোনও ভ্রমণবিলাসীর আসাও নেই
শহরের এমন মৌনী আলোয় গিরীশ তামাং মৌনী নয়।
গিরীশ তামাং ড্রাইভার-কাম-গাইড। মারুতি ওমনি উড়িয়ে
যে আমাদের দিন শুরুর আগেই পৌঁছে দিয়েছিলো টাইগারহিল।এখন
বাক্‌-হারা রাত্রির শুরুটুকু ওর! এখন ম্যাল রোডের ব্যতিক্রমি সুর
ওর গিটারের তারে এসে ভিড় করে। আহ্‌! কোথায় চড়াই, কোথায় উতরাই,
এ যেন কস্‌মিক হারমনি পাহাড় জুড়ে !
এ যেন সমস্ত পথহারাদের মহা শোক সম্মেলন
শহর জুড়ে। আমি হারাই,তুমি হারাও,
গিরীশ তামাংও ঘরের পথ হারায় ইচ্ছে করেই...

৩।।
স্টেশনের কারশেডে যোগনিদ্রায় হেরিটেজ ইঞ্জিন। কুহ্‌হ্‌...... ফুক্‌ ফুক্‌ দিনভর
অনুলোম বিলোমে ক্ষমতা বাড়ায়। প্রাণে বায়ু ধরে ধরে হাঁটু ভেঙে ওঠে নামে
বাতাস পুড়িয়ে বুকে বেলচায় ঠেলে দেয় কালো মেঘ আগুনের মুখে যে-
সে বিজন লামা। এই পাহাড়েই কোনো গ্রামে আছে তার বাড়ি
যেহেতু সেখানে হেরিটেজ রাত্রি নেই, সেহেতু সে রয়ে যায় এই খবরবিহীন,
ট্রেনেদের আনাগোনাহীন ষ্টেশন বাড়িটিতে। কয়লার মত রাত্রি
যত ঘন হয় তত সে মায়ায় পড়ে ঘুমিয়ে থাকা যান-শব্দের,
ততই সে মায়ায় পড়ে যায় নিজমুখে ইতিহাস না বলা বাড়িটির
ঘরে ফেরার পথ এসে দেখা করে যায় বাতাসিয়া লুপে।

আমি তুমি ফিরে আসি হোটেলের ঘরে কথা কুড়োতে কুড়োতে।
ফেরার পথ ভুলে বিজন লামা ঢুকে পড়ে লাল বাড়িটিতে।