একটি কবির সুইসাইড নোট

দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়


আমার হাত ফেটে পুঁজের মত নেমে যাচ্ছে ভাষা -পৃথিবীর ছেঁড়া ফাঁটা ফুটোগুলোর দিকে।যেহাত দিয়ে একদিন আমি প্রেমের কবিতা লিখেছিলাম অনেক সুন্দরী মহিলাদের সাথে যৌনসম্পর্ক চাই বলে। আমি, অন্য কবির লাইন ঝেড়ে,উল্টেপাল্টে ছোট বয়সে দু চারটে কবিতা যে লিখিনি- এ কথা এই বয়সে এসে অস্বীকার করা যায় না। তাছাড়া,এই যে আরেকটু বাদেই মরে যাবো। মৃত্যুর আগে মিথ্যে কথা বলতেও ইচ্ছা করছে না। সেই পাপে -আজ আমার তালু ফেটে ভাষা খেয়ে নিচ্ছে পৃথিবীর এক প্রকান্ড ফুটো। তার খাওয়ার ধরণ অনেকটা চুষে চুষে খাওয়ার মত।

একদল মানুষ ক্রমাগত বড় বড় সূঁচ দিয়ে এদিক ওদিক করে যাচ্ছেন,পৃথিবীর ফুটোগুলো সেলাই করে দেবেন বলে। আমি পৃথিবীর যে ফুটোর পাশে শুইয়ে আছি এই হাত নিয়ে- সেখানে ওই সেলাইদলের পৌঁছাতে অনেক দেরি আছে। প্রকৃতি মহা আনন্দে আমার হাত চুষছে। যেন ললিপপ। তার খড়খড়ে জিভ, ভারি লাল।

আমার জিভ,মস্তিক,চোখ- ক্রমে এক এক করে ফাটতে শুরু করলো। প্রত্যেকের মধ্যে জমে থাকা অল্প অল্প ভাষা - ফেটে ছড়িয়ে পড়লে আসে পাশে ভিড় করে থাকা জনতার চোখে মুখে। ভুল করে অল্প কয়েকজনের জিভে এক দু ফোঁটা থকথকে,পচা,পুতিগন্ধযুক ত ভাষা গিয়ে পড়েছিলো(তারা আসলে এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে দেখতে হাঁ হয়ে গেছিলেন)। তারা নাড়িছিঁড়ে ফেলা বমি করছে টানা।

এরপর আস্তে আস্তে খসতে শুরু করলো ভাষার চামড়া। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ভাষার মাংস,হাড়,পুঁজরক্ত ও বীর্য। সে কি অসহ্য যন্ত্রণার। হাওয়া এসে ধাক্কা মারলেও-সারা শরীর যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। এই বাসন্তী সূর্যের তাপ যেন কি প্রখর। কিচ্ছু সইতে পারা যাচ্ছে।

তারপর আস্তে আস্তে খসতে শুরু করলো ভাষার মাংস। কোয়া কোয়া হয়ে খুলে যাচ্ছে। বিছিয়ে যাচ্ছে মাঠিতে। আমার দেহের ভার ক্রমে কমে আসছিলো। হাঁটতে ভালোলাগছিলো। সুবিধা হচ্ছিলো। একসময় আমি আর ভাষার কঙ্কাল শুধু মাত্র দাঁড়িয়ে। সেই কটূগন্ধের ঝামটা খাওয়া জনগণ,এই ভাষাত কাঠামো থেকে অনেকদূরে দাঁড়িয়ে। তখনও তারা সমান উৎসাহী। কারোর কারোর মুখ আবারও হাঁ হয়ে গেছে।


প্রত্যেক হাড়ে জোর খুলে গেলো। একটা স্তুপের মত পড়ে আছি আমি। নির্বোধ স্থাপত্যের মত অপেক্ষা করছি ভাস্করের। কিংবা, যা গোছানো,সুন্দর হয়নি বলে ভাস্কর ভেঙে ফেললেন আমায়,আমার ভাষাকে দুঃখে,রাগে, কষ্টে? আমার কি অপেক্ষা করা উচিৎ?


এমন সময় ফেটে পড়লো আমার মগজ। অন্তিমে। বিকট বোমা ফাটার মত শব্দ হলো। করোটির টুকরোগুলো উড়ে কোনদিকে চলে গেলো- তাও জানা গেলো না। এমনকি ভেতরে জমে থাকা একটা কাদাকাদা, পোকা লাগা ও পচন ধরা ভাষার শবাংশ গিয়ে থক করে পড়লো- আমার কেনা শেষ সাদা খাতার ওপর।

মৃত্যু আসন্ন।দূরে ঝাপসা ভাবে দেখা যাচ্ছে,প্রকান্ড প্রকান্ড সুঁচ নিয়ে সেলাইদল পৃথিবীর ফুটোফাটা সেলাই করতে হাজির হয়েছেন।তারা নাকে রুমাল দিয়ে,বুটের ডগা দিয়ে লাথি মেরে সরিয়ে দিলো আমার শেষ খাতা। দাঁতের আশেপাশে লেগে থাকা অন্তিম ভাষাটুকু কাছিয়ে মৃত্যুর আগে তাদের বলেছিলাম, শুয়োরের বাচ্চা।


(ভাষার অভাবে এই চিঠি এখানেই শেষ করতে হলো)