ঘেউ

মনীষা মুখার্জী

টেবিলটা জ্বলছে । শাটিনের ফুল্কাটা ক্লথ থেকে তখনও ধোঁয়া বেরোচ্ছে গলগল করে । মেঝেয় বসে পড়লেন বাড়ির কর্তা । ল্যাম্পশেডটা নিভিয়ে না বেরোনোতেই এই বিপত্তি । গৃহকর্তা দেখছেন দাউ দাউ জ্বলছে অ্যাডভান্স গ্র্যাভিটেশন ল’ । ক্যালকুলাসের
ন্যা ইকোয়েশনের কপি কুঁচকে গুটিয়ে ক্রমশ মিশে যাচ্ছে টেবিলে । আর তার পাশে বসে লেজ নাড়াচ্ছে ডায়মন্ড। তাঁর প্রিয় পোষ্য । অকারণে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে ল্যাম্পটা তার পা লেগেই উল্টেছে । আইজ্যাক জানতেন তার কি হারাল । কি হারাল বিশ্ব । তবু ডায়মন্ড যে মানুষটার বড় প্রিয় । তাই কাঁদলেন ডায়মন্ডকে জড়িয়েই । পরবর্তীকালে তাঁর এই অতিরিক্ত কুকুরপ্রীতিকেই তাঁর আবিষ্কারের অন্তরায় বলে মনে করেছেন বেশ কিছু বিজ্ঞানী ।
( ‘দ্য লাইফ অফ স্যার আইজ্যাক নিউটন’ বাই ডেভিড ব্রুশটার )


- অমন হাঁ করে কী দেখছো ?
কফির কাপটা একহাতে ধরে আদুরে বিড়ালীর ওম নেওয়া গলায় আলতো জিজ্ঞেস করল মধুজা । দুপুরে পার্কস্ট্রিটের এই সিসিডিটা মোটামুটি ফাঁকাই থাকে । দোকানের আপার ফ্লোরে একটা বড় আয়না আর তার তার গা ঘেঁষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট কুশন সিটগুলো ক্যাফেটাকে বেশ মায়াময় করে রাখে ।

মধুজার কাছেই অফিস । তাই নিউটনের সঙ্গে লাঞ্চ আওয়ারে মাঝেসাঝে দেখা করতে হলে এই সিসিডিটাই বেছে নেয় ওরা । শহরের ভিড় কাটিয়ে একটু একলাও হওয়া যায় । আবার ঘণ্টাখানেকের আড্ডা সেরে টুক করে ফিরেও যাওয়া যায় অফিসে । অসুবিধা যা হয় তা নিউটনের । ওকে আবার পার্কস্ট্রিট উজিয়ে রবীন্দ্রসদনের দিকে যেতে হয় । তবে প্রকাশনা সংস্থার চাকরি । কাজ শুরু হতে হতেই বেলা তিনটে । তাই আড্ডা সেরে অফিসে ঢুকতে পাঁচ - দশ মিনিট দেরি হলে সেটা অ্যাডজাস্ট করে নেয় । যেটা অ্যাডজাস্ট করতে পারে না তা হল ওর নামটা । দাদু প্রাণকৃষ্ণ সেনের ছিল বিজ্ঞানে প্রবল ঝোঁক । কিন্তু ঝোঁক যে এমন মাথায় চাপবে তা আর কে কবে বুঝেছে ? নাতি হতেই দিলেন অমন একটা নাম ঠুকে । বুড়ো হলে মানুষ অভিমানী হয় । তাই প্রাণকৃষ্ণকে আর এ নিয়ে কেউ কিছু বলতে যায়নি । কিন্তু সেই কোন ছোটবেলা থেকে নামের ঠেলায় আওয়াজ খেতে খেতে চিরটাকাল পেটরোগাই থেকে গেল নিউটন । জীবনেও ফিজিক্সে টেনেটুনে ৬৭ - এর বেশি পায়নি । আর তার পর সারা ক্লাসকে সঙ্গে নিয়ে ফিজিক্সের গৌরাঙ্গবাবু যে খোরাকটা করতেন , তা এই বয়সেও আর মনে না আনাই ভাল । শুধু স্কুল ? ওর এখনও মনে পড়ে , ইন্টার্ভিউয়ের দিন সি.ভি.তে ওই নামটা দেখে কোম্পানীর ম্যানেজার কেমন গোল গোল চোখ করে তাকিয়েছিলেন । একমাত্র মধুজাই নাকি ওই নামটা শুনে প্রেমে পড়েছিল । কে জানে কী করে ! আর মেয়েদের মনের বেশি কার্যকারণ ব্যাখ্যায় না যাওয়াই ভাল ।
- কী হল ? বললে না তো কী দেখছো ? অনেকক্ষণ উত্তর নেই দেখে গলাটা একই খাদে রেখে প্রশ্ন করল মধুজা ।
- উঁ ? নাহ দেখছিলাম । তোমার তাকানোটা কেমন সকালবেলার কুকুরের মতো ।
- মানে ! কী যা তয বলছ ! হাউ ইনডিসেন্ট !

গলাটা কি একটু জোরে হয়ে গেল ? চকিতে চারপাশটা দেখে নিল মধুজা । নাহ । উপরের তলাটা এখনও ফাঁকা । নীচে গুটিকয় কলেজপড়ুয়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে । এমন দুপুরগুলো বেশ লাগে নিউটনের । এই বিরক্তিকর শহরটা থেকে খানিক্ষণ পালিয়ে থাকা যায় । এমনিতে ওর জীবনের সমস্যা তেমন নেই । বাড়িতে একাই থাকে । সকালে দেশের বাড়িতে মা বাবার সঙ্গে কথা বলেই ভাত চাপায় । ডাল - ভাত ডিমভাজা করতে পারে । সঙ্গে মাখন থাকে । ফলত সোনায় সোহাগা । অফিস থেকে ফেরার সময়টা মোটেও ভদ্রস্থ নয় । তাই ফেরার পথে রাতের খাবারটা কিনেই নিয়ে যায় । ফিরে কিছু সময় বইটই পড়ে নাহলে সটান টিভি-র সামনে । মোটের ওপর নির্ঝঞ্ঝাট জীবন । ছুটির দিনে ওর একা ফ্ল্যাটে মধুজার আসা ছাড়া আর তেমন কোনও তরঙ্গও নেই জীবনে । তবে ইদানিং একটা সমস্যা বেশ গলা চাড়া দিয়েছে । ঝামেলাটা কিছুটা নিউটনেরই ডেকে আনা । তবে এমনটা হবে জানলে ও মোটেও সে পথ মারাত না ।
- যাব্বাবা ! খারাপ কী বললাম ? তুমি কখনও সকালবেলা কুকুরের মুখের দিকে চেয়ে দেখেছ ? কী নিষ্পাপ দেখায় ওদের চোখদুটো । কোনও শ্লাঘা নেই । হিংসে নেই । কামড়াওকামড়ি মারামারি নয় । তোমার তাকানোটাও তো তেমনই বললাম ।

তার পর এটা সেটা কথা ছুঁড়ে দেওয়া ছাড়া আর তেমন জমেনি আড্ডাটা । মধুজা কেমন যেন গুটিয়ে গেল । কুকুরের মত বলায় খুব রেগে গেল কী ? এটাই বুঝতে পারে না নিউটন । মানুষ কী ভাবে ? সব সৌন্দর্য্য শুধু প্রকৃতি আর নিজেদের মধ্যে গচ্ছিত আছে ? ইতর প্রাণীবিশেষে তা থাকতে নেই ? তবে এমন বোধোদয় যে ওর নিজেরও খুব ছিল তা হলপ করে বলা যায় না মোটেও । তা হয়েছে ইদানিং ।

গত শনিবার অফিস থেকে ফেরার পথে বাড়ির চেনা গলিতায় দাঁড়াল নিউটন । ওই তো দূর থেকে জটলাটা দেখা
যাচ্ছে । কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকানো দড়ির মত লাগে দূর থেকে । নিউটন যত এগোয়ে কুণ্ডলীও যেন তত খুলে যেতে থাকে । পরের ঘটনাগুলো ওর জানা । নিউটন আরও কাছে যাবে , কুণ্ডলী ততক্ষনে খুলে টানটান । ফাউল বাঁচাতে গোলকিপারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কেলোয়াড়দের পাঁচিলের মতো তাগড়াই চার পাঁচজন দাঁড়িয়ে কোনওভাবেই ওদের ড্রিবল করে এগোতে দেবে না । আর রোজই ওদের সাবধানে এড়িয়ে পায়ে পায়ে গোলপোস্টের মানে একতলার ফ্ল্যাটের চাবি ঘোরায় নিউটন । এটা যে ওরাও খুব ভালো চোখে দেখে তা নয় । রাতের অন্ধকারে না বুঝতে পারলেও দিনের আলোয় নিউটন দেখেছে এদের কয়েকজনের চেহারাটা মোটেও হেলাফেলার নয় । আর যে চোখে ওরা নিউটন সেনের দিকে তাকায় তা আরও হেলাফেলার নয়। নিউটনের মাঝে মাঝে মনে হয়, ওকে কী চোর-ডাকাতের মতো দেখতে হয়ে যাচ্ছে ? নাহলে অমন হিংস্র চোখে ওরা তাকিয়ে থাকে কেন ? মধুজাকে বারকয়েক জিজ্ঞেস করেছে , আচ্ছা আমাকে কেমন দেখতে গো ? হয় সিরিয়াসলি নেয়নি প্রশ্নটা নাহলে সব প্রেমিকারা যেমন বলে তেমনই গতে বাঁধা কিছু একটা বলেছে ।

নিউটন জানে , এভাবে কিছু হবে না। আর ও যে ওদের বেশ ভয়টয় পায় তা ওরা বিলক্ষণ জানে । নিউটন দেখেছে ওদের দাঁতগুলো অদ্ভুত হয়ে থাকে তখন । যাবতীয় খিদে আর হিংসে যেন মিশে থাকে দাঁতগুলোর ফাঁকে । সংগ্রামী সমাজের কথা কী ওরাও জেনে গ্যাছে নাকি ? অফিসে একবার জয়ন্তকে বলেছিল কথাটা । জয়ন্ত খানিক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে বলেছিল , “ তুই বোধহয় সকালে আর ইসবগুলটা খাচ্ছিস না না রে ! ” এরপর আর কাউকেই কিছু বলতে ইচ্ছে হয়নি । এই এক জয়ন্ত । নিউটনের সহকর্মী , তার চেয়েও বেশি বন্ধু । যদিও প্রথমদিন অফিসে এমন একটা অদ্ভুত নাম শুনে কেবিনভর্তি লোকের সামনে হ্যা হ্যা করে জয়ন্ত বলেছিল , বাওয়া বল কী গুরু ? জগদীশ , সত্যেন টত্যেন নয় , এক্কেরে স্ট্রেট নিউটন ! বোজো ! গ্র্যাভিটেশনের টানে ভুল ঠিকানায় এসে পড়েছ নাকি চাঁদু ? এখান থেকে তো নাসায় যাওয়ার শর্টকাট রুট নেই । নাহ ! আমাদের পাবলিশিংয়ের দেখছি বরাত খুলে গেল । ঝপঝপ দু - চারটে বেস্ট সেলার পয়দা হবে দেখছি ! যদিও যত দিন এগিয়েছে জয়ন্তর সঙ্গে বন্ধুত্বই বেড়েছে নিউটনের ।

শনিবারও দূর থেকে কুণ্ডলী জড়ানো কুয়াশাটা দেখতে পেল ও । কিন্তু কেমন একটা থমথমে ভাব । সেই রনংদেহী আবহাওয়াটা আজ নেই । নির্বিঘ্নেই গেটের কাছ অবধি পৌঁছে গেল । হঠাৎ পায়ের কাছে কিছু একটা নড়েচড়ে উঠতেই একলাফে তিন পা পিছিয়ে গেল নিউটন । একটা কালো কুকুরছানা । ডান পাটা যেভাবে থেঁতলেছে তাতে বোঝা যাচ্ছে ভারী কোনও চাকার কাজ । আর টাটকা । রক্তটা চুঁইয়ে পড়ছে এখনও । অসাড়ে শুয়ে নাকি মরা ? এই গলিতে আবার গাড়িফাড়িও ঢুকছে নাকি আজকাল ? কিন্তু এ তো আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়া গেল । ছানাটা যেভাবে শুয়ে তাতে ওকে কাটিয়ে গেট অবধি পৌঁছানো মুশকিল । ঘাড় ঘোরাতেই হঠাৎ বুঝতে পারল চার পাঁচজন ইতিমধ্যেই ঘিরে ধরেছে ওকে। আজ চারপাশে জড়ো হয়েছে , কাল যে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলবে তা নিউটন জানে । কিন্তু কী করতে হয় এখন ? মধুজাকে ফোন করবে ? নাহ । থাক । চারপাশের ভিড়টা আগে খালি করা দরকার । কিন্তু কী করবে ? ছুয়ে দেখবে একবার? কিন্তু চারপাশের ওই দাঁতগুলোকে বিশ্বাস নেই । সাতপাঁচ ভেবে কাছে গিয়ে পাটা ওল্টাতেই দগদগে ঘা টা দেখা দিল । ভিড়টা এখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে। বুকের কাছে হাত এনে নিউটন বুঝতে পারল , ব্যাটা বেঁচে । ব্যথার তারসে অজ্ঞান হয়ে গ্যাছে । দ্রুত ওকে এক হাতে ধরে গেটের কাছে রাখল । ভিড়টা এখনও চুপচাপ । আক্রমণের আগে জরিপ করে নিচ্ছে নাকি ? সম্ভাব্য প্রতিরোধগুলো মনে মনে ছকে রাখছে নিউটন । গেটটা খুলে আগে ছানাটাকে বারান্দার চেয়ারে রেখে আলো জ্বালালো ও । না , এখনও অবধি সব চুপচাপ । গেটটা আজ ভাল করে তালা দিয়ে ঘুমোতে হবে । ভিড়টাকে বিশ্বাস নেই ।

ব্যাগটা রেখেই মধুজাকে ফোন করল । স্যুইচড অফ । এই - ই হয় ! দরকারের সময় পৃথিবীর সব নারী নট রিচেবল হয়ে যায় । কাল সব শুনে দিস্তে দিস্তে জ্ঞান দেবে । কী কী করেনি নিউটন , এই অবস্থায় আর কী কী করা উচিৎ ছিল সব পয়েন্টওয়াইস বলবে আর ও নিজে যা ক্যালাস তাতে তার একটা উত্তরও জুতের দিতে পারবে না । মাকে একটা ফোন করবে ? নাহ । থাক । ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো । তার চেয়ে জয়ন্তকে একটা ফোন করা যাক । ওর বেশ এলেম আছে আর মাথাটাও ঠাণ্ডা । মানে নিউটনের মতো কাছাখোলা নয় । জয়ন্তর থেকে ডাঃ ঘোষের নম্বরে ডায়াল করতেই উনি কিছু ফার্স্ট এইড বললেন । গরম জলে বেটাডিন ফেলে জায়গাটা ওয়াশ করতে করতে কেঁপে কেঁপে উঠছিল ছোট্ট শরীরটা। এর আগে এত মমতায় কাউকে সেবা করেনি নিউটন । ওর মনে পড়ে গেল , ছোটবেলায় ওর জ্বর হলে মা কেমন জলপট্টি দিয়ে ঠায় মাথার কাছে জেগে বসে থাকত । রাতে যতবার ঘুম ভেঙে যেত দেখত ও নড়লেই মা জেগে যাচ্ছে। জ্বর মাপছে , থার্মোমিটার দিচ্ছে । চাপা গলায় বাবাকে ধমকাচ্ছে – তুমি এবার শোবে একটু ? আমি তো রইলাম জেগে । হঠাৎই একটা বিজবিজে মন খারাপ টের পেল নিউটন । গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছে কিছু একটা । আবারও মোবাইলে আঙুল চালালো নিউটন । স্যুইচড অফ ।

ওই শুরু । তার পর থেকে লাদেন ওর কাছেই আছে । লাদেন নামটা অবশ্য মধুজার দেওয়া । যদিও কুকুরটুকুর ওর মোটে না পসন্দ । তাই এমন একটা ভিলেনমার্কা নাম দিয়েছে । তবে একসঙ্গে থাকতে থাকতে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছে নিউটনের । নিউটনের বেরোনোর সঙ্গেসঙ্গেই বেরিয়ে পড়েন তিনি । সারাদিন পাড়াটাড়া বেড়িয়ে রাতে নিউটন আসার আগে ঠিক গেটের সামনে হাজিরা দেন । তারপর একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া মিটিয়ে ঘুম । টেবিলের তলাটা লাদেনের বেশ পছন্দ হয়েছে । উনি ছেতরেবেতরে ওখানেই ঘুমোন । নিউটন লক্ষ্য করেছে ছুটির দিনটা খুব একটা বাড়ি থেকে বেরোতে চায় না লাদেন । মধুজা প্রথম প্রথম নাক সেঁটকালেও এখন দায় পড়েই অভ্যাস হয়েছে কিছুটা । বহুবার নিউটনকে বললেও ও ওকে দূর করে দিতে পারেনি । তা ছাড়া ঘা-টাও পুরো শুকোয়নি এখনও । কেমন একটা মায়া আছে ওর চোখে । বিশেষ করে সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর । ঠিক এই কথাটাই সেদিন মধুজাকে বলেছিল । কেন যে কুকুরের মতো বলতেই অমন রিঅ্যাক্ট করল ! তাহলে কী দোষটা মধুজারই না মাঝে মাঝে যে ভয়তা নিউটন পায় সেটাই আসল ?
পাড়ার অবস্থা ইতরবিশেষ বদলেছে । আজকাল রাতে কুণ্ডলীটা চোখে পড়লেও তারা আর খুব একটা ঘিরেটিরে
ধরে না । তবে নিউটন দেখেছে দিনের বেলায় চোখাচোখি হলে ওকে যেন কিছুটা মেপে নেয় চোখগুলো । ভাবখানা এমন যেন – কী ? সব ঠিকঠাক তো ? কিছু এদিকওদিক দেখলে একদম খাল খিঁচে নেব ।

সেদিন মধুজাকে মোড় অবধি এগিয়ে দিতে গিয়ে দেখেছে , মধুজাকে মোটেও ভালচোখে দেখছে না ওরা । মধুজাকে বলতে হবে , এর পর থেকে যেন রিক্সায় আসে । মধুজাকে বলতেই বিদ্রূপ । - হাঃ ! তুমি কী আজকাল ওদের স্ট্যান্ডার্ডে নেমে গ্যাছো নাকি ? বেশ চাউনিটাউনি দেখে মনের কথা বুঝতে পারছ তো ! মেয়েদের এই এক দোষ । ভাল কথা কোনওকালে ভালভাবে নেবে না । নিজেরা যেন সব জানে ।

তবে তক্ষুনি মধুজাকে কিছু বলতে না পারলেও দিনদুয়েকের মধ্যে নিউটন বেশ বুঝতে পারছি ঠারেঠারে ওদের চাউনিটাউনি বেশ বুঝতে পারছে ও । এমনকি ওদের কথাবার্তাগুলোও । নিউটন দেখেছে , সকাল দুপুর বিকেল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওদের চাউনি কথাবার্তা বদলে যায় । চারপাশের সবকিছুতেই যেন ওই কুণ্ডলীটা । কেউ ঝগড়া করলে মনে হয় ওদের মতো চেঁচাচ্ছে , কেউ চিৎকার করলে মনে হয় ওদের মতো । এই যেমন সেদিন , পাড়ার দোকান থেকে এক ক্রেট ডিম কিনে ফিরছিল নিউটন । নীহারদা পথ আটকালেন ।
- কী ? আজ সক্কাল সক্কাল যে ! ডিমভাতেই সপ্তা চালাবেন নাকি ?

নীহারদা’র চকচকে চশমার ওপারে চোখদুটো অনেকটা ওই ওদের মতো লাগছে । নিউটন দেখেছে , রুটি - তড়কা নিয়ে ফেরার সময় ওর প্যাকেটটার দিকে এমন করেই তাকায় ওরা ।
- আপনি ওই ওদের মতো নজর দেন কেন ?
- নজর ? আর কাদের মতো ? ছিঃ ছিঃ কী বলছ তুমি এসব ! আমি তোমার বাপের বয়সি । আর তুমি কিনা ...

আরও কিছু বলছিলেন নীহারদা । তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাড়ি ফিরল নিউটন । ব্যাপারটা বাড়াবাড়ির দিকে যাচ্ছে । শুধু মনে হওয়াতেই যদি আটকে থাকত তাও একটা কথা ছিল , কিন্তু নিউটন দেখেছে এই নিয়ে কিছু মনে হলে তা শুধু মনে থেমে থাকে না । যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই কথাটা সেই পার্টিকুলার লোকটাকে বলছে কেমন একটা অস্থির হয়ে ওঠে ভেতরে ভেতরে । এটা মস্ত বড় সমস্যা। সেদিন বৃষ্টিতে মধুজাকে পার্কস্ট্রীট ক্রশ করতে দেখে বলেই ফেলল, “ তোমাকে না দূর থেকে সন্ধ্যের ওই কুণ্ডলীটার মতো লাগছিল । কী গ্রেসফুলি আসছিলে ! ” শুনেই টং মধুজা ।
- তুমি একটা ডাক্তার দেখাবে প্লীজ ? এগুলো ইচ্ছাকৃত বল না তোমার মেন্টালি কোথাও সমস্যা হচ্ছে একটু বলবে ? সেদিন বাবাকেও বললে আপানার জিভ দিয়ে ঠোঁট চাঁটাটা অনেকটা ... ছিঃ ছিঃ ! সবকিছুর একটা লিমিট আছে রনি , তুমি ভুললে কী করে উনি আমার বাবা !

ধুস ! মধুজাও বোঝে না । আচ্ছা বোঝালেও বুঝবে না ? ওই কুণ্ডলীটা দেখলে মধুজা বুঝত , ওদের কাউকে একটু মুশকোমতো দেখতে , কাউকে সিড়িঙ্গে । কেউ আবার আড়েবাড়ে মোটামুটি মানানসই । কিন্তু শালাদের চোখের ভাষা এক । নিউটন দেখেছে , ওই মুশকোটার কথাই মোটামুটি মেনে চলে অন্যরা । মাঝেমাঝেই নিউটনকে দেখিয়ে বলে , মালটাকে একটু চোখে চোখে রাখিস । আর এই চোখে চোখে রাখাটাই নিউটনকে টেনশলে ফেলে । কাউকে বললেও বোঝে না । ওদের ভাষা অ্যাটিটিউড এগুলো বুঝতে পারার পর থেকেই সমস্যাটা ঘোরালো হচ্ছে । ওরাও বোধহয় বুঝে গ্যাছে যে নিউটন ওদের পড়ে ফেলেছে । ওরাও বুঝল শুধু মধুজাই যে কেন ... ইদানীং বিষয়টা নিয়ে মধুজা যা শুরু করেছে তাতে লাদেনকে ঘরে রাখা দায় হয়েছে । ওর ধারণা লাদেনকে এ বাড়িতে আনার পর থেকেই নিউটনের এই হাল । সুতরাং লাদেন হাটাও ।

হাটাতে যে হবেই তা বেশ বুঝতে পারছিল নিউটন । তবে সেটা যে এত তাড়াতাড়ি তা বোঝেনি । সকালে মৌজ করে প্রথম সিগারেটটা ধরিয়েছে সবে । হঠাৎ কলিংবেল । তিন - চারটে লোক , হাতে একটা থলের মতো ব্যাগ । চেহারাছাপে বেশ ষণ্ডাষণ্ডা হাবভাব । আর এদের চেহারার চাপে যাকে এখনও চোখেই পড়েনি তাকে দেখেই চমকে উঠল নিউটন । মধুজা। সোমবারের সকালে ! একটাও খবর না দিয়ে !
- অমন ঘটের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন ? সরো ওদের ঢুকতে দাও ।
- এরা কারা ?
- লাদেন কোথায় ?
- খাটের তলায় । কেন ?
- ওরা লাদেনকে নিয়ে যেতে এসেছেন । আমি ডাঃ ঘোষের সঙ্গে কথা বলেছি কাল। উনি বলেছেন, লাদেনের জন্যই এত সমস্যা। ওকে সরাতে হবে।

প্রমাদ গুনল নিউটন। যা ভেবেছে তাই। মধুজা আজ আঁটঘাট বেঁধে এসেছে । ওকে আজ আটকানো মুশকিল । লোকগুলোও বেশ গুছিয়ে এসেছে দেখছি । দ্রুত বাইরের দিকটা পলক তাকাল নিউটন । ওরা দ্যাখেনি তো ? মধুজা যেভাবে রণংদেহি হয়ে এসেছে তাতে ওকে আটকাতে হলে একটা সিন হবে । আর সেটা বাইরের লোকগুলোর সামনে মোটেও ভাল লাগবে না নিউটনের । ঝকঝকে সকালটার গায় কে যেন অ্যাসিড ছুঁড়ে দিল বলে মনে হল নিউটনের ।
- কী পাগলামি করছ মধু ? ও থাকুক যেমন আছে , আমি দেখছি বিষয়টা কিভাবে সামলানো যায় । এঁদের যেতে বল ।
- না । আর কিছু দেখার নেই তো । একটা উটকো ঝামেলা ... আর তাছাড়া ডাঃ ঘোষের কথাতেই আমি ওঁদের খবর দিয়েছি । তুমি সরো ওদের কাজতা করতে দাও ।
- না । সরবো না । ওদের চলে যেতে বল । লাদেন আমার সঙ্গেই থাকবে ।
- বোকা বোকা আদিখ্যেতা কোরো না । এতে নিজের ক্ষতি করছ , আমাদের সম্পর্কটার ক্ষতি করছ । সেদিনের পর থেকে বাবা খুব রেগে আছে । কোনোরকমে ম্যানেজ করেছি । কী চাইছ তুমি ? সবটা শেষ হয়ে যাক ?

মাথাটা বোম মেরে আছে নিউটনের । এই মুহূর্তে মধুজাকে ওই মুশকোটার মতো লাগছে , আর লোকগুলোকে সিরিঙ্গেটার মতো । যেন হুকুম তামিল করতেই এদের জন্ম ।

এবার ওই সিরিঙ্গেদের একজন এগিয়ে এল ।
- আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। ওর কোনও কষ্ট হবে না । আর তা ছাড়া আপনার খুব মন খারাপ করলে না হয় মাঝেমাঝে যাবেন , গিয়ে দেখে আসবেন । আপাতত ও আমাদের কাছেই থাক ।

নিউটনকে কী গাণ্ডু পেয়েছে নাকি ? নিউটন জানে এসব ঢঙের কথা । কাজ মিটিয়ে পয়সা পেয়ে গেলেই এরা খুশ । এই মুহূর্তে লোকটার চোখটা লাদেনের রুটি মাংস খাওয়ার সময়ের মতো । নিউটন বলতে যাচ্ছিল কিছু একটা , তার আগেই মধুজার তুরন্ত নির্দেশে শিকারির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকদুটো । লাদেনের যাবতীয় প্রতিরোধ প্রতিবাদ ডিঙিয়ে গেরিলাকায়দায় ঠিক বস্তাবন্দি করে ফেলল ওকে । শুধু শেষ মুহূর্তে লাদেনের সঙ্গে চোখাচোখি হতে কেঁপে উঠল নিউটন। কী ছিল চোখদুটোয় ? অবিশ্বাস ? কাতরতা ? প্রভুভক্তি ? ঠিক কী ছিল ?

সেদিন নিউটনের অফিস বেরোনো অবধি আকি সময়টা মধুজা ওর সঙ্গেই ছিল । কত কী বলছিল । মনের জোর
বাড়াও , এতে খারাপ কিছু হবে না ... এমন ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু কথা কানে আসছিল । শুনছিল না কিছু । অশান্তি এড়াতে ক’টা হুঁ হাঁ ছুড়ে দিচ্ছিল শুধু । এই প্রথম মধুজাকে ঘেন্না করছে নিউটনের । কোনোক্রমে দুপুরটা কাটতেই বেরিয়ে পড়ল ও । আজ একটু তাড়াতাড়িই অফিস যাবে । বাড়ি , মধুজা সব যেন হাঁ করে গিলতে আসছে ।

ওর সঙ্গেই বেরোলো মধুজা । গলির মোড়ে বেরোতেই মনটা কেঁপে উঠল । ওরা আসবে না তো ? নাহ কোথাও
কিছু নেই । সবকিছু আগের মতোই। যান বদলায়নি কিছুই । কিছুটা হাঁটার পরই মনটা একটু ভাল লাগল । মধুজা বেশ কলকল করছে । উফ কথাও বলতে পারে মেয়েটা । নাহ । এতটা খারাপ বোধহয় নয় । নিউটনের কষ্ট হবে ভেবেই সারাটা দিন অফিস কামাই করে ওর সঙ্গে রইল । রান্না , আড্ডা সব মিলিয়ে দিনটাকে তো ওর মতো করে হাসিখুশিই রাখতে চেয়েছিল মেয়েটা । নিউটনের বইয়ের তাকটাও গুছিয়ে দিল একফাঁকে । নিউটন মুডে নেই বলে একে ছুঁইয়েও দেখেনি আজ । একটু আলগোছা আলগোছাই থাকল । নিউটনকে এই স্পেসটুকুও তো দিব্যি দিল । আচ্ছা ও - ও কী মধুজার জায়গায় থাকলে এমনই করত ? যাকে নিয়ে ঘর বাঁধবে সে - ই যদি দিনের পর দিন এমন অদ্ভুত আচরণ করে তাহলে সব মেয়েই কী এমন নিরাপত্তাহীনতাতেই ভোগে ? কে জানে ! আজ আর বেশি ভাবতে ইচ্ছে করছে না । শুধু মধুজাকে একবার বলল , তুমি আমার অফিস অবধি যেতে যেও না । সেই কোন সকালে বেরিয়েছো , বাড়ি ফেরো । আমি ঠিক আছি ।
- আমায় খুব নিষ্ঠুর ভাবছো , না ?

এই চোখটাতেই লাদেন তাকিয়েছিল যাওয়ার সময় । কিন্তু এখন আর মধুজাকে এটা না বলাই ভাল । ওর হাতটা ছুঁয়ে একটা আলতো চাপ দিল নিউটন । খুব আস্তে ওর কানের কাছে মুখ এনে বলল , ফোন করো রাতে ।


রাতে ফোন করেছিল মধুজা । ফোনটা বেজেই চলেছে । পর পর পাঁচবার । সেদিনের পর থেকে নিউটনকে আর ফোনে পায়নি কেউ ।

পরেরদিন সকালে খবরে কাগজের বয়ান অনুযায়ী ,

গতকাল রাতে কলকাতার গৌর মিত্র লেনে এক যুবকের ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ । মৃতের নাম নিউটন সেন (২৭) । দেহের ক্ষত দেখে পুলিশের অনুমান , হিংস্র কোনও জন্তুর আক্রমণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে । তার চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে । শরীর থেকে বাদ গিয়েছে ডান হাতটিও । এ ছাড়াও শরীরে অজস্র কামড় ও আঁচড়ানোর দাগ মিলেছে । কলকাতার একটি নামী প্রকাশনা সংস্থায় চাকরি করতেন এই যুবক । স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে , গতকাল রাতে অফিস থেকে ফেরার পথে পাড়ার কুকুরের একটি দল তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে । কুকুরে অসম্ভব ভয় থাকলেও সম্প্রতি তিনি পাড়ারই একটি কুকুরকে পোষ্য নিয়েছিলেন । গতকালই তাকে ক্যানেলে পাঠান এই যুবক । তবে কী কারণে তাকে ক্যানেলে পাঠানো হল তা জানা যায়নি । স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবী , সম্প্রতি যুবকের আচরণে কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ছিল।