সন্ধ্যের পরিভাষা

শিমন রায়হান

সব ভাষা অনুভূতির অনধিক বা অনুভূতি ভাষার অধিক। আবার নৈঃশব্দ্যও এক প্রবল ভাষার নাম। পৃথিবীর সকল ভাষার সকল শব্দের অধিক যার ওজন। ঈশ্বর কবিতা লেখেন নির্জনতার শব্দমালায়। পৃথিবীর কবি সেই ঐশ্বরিক নির্জনতা অনুবাদ করেন তার একান্ত পরিভাষায়। পাখি থেকে প্রস্তর, ধূলি থেকে ধূসর, শিশির থেকে শুয়োপোকা- যা কিছু প্রকাশ-উন্মুখ ও অপেক্ষমাণ তাই আদতে ঈশ্বরের কবিতার এক সুবিস্তৃত শরীর। কবি এই কবিতার পাশে সন্নিহিত হন এবং তাদের রুপান্তরিত করেন পার্থিব ভাষায়।

কোনো পাজলপুরের পুস্তানি ফুড়ে বেরোয় কথাপ্রবাল
কথাদের মিলিয়ে দিতে বুক পেতে রাখে কালভার্ট

কবিতা একটি শূন্য খালের মধ্যে পড়ে থাকা নির্জন সাঁকোর মতো। যেন সাঁকো পেরোলেই খুব প্রত্যাশিত কোন সাক্ষাৎ ঘটে যাবে। অথচ এক মিহিন উপেক্ষায় পারাপার হয় না। নির্জন সাঁকোর জন্য শুধু জমা হয় অপার্থিব চুম্বন।
রাতগুলো কী ভয়ানক নিঃস্ব
আর সেই পাথর সাঁতরে
ধূসর খিলানেরা হয়ে উঠল ভাষা

সমস্ত অগোচর ফুঁড়ে নভ্যোস্মৃতি ফিরে আসে তারার রাতে। আফিমের বেশে আসে উপকথার গোলাপি ডাক। ইচ্ছেই ভাষা হয়ে ওঠে, ভাষা হয়ে ওঠে অন্তরাত্মার কণ্ঠ; কী ধূসর কোলাহল! তবু উপকথার নদের চাঁদ কী শাপে কুমির হয়ে শুয়ে থাকে চন্দ্রালোকিত বালিয়াড়িতে। তার ভাষাহীন পৃথিবী সাঁতরে কোমল ভাষান্তরে মুদ্রিত হয় রেইনফরেস্ট। জঙ্গলের কান্না হামেশা ধোয়া হয়ে যায়।
কদিন বাদেই আঁকগুলো হয়ে যায়-
ধাতব ছায়া, জঙধরা মাস্তুলের নিরীহ মায়া

ভাষার বিবিধ শব্দ আর উপকরণ যেন ধাতব ও আবেগবর্জিত। শব্দে-শব্দে এই যে ঝনঝনানি আর শীৎকার সবই আমাদের পার্থিব প্রকল্প। যেন বধির পাথরের কাছে গান রেখে যাওয়া। তবু প্রেয়সীর চোখ থেকে শুরাপান আর অপেক্ষার ওপর আফিম চাষ অব্যাহত থাকে। মানবের বহু বিচিত্র ব্যাকুলতার ফলক হয়েও কবি কী দারুণ দুষ্পাঠ্য ও দুর্গম। তার স্বপ্নে অগুন্তি মখমলের ফুল উড়ে যায় সূচিকর্মের বিকল্প নগরে।
ভুলপ্রবণ গন্দমের নেশায়
যেকোন নাম আজ এমিলিয়া শোনায়

কোন কোন ভাষা এমনকি গন্দমের মতো। প্রেমের ভাষা নাকি প্রেমের অধিক গন্দম। যেকোন প্রেমিকের কাঁধ হতে পারে ফ্রান্সিসের কিংবা ফ্রান্সিসের কাঁধ হতে পারে সকল প্রেমিকের। তেমনি করে এমিলিয়া হতে পারে যেকোন প্রেয়সীর নাম। কেবল ভাষা পারে সব অভিন্ন গল্পের একটি সাধারণ নাম দিয়ে দিতে।
অতিক্রান্ত শোক ও স্বল্পায়ু মাছের আদর
লিপিকারের প্রস্তুতির অতীত

ক্ষীণ দেহের শ্যামাপোকা কিংবা ক্ষণজন্মা কত ফড়িং এর জীবনকাহিনি লিপিবদ্ধ হচ্ছে না। কত স্বল্পায়ু মাছ তার আয়ুর মধ্যে রেখে যাচ্ছে বিচ্ছেদের অপরভাষা। তবু তাদের নিজস্ব সব ভাষার ফানুস কোন এক ক্লান্ত পাগলের কল্পভ্রমে উড়তে থাকে। শোক ও আদর এক মৌলিক ভাষা। ভাষান্তরে যা ক্রমশ মৃদু হতে থাকে। শোক ও আদরের ভাষা এতোটাই লক্ষ্যভেদী যে একটি কুকুরও সে-ই ভাষার সঙ্গে দ্বিমত করে না। মূক লিপিকার কেবল চেয়ে থাকেন মুখাবয়বের দিকে; অগুন্তি রেখার চলাচল তাকে ক্লান্ত করে।

প্রতিটি সন্ধ্যের অবিচ্ছিন্নতা আবিষ্কারের আমোদে ডুবে থাকে কবির শোকাতুর ডানা। রোশনাই সমূহের অন্তরালে কোনও এক সাপেক্ষে বুঁদ হয়ে থাকার বিশেষ কানুন নেই। আর সকল মুদ্রণ শুধুই শাদা-কালো। অন্যান্য কিছু রঙিন অলংকরণের উদাহরণ ছাপিয়ে বেদনার সরল চলাচলই এঁকে যায় সে। যেহেতু কোনও কবিতাই এমন সন্ধ্যের সমকক্ষ হয়ে ওঠে না। হয়ত অসীম নৈঃশব্দ্যই পারে তাকে পরিভাষার বেদনা থেকে মুক্তি দিতে।