প্রকৃতি-পুরুষ আমায় অক্ষর চেনাবেন বললেন...

সুমন সাধু


সহস্র ধুলোর মধ্যে আটকে আছে গতিবিধির চেতনা। ক্ষয়ে আসছে দেহ, পোড়া ত্বক। যেন এইমাত্র জন্ম নেবে মেঘ-মা। হাজার বছরের গান গাইবেন শহুরে কোকিল। উত্তুরে হাওয়ায় মিশে যাবে শুভ লগ্ন, খুলে যাবে রুদ্ধদ্বার, তান সেনের গানে হালকা কড়ি-মা উড়ে আসবে এইমাত্র। চিনে যাচ্ছি প্রকৃতি। বেগতিক দোলনায় ঢং ঢং সময় কত কত আমুদে আওয়াজ দিয়ে যাবে। মিনিটের কাঁটা, সেকেন্ডের কাঁটা... তরতর করে কেঁপে উঠবে অজয় নদের জল। যেখানে লুকিয়ে অবুঝ বাল্যকাল। ইটের গভীরে লুকিয়ে রইবে ক্ষত দাগ। মলিন হবে সময়। আহা! মলিন... আকবরের সভায় এইবার গান ধরবেন তান সেন। আর মেঘাড়ম্বরে বৃষ্টিপাত হবে মফস্‌সলে। রাগ ললিত। ইট কাঠ বালি সভ্যতার রাগ। তাতে জুড়ে দেওয়া আলতো ললিত। ভোর হবে হবে ভাব! ভৈরবীর পাশে চুপটি করে বসে আছেন ললিত।
আমার বাড়ির পাশের প্রকৃতি আর আমার ছোট্ট একটা ঘরের প্রকৃতি এইভাবে মিলেমিশে যায় কিংবা কেউ কাউকে চেনে না। ভিন্ন চওড়া রাস্তা খোঁজে। আলো আর অন্ধকারের গোপন সুরটি একসময় ধরিয়ে দিয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ। শয়তানের চোখ গেলে অপার আনন্দাশ্রু খুঁজতে খুঁজতে একটা তেজি ঘোড়া এইবার খালে পা দিলেই সে হেরে যাওয়া একফালি বীজ। খাদ্য নেই, শস্য নেই, শুধু দূরন্ত মেঘ নিয়ে সে অবিরাম...কী অসম্ভব বেগ তার... কার্তিকের জ্যোৎস্নায় তারা পিঠে ডানা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে স্বপ্ন দেখতে। উদ্দেশে রওনা হয়। গন্তব্য নেই অথবা আছে। ওসব তুচ্ছ করে জাগতিক মায়াজড়ানো চেতনায় মিশিয়ে দেয় সোনালি ধানক্ষেত। মুখে রা নেই। চুপটি করে আমার পাশে বসে পাড়া জুড়োনো বেপাড়ার দিন। অঙ্ক কঠিন বলে পালাতে চাইলে বারবার, প্রতিবার গসাগুর লম্বা সিঁড়িতে পা রাখতে হয়েছে। আর মা আমায় চিনিয়েছে আকাশ, পাখি কিংবা পালক খসার দৃশ্য। ছোটবেলায় কোনো ছাদ ছিল না বলে লম্বা লম্বা পাঁচিলগুলো ক্রমে বন্ধু হয়ে উঠতে লাগলো। তাদের সঙ্গে কথার আদানপ্রদান। এইভাবে কথাও একসময় আমার স্বজন হয়ে উঠল। পাঁচিল প্রকৃতি দেখালো। বাড়ির পাশের প্রকৃতি। ক্ষয়ে যাওয়া, দম বন্ধ করা, উড়ে চলা প্রকৃতি।
মহাদেব এইবার ধ্যানে বসবেন। এইবার প্রাণসখা, নাস্তিকপূজার ঘট হাতে নিয়ে শিবলিঙ্গে ঢালবেন জল। উড়ো খই দেখে রব উঠলে আগুনকে সাক্ষী মানবেন প্রাণপতি। পুজো শেষ হবে। অথচ খাঁড়াই সেই মধ্যম আঙুলটি গেঁথে দেবেন আমার নাভিকুণ্ডে। মুখে রা নেই। নবারুণ লিখেছিলেন, পৃথিবীতে সমস্ত ঘটনার একজন করে সাক্ষী আছে। আমার প্রকৃতি-পুরুষের সাক্ষী কে? আমার পাঁচিলের কথা আমি ছাড়া বলার লোক কই? সে তো একমাত্র আমার। প্রতি বুধবার খুব জ্বর আসে। ১০২-১০৩ আওড়ানো গল্পের সেই আদিম বুনো কোকিল এতিম করে দিয়ে পালালো। তার পালানোর ভয়ে এইমাত্র সা থেকে সা-এর হাওয়া চেতনায় বসে ডাক দেবে। চিরকালীন ডাক। ছোটবেলার পাঁচিলটা আজও ইট বালি পাথরের ক্ষয় নিয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকবে ঠায়। ক্ষয়ে আসবে দেহ, পোড়া ত্বক। পাশ কাটিয়ে কড়ি-মা উড়ে গেল এইমাত্র।