তাম্বোরিলো ভালোবাসার আরণ্যক

মৃন্ময় চক্রবর্তী


সব লেখাই চিরায়ত হয়ে ওঠেনা, একবার পড়ার পর দ্বিতীয়বার পড়তে ইচ্ছে জাগেনা। কিন্তু কিছু লেখা বার বার পড়েও ফিরে পড়তে ইচ্ছে হয়। মারিও পায়েরাজের 'The Days of Jungle'-এর সুদেষ্ণা চক্রবর্তী অনূদিত "বিষুব অরণ্যের দিন" আরেকবার ফিরে পড়লাম। প্রথম পড়েছিলাম নব্বই দশকের মাঝামাঝি, তারপর আবার এই পড়া। এই লেখাটি একটি স্মৃতিউপন্যাস। এডগার স্নো'র "রেড স্টার ওভার চায়না" কিংবা উইলফ্রেড বার্চেটের "ভিয়েতনাম : গেরিলা যুদ্ধের কাহিনী"র মত বাইরে থেকে গিয়ে সাংবাদিকের চোখ দিয়ে দেখা বৃত্তান্ত নয়। এই রচনা একজন গেরিলা যোদ্ধার, একজন কবির। এই কাহিনী শহর থেকে গুয়াতেমালার গভীর নিরক্ষীয় অরণ্যের গ্রামাঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধ সংগঠিত করতে যাওয়া, দুর্গম প্রকৃতি, বিপদসংকুল প্রতিবেশ, ভাষাপার্থক্য সত্বেও অসম্ভব কষ্ঠসহিষ্ণু একদল মার্ক্সীয় বিপ্লবীর বিপ্লব প্রচেষ্টার গল্প।
দক্ষিণ আমেরিকায় চে গুয়েভারার রোমান্টিক বিপ্লববাদের মোহ থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টার দিনলিপি হল এই বই। তাঁরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লড়তে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করছেন, এবং তারপর জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তাদেরকে সামিল করার নিদারুণ বিপজ্জনক কঠিন ব্রতে নিজেদের নিয়োজিত করছেন। পড়তে পড়তে একজন সাধারণ পাঠকও গেরিলাদের প্রতি মমত্ব অনুভব না করে পারবেন না। এমন একটি গ্রামের গল্প রয়েছে "রুবেলোলম" অধ্যায়ে।
বইটির অধ্যায়ে অধ্যায়ে রয়েছে জনগণের ভেতর থেকে উঠে আসা খাঁটি শ্রেণীযোদ্ধাদের মহৎ আত্মদানের কাহিনী। মমতার সঙ্গে পায়েরাজ বর্ণনা করেছেন তাঁর সঙ্গী কমরেডদের কথাও। খাদ্যের সঙ্কটে দলের ভেতর তৈরি হওয়া বিদ্রোহ, কোনো কমরেডের খাদ্যের খোঁজে অরণ্যে পথভ্রষ্ট হয়ে হারিয়ে যাওয়ার মর্মন্তুদ বিবরণ পাঠককে স্তম্ভিত করে দেবে।
পায়েরাজ যেহেতু কবি, তাই তাঁর লেখায় জঙ্গলের অপরূপ প্রকৃতির ছবি পাঠককে মুগ্ধ করবে। চিরমুক্ত বিরলপ্রায় পাখি উড়ন্ত কেতজেলের দর্শনপ্রাপ্তির আনন্দ, টেপিরের গল্প, তাম্বোরিলো ফুলের বসন্তের উল্লেখ পাঠককে নিরক্ষীয় অরণ্যের সৌন্দর্য অবলোকন করাবে। এছাড়াও রয়েছে জঙ্গলের অসংখ্য গাছ, ফুল, পতঙ্গের উল্লেখ।
'ইক্সকানের জাগুয়ার'-- একজন অত্যাচারী সামন্তপ্রভুর হত্যার পর নেমে আসা প্রবল সামরিক নিপীড়ন কেমন করে মোকাবিলা করতে হয়েছে তার রোমাঞ্চকর বিবরণ রয়েছে "গেরিলারা পরিণত হল" অধ্যায়ে। গ্রাম থেকে বিপ্লবী দলে যোগ দেওয়া একজন বিপ্লবী "ইন্ডিয়ান" গেরিলার অভূতপূর্ব বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে "ফনসেকা"য়।
'ফনসেকা' ছিল পায়েরাজের গেরিলা বাহিনীর প্রথম ইন্ডিয়ান বিপ্লবী, যে বাইরের পৃথিবীকে জেনেছিল, জেনেছিল সমাজতন্ত্রবাদের কথা, গ্রহণ করেছিল কম্যুনিস্ট মতাদর্শ। সেই ফনসেকা মিলিটারির হাতে গ্রেপ্তার হয়ে অবর্ণনীয় নিপীড়নের মুখে পড়ে কায়দা করে কমরেডদের বাঁচাতে গিয়ে শেষ রক্ষা করতে না পেরে একে একে বহু সাথীকে ধরিয়ে দিতে বাধ্য হল। সে চিহ্নিত হল তার কমরেডদের কাছে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে। কিন্তু একসময় সে যখন গেরিলা হানায় মুক্ত হল তখন সে তার কৃতকর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ রেখে গেল একটি টেপ রেকর্ডার, আর নিজেই নিজেকে দিল বিশ্বাসঘাতকতার চরম শাস্তি। এই মর্মভেদী পর্বটি পড়তে গিয়ে পাঠক হয়ত একটু বিচলিত হয়ে পড়বেন,পায়েরাজের মতই ভালোবেসে ফেলবেন অভিশপ্ত বিপ্লবী ফনসেকাকে।
বইটির বাংলা ভাষান্তরটি প্রকাশ করেছিলেন কলকাতার 'পিপলস বুক সোসাইটি'। অনুবাদকর্মটি অত্যন্ত সাবলীল। ভাষান্তর বলে মনে হয়না একবারও। অনুবাদিকা এখানে 'লেখক পরিচিতি' দিতে পারেন নি। কারন তখন হয়ত পায়েরাজ সম্পর্কে কোনো তথ্য সেভাবে পাওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু এখন লেখক সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে অন্তর্জালে। নতুন সংস্করণে তা সংযুক্ত হয়েছে কিনা জানা নেই।
পায়েরাজ ১৯৯৫ এ অন্তরীণ অবস্থায় মেক্সিকো সিটিতে মারা যান। একটি দূরবর্তী গ্রামে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর কবর থেকে তাঁর অবশিষ্ট ব্যবহার্য যা কিছু তা চুরি যায়। কিন্তু বেঁচে যাওয়া লেখাপত্রগুলি হারায় নি। তাঁর রচিত এই কাহিনী বিশ্বসাহিত্যের চিরায়ত সম্পদ হিসেবে বিবেচনার যোগ্য।
পায়েরাজ লিখেছিলেন "প্রথম বসন্তে উচ্ছ্বসিত এক রাশ হলুদ তাম্বোরিলো ফুল ভালোবাসা আর কমরেডদের ভালোবাসতে শেখা----দুই-ই সমান তাৎপর্যপূর্ণ।" তাম্বোরিলো ফুল দেখিনি কখনো কিন্তু গোটা কাহিনীজুড়েই পেয়েছি অনুপম তাম্বোরিলো সৌরভ।