মোনোলগ

শতাব্দী দাশ

কি খর রোদ আজ, দেখেছ? যেন কোনো স্নেহ নেই, প্রেম নেই, আশ্বাস নেই। ধূলো ওড়ে অতীতের। চল হাঁটি। দুই ধারে ধানখেত, পথভ্রষ্ট প্রেমের মতো লাট খেয়ে আছে। ধানের বুকের দুধ, কবির কথামতো, পোকা খেয়ে গেছে।


কবিদের কথা বলে ফেলি । তাঁরা অচেনা ভাষার অনুবাদক। প্রকৃতির ভাষা আমি যত্ন নিয়ে শিখিনি কখনও। ওই যেমন একটি পাখি নির্বাক চেয়ে আছে... কোনো কবি বলেছিলেন, তার মাতৃভাষা ‘চেয়ে থাকা’৷


‘পাখিটির মাতৃভাষা চেয়ে থাকা

ত্রিজগৎ রুষ্ট যখন,ভ্রুকুঞ্চিত

পাতাহীন শিউলি ডালে একলা একা

পাখিটির মাতৃভাষা চেয়ে থাকা।’


‘একলা একা’ কথাটির দ্বিত্বতায় আমার গভীর একাকীত্ব জমা আছে। কথাটির চারপাশে মাছি হয়ে ভনভন ঘুরি৷ কথাটির দিকে চেয়ে থাকি। পাখিটির দিকে চেয়ে থাকি। ত্রিজগতের দিকে চেয়ে থাকি।


চরাচর ‘রুষ্ট’ বটে। দহনে বারুদগন্ধ। যুদ্ধের দিকে চেয়ে থাকি৷ দ্বেষ ও অপ্রেমের দিকে চেয়ে থাকি। মানুষের যত কথা, বাচালতা শুধু৷ নিজের মাথার ভিতর কথা বলি আর চেয়ে থাকি।


ধানখেতের ওপারে পাহাড়। অবিচল তপস্যার ভাষা তার। বুঝিনা,তাই চেয়ে থাকি৷ মৌনী সাধনা ভাঙতে ঝর্ণার যত চঞ্চলতা, তা বোঝা কিছুটা সহজ। ঝর্ণাকে প্রথমে দেখতে পাইনা ৷ শুধু তার গান শোনা যায় । এতক্ষণে ধানখেত পিছিয়ে পড়েছে৷ নদীতীরে পৌঁছলাম৷ পায়ে হেঁটে নদী পেরোতে হবে। বৃক্ষ নির্দেশ দিল, সাতবার এই নদী অতিক্রম করে, ঝর্ণায় পৌঁছনো যাবে৷ যেন কোনো গুপ্ত ব্রত পালনের জন্য আমরা জুতো খুলি। মন দিয়ে নদী পেরোই। পায়ে ঠাণ্ডা স্রোত যায়। তার ভাষা আদরের।


নদী ফেলে আমরা আবারও নদীর দিকে যাই। একই নদী, ঝর্ণার বুকের মায়া। দার্ঢ্যে ফাটল ধরিয়ে জায়গা করেছে৷ এতটাই এঁকে বেঁকে সঙ্কুচিত চলন বেচারার, সিধে গেলে সে শরীর সাতবার পেরোতেই হবে। এইবার পাহাড় ঘাড়ের উপর এসে পড়ে, যে পাহাড়ের গায়ে জঙ্গল৷ আসলে আমরাই পাহাড়ের ঘাড়ে এসে পড়ি, বহিরাগত। তেমন নিশ্চল নয় এখানে সে৷ অনেক হাঁটার পর পাহাড়ের আলিঙ্গনে ঝরণাকে দেখে ফেলি৷ পাহাড়ের গায়ে বিন্দু বিন্দু উত্তেজিত স্বেদ। অজানা কোনো পাখি জঙ্গল থেকে চিৎকার করে। তাদের একবিন্দু সঙ্গমে বাধ সাধে৷ আমাদের মনে পড়ে যায়, ‘গারো পাহাড়ের পায়ে কাটা হাত আর্তনাদ করে’। ভয়ে কাছাকাছি আসি, কারণ সে কবিতা শেষ হয়েছিল শ্বাসরোধী বিলাপে। ‘দেশ আমাদের কোনো মাতৃভাষা দেয়নি এখনো।’ তুমি আমাকে বলো, শহরে কাটাকাটি চলছে, খবরে দেখলাম। আমি বলি, কাল ভোরের স্বপ্নে সূর্যের গলায় আড়াই প্যাঁচ ছুরি মারল কেউ৷ রক্ত গড়িয়ে পড়ল আকাশে । সে রক্ত সেনার,না জঙ্গীর, না বিপ্লবীর না ধর্ষিতার-সব গুলিয়ে গেছে,জানো? আমাদের মাতৃভাষা কাছাকাছি আসা।


নিভৃতের ভাষা শহরের থেকে অন্যতর। এখানে বিন্যাস আছে। ব্যাকরণ আছে। কাল যে ফুল দিয়েছিলে, তেমন ফুল ফুটেছে পথের ধারে। সে ফুলের কোষে কোষে অভাবনীয় অথচ নিয়মানুগ কত কাণ্ড নিয়ত ঘটছে, ভাবো একবার! সে ছন্দ-তাল-লয়-সময়জ্ঞানে অপার সৌন্দর্য আছে। তার এত আশ্চর্য রঙ হল কোন বিক্রিয়ায়? কেন হল? পতঙ্গকে কাছে টানতে, ,যাতে পরাগমিলন ঘটে? ক্ষুদ্রবুদ্ধি পতঙ্গের সৌন্দর্যবোধ আছে? বোধ আছে যদি, তবে ভাষাও কি আছে?


এই যে বারবার নদী পেরিয়েছি আমরা, এ তেমন লক্ষ্যহীন পুনরাবৃত্তি নয়৷ এক এক বারে একেকটা জটিল গ্রন্থি খুলে গেছে। অবিশ্বাসের। স্বার্থের। সন্দেহের। অনিশ্চয়তার। এইভাবে বারবার নদী পেরিয়ে একটা সাঁকোয় পৌঁছেছি। ‘নদীর শিয়রে বাঁশের সাঁকোর অভিমান’ মনে পড়ে। কেন ‘অভিমান’ সাঁকোর? কবিতায় সাঁকোটির অভিমান কেন, ভালো করে বুঝিনি কখনও। সাঁকোটি এখানে বাঁশের নয়, মরচে ধরা লোহার অবশ্য। সাঁকোটি একলা দাঁড়িয়ে, মুখ ফিরিয়ে পাহাড় ও ঝর্ণার থেকে।


চলো, অভিমান ভুলে যাই। মেঘ করেছে। ৷ খর রোদ নিবে এসেছে। ফেরা যাক৷ পথে যদি বৃষ্টি নামে? বৃষ্টির মাতৃভাষা স্নেহ। মেঘের মাতৃভাষা ছায়া। আবার আমরা নদীর আঁকাবাঁকা স্রোত পেরোই৷ এক এক করে সাতবার। একেকটা গ্রন্থি পড়তে থাকে৷ বিশ্বাসের। নির্ভরতার। রাতের আকাশে তারার তলায় তোমার সঙ্গে দাঁড়াব একবার। কি শৃঙখলা, কি পারম্পর্য সৃষ্টিতে! সেইখানে কোনোকিছু অ্যাবসার্ড নয়৷ বিন্যাসে বিশ্বাস হারালে প্রেম হয় না। প্রেম না হলে বিপ্লবও হয় না। রাতের আকাশের মাতৃভাষা আবহমানতা৷