পাখির ভাষা ফুলের সনে

বিধান সাহা

ফুল নামে যে মেয়েটির সাথে গতকাল দেখা হলো, তাকে বহুদিন মনে থাকবে। ক্লাশ ওয়ানে পড়া, ফুলের মতোই উৎফুল্ল, পুতুলের মতো ফুটফুটে কোমল একটা মেয়ে। সামনে দিয়েই যাচ্ছিলো। পাশ থেকে কে একজন তার নাম ধরে ডাকাতেই, আমারও মনে লাগলো নামটা। আমিও তার ছুটে চলা হাত ধরে, তোমার নাম কী গো?
- ফুল।
- ফুল! বাহ কী সুন্দর নাম। কী ফুল গো তুমি?
- উম... গোলাপ ফুল!

ভেবে বিস্মিত হয়েছি যে, মফস্বল শহরের একটা মেয়ে, যে কিনা ক্লাশ ওয়ানে পড়ে, যেখানে অন্যান্য মেয়েরা, অনেকটা ট্রাডিশনের মতো, অপরিচিত কাউকে দেখলেই জড়তায় কিংবা শংঙ্কোচে দৌড়ে পালিয়ে যায়, সেখানে এই মেয়েটি, জড়তাহীন নিজেকে প্রকাশ করে গেলো। এটাকে যে স্মার্টনেস বলে, আত্মবিশ্বাস বলে, ওই ফুল মেয়েটি কি তা জানে? ফুল চলে যাবার পরও তার সুগন্ধটুকু আপ্লুত করে রাখলো।

পরে, ফেরার সময়, ওদের ঘরের চৌকাঠে দেখি ফুল দাঁড়িয়ে আছে। আমি দূর থেকে, ওর থেকেই শেখা স্মার্টনেসকে সম্বল করে, বাম হাতে বিদায় সঙ্কেত আর গলার সুর একটু টেনে, জোরে চেঁচিয়ে বললাম টা টা ফুল। বাইই...
দেখলাম, ফুলও হাত দিয়ে টা টা দেখাচ্ছে।

ফিরতে ফিরতে, মনে মনে বললাম, ভালো থাকিস ফুলসোনা। ভালো থাকিস, গোলাপ ফুল।

*
সিমিকে নামেই চিনতাম। পাকা পাকা কথা বলে উপস্থিত সকলকে তাজ্জব করে দিতে ওস্তাদ একটা মেয়ে! মুহূর্তেই যে কোনো আয়োজনের মধ্যমণি হয়ে উঠায় চপলা একটা মেয়ে! অথবা সিমির গল্পগুলো শুনে তাকে আমি এভাবেই নিজের কল্পনায় গড়ে নিয়েছিলাম। সেই সিমির সাথে গতকাল দেখা। শুরুতে লাজুক, খানিকটা দূরত্ব রেখে চলা মেয়েটা কি করে যেন, ওই দেড় প্রহর সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে উঠলো। ওদের বাড়ি থেকে বের হয়ে পুরোটা সময়, যতক্ষণ শিয়ালকোল নামের গ্রামটাতে ছিলাম, সিমি সাথে সাথে। ওর যত গল্প, বলা কিংবা না-বলা, আমাকে শোনালো। ঠাঁটা পড়া দুপুর বেলায়, কোন এঁদো পুকুরের মাটি ভেদ করে মহিলার চুল ভেসে উঠেছিলো, তার পর থেকে নব বিবাহিত কোনো ছেলে মেয়ের ভরদুপুরে সেই পুকুর পাড় দিয়ে যাওয়া বারণ, কোন গাছে ভূত থাকে কিংবা ওর মামার বাড়ি, ঘুড়কা বেলতলায়, লক্ষ্মীপূজায়, মারামারিতে কয়জন মারা গেছিলো এবং তারপর থেকে চারদিনের পূজার আনুষ্ঠানিকতা কিভাবে তিনদিনের হয়ে গেলো, সব সিমির মুখস্থ। ওর কথা শুনি আর মনে মনে নিজেকেই বলি, শিশুদের এমন সহজ সুন্দরের পাশে আবার কবে নিজেকে নিয়ে যেতে পারবো? এই যে মেয়েটা, বা ওর বয়সী বাচ্চাগুলো, যাদের ভেতরে এখনও ঈর্ষার বিষ জন্ম নেয় নাই, এখনও ইগো তাদের সৌন্দর্যকে ম্লান করে নাই, এই শিশুগুলো বড় হতে হতে কেন বিষাক্ত হয়ে ওঠে?

বড় হবার পরে, আমার এই লেখা কোনোদিন যদি তাদের চোখে পড়ে তারা যেন সেদিন বুঝে নিতে পারে, আজকের এই ছোটবেলায়, একটা মুক্ত-সৌন্দর্য আর সারল্য তাদের শৈশবকে রঙিন করে তুলেছে।

*
গতকাল ভাস্করের গদ্যসমগ্র পড়ে, বহুদিন পরে, শান্তি পেলাম! আমি আসলে এরকম অনুভূতি সমৃদ্ধ জীবনই চেয়ে এসেছি জীবনের কাছে। সস্তা বিনোদনের এই যুগে টানা প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা, ট্রেনে ফিরতে ফিরতে, গদ্যসমগ্রের অনেকটা পড়া হলো। একটা শান্ত, স্থির মনুমেন্টের উপর থেকে যেন তিনি কথা বলে চলেছেন। নিজের কথাগুলো নিজেকেই জানিয়ে রাখা যেন। জগতের মাঝে থেকেও যেন দূর থেকে জগত সম্পর্কে বলে যাচ্ছেন নির্লিপ্তভাবে। পড়তে গিয়ে বুকের ভেতর সাহস বাড়ছিলো। তারুণ্যই হবে হয়তো, কিংবা তারুণ্যের দুর্বিনীত আগুন, ভেতরে টগবগ করছিলো। আমি যেন নতুন করে বেঁচে উঠছিলাম। ভাস্কর চক্রবর্তীকে, এই ক্ষণে, অন্তরের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা না জানালে পাপ হবে।

আপনি কি আমার জীবনটাকে অন্য অনেক আলোয় উদ্ভাসিত করে তুলতে পারেন, প্রিয় ভাস্কর?

আজ দুপুরে, এই নগরে, শিয়ালকোল নামে কোনো গ্রাম আর টের পাওয়া যাচ্ছে না।

*
ভাষায় ভেসে যাচ্ছি। কাক ও কোকিলের ডাকের পার্থক্য কী? কিসের ভিত্তিতে এই পার্থক্য? কিংবা এই যে বলা হয় কোকিলের ডাক সুমধুর, কাকেরটা কর্কশ, সেটাই-বা কেন? তাদের ভাষা তো অজানা। তাহলে? কিংবা ভিনদেশী ভাষার রেডিও চ্যানেল যখন শোনা হয়, তখন তো শ্রোতার মুডেরও পরিবর্তন হয়। কেন হয়?

কেবলমাত্র ভাষা মানুষকে স্পর্শ করে না। স্পর্শ করে ভাষার ভেতর ইম্পোজ করা ইমোশন বা সুর। এ কারণে ভাষার আঞ্চলিকতা থাকলেও সুর ও আবেগ ইউনিভার্সেল। সুতরাং এই যে ‘কবিতা বুঝি না’ ‘কবিতা বুঝি না’ বলে চিৎকার-চেঁচামেচি, এটা স্রেফ বোকামি। কবিতা বুঝতে চান কেন? শব্দ আর বাক্যের ভেতর ইম্পোজ করা ইমোশনের দিকে বিনম্রভাবে মন লাগাইতে পারেন না? মনে রাখবেন, আছে গরু না-বায় হাল, তার দুঃখ সর্বকাল।

হিম ইতামবাম!!