পিছুদাগ

সাদিয়া সুলতানা

১.
তুমি চলে গেলে থাকে শুধু প্রতীক্ষা আর প্রতীক্ষা জমে হয় অভিমান। আর অভিমান ফুরিয়ে গেলে থাকে শুধু নদী। ঢেউময় পাহাড়ী নদীতে জল থাকে অবিরাম। সেই অতল জলে আমি ডুবি-ভাসি নিভৃত যাতনায়। আমার দীঘল চুলের ছায়া স্রোতের তালে তুমুল নাচে আর নদীর বুকে গুমরে মরে ভাঙনের সাত সুর।

আচমকা পাড়ে ভেড়ানো ইঞ্জিন নৌকার মাঝি হাঁক দেয়, 'যাবে?'

তখন তাবৎ পৃথিবী জুড়ে চিরহরিৎ সন্ধ্যা নেমেছে। মখমল মেঘের আঁচল দুই পাহাড়ের চিবুক ছুঁয়ে ভেসে গেছে দূরে। মেঘের আকাশ সীমানাহীন। সেই আকাশে একটা দুঃখপাখি উড়ে উড়ে কেঁদে মরে। পাখির ডানা নেই। ডানাহীন পাখির পালকে বিন্যস্ত থাকে গাঢ় চুম্বনের দাগ।

আর আমি মাঝির ডাক উপেক্ষা করে ডুবে যাওয়ার সব পূর্বপ্রস্তুতি সম্পন্ন করি।

২.
দূরে কোথাও বেহালা বাজে। যে বেহালার বুক জুড়ে রোদনের সুর আর তোমার ফেলে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস। অত কান্না কেনো ওর বুকে? জানি না, কেউ জানায় না। শূন্যতার সেই সুর আঁকড়ে ধরে আমার শুধু মনে পড়ে, আমাদের যুগলজীবন। আমরা তখন ভালোবেসে আকাশ হয়েছিলাম। যে আকাশজুড়ে ছিল কেবল বিজলির আখ্যান। বৃষ্টি বিরতির রঙধনু বাহার নিয়ে আজো সে আকাশ বহুতল মেঘের পরে শরীর এলিয়ে আছে। আর আমি মেঘের ভাঁজে দাঁড়িয়ে শুনছি পুরনো সব কথার বুদবুদ।

তুমি বলতে অভিমানের কান্না ভালোবাসো, এই কান্না বরাবর আমাকে নাকি রূপসী করে তোলে। তাই হয়তো বৃষ্টি ফুরোলেও অভিমানের সেই কান্না ফুরোয় না। আমার জলজ চোখ তোমার ফিরে আসার দিন গোনে আর মেঘের পালকে সাজিয়ে রাখে হারিয়ে ফেলা সুখ।

আমাদের সুখগুলো ছিলো গাছের মতোন, যার ছিল অতল শিকড় আর সবুজের বাড়াবাড়ি। আমাদের চুম্বনের উত্তাপ ছিল পাপের মতোন, যার রং ছিল লাল, নীল, আসমানি, কমলা, হলুদ, সবুজ, বেগুনি। আমরা সেই পাপের ঘ্রাণে বুঁদ হয়ে দুজন দুজনকে তুমুল ভালোবাসতাম আর কথা বলতাম প্রিয় রঙের তারুণ্যে। মেঘনিনাদের মতো আজো সেই কথোপকথনের ঝলকানি আমার বুকে জমে থাকা ক্ষরণের দাগকে দৃশ্যমান করে তবু আমি কান পেতে রই। আচমকা পা হড়কে পড়ার মতো হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামতেই মেঘের চূড়ো থেকে খসে পড়তে পড়তে আমি রঙধনুর ফাঁকিটা ধরতে পারি।

৩.
এমন বৃষ্টিধোয়া কদমগন্ধী সকালে সুখের পতনের মতো নিস্তব্ধ মেঘেরা নেমে আসে। জারুলের থোকায় বসতি গড়া বিষপিঁপড়ের বেগুনি রঙমাখা পায়ে চড়ে পিলপিল করে এগোয় অচেনা সুখের চেনা বার্তাবাহক। আর আমি শতখণ্ডী মেঘের আড়ালে দ্বিখণ্ডিত শরীর নিয়ে মৃতবৎ পড়ে থাকি। এ এক অবাক সুখের অসুখ। চোখের কোটরে ফ্রকে কুঁচি দেওয়া তাড়িত শৈশব আর শরীরময় হিরন্ময় নিস্তব্ধতা!

নৈঃশব্দের নিবিড়তায় রোদের পালক পরশ বুলাতেই স্মৃতির ভাষা বদলে যায়। সবুজ বনের নীল আড়ালে শুরু হয় মেঘের লুটোপুটি। মেঘের নির্যাস ছড়িয়ে দিতে থাকে থোকা থোকা অশ্রুফুল। ভাঙা শরীরে আমি সেই ফুল কুড়াই। সকাল ফুরিয়ে দুপুর আসে। অবিন্যস্ত দুপুরের বাওকুড়ানি হাওয়ায় তোমার-আমার সোনালি দুঃখগুলো উড়তে শুরু করে। উড়তে উড়তে ওরা হারিয়ে যায়। ঠিক তখনি অবিনাশী মেঘদল আমার পিঠে ডানা লাগায় আর আমি পিছুদাগ ভুলে অমল মেঘে ভাসি।