জোছনা পড়ার শব্দ

পার্থ কর


নির্জন কাঠের সেতুটি আসলে তিনটি যুবক শালের শবদেহ । আর্তনাদহীন ম'রে গিয়েছে ব'লে আমরা বুঝতে পারিনি, আমাদের নজর বড় কম ।
সবকিছু দেখে ফেলতে নেই— সেই ব্যবস্থাই করা আছে । খসে পড়ার পর পঞ্চম হয়ে গেল যে পাপড়ি তার নামে হেলদোল নেই বাকিদের । সব কান্নার জল আর সব জলের দাগ থাকে না । সেখানে বেদনা রঙিন, জলের নাম শবনম ।
গর্তের সঙ্গে চিরশত্রুতা জলের— গভীরতার সঙ্গে পূর্ণতার যুদ্ধে শব্দ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসে... অবশেষে থেমে যায় ।
তখন আর কিচ্ছু শুনতে নেই, সমস্ত ইন্দ্রিয় ঈশ্বরের কাছে জমা রেখে লীন হয়ে যেতে হয় ।
তখন ফুল পাখি আর মেঘের ঠোঁটে সোহাগের ঘুম ভাঙানিয়া,
প্রেমের ঠোঁটে নিরাময়ের মুখসুধা—
নিচু হতে হয়, গড়িয়ে আসতে দিতে হয় ।
এই নিচু হ'বার কৌশল জানে বলেই ভ'রে ওঠে সরসীর বুক,
শান্তি আসে
চুপকথা লেখা হয় প্রতিবিম্বের হৃদয়ে ।
তুলতুলে পাপড়ি থেকে কালো হয়ে আসা জলে ঝ'রে পড়ে একটি ফোঁটা, কচুরিপানাফুলের এই ছোট্ট ম্যাজেন্টা-শব্দেও শালুকের পাতায় বসা জলপিপি চমকে ওঠে । একটা তালশামুক তার মুখের ঢাকা খুলে চাঁদ গিলছে তখন,
কালচে বাঁশপাতার মধ্যে ঝিম ধরে বসে থাকা কুবো পাখিটার তখন আর সেদিকে নজর নেই । জলমাকড়সার আলপনা দেওয়ার শব্দ শুনে মাদার গাছের তিরতিরে ছায়াটি কেঁপে কেঁপে ভেঙে যায়— নিস্তব্ধতার শব্দকোশে যোগ হয় দুপুর নামের আরেকটি অবয়ব ।
একমাত্র এইসময়ই পাতা ঝরলে শব্দ হয়... মাটি কখনো ঝরাপাতাকে ফেরায় না ।
সেসব শুনতে হলে নিজের কাছের সমস্ত শব্দ নিভিয়ে দিতে হয়, যেমন নিভাতে হয় দূরাগত আলো দেখতে হ'লে নিজের পাশের সাঁঝবাতি ।
আঁধারের সঙ্গে ধর্মযুদ্ধে আলো ক্লান্ত হয়ে এলে স্নিগ্ধ বরাভয় নিয়ে হেসে ওঠে অশ্বিনী নক্ষত্র ।
তখন নদী, নারী ও ঈশ্বরের কাছে নামিয়ে রাখি আমাদের যাবতীয় কৌশল— সেই নম্রতার পথ বেয়ে প্রত্যেক পার্বণী-সন্ধ্যায় আলোর কাছে উড়ে আসে অলৌকিক মথেরা...যাদের শ্রান্ত ডানার বিষণ্ণ স্বরলিপি থেকে বেজে ওঠে আশাবরী ভোরের শবনম-শিঞ্জিনী ।
ততক্ষণে মৃতপ্রায় নদীকে নাম ধরে ডাকলেই তার ফুরিয়ে আসা বুকের পরিমিত গভীর থেকে ভেসে ওঠে মায়াবী শুশুক—
জলপরি-সবুজিয়া চোখে তার পূর্ণ চাঁদ ভরা-কটাল...
জোসনাকে সে শোনাবে— কোন এক পড়ন্ত গোধূলিতে নদীটির লাজবনতা সমুদ্রদয়িতা হয়ে ওঠার কাব্য ।
ন্যাড়া জিওলের ডালে ঠোঁট ঘষা রাতচরার চোখে তখন ফুটছে টগবগে তারা ।
নয়ানজুলির আঁশটে গন্ধ মেখে উঠে আসে নবান্নের ঈশ্বর—
সুবচনী শস্যের আল দিয়ে এগিয়ে এসে ফুলের গর্ভে ব'সে পড়লেই কাকতাড়ুয়ার দায়িত্ব ফুরোয়,
তখন বাকি পাপড়ি ঝরার শব্দকে আর আর্তনাদ মনে হয় না ।
এরপর আগামী ফাটলের মাপে মেঘের বায়না দিলে আকাশকে চিন্তা-গম্ভীর দেখায় । আমাদের এইসব বায়না, এইসব নির্বাসিত ইচ্ছে-সমূহের নামই মেঘ।
সে থাকে কোন সুদূর পরবাসে, মাঝে মাঝে দেখা করতে আসে,
মুখ ভার করে ফিরে যায় ।
থেকে যায় জল—
থেকে যায় পৃথিবীর বুক থেকে ছিঁড়ে যাওয়া চাঁদের গর্তে জমে থাকা সাগরসাগর অভিমান—
তিথি মেনে ফুঁপিয়ে উঠলে কান্নার জোয়ার আসে সেথা ।
গভীরে তার শুক্তির কথামালায় লেখা থাকে— সমুচ্ছ্বাস লুকিয়ে সাগর ঠিক কতটা নিচু হলে সমস্ত শৈবলিনী নদী কোনো এক ভরন্ত গোধূলিতে সমুদ্রিতা হয়ে ওঠে মোহনায় ।
তবু তো আগুন থেকে গেছে, তবুও দহন, তবুও পোড়াদাগ—
বুকের তরলিত সেই অন্ধকারের নাম লাভা রেখে এই শাশ্বতিক পাথরের পথে মাটি হয়ে গেছে পৃথিবী ।

কিন্তু এত কিছু দেখে ফেলতে নেই, এত কিছু লিখে ফেলতে নেই...
কারণ
পাখিরা একবার উত্তর-ফাল্গুনে প্রথম কলতানসমগ্র প্রকাশ করবে ব'লে সভা আহ্বান করার পরপরই বসন্ত খুব তাড়াতাড়ি সেখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছিল । সম্বৎসরিক আবহাওয়ার প্রতিবেদনে সে কথা অবশ্য লেখা ছিল না ।
মাঝরাতে দু'পাশ থেকে সমাধিবেদীর উপরে উঠে বসা একজোড়া নারী-পুরুষ-ছায়ার হাসির শব্দ একমাত্র শুনতে পায় যে, শোনা যায় সে আসলে আজন্ম বধির... কেবল কোনো এক অলস দুপুরে নিচু আমের ডাল থেকে তাদের অকারণে দীর্ঘক্ষণ ঝুলে থাকা থেকে সে দেহজোড়াকে বাঁচিয়েছিল ।
সব শোনা যায় না, সব না শুনলেও চলে যায় দিব্যি ।
কবিত্বের অসুখ অত্যন্ত গভীরতর— এ কথা শুনে
বৈষয়িক মানুষটি অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ডুবুরীর সরঞ্জাম কিনে এনেছিলো । পোশাকে যন্ত্রে ভ'রে উঠছিলো ঘরের সমস্ত কোণ,
বাতাস ভ'রে গিয়ছিলো কৃত্রিম অক্সিজেনে...
অবশেষে একদিন তার সিন্দুক ভেঙে উদ্ধার হলো ভাঙা আয়নার কতকগুলো টুকরো.. সেখানে তাকালে একটায় নির্মেঘ আকাশ, একটায় সবুজ খেলার মাঠ, একটা লাঠাই আর চিলেঘুড়ি.. একটা শাদাটে সরু আলপথ, একটা সন্ধ্যার কুয়াশালেখা, একটা ধূপের সন্ধ্যারেখা দেখা যায় । কোনো সোনালি সকালের গভীরতম ময়নাতদন্তেও কোনো সোনার কুচি মেলেনি, অথবা গোধূলীতে কোনো জ্বলন্ত অঙ্গার..
মেলেনি সমুদ্রের গভীরে শুক্তির বুকে লুকিয়ে থাকা কোন মুক্তোরও ।
পোশাক প'ড়ে আছে জড়সড়, ডুবুরী কেবল ভাসতে ভাসতে কোথায় যেন চলে গেছে ।
সব স্রোত, সব নদী, সব ভাসান— সন্ধ্যায় এসে পড়ে,
সেই সন্ধ্যা, সেই নদী— যেখানে
বড় শালুক পাতার উপর বুক পেতে বসে থাকা বুনোহাঁসের শাবকটি পালকে ঠোঁট গুঁজে ঘুমে কাদা হয়ে যায় ।
আমাদের কারুবাস সুখপাখি পলকে নেমে এলে তাকে ঘুম ভেবে নিঃশব্দে তার ঠোঁটের সামনে ছড়িয়ে দিই আমাদের অবশিষ্ট রাত । কী ভেবে অকারণে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে বরিষ্ঠ বট— শিশুপাঠের দাওয়ার আঁধার ধার ক'রে যে এতক্ষণ মৌন ছিল ।
টুপ নামক অলীক শব্দে যে হলুদ হয়ে ওঠে, এই বাতাসটুকুকে সে জানিয়ে দিয়েছে— ভরপুর পাতাজীবনের পরও উড়ে যাবে সে...অজুহাতে মতো একটু কেবল বসন্ত হলেই চলবে তার ।
তারপর ঋতুক্ষত দেহে মাটি কামড়ে ধ'রে থাকবে গাছ ।
ডালে তার সুখ-বাসা ।
তীর বুকে নিয়ে সেখান থেকে যতদূর পারে উড়ে যায় পাখি,
কষ্টের ফোঁটাগুলো ডালে শুকিয়ে ওঠে একা । কোনো অভিযোগ ছাড়াই শবহীন চিতা নিভে আসে বাসার বুকে ।
শবরের চুলায় ফুটে ওঠে আমিষ-গন্ধ ...বেঁচে ওঠো হে কলতান সন্ধ্যার জঠরে জঠরে.. রাতের অন্ধ শূন্যতায় ঘুমের মতো পেলব হয়ে ওঠো । আনন্দময় হয়ে ওঠো ওহে পালকসকল ..
বেঁচে থাকো হে আদুড় জিওল—
শেষ পাতাটি ঝরে যাবার পর গাছকে যারা মৃত ভাবে তারা আসলে বসন্ত দেখেনি