একটা গাছ - গাথা

তামিমৌ ত্রমি



একটা আঁকাবাঁকা দুধের ধারা। পাড়ের কাঁথামাটিতে যখন সে আঁতুড় চারা ছিল, নদীকে এমনই মনে হোত তার। মাইভরা মা। প্রতিদিন জোয়ারের দুধে শিবস্নাত মথিত সে কাঁচাকুঁচো পত্রালি ঝাড়ত অনর্গল হাওয়ায়। পুষ্ট হোত গায়েগতরে। রোদচাদর তার ছোট্টো নরম অশক্ত দেহকে মুড়ে রাখত। শুধু 'ছাগল' আর 'কুকুর' সেপ্টেম্বরের জোড়া হাইজ্যাকের মতো কাঁপ ধরাত- যদি ছাগল মুড়িয়ে নেয়; কুকুর যদি মুতে দেয়। মুড়োলে তো গল্প ফুরিয়েই গেল। কিন্তু মুতটা বড় অবমাননাকর। কারণ, কুকুরের মোতার আঙ্গিকটা যথেষ্ট মহিমান্বিত নয়। এক ঠ্যাং উঁচিয়ে ভব্যতা ঘুচিয়ে.. বড়লোকের বাড়ির মোহনভোগ খেয়ে অপুর যেমন দিমাগ কি বাত্তি জ্বল গয়াথা- মোহনভোগ আর সুজির পুলটিস সমার্থক তো নয়ই, সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক ও নয়। ধর্মঠাকুরের প্রতিস্পর্ধী মুত ঝটসে শ্রেণীচেতনা উজিয়ে তোলে- যদিও 'সে' জানে তার বলবাল কিছুই নেই শেভ করার মতো। এমনকী ঝড়ের হাওয়াও তাকে নুইয়ে মারে। কিন্তু বাতাসের মধ্যে একটা তুলতুলে সংসদীয় সাম্যবাদী ভাব থাকায় মাথা নোয়ানোটা মাথা হেঁট বা মাথা কাটা যাওয়া বলে প্রতীয়মান হয় না। তবু, নিরন্তর আস্তিত্বিক সংগ্রামে পাঁউরুটি, ঝোলা গুড় ঝাপটস্রোত, ধুলোপাউডার, কর্দমাক্ত ক্রিমময়তা কিছুই কি ছিল না? এক কাঁখে ঘড়া আর এক কাঁখে গলায় তাবিজ কোমরে কালো কার বাঁধা ন্যাংটা বাচ্চা নিয়ে জল আনতে আসতো কলস কাকিমারা। আগে নিজেরা কলস হয়ে ডুব উপুড় করত। স্নান সেরে ভিজে শাড়ির ভারী কাকিমারা উঠে আসত তীরে। কলস ভরত। উদোমকচিগুলোর তখনো ঝাঁপজল থেকে উঠতে ধাষ্টামো। চ্যালাকাঠ কিংবা জুতো মেরে পিঠের ছাল উঠিয়ে দেওয়ার সাতধমকে তারা যখন ভিজে পায়ে কাদায় ছাঁচ ফেলতে ফেলতে নরমপাকের পথে মিলিয়ে যেত, তার মনে হোত পিঠোপিঠি ভাইবোনুরা মিলিয়ে গেল দিগন্তে।

সেই ভাইবোনুদেরই একজন যখন পূবদিকের আঁশশ্যাওড়ার ঝোপে একদিনান্তে রাবারের চ্যাপ্টা থ্যাঁতলানো কলা ফেলে এদিক ওদিক সন্ত্রস্ত তদন্ত চালিয়ে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল,- সেদিন নদীর জলে সে দেখল, এক ঝাঁকড়ামাথা কান্ডপ্রখর সহস্র বাহু রাজবৃক্ষ। অবাক হয়ে আপনাতে জারিত হতে হতেই এক বিবাগী দোয়েল তার মগডালে বিষ্ঠাতিলক ফেলে উড়ে চলে গেল। চারাবচ্চনের অভিষেক হয়ে গেল এক লহমায়। বৃষ্টি এল যেন প্রখর শিশির। উন্মত্ত ঘাম। আঠালো রেচন বীর্য ধুয়ে ধুয়ে নুয়ে গলে যেতে যেতে সে দেখল- নদী আর দুধের ধারা নেই। তার প্রতিটি বাঁক বুক হয়ে গেছে। বৃষ্টির সূক্ষ্ম কারুজালি ব্রেসিয়ার ছাড়া আর কিচ্ছু না। তার ইচ্ছে হল মাছ ধরা সেই বুড়োর মত ছিপ ফেলে নদীর মাছবোতামগুলো পটাপট খুলে ফেলতে। সে সোঁ সোঁ করে ঝুঁকে পড়ল নদীর বুকে। তার এখন নদী পাচ্ছে, অঙ্গাত্মায় নদী মাখছে সে। ঝোড়ো হাওয়ার অকস্মাৎ। তার ঝাঁকড়া আপনি ঘুরে গেল ডানদিকে। ঢিল দূরত্বে আমগাছটাও একমনে গিলে নিচ্ছে নদী। সে থ্রি সিক্সটি ডিগ্রী জরিপ করে নিল। গাছের পাশে গাছ, গাছের পরে গাছ, গাছের কোলে ঝোপ, গাছের পায়ে ঘাস, ঘাসের গায়ে ফড়িং, মেঘের গায়ের ফোস্কা, পুঁজফাটা বদরক্ত ঝরা আকাশ, সবাই, সব্বাই নদীকে চাটছে। 'তার' নদীকে লেহন করছে। ক্রোধান্বিত কটা পাতা ঝরে পড়ল নদীর উপত্যকায়। পড়েই শিহরিত হয়ে মিলিয়ে গেল ঘূর্ণিহোলব্ল্যাকে। মূলত বাতাসের কোন কারিকুরিই নেই। দৃকসঙ্গমজাত রতিসুখে কেঁপে কেঁপে উঠছে সবাই। উতক্ষিপ্ত আষাড়েরস কাদামাটি বেয়ে গভীরগূঢ় অন্ধকারের পথে নদীতে এসে মিশছে। ফলতঃ সহস্র ঢেউগর্ভা নদী কামড়ে ধরছে তীরের বেড কভার আবার আছাড়ি পিছাড়ি খেয়ে নেমে যাচ্ছে এমনিওটিক মহাফ্লুইডে।
এবং
সমস্ত বৃষ্টির শেষ আছে।সমস্ত আর্তি এবং নাদের। নাদব্রহ্মের অমোঘবুটের ধাক্কায় রজঃস্বলা অস্তনদীর যোনি পিছলে যখন জনসন চর্চিত চাঁদ কঁকিয়ে উঠল- সে, ঢিলদূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছটা, গাছের পাশে গাছ, গাছের পরে গাছ, গাছের কোলে ঝোপ, গাছের পায়ে ঘাস, ঘাসের গায়ে ফড়িং, মেঘের গায়ে ফোস্কা, পুঁজফাটা বদরক্তমাখা আকাশ- কেউ হাজার ঝাঁকিয়েও বুঝে উঠতে পারল না, চাঁদের বীর্যবাপ কে।