জঙ্গল ও মুখোশ

মুক্তি মণ্ডল


জঙ্গলে ঢুকার আগে অনেকগুলি মুখোশ অরণ্যকে সাক্ষ্য রেখে ছবি তুলছে। মুখোশের সেল্ফি তুলছে। সেইসব বিভৎস ছবিগুলি কিছুক্ষণ পরেই ছেড়ে দিচ্ছে র্ভাচুয়াল জগতে। অন্য মুখোশেরা তাদের সেইসব বিভৎস সেল্ফিগুলি দেখে রিএক্ট করছে। হাহা হোহো। আমিও তাঁদেরকে দেখছি। দেখার পর মগজে ভাইরাস এক্টিভ হয়ে ওঠে। ওদেরকে আক্রমন করতে পারে যে কারণে ডিলিট করে ফেলি সঙ্গেসঙ্গেই। দূর থেকে বন দেখতে দেখতে কাছে আসি। মাথা নত হয়ে যায় বনান্তর দেখে। তখন প্রশান্তির ডানার নিচে মনে হয় ঘুমিয়ে পড়ব এখুনি। তন্দ্রাময় একটা ভাব শরীরকে কোলে তুলে নিয়ে নিরুদ্দেশ হতে চায় যেন! নির্ভার শরীর তখন তুলোর মতো ওড়ে। চোরাচাহনির বন্য রোদ তখন হেসে ওঠে। তন্দ্রা ছুটে যায়।

তারপর জঙ্গলে ঢুকে পড়ার আগে থমকে দাঁড়াই। দেখি ঝড়ে ভেঙে যাওয়া অট্টহাসি দেওয়া মুখের মত পড়ে আছে একটা বয়স্ক বৃক্ষ। তার সেই অট্টহাসি দেওয়া মুখের ভেতর বালু মিশ্রিত শুকনো পাতার স্তূপ, শিশুর আঙুলের মত অসংখ্য ডালপালা, এমন ভঙ্গীতে জড়াজড়ি করে আছে, যা সত্য সম্রাটের মুকুটের গোপন সৌন্দর্যের বৈভব যেন। তা অবলোকন করতে গিয়ে উঠে আসে নির্জন বনের দীর্ঘশ্বাস আর মচমচ শুকনো পাতার ধ্বনি। সেই ধ্বনিতে লুটিয়ে পড়ে আমার যাবতীয় সংশয়ভরা অহংকার আর অব্যক্ত অভিমান।

নিজের ভেতর গোটানো মানুষের কান্না সেসব দেখে থেমে যায়। তখন জঙ্গলের অবাধ্য জংলি হাওয়া গায়ে মেখে ঘুরতে ভাল লাগে। শুধু দেখতে থাকি জীর্ণশীর্ণ বয়স্ক বৃক্ষের অট্টহাসি দেওয়া মুখের ভেতর আমারই বিকল্প এক জীবন, স্বাধীন মেঘের রঙে ভেসে চলা অনন্ত উল্লাস। সীমাহীন সেই উল্লাসের তলে সহজ জীবনের ছায়া গোপনে বয়ে বেড়াতে আনন্দ হয়, তখন মনে হয় অরণ্যর গভীরে অন্তহীনতার বুকে মিশে যদি যায় সমস্ত স্মৃতির ধুলো, তারপর যে জীবন পাব তখন, তা মাতাল ঝাউবনের বাতাসে, নির্ভয়ে উড়তে শিখবে, যার হারানো কোনো চিহ্ন রেখে যাওয়ার কোনো মিনতি নেই, নেই কোনো প্রণতি ও বিস্ময়।

জানি মুখোশের জীবন বয়ে চলা জটিল, দ্বন্ধ আর সংঘাতে ভরা কাঁটার মত। মুখোশী সমাজ ওই জীবনকে রীতিনীতি ও নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখতে চায়। জঙ্গলের কোন রীতিনীতি নেই। মুখোশী সমাজের রীতিনীতি ও নিয়ম উপেক্ষা করলে শৃঙ্খলা সংহত রক্ষার দোহাই দিয়ে মুখোশী সমাজ মুখোশ-ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়, বিভৎস আচরণ করে। যে মুখোশ-ব্যক্তি কাউকে কোনো ক্ষতি না করে মুখোশী সমাজের রীতিনীতি ও নিয়মকে উপেক্ষা করে তাকেও মুখোশী সমাজ শাস্তি দেয়, একঘরে করে, এটা মুখোশ-ব্যক্তির স্বাধীনতাকে খর্ব করে। এতে মুখোশ-ব্যক্তির সৃজনশীলতা বিনষ্ট হয়। ওটা তখন মরে পড়ে থাকা শুকনো পাতার মতই। পলকা হাওয়ায় উড়ে উড়ে যায়। কেউ মাড়িয়ে গেলে মচমচ শব্দ হয় শুধু। অরণ্যের নির্জন দুপুরে যেদিন পথ হারিয়ে ফেলি, সেদিন সমস্ত স্মৃতি মুছে দিয়ে জঙ্গলের গভীর থেকে গভীরতর নির্জন পথের রেখা ধরে হাঁটতে হাঁটতে অসংখ্য পাতার সঙ্গ পেয়ে এরকমই মনে হয় আমার।