মূক

অলোকপর্ণা

না থাকার ধারণা মুশার নেই। না হওয়ার ধারণা মুশার কোনোদিনও হবে না। মুশা শব্দের কিঞ্চিৎ পৃষ্ঠপোষক, নৈঃশব্দ তাকে সন্দিগ্ধ করে। সে সজাগ হয়ে শব্দ খোঁজে, হাতড়ায়। অথচ রোদ্দুরের কোনো শব্দ নেই, জ্যোৎস্নার কোনো ডাক হয় না, হাওয়ার আঙুল কিছুতে লেগে না গেলে হাওয়ার নিজস্ব কোনো শব্দ নেই। জগতের যেকোনো সহজ সব কিছুই শব্দহীণ। স্মিত হাসি, গভীর চাওয়া বা স্পর্শ... স্পর্শের কোনো শব্দ হয় না। তাই মুশা রোদের মলিন আঁচ বিষয়ে লাইন তিনেকের বেশি ভাবতে পারে না। মলিন আঁচ নিয়ে ভাবতে গেলে উপমা টানতে হয়। শব্দ খুঁজতে হয়,- “পেলব”, “মেদুর” বা “কোমল”। এক শব্দ কাঙাল হলে আরও আরও শব্দের প্রতি কাঙাল হতে হয়। মলিন রোদের কথা ভাবতে গিয়ে শব্দ নয়, মুশার মায়ের কথা মনে পড়ে, কারণ তার অভিধানে এত শব্দ নেই।
মুশার মন এমন কাতর,- স্মৃতির গায়ে গায়ে গন্ধ, উত্তাপ বা আবেশের ডাকটিকিট লাগিয়ে দিতে ভালোবাসে। যেভাবে তারার নিজের আলো তারার মৃত্যু সংবাদ বয়ে আনে, গন্ধ, উত্তাপ ও আবেশেরা স্মৃতির কফিন থেকে ঢাকনা সরিয়ে সরিয়ে দিয়ে যায় অনেক বছর পরেও। মুশার মন নাম ভুলে যায়, ফোন নম্বরেরা গাছের মত একে অপরের গায়ে হেলে পড়ে এলো হয়ে থাকে, অথচ স্বর,- সেই মৃত তারার আলো। ঘ্রাণ,- সেই মৃত তারার আলো। স্পর্শ,- সেই মৃত তারার আলো,- মনে করায় মুশাকে, কি যে ছিল... কি যেন আর নেই?... আর নেই?
এভাবেই মৃদুতর অস্তিত্বের দিকে যেতে যেতে মুশারফ বাক হারায়। তার চোখের সামনে পিঁপড়েরা গন্ধ চিনে চিনে পিঁপড়ের পথ বেয়ে চলে, প্রজাপতিরা রঙ বেয়ে বেয়ে ফুলে এসে বসে। কাঁদতে গিয়ে মুশার গলা বেমক্কা আটকে যায় কোনো এক দুপুরে। মুশার স্বর বেইমানি করে। মুশার শব্দ লোপ পায়। অথচ কাহারো কাছে পৌঁছোতে গেলে তাহাকে শব্দের আশ্রয় নিতে হবে। কিন্তু মুশার অভিধানে অত শব্দও নেই। অল্প কিছু শব্দের মাঝখানে মুশার পৃথিবী চুপচাপ ঘুরতে থাকে। অন্ধজন যেমন একই স্পর্শ দিয়ে পুরোটা পৃথিবী অনুবাদ করে, মুশাও সেই কটা শব্দ দিয়ে পৃথিবী দেখে।

অর্জুন গাছের একটা সবাক অস্তিত্ব মুশা অবাক হয়ে দেখে,- “ঝলমলে”, “সবুজ”, “সাবলীল”। মাটির নিচে অর্জুন গাছটার এক গোপন জীবন আছে, নিঃশব্দ এক প্রবল জীবন। মুশা জানেনা, মুশার ভিতরের দিকেও তেমনই এক অন্ধকার,- শব্দহীন, বাক্যহীন। এবং লালিত। মূক বধির মানুষের মনের কথার মত সেই অন্ধকার নিঃশ্চুপ। অন্ধকার অন্ধকারে চুপচাপ বসে আছে। যেদিন মুশার মা চলে গেল, মুশা সেই অন্ধকারে বসে ছিল অনেকক্ষণ, তারপর মুশার খিদে পেয়ে গেল। মুশা জানল, পিঁপড়ের ডিম মুশার ভালো লাগে। পিঁপড়ে খেলে সাঁতার শেখা যায় যেন কে বলেছিল। মুশার মনে নেই। মনে না থাকার বেদনা কিভাবে প্রকাশ করতে হয়, শব্দরা বেইমানি করে বারবার। মুশা মৃত্যু দেখেছে,- শব্দের, ঘুঘু পাখির, ভোলু কুকুরটার। মুশা দেখেছে আজীবন শব্দ নিয়ে লড়তে লড়তে মানুষ মৃত্যুর দিকে,- নৈঃশব্দের দিকে হেঁটে যায়। মা বলত, মরে গেলে সবাই আকাশে চলে আসে। অর্জুন গাছটার নীচে বসে মুশা রাতের আকাশের দিকে তাকায়।
আকাশটা শূন্য। অপার। এবং শব্দহীন।
নৈঃশব্দের সমুদ্রে বসে মুশা আকাশের ডাক শুনতে পায়, আকাশের ডাক শোনে।