মূক ও বধির এই ভাষা আমি লিখি আমগাছ তোমার জন্য, জলে লিখি

রাণা রায়চৌধুরী


আমি ছোটবেলায় দীর্ঘদিন, দীর্ঘ বছর গ্রামে কাটিয়েছি। একথা অনেক লেখাতেই বলেছি। কিন্তু এই লেখা লিখতে বসে তার আবার পুনরাবৃত্তি করছি কেন, কারণ এই লেখাই প্রকৃতির ভাষা নিয়ে। আর প্রকৃতি বলতেই আমার সেই ছোটবেলার গ্রামের দিনগুলির কথা মনে পড়ে।
সত্যি বলতে, যখন বিভূতিভূষণ পড়ি বা অন্য কোনো লেখায় যেখানে থমথমে বর্ষার আকাশের বর্ণনা বা বিকেল চলে যাচ্ছে তার সব মনখারাপকে সঙ্গে নিয়ে... তখনই আমি খুব মিস করি সেই ছোটবেলার গ্রামকে-প্রকৃতিকে, মিস করি মানে খুব কষ্ট হয়, যেমন মাকে আর কোনোদিন ফিরে পাব না, যেমন আর ফিরে পাব না আমার ক্লাস ফাইভের পাঠ্যবইয়ের ছড়াকে... ঠিক সেইরকম না ফিরে পাওয়ার কষ্টে আমি বিভূতিভূষণ পড়া থামিয়ে মনে করার চেষ্টা করি, ঘোর বর্ষার রাত, ধান খেতের ওপর কালো থমথমে দৈত্যের মতো মেঘ, অন্ধকার, ব্যাঙের আনন্দের চিৎকৃত ডাক, হঠাত দেখি হ্যাজাক হাতে দু-চারজন চলেছে ধানক্ষেতের নীরব-অন্ধকার ভেঙে, মাকে জিগ্যেস করি, ‘ওঁরা কারা!’ মা বলে, ‘ব্যাঙ ধরতে যাচ্ছে’।
আহা, নিরীহ ব্যাঙ। লাফ মারে, পিটপিট করে নীরবে তাকায়, কোনো চাহিদা নেই শুধু লাফ মারা ছাড়া, পুকুরের শান্ত জলকে যে প্রাণী সাঁতারে সাঁতারে সুর তোলে, তাকে ধরে কী করবে লোকগুলো! আমার বালক মনে প্রশ্ন জাগে, দুঃখ হয় ব্যাঙের ছানাগুলোর কথা ভেবে, মা ব্যাঙ মানুষের নিষ্টুর অস্ত্রে রক্তাক্ত হলে শিশু ব্যাঙ কি করবে? তাকে সাঁতার শেখাবে কে? আমার বালক মন, কালো মেঘে ভরা, উপুড় করা কড়াইয়ের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে ব্যথিত হয়, উদাসীন হয় শুধু। পাঠ্য বইয়ে মন থাকে না। বা চৈত্রের তীব্র রোদে পুড়ে যাওয়া আমগাছ, পুকুরের জল, সবুজ তৃণের দল পুড়ে যাচ্ছে, চৈত্রে বৈশাখে, আমি দেখেছিলাম একদিন এইসব... মনে পড়ে, আধা শহরের এক টিভি-চিৎকৃত ঘরে বসে। মনে পড়ে কী শান্ত ছিল সে সব শান্তির দিন... টিভি নেই, স্মার্ট ফোন নেই, বাইকের আওয়াজ নেই, মলের আধুনিক দেখানেপনা নেই, জিন্স পরিহিতা তরুণী নেই... ছিল ছেঁড়া ইজেরের ফ্রক পরা বালিকার মতো শিশু আমগাছ লিছু গাছ, জামের ছড়ানো ডালপালা ধেয়ে যাচ্ছে অন্য তরু-হৃদয়ের দিকে। সেইসব থাকা বড় নীরব, বড় আড়ালের মহা কবিতা সে... আমি দেখেছিলাম একদা। গরুর গাড়ির শান্ত চলা, মাটির রাস্তা বেয়ে কাদা বেয়ে, যেন রাজধানী কাঁধে নিয়ে সে চলেছে মহান ব্রতে, গরু দুটির দায়িত্ববোধ, যেতেই হবে গন্তব্যে, এরকম জেদ, যেন মৃদু বাতাসকে তারা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কোনো আহত মানুষের শুশ্রুষার জন্য।
আর ছিল জোনাকি। আর ছিল ঝিঝি পোকা। আমি ঝিঝি আর জোনাকির তফাত বুঝতাম না, কিন্তু সন্ধে থেকে গভীর রাত অব্দি একটানা ডাক তাদের, আমার মনে হতো কোনো সুসংবাদ বয়ে নিয়ে আসছে তারা এই নিষ্টুর পৃথিবীর জন্য। আমার গা ছমছম করত, আমার ঝিঝির ডাক ভাল লাগত, ঝিঝি পোকা আমাকে চাঁদের দিকে তাকাতে বলত, দেখি ভরা জ্যোৎস্নায় পুরো ধানখেত পূর্ণিমা গায়ে জড়িয়ে সন্তানসন্ততি নিয়ে নিদ্রা যাচ্ছে, আমি জানলা দিয়ে দেখতাম গভীর রাতে, আমি যে দেখছি তা জ্যোৎস্নামাখা ধানখেত টের পেত না। সে পূর্ণিমার আলো জড়িয়ে পাস ফিরত তাল বাগানের দিকে, পাস ফিরত গোখরোর গর্তের দিকে, একটা মায়া... আমার প্রিয়, দীর্ঘ, অনন্ত ধানখেতের রহস্যময় অথচ সংগীতময় সেই শুয়ে থাকা। মা ঘুমোচ্ছে, ছোটবোন ঘুমোচ্ছে, বাড়িওলা ঘুমোচ্ছে, বাড়ির পাশের পুকুর আমবাগান দীর্ঘ নারকেল গাছ ঘুমোচ্ছে, আমি শুধু জেগে চাঁদের আলো মেখে অল্প লেখাপড়া জানা ধানখেতের শুয়ে থাকা দেখছি রাত জেগে। একটা সড়সড় শব্দ, শিক্ষিত বিষধরের চলে যাওয়া দেখি দূর থেকে, পিঠ বেয়ে ভাদ্রের চাঁদ চাকু টানে আমার পিঠে।
ঝড়ের একটা নিজস্ব ভাষা আছে। তা বাংলা কিনা জানিনা। আমার ঝড় দেখতে ভাল লাগত। সে ঝড় প্রকৃতির। বড় হয়ে, বুড়ো হয়ে যে ঝড় আমাকে টলায় তা মানুষের মনের সংকীর্ণতার ঝড়, আমি ভেঙে পড়ি, ঘুমের ওষুধ খাই। কিন্তু গ্রামের দেখা ঝড়, আমাকে আনন্দ দিত, মনে হত জিততেই হবে, মনে হত ওই ঝড়ে পড়া সব আম আমি একা কেন, আমার বন্ধুরাও পাক, আনন্দের সে পাওয়া। ঝড় তার সব ভাষা নিয়ে আমাদের সঙ্গে... আমরা, কিশোর-কিশোরীর দলের সঙ্গে গল্প করত, সে গল্প পড়তে না বসার গল্প। ভাল মনের, উদার মনের, মানুষ হওয়ার গল্প। উদাসীন হয়ে ওঠার গল্প... সে, মানে কালবৈশাখী আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যেত আকাশে আকাশে... পাখির নীরবতার ভাষা শেখাত আমাদের সে, কালবৈশাখী। ঝড়ের ভাষা জয়পতাকার কথা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কথা, নতুন দিনের সঙ্গীতের... নতুন দিনের শান্তির... নতুন দিনের বিদ্রোহের ভাষা আমাদের শিখিয়েছিল সেই কোন ছোটবেলার ঝড়... বহুদিন সে ঝড় বা কালবৈশাখী দেখিনি... এখন যে ঝড় দেখি তাতে উদারতা নেই, তা বড় সংকীর্ণ, তাতে ষড়যন্ত্রের লিখন লেখা আছে। আমার কষ্ট বাড়ে, চুপ করে তাকিয়ে থাকি জানালার বাহিরে, দেখি ঝগড়া যাচ্ছে দামী রেস্তোরাঁয়, দামী মনখারাপ খেতে... দামী মৃত্যুকে আহ্বান করতে।

হঠাত রিশপ লাভা ইত্যাদি পাহাড়ি স্থানে বেড়াতে গেছি এই পরিণত বয়সে, সেখানে দেখলাম মেঘ। আমার প্রিয় মেঘ। ভাষাহীন ভাষা তার, তার ভেসে ভেসে জীবনকে টেনে নিয়ে যাওয়ার শিক্ষা, সেই মেঘের টানে, ভেসে থাকায় চিরকালীন কবির বার্তা যেন মনকে শান্ত স্থির হতে শেখাচ্ছে।
আমি রিশপের হোটেলের বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে দেখতাম, দূরে বিরাট পাহাড়-চূড়ার সারি, তার ওপার থেকে ভেসে আসছে দলে দলে মেঘ, মৃদু কিন্তু তীব্র সে ভেসে ভেসে আসা। যেন মিছিল, যেন বুঝে নেওয়ার, প্রতিবাদের নিরহং চলা তাদের। আমাদের ছাদের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় সে ঝরঝর করে ঝরে জানান দিল, আমাকেও যেতে হবে তাদের সঙ্গে ভেসে ভেসে, যতদূর না লড়াই থামে ততদূরের যাত্রা তাদের। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমিও উড়তে থাকি, ভেসে যাই ততদূর যতদূরে রণাঙ্গন, যতদূরে নিশ্চুপ অথচ তীব্র ও নূতন বলার ভঙ্গী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। এই অনন্ত, এই বিশাল, সারাজীবনের পুরো জানতে না পারা ঐ পাহাড়ি আকাশ আমাকে বিস্তৃত হতে বলে, বলে ব্যাপক হতে। আমি চেষ্টা করি, পারি, পাড়ি দিই, আবার পারিওনা, ব্যর্থ হই। ব্যর্থতা নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয় আমার ভিতর।

তবু এক অন্য কথা তা এক অজানা ভাষায়, আমার ভিতর কেউ বলতে থাকে। কি কথা আমি বুঝি না, কিন্তু নতুন সে ভাষা সে কথা আমাকে ঐ দূরের পাহাড়ের মতো এক বিরাট উচ্চতায় নিয়ে যায়। আমি লম্বা হতে থাকি, লম্বা হতে হতে দেখি আরও কত দেশ, কত মানুষ, কত গান, কত ছবি, কত প্রেম পাইনের বন ছাড়িয়ে সুদূরের অজানা কথার দিকে, অজানা কবির দিকে আগুনের মতো দাউদাউ আমি ছড়িয়ে চলেছি। পুড়িয়ে দিতে নয়, আলো দিতে। আলো, আলো ঐ সবুজ পাহাড়ের ঐ পারে নতুন ভাষার জন্ম দিচ্ছে।
পাহাড়, সমতল, নদী, মরুভূমি, নরম ঘাস, রামধনু, সূর্যাস্ত, সূর্যোদয়, বৃষ্টি, জোনাকিপোকার দল সবাই এক সুরে যেন নতুন এক ভাষায় আমায় জাগিয়ে তুলছে, বলছে চলো বেড়িয়ে পড়ি। আমি বেড়িয়ে পড়ি, কিন্তু ফিরে আসি, আবার যাই, সঙ্গে আম বট অশথের উচ্চারিত সেই বাংলা ভাষাই আমাকে সেতু সাঁকো ব্রিজ পার করে নিয়ে যায় দিদির মতো, মায়ের মতো, অথবা একজন প্রকৃত নেত্রীর মতো, আমি চলি। আমি বাহিরপানে বেড়িয়ে পড়ি, পাল তুলে, ঝাণ্ডা তুলে, মশাল তুলে, জয়নিশান তুলে। আমার সঙ্গে চলে আমাদের পুকুরের সব জল, সব মাছ, সব ব্যাঙ, সব শ্যাওলা, সব অনুচ্চারিত নীরব এতদিনের থাকাগুলো।