নিরুদ্দেশের রূপকথারা

দ্বৈপায়ন মজুমদার

বাবার জন্য তিনতলার বারান্দায় বাবু অপেক্ষায় । বাবা বিকেলে বাড়ি ফিরবে । অন্য দিন অবশ্য এমন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে না, কিন্তু দু' সপ্তাহ পেরোলেই বাবুর মনটা আর বশে থাকে না । বুধবার, দু'টো সপ্তাহ পার করে 'আনন্দমেলা' নিয়ে আসে বাবা । মানে পাক্কা দু'সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয় টিনটিন, হ্যাডক, রোভার্সের রয়, গাবলুদের জন্য । এক নিঃশ্বাসে বাবু শেষ করে । অঙ্কের স্যার সন্ধ্যেতে পড়াতে আসবে, তার আগেই যতটা সম্ভব গিলে ফেলতে হয় ।

তবে বাবু এখন কিন্তু বড়, আর ক্লাস ওয়ানের ছোট বাবু ভেবোনা । বাবু এখন লোডশেডিং হলে একটু, মানে খুব একটু ভয় পায় । তাতে কী, সে তো বুবুনও পায় । তবে ক্লাস ওয়ানের বাবু খুব ছোট ছিল, তাই তো ওই হাঙরের সিনেমা জস্ দেখে হাফটাইমে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিল । তারপর ফেরার পথে গোল্ডস্পট, উফ কি ঝাঁজরে বাবা, কিন্তু বাবু কিচ্ছু বলেনি, পুরো হাফ বোতল গিলে ছিল, কি একটা মিষ্টি গন্ধ থাকে ঢেকুরে ।

বাবুর অবশ্য সিনেমা দেখা তেমন হয় না, বাড়িতে একটা সাদা কালো টিভি এসেছে, ওই বিশ্বকাপের সময় । তাতে বাবুর ছাড় শুধু ক্রিকেট দেখায়, সিনেমা সপ্তাহে একদিন হয় বটে, কিন্তু বাবুদের বাড়িতে চলে না । তবে টিভিতে একদিন সব ছাড়, রোববারের সকাল । সেদিন কত কিছু, পাক্কা এক ঘন্টা ধরে বাবু মহাভারত দেখে, অবশ্য ওর বাবা মা, দুজনেই দেখে । মহাভারতের শুরুতেই কী ভাল একটা গান থাকে, বাবুর প্রায় মুখস্ত, গানের মানে অবশ্য জানে না । আসলে মহাভারত বাবুর খুব খুব প্রিয়, সেই ছোটবেলা থেকেই ওর আছে ছবিতে গল্প মহাভারত । ওহ, ছবিতে গল্প বলতে মনে পড়ল বাবুর অনেক 'অমর চিত্র কথা' আছে ।

ক্ষুদিরাম থেকে বাঘাযতীন, বাবু সব পড়েছে । রানা প্রতাপের চেতক চিনেছে আবার শিবাজীর বাঘ নখও । এমনকি আনন্দমঠও বাবুর পড়া হয়েছে অমর চিত্র কথা থেকে । অমর চিত্র কথা তো একটা পৃথিবী, কী নেই, রাজা হরিশ্চন্দ্র আছে আবার বুদ্ধদেবও, সব আছে।

গল্পের কথাই যখন উঠল তখন এটাও ঠিক বাবু কিন্তু বড় হচ্ছে । শুধু কিশলয়, সহজ পাঠ পড়া বাবু ভাবলে ভুল হবে । বাবু কাকাবাবু, সন্তু পড়াও শুরু করেছে । বাবুও একদিন সন্তুর মত বেরোবে, ঠিক বেরোবে । তা বলে বাবু অবশ্য পড়তে খুব ভালবাসে এমন না । হাফ ইয়ার্লি খারাপ হয়, বাড়িতে বকা জোটে, তারপর অ্যানুয়াল ঠিকঠাক । অ্যানুয়ালের রেজাল্টের আগে খুব ভয় পায়, খারাপ হলে বিকেলে আর খেলতে পারবে না ।

ওহ, বিকেলের খেলা বলতে মনে পড়ল বিকেলের খেলা জ্বর এলেই বন্ধ থাকে । বাবু কী করতে পারে, ওর যে মাঝে মধ্যেই জ্বর আসে, উফ সে কী জ্বর, গা পুরো আগুন, বাবুর খুব শীত করে তখন । তরতর করে জ্বর বাড়ে, তখন কত ওষুধ, কত নিয়ম, কত ডাক্তার । এক বার জ্বর এলো মানে অন্তত এক সপ্তাহ বারন্দায় দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে হবে । বুবুনরা এই সময় যেন ইচ্ছে করে বেশি খেলে । অবশ্য জ্বরের পুরোটা বাবুর খারাপ লাগে না, পড়তে বসতে হয় না, খিচুড়ি খায় । বাবুর খিচুড়ি খুব খুব প্রিয়, আর সাথে একটা ডিম ভাজা পেলে তো স্বর্গ । তবে বিকেলের খেলাটাই যা...

ওহ খাওয়া বলতে মনে পড়ল খেলে ফিরে অবশ্য এসে এক গ্লাস দুধ খেতে হয় । খুব বিচ্ছিরি লাগে, বাবু তো ভালবাসে অন্য কিছু । কুচি পেঁয়াজ, আর দু' এক টুকরো সবুজ লঙ্কা দেওয়া ডিম ভাজা, হ্যাঁ এক দু'টুকরো লঙ্কা বাবুর লাগে । লঙ্কা ঝাল, বাবু না খেয়ে সরিয়ে দেয়, তবু দেখতে দারুণ লাগে । আর ভালবাসে পপিনস, ওদের সামনের লাল মাটির রাস্তাটা পিচ রাস্তায় যেখানে পড়ে, সেখানে একটা দোকান আছে, বাবু স্কুল থেকে ফেরার সময় মাঝে মধ্যে ওখান থেকেই পপিনস কেনে, মানে ওকে কিনে দেওয়া হয় । কত রঙ, বাবু কাউকে ভাগ দিতে চায় না । কিন্তু তবু দেয়, কষ্ট হলেও বন্ধুদের দেয় ।

ওই যে লাল রাস্তা ওটা দিয়েই বাবু স্কুল যায়, একটা ছোট্ট বাক্স আছে বাবুর । তার ভিতরেই ওর বই, খাতা, পেনসিল আর কিছু স্টিকার, খুব যত্নে বাক্সের ভিতর লাগিয়েছে । এই স্কুল বাক্স নিয়ে, সাত সকালে সাদা জামা আর হাফ প্যান্ট পরা বাবুর স্কুল যেতে খুব কষ্ট, ঘুম ভাঙতেই চায় না, আর স্কুল গেলে বাবুর তখন অন্য দুনিয়া, কত বন্ধু, খেলা, ঝগড়া, মারপিট । আসলে নন্টে, ফন্টে কেল্টুদাকে বেশ পছন্দ করে, মনে হয় ওমন একটা বোর্ডিং স্কুল হলে দারুণ হয় । তারপরই ভয় লাগে, ইস্ বাড়ি ছেড়ে, নিজের স্কুল ছেড়ে ও থাকতেই পারবে না ।

তারপর একদিন, ঠিক কোন দিন মনে নেই, স্কুল বাক্সটা হারিয়ে গেল । গোল্ডস্পট, বিকেলে খেলা শেষে গ্লাস ভরা দুধ, গরমের ছুটি সব বেমালুল উবে গেছে, পপিনস হাতের বাবু বুবুনদেরও এখন আর খোঁজ নেই, এখন তাদের অনেকে বাবু বলে ডাকে, তবে নামের পর 'বাবু' । এখন জ্বর মানে কত পরীক্ষা, কাজের জায়গায় ছুটি নেবার কত ঝামেলা । নন্টে ফন্টে, টিনটিন, গাবলু এরা আর ডাকতে আসে না ওদের । চার দিকে পরিবর্তন, বিকাশ । বিকেলের লাল মাটির মফস্বল, কাদা মাখা ঘাস আর জ্বর গায়ের ছেলেটা, এখন একটা রূপকথার মত, নিরুদ্দেশের রূপকথা ।