বেসিক ইন্সস্টিংট

চিত্রালী ভট্টাচার্য

মোহ - মায়ায় জড়ানো এক একটা ফুল আর তার ভেতর টলটল্‌ করছে একফোঁটা সোনালি বিষ । সমুদ্র মন্থনে অমৃতের সঙ্গে যে বিষ উঠেছিল সে বিষের এক - একটা বিন্দু যেন লুকিয়ে আছে সেইসব ফুলের মধ্যে।দেখে বোঝার উপায় নেই ! বহিরাঙ্গে সে ফুলের কি বাহার ! আহা ! যেন শিশিরে সিক্ত এক - একটা মুক্তোবিন্দু । যে দেখবে সেই মুগ্ধ ! মনের মধ্যে জেগে উঠবে কামনা । যারা খুব সতর্ক তারাই শুধু জানে কিভাবে সে ফুল আলগোছে তুলে এনে সাজিয়ে ফেলতে হয় জীবন । আর অসাবধানীরা ? হাত দিলেই সর্বনাশ ! বিষের জ্বালায় প্রাণ জেরবার । সে ফুলের নামই বোধহয় ভুল ।
মোবাইলে কথাবলা শেষ হতে অজয় বিছনায় শুয়ে শুয়ে এতক্ষণ এইসব কথাই ভাবছিল ।এখন মাঝরাত । ঠিক কটা বাজে তা বোঝার জন্য মুখ ঘুরিয়ে তাকাল দূরে , দেওয়াল ঘড়িটার দিকে । গাঢ় অন্ধকারে ঘড়ির কাঁটার অবস্থান ঠিক করে উঠতে পারল না । শুধু পেন্ডুলামের একটানা আওয়াজটা অন্ধকার চিরে ছুরির মত কানে বিঁধছিল । ঘুম আসছিল না কিছুতেই । ‘ মিমি কি ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি ঘুমের ভান করে পড়ে আছে ? ও কি জেনে গেছে আমার আর অনামিকার ব্যাপারটা ’! – ভাবল অজয় । অল্প শিউরে
উঠল , কিন্তু পরক্ষনেই অদ্ভুত এক দক্ষতায় সামলে নিল নিজেকে ,কারণ - ভুল করা আর ভুলের সঙ্গে থাকাটা এখন ওর নেশা হয়ে উঠেছে । ওর জীবনের ছোটখাটো অজস্র ভুলের মধ্যে পদ্ম হয়ে ফুটে আছে যে ফুল তার নাম অনামিকা । এ ভুলে যেমন মাদকতা আছে তেমন আছে উত্তেজনা আবার তার সুখের সংসারটা হারিয়ে ফেলার ভয়ও আছে। কবে , কখন , কোথায় এবং কেন এ ভুলের জন্ম সে বিষয়টি আজও প্রশ্নচিহ্নের মত জটিল । নিজেকে বার বার বিশ্লেষণ করেও এর সদুত্তর পায়নি । র্দুবোধ্য এক আর্কষনের মত অনামিকা গোপনে জড়িয়ে আছে ওর জীবনের সঙ্গে ।
আসলে ক্রমাগত ভুল করে যাওয়াটা বোধহয় একটা জন্মগত প্রবণতা ,তা নাহলে অজয় কেন ছেলেবেলা থেকেই এই ভুলের শিকার হবে?মনেপড়েগেল ছেলেবেলায় একবার বাবার সঙ্গে মেলায় গিয়ে হঠাৎ করে অন্য এক ভদ্রলোকের হাত ধরে গোটা মেলাটা ঘুরতে ঘুরতে যখন আবিষ্কার করেছিল উনি বাবা নন তখন বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল ।চিৎকার করে কান্না জুড়েছিল । শেষে বাবাকে খুঁজে পাওয়ার পর ওর কান্না থামানোর জন্য বাবা কোলে তুলে নিয়ে বলেছিল –আরে , বোকাছেলে এতে এতো ভয় পাওয়ার কি আছে ! এতো একটা ভুল । মজার ভুল । কেমন অন্য একজনকে তুই তোর নিজের বাবা ভেবে মজা করে মেলার ঘুরলি বলত ! এখন ভয় পাচ্ছিস ঠিকই কিন্তু পরে ভাবলে দেখিস খুব মজা লাগবে । আর আমি হলপ করে বলতে পারি এ ঘটনাটা তুই জীবনভোর ভুলতে পারবি না ।


সেই শুরু । এরপর জীবন যত এগিয়েছে তত তারই ঘটানো ভুলে বার বার বিভ্রান্ত হয়েছে অজয় , কিন্তু এই বিভ্রান্তি তাকে সজীবও রেখেছে একথা অস্বীকার করতে পারেনা ও । মনেহয় বশ না মানা ঘোড়ার পিঠে উঠে লাগাম ধরেছে । ধীরে ধীরে কখন যেন ভুল করার নেশা পেয়ে বসল । আর এইভাবেই পেরিয়ে গেল – ছেলেবেলা , বয়ঃসন্ধি , তারুণ্য । তরী এসে ঠেকল মধ্যযৌবনে । দীর্ঘ পথচলা । লাগামহীন ঘোড়ার এবার বিশ্রামের প্রয়োজন। শ্লথ একটা জীবন, ছলনাহীন একটা ভালবাসা তাকে তখন ফিরিয়ে আনতে চাইছে বন্দরে । অজয়ও তখন তাইই চাইছিল । নাহ্‌ , আর কোন ভুলের উত্তেজনা নয় । দূরন্ত ঘোড়া এবার তার খুর থেকে খুলে ফেলতে চাইছে নাল । আস্তাবলে তখন ভিজে ছোলার ঘ্রাণ । হাতের বেড়ে বনলতা সেন । পাখির নীড়ের মত চোখ । কিছুদিন বেশ অন্যরকম একটা জীবন ।
কিন্তু ভ্রান্তি যার প্রারব্ধ তারজন্য তো ভালবাসার শান্তি যথেষ্ট নয় । ক্লান্তি আসতে বাধ্য । এলোও তাই । এইসব ছাঁচে ফেলা জীবন যেন শ্বাসরোধ করে দিতে চাইল । অজয় মনে মনে পালাতে চাইছিল । ঠিক সেই সময় অনেকদিন পর আবার এল ভুলের হাতছানি । হাতছানির নাম – অনামিকা ।
স্মার্ট , এলিগ্যান্ট , অকুতোভয় । নিমেষে ধ্বংস করে দিতে পারে সবকিছু । অতএব ----- । অজয়ের এখন সময় কাটে অনামিকাকে আড়ালে রাখার ছক কষতে কষতে । ভুলের বিষ যেন ছলকে না পড়ে । সাবধানে হ্যান্ডল করতে হবে সব । মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে । শুধরে নিতে ইচ্ছে করে এ ভুল কিন্তু কিভাবে ? অজয় পথ খোঁজে । পায়না । মনেহয় আগের সেই ম্যজিক যেন ভুলেগেছে ও ।
অজয় আবার তাকাল দেওয়াল ঘড়িটার দিকে । রাত ফুরিয়ে আসছে । আবছা আলো ।সেই আলোয় স্পষ্ট হল ঘড়ির কাঁটা । চারটে । অজয় পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করতেই বেজে উঠল মোবাইলটা । অজয় হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নিয়ে চোখের সামনে ধরতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল — অনামিকা কলিং ---