পরমাণু গল্প

অপরাহ্ণ সুসমিতো


( আমি যখন অর্থ উপার্জনের জন্য কাজ করি তখনই মাথায় ঘুরপাক খায় পরমাণু সব চিত্র বিচিত্র চিন্তা। ফোনের মাঝেই আধো আলো আধো অন্ধকারে লিখতে থাকি এই সব ক্ষুদ্র গল্প। লিখেই একা একা মুগ্ধ হই। লেখকদের নিজের লেখা নিয়ে মুগ্ধ হতে নেই।
আমার এবার দায় পড়েছে আপনাদের মুগ্ধ করাবার। এ রকম অসংখ্য পরমাণু গল্প থেকে নির্বাচিত কয়েকটি এখানে দিলাম।
প্রিয় পাঠক, শুভমিতি। )


বই :
কাগজের পাতাগুলো বাতাসে উড়ছিল, নিজেদের মাঝে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিল। একজন আরেকজনকে কলকল পড়ছিল।
আচানক দুটো শক্ত মলাট এসে পাতাগুলোকে বন্দী করে ফেলল। গম্ভীর হয়ে ওদের বলল;
: থাক এত উড়তে হবে না। এসো ভালোবাসি। জড়াজড়ি করে থাকি।

সেই থেকে বন্দী ওরা পরস্পর ভালোবেসে।

*
বিস্তার :
মেয়েটাকে দেখেই আমার মুখ উদ্ভাসিত হলো। দিগন্ত প্রসারিত হাসি উপহার দিয়েই হাত বাড়ালাম করমর্দনের জন্য। বললাম;

: আমি রাজা

মেয়েটা অবাক হয়ে হেসে খুন। হেসেই হাত বাড়াল।

: আমি রানি।

সেই থেক শুরু। রাজত্ব বাড়ল আর সীমানা।

*
সভ্যতা :
মদের গেলাশে চুমুক দিতে যাব তাকিয়ে দেখি ঠোঁটের মতো দুই টুক্কা লেবু টলটল ভাসছে।

লেবুপানা স্বাদ জম্পেশ করার জন্য আঙ্গুল দিয়ে লেবু টুকরা দুটো মদে ডুবিয়ে সঘন করতে চাইলাম। টুক্কা দুটো কাতর কঁকিয়ে উঠল;

: স্ট্র নেই তোমার?

*
বন্ধুতা :
ঘুম ভেঙ্গে সৈকত দেখল সামনে সমুদ্রটা আজ ভীষণ অন্যরকম অস্থির। গর্জন করছে বায়ুসেনা নিয়ে। কূলে আছড়ে পড়ছে অবিরাম ঢেউ।

চোখ থেকে বালুরাশি সরিয়ে অভিমানী সৈকত বলল;

: দুই তীর দিয়ে সমুদ্র তোমাকে বাঁধি, তবুও...?

*
স্যার :
সিভিল সার্ভিস করা চৌকস এক মেয়ের সাথে আমার ধুমধাম করে বিয়ে গেল।

বাসর রাতেই আমার কানে ফিসফিসিয়ে বলল;

: আমাকে এখন থেকে স্যার বলে ডাকবে কিন্তু।

*
অসময় :
মাতাল মেয়েটা বলল;
: সূর্য ঘোরে। পৃথিবী ঘোরে।

আমি হেসে প্রতিবাদ করতে চাইলাম। মেয়েটা আরো জোরে হেসে দিলো। ঝরনার মতো হাসি। ও বলল;

: আমি সূর্য। তুমি পৃথিবী

আমি চুপ করে থাকলাম। মাতাল সময়ের কাজল উথাল পাথাল আছে।

*
যুগলেষু :
পাতাটা তাল গাছ থেকে নেমে একটু সময় নিয়ে বাঁশি হয়ে গেল। আসলে হয়ে গেল বলা ঠিক হবে না। এক কিশোর তালপাতাটা দিয়ে বাঁশি বানাল যত্নে।

কাজল কিশোর বাঁশিতে ফুঁ দিতেই সুর ছড়াল প্রজাপতি। নৌকায় করে যাচ্ছিল বিয়ের সাজে বউটি।

নৌকার ছইয়ে বাঁধা মাইকে গান ভেসে এলো কিশোরের সুরের সাথে মিতালী করে;

আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি....

কখনো কখনো নদী ও সুরের যাপন খুব সুন্দর।

*
সমানুপাত :
ডালিমকুমার অনিমেষ তাকিয়ে রইল গোলাপবালার দিকে। গোলাপবালা অবাক হয়ে চোখ সরিয়ে নিল। ডালিমকুমার অস্ফুট বলল;

: মুখানি তোলো গোলাপ।

গোলাপ সুরভি ছড়াবে বলে পাপড়ি মেলল। কুমার মুগ্ধ হয়ে কানে কানে বলে;

: পাপড়ি মেললেই তো খসে যাও বৃন্ত থেকে।

গোলাপবালা হেসে দিলো পাখোয়াজ সিম্ফনিতে। সেও কানে কানে বলে:

: তুমিও তো পেকে গেলে বিদীর্ণ হও।

*
দুখুগুলো একা নয় :
দুপুরের পর আলোটা যখন বিকেলকে ছুঁয়ে দিল তখন দুই বেণী করা ছোট্ট মেয়েটা আশ্চর্য তাকিয়ে দেখে সামনে একটা চকচকে ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য।

কেমন যেন মায়ের মতো হাঁটু ভেঙ্গে মাথা নিচু করে দুখু বসে আছে। মায়ের সাথে সে ফ্রক বিছিয়ে একাত্ম বোধ করল।

পৃথিবীর সমস্ত সারল্য নিয়ে মেয়েটা মাথা নিচু করে ভাস্কর্য মায়ের সামনে বসে রইল, একা।

*
যুগলেষু-২ :
চাঁদটা অভিমান করে মেঘের আড়ালে লুকাতে সূর্যের মন খারাপ হলো।

চাঁদকে এক পলক দেখবে বলে সূর্য মেঘকে বলল সরে যেতে। মেঘ চাঁদটাকে ভালোবাসবে বলে সরলো না।

তাপ্পর বাতাসকে বলল;

: ও বাতাস তোমাকে আলো দিব, মেঘকে সরিয়ে দাও। আমি চাঁদকে দেখব।

বাতাস বলল;

: আমার আলো লাগবে না। তবুও তোমার ইচ্ছা পূরণ করব।

বাতাস এক ফুঁ দিয়ে মেঘকে সরিয়ে দিতেই চাঁদ ও সূর্য যুগলেষু হেসে উঠল প্রণয়ে।

*
যোজন দূরত্ব :
মেয়েটাকে বললাম;
: তোমার পায়ের পাতা ভেজা কেন সই?
সে হাসল ঝরনা ছন্দে। বলল;
: রবিনাথকে ফোন করেছিলাম। কবি বললেন;
: তোমার পায়ের পাতা যে সবখানে পাতা।
আমি মন খারাপ করলাম।

: থাক সম্ভাবনাকে সম্ভব না করো না।

*
অরুণা :
আলো অপসৃয়মান মিলিয়ে যেতেই নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল ডান্স ফ্লোরে।
মিউজিকের বিট নেচে উঠল রক্ত ছলাতে।

আকর্ষণীয়া গোলাপী মেয়েটাকে আধো মাতাল লোকটা বলল ফিসফিসিয়ে;

: তুমি অগ্নি সুন্দর

মেয়েটা বিয়ারের ফেনা ঠোঁটে কোমল মেখে খিলখিল করে উঠল মন্থরে।

: আলো নিভে গেলেই আলো সুন্দর হয়ে ভেসে ওঠে।

*
একই সমতল :
বৃষ্টির তোড়ে ছোট্ট কাগজের নৌকাটা ভাসতে ভাসতে ডুবুহাবু খেতে খেতে নদীতে এসে পড়ল।

নদীর বিশাল ঢেউ আর স্রোত দেখে ভয় পেল খুব। ভেসেই যাচ্ছিল, আচানক স্বপ্ন দেখার মতো অবাক হয়ে দেখে একটা বড় নৌকা কাগজের নৌকার দিকে হাত বাড়িয়ে বলছে;

: এসো স্বজন।

কাগজের নৌকাটার চোখ ভিজে উঠল। বৃষ্টি বলে কান্না লুকাতে পারল। মুখ থেকে কথা বেরুল না। বড় নৌকাটা ছোট্ট নৌকার কাঁধে হাত রেখে হেসে দিলো। বলল;

: এসো বাঁচি সমস্বরে।

*
সেদিন একই অঙ্গে :
কানের ঝুমকো হাঁটার ছন্দে খানিক দুলছিল। আচানক চোখ পড়ল গলার হারের দিকে। কী রকম একটু ঈর্ষা হলো।

চেঁচিয়ে গলার হারকে বলল;

: ওরকম অসভ্যের মতো পেঁচিয়ে আছিস কেন?

হারটা ঠোঁট বাঁকিয়ে ঝামটা দিলো।

: তুই ওরকম ফুটো করে ঝুলছিস কেন?

*
জোটে যদি একটি মুদ্রা :
কালো নেকাব পরা শাহজাদী তার বরকন্দাজদের বলল তাকে গোলাপ বাগানে নিয়ে যেতে।

শাহজাদী গোলাপ বাগানের মোহন সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হলো। ঘোষণা করল সে সব গোলাপ বাগান খরিদ করবে। রাজ্য জুড়ে ফরমান জারী হলো সব গোলাপ উদ্যান শাহজাদীর।

জনগণ এই গোলাপ উদ্যান নিয়ে কোন কৌতূহল প্রকাশ করল না। তারা ঘ্রাণ পায় ফসলের।

শাহজাদী এক প্রজাপতি সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে সব পাপড়ি ঝরে গেছে।

প্রজা সকল কোরাস গান ধরলো ফসলের।