মৃত্যু-যাত্রা

হুসাইন হানিফ

মৃত্যু! সে তো অনিবার্য; তবে তাকে কেন বলো আকস্মিক! যখন সে আসে সময়ে-অসময়ে, কারণে-অকারণে!


আপনি কি সেই ব্যক্তির গল্প জানেন যে নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টায় ব্যর্থ-অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় আর তার এক সপ্তাহ পর সুস্থ হয়ে উঠতে উঠতে হত্যার শিকার হয়?

বিচিত্র নয় পৃথিবীতে এমন ঘটনার; আর তারই সাক্ষ্য স্বরূপ পুনরাবৃত্তি ঘটে ঠিক আমার বেলায়।

আমাকে বলতে দিন, আমিই সেই হতভাগা যে নিজের ইচ্ছায় বাঁচতে পারিনি, মরতে পারি নি নিজের ইচ্ছায়।
দেখুন, কী আশ্চর্য!- যখন আমি বাঁচতে চাই না- বাঁচতে চাই না সঙ্গত কারণে- তখন আমাকে বাঁচানো হয়; আর আমি যখন মরতে চাই না, বাঁচার জন্য ব্যাকুল হই- কারণ তখন আমার সাধ জাগে আরো কিছুকাল বাঁচবার- আমাকে হত্যা করা হয়!

এসব খুবই পুরনো বিষয়- নষ্টকথা। এ নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। তাছাড়া আমি অত বড় পণ্ডিত নই যে আপনাদেরকে জ্ঞান দিতে পারব। আমি চাষা মানুষ। চোখ থাকতেও অন্ধ। শুধু স্বাক্ষরটা করতে পারতাম। ওটা ছোট ছেলে চান মিয়া (-হায়! ছেলেটা যেন মানুষ হয়), যদি ধরিয়ে না দিত তাহলে আরো মূর্খ থাকতাম। না, স্বাক্ষরের কারণে যে খুব একটা পার্থক্য দাঁড়ায় এমন না; কিন্তু তবু কিছু লোকদের থেকে এই কারণে আমি একটু হলেও বিশেষ।

অতএব আমার উচিৎ নিজের সাথে ঘটে যাওয়া পরিহাসের কথা বলা। কিন্তু দেখুন হেমন্তের এই শেষ বিকেলে যমুনা পাড়ের নৈসর্গিক পরিবেশ কী রকম প্ররোচিত করছে আমায়! আমাকে, আমার লাশ দেখে উপহাস করছে! ও বাতাস, তুমি কি আমার একাকিত্বের ভার সইতে পারবে! কত দিন নালিশ করেছি তোমার কানে কানে- আমার এই নিঃসঙ্গতা তুমি উড়িয়ে নাও! ও আকাশ, কত দিন তোমার পানে চেয়ে চেয়ে প্রার্থনা করেছি এমন এক বর্ষণের যা আমার নিঃসঙ্গতাকে ধুয়ে নেবে! ও নদী যমুনা! কত দিন তোমার তীরে হেঁটেছি খালি পায়ে, পায়ে ছুঁয়েছি জল, তোমার কালো জলে ধুয়েছি অঙ্গ, বলেছি কত শত বার, আমার নিঃসঙ্গতাকে তুমি ভাসিয়ে নাও! ও নদী আকাশ বাতাস, তোমরা কেউ আমার দুঃখ বোঝোনি, শোনোনি আমার প্রার্থনা, খালি হাতে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছো বারবার, আজ আমার মৃত্যুতে তোমাদের দেখি বেজায় সুখ!

কান্না! ভেসে আসে আমার কানে স্ত্রী কন্যার কান্না! আমি কি তাই চেয়েছিলাম! আমি তো চেয়েছিলাম হাসি! অমল তোমাদের ওই মুখের হাসি আমি দেখতে চেয়েছি কতটাকাল! অথচ তোমরা আমাকে দিলে কান্না! আর একি মরাকান্না! এই কান্না তো সুখের! আমার কামাই করা সম্পত্তি আজ তোমরা শকুন খাবে খুবলে খুবলে!
কত সুখের হতে পারত আমার জীবন! কতটা নিরুপদ্রব! আমার আছে সুন্দরী স্ত্রী; এক মেয়ে- বিয়ে হয়েছে মেয়েটার; দুই ছেলে; বড়টা বিদেশে থাকে, ভাল কামায়; ছোটটা ঢাকায়- নিজের মত করে চলে; আর আছে সয়-সম্পত্তি, যা শুধু বর্গা দিয়ে খেলেও দুই বুড়াবুড়ির দিন চলে যাবে! অথচ, অথচ আমাকে কি না চেষ্টা করতে হয় মরে যাবার!

ও নদী, কতদিন তো তুমি আমার কথা শুনে তুরতুর করে ভেগে গেছে তোমার স্বতঃস্ফূর্ত ¯স্রোত নিয়ে, একবারটি থামো নি; চলে গেছে কত শত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তোমার গন্তব্যে; কী ধার ছিল তোমার -স্রোতের, কী আবেগে চলেছো মাঠ প্রান্তর ভাসিয়ে নিয়ে, নিজের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ানো হাজারো ভিটে বাড়ি করেছো উজাড়, পারলে আজ আমার জন্য একটাবার যৌবনা হও, ফুঁসে ওঠো কালো আসল রূপ নিয়ে; আর ঘূর্ণন তোলো, ঘূর্ণন তোলো সাই সাই চাবুক যেন; আর তোমার রাক্ষুসে কামদ ক্ষুদা মিটাও এই মৃত্যু-যাত্রার নৌকার ভেতর আমার লাশকে ঘিরে কেঁদে চলা এইসব নর নারীকে ডুবিয়ে চুবিয়ে!

কল্পনা করুন ওই লোকটিকে যে তার আত্মহত্যার আগে প্রিয়জনদের সাথে শেষ দেখা করতে যায়; প্রিয় কন্যাকে একটিবার দেখবার, আর একটিবার দেখবার আশায়; সহোদরা বোনদের সাথে আর একবার হাসিমুখে কথা বলবার ইচ্ছায়; এক সাথে চলাফেরা করা বন্ধুদের সাথে আর একবার ধূমপানের আকাক্সক্ষায়; লোকজনদের সাথে লেনদেনের হিসাবনিকাষ চুকিয়ে দেবার চাহিদায়; আর তারপর ঠা-া মাথায় দোকানে যায়, বাড়ি ফেরে; তারপর কল্পনা করুন, জমিতে দেবার কথা বলে নিয়া আসা বিষের বোতল, মনোযোগ দিন, চোখের পাতা বোজে, চোখের পাতা গলে অশ্রু গড়ায়, চোখ খোলে, আরেকবার দুনিয়ার আলো দেখে, দেখে ধুলিমলিন এই পৃথিবী, যে পৃথিবীতে সে বসতি গড়েছিল, যে বসতির মায়া তার হৃদয়ে ছিল, যে হৃদয় আরো একবার কথা বন্ধ করে দেয়া স্ত্রীর প্রতি মায়া অনুভব করে, যে অনুভব প্রচণ্ড রাগে অভিমানে খা খা শূন্যতায় আবার বিকৃত উলঙ্গ উদ্যত পাগলিনী হয়ে যায়, যে পাগলিনী প্রচণ্ড ক্ষিপ্ততায় মুখে সোনালী বিষ ঢেলে দেয়, যে সোনালী বিষ ধীরে ধীরে নামতে নামতে হয়ে যায় বেদনার রঙ নীল, যে নীল তার সর্বোচ্চ ক্রীড়নক দেখাতে দেখাতে ক্লান্তি অবসাদে ফিকে হতে হতে ধূসর হয়ে যায়...!

না, ধূসর হতে দেয়া হয়নি আমার বেদনাকে। ভেবে নিন এর পরের দৃশ্যটি- একজন বিষ খাওয়া লোককে নিয়ে হুলস্থুল- হই হই কাণ্ড রই রই ব্যাপার; গু গোবর কেঁচো খাওয়ানোর মত রি রি করা বিবমিষাময় সময়...; কল্পনা করুন, নিজেকে তার জায়গায় বসিয়ে দেখুন, এর পরের দৃশ্যগুলো, কি অবলিলায় ঢুকে যাচ্ছে আপনার করোটিতে- ডাক্তার আসবে, গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তার, হাতড়াতে হাতড়াতে যে আপনার নাড়ি ভুড়ি ফুটো করে দেবার জোগার করবে; তারপর সে তার ব্যর্থতা ঢাকবে আপনাকে মরণাপন্ন ঘোষণা করে শহরে নেবার কথা বলে; আর তারপর থমথমে উত্তেজনা- নাছোড় মৃত্যুর সাথে ধরা বেহায়া জীবনের পাঞ্জা লড়াই, মোটরসাইকেল-নৌকা-সিএনজ , টানাহেঁচড়া, জরুরী বিভাগ, কল্পনা করুন, মিলিয়ে নিন অভিজ্ঞতার সাথে, ভাবুন, সরকারি ডাক্তারদের অবহেলা, নার্সদের গড়িমসি, আত্মীয়-স্বজনের চিৎকার চেঁচামেচি, ঝিমধরা দীর্ঘ জ্ঞানহীন সময়...!

এসব আপনাদের চোখের সামনে নিত্যই ঘটে চলেছে; তাই বিচিত্র কিছু মনে হবে না। মৃত্যু এখন আর মানুষকে ভাবিয়ে তুলতে পারে না; মৃতরা এখন শুধু সংখ্যা। তাই এসব বলা নিষ্প্রয়োজন। আসুন আমরা আলোচনা করি আমাদের মরণোত্তর অবস্থা নিয়ে। আমাকে বলতে বলুন, মৃত আমার এখনকার এই অনুভূতি; এটা আপনাদের নিশ্চয় কৌতুহলী করে তুলবে। কিন্তু আপনারা হয়তো জেনে হতাশ হবেনÑ এখনো আমি ধর্মে বর্ণিত কোন ফেরেশতার সম্মুখীন হয় নি। তাছাড়া এগুলো তো কবরস্থ করবার পরে সংঘটিত হয়; এমনটাই আমরা জানি; আমাকে তো এখনও কবর দেয়া হয়নি, আমাকে মাত্র নৌকা থেকে নামানো হল; আর আমার থেকে জানবার কথা, আমি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিই এমন কিছু ঘটে নি; আর ঘটবেই কি না সে ব্যাপারেও আমি নিশ্চিত করতে পারি না। আর যদিও ঘটে তো আমাকে কোথায় দেয়া হবে- আপনার কি মনে হয়- দোজখে না জান্নাতে?!
এ তো জানা কথা- সমস্ত ধর্মীয় গ্রন্থেই নাকি লেখা আছে- আত্মহত্যা মহাপাপ; আত্মহত্যাকারী দোজখে যাবে, আজীবন সেটাই তার বাসস্থান! কিন্তু ধর্মঅলারা কি মনে করে একজন মানুষ নিজের মৃত্যু ডেকে আনে সাধে, নাচতে নাচতে কেউ মরতে যায়, সুপেয় পানীয় মনে করে পান করে বিষ, অত্যন্ত উল্লাসে গলায় দড়ি দেয় কেউ, ট্রেনের নিচে নিজেকে শত বিভক্ত হতে দেয় আহ্লাদে, নদীতে ঝাপিয়ে জীবন দেয় মেডেল পাবার আশায়?! হায় সব নির্বোধের দল!

আমাকেই জিজ্ঞেস করুন কতটা ব্যথা নিয়ে আমি জীবননাশক বিষ গলায় ঢেলেছি! আপন সন্তানরা যখন আপনার সাথে কথা বলা ছেড়ে দেবে, কেমন লাগবে আপনার? যখন দেখছেন আপনারই পাশে বসে আপনার স্ত্রী তাদের সাথে কথা বলছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা; অথচ একবারও কেউ আপনাকে জিগায় না কথা বলবেন কি না! আপনার কলিজা ছিদ্র হয়ে যাবে কি না বলুন! ওরা তো আমারই সন্তান, আমারই বীর্যে তারা পয়দা; অথচ আমাকে তারা দূরে দূরে রাখে, আমার সাথে কথা বলে না! আমার কি একবারও মনে চায় না আমার ছেলেদের সাথে একটু কথা বলি, বলি বাবা কেমন আছো, খেয়েছো কি না, বিদেশে তোমাদের কষ্ট হয় না, কবে বাড়ি আসবে, আমার জন্য কি আনবে বিদেশ থেকে, কত জনের ছেলেই তো বিদেশ থেকে কত কি আনে আমার জন্য কি একটা জুব্বা আনতে পারবে, একটা জায়নামাজ, হাতে পরবার একটা ঘড়ি, একটা টর্চ লাইট, বাবা এনো কিন্তু, আনবে তো!

এই দুঃখে যদি আমি মরে যাই আর আমার জন্য নির্ধারণ করা হয় জাহান্নাম তা নিশ্চয় ন্যায়বিচার হবে, হবে কি না বলুন?!

নিজের স্ত্রী যখন আপনার সংসার থেকে বাবা মার বাড়িতে সম্পত্তি পাচার করবে আপনার কেমন লাগবে? আপনার শ্বশুরগোষ্ঠি গরীব হলে কিংবা এক দুদিন হলে মেনে নেয়া যায়, কিন্তু যখন আপনার শ্বশুর স্বাবলম্বি, গ্রামে যার রয়েছে প্রতিপত্তি, আর তারপরও দিনের পর দিন একই কাজ করে যাবে আপনার স্ত্রী, তখন আপনার সুখ হবে নিশ্চয়? ধরুন, নগদ টাকা দিয়ে আপনি আপনার শ্বশুরের কাছ থেকে পাঁচ বিঘা জমি কিনে নিয়েছেন; কিন্তু কোন দলিল নেননি; কারণ, শ্বশুর আপনাকে ভরসা দেয় আমরা আমরাই তো, দলিলের কি দরকার, কিন্তু কয়েক বছর পর যখন জমিটার দাম বেড়ে যায়, আর আপনার শ্বশুর মশায়ও টাকা দাবি করে বসে, অন্যথায় জমির ধারেকাছে যেতে নিষেধ করে; আপনি বেকায়দায় পড়ে নিজের বোকামীর দণ্ড স্বীকার করে নেন, এবং তাদের দাবি করা টাকা হাতে দেন, আর যখন দলিল চান তারা আবারও গড়িমসি করে- কেমন লাগবে আপনার? আর এরপরও আপনার স্ত্রী বাপ ভাইয়ের চালিতে পড়ে ওই জমির টাকা আবার পাচার করে আপনি কি খুশিতে বগল বাজাবেন? স্ত্রীকে শাসন করতে গেলে সে আপনার লাঠির দুর্বলতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বাপ ভাইদের দাপটের ভয় দেখায়, নিশ্চয় আরো একশ বছর বেঁচে থাকবার প্রার্থনা করবেন আপনি, করবেন কি না বলুন?! তখন আপনার বারবার জন্ম নিতে ইচ্ছে করবে এই সংসারে, তাই না?! কেন নয়?

তারপর যদি আপনার এই মিছে জীবন রাখার চেয়ে না রাখার সিদ্ধান্ত আপনি নিয়ে ফেলেন, আর তখন ধর্মীয় গ্রন্থগুলো আপনার কানের কাছে বাণী চিরন্তনী শোনাতে থাকে- আত্মহত্যা মহাপাপ, আত্মহত্যা মহাপাপ- আপনার তখনকার অনুুভূতি কেমন হবে? না না প্রকাশ করার দরকার নেই, প্রকাশ করলেই দোষ; কেন কুঁড়োখাওয়া রাজার গল্প জানেন না, কুঁড়ো খাওয়াতে দোষ নেই, কিন্তু বলতে গেলেই দোষ! বললেই প্রাণ যাবে!

আর ধর্মের কথাই যদি ধরি তো আমাকে কেন জাহান্নামে দেয়া হবে? আমি তো বলেছি আমাকে হত্যা করা হয়। আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম; কেননা এ কয়দিনে বোঝা হয়ে গিয়েছিল যে তারা আমাকে ঠিকই ভালবাসে; তাদের ভালবাসার পরশ আমি পেয়েছি। আমার বড় ছেলে লাল মিয়া ফোন করেছিল বিদেশ থেকে, আমার সাথে কথা বলেছে। ঢাকা থেকে চান মিয়া এসেছে- তার অনুতপ্ত মুখ আমি দেখেছি; এবং এখনো সে তার মৃত বাবাকে সঙ্গ দিচ্ছে, অর্থাৎ সে আমার লাশ নিয়ে যাবার জন্য ব্যবস্থা করছে। আমার একমাত্র মেয়ে, সত্যি মেয়েরাই বাবাকে নিরঙ্কুশ ভালবাসে, আমাকে কিভাবে আগলে রেখেছিল এ ক দিন; আর কি রকম পাগল হয়ে গেছে মৃত্যুশোকে। আপনাদের হয়তো জানা কথা, ধর্মীয় গ্রন্থে নাকি লেখা আছে, অন্যায়ভাবে নিহত ব্যক্তি শহীদ, সে বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে; আর হত্যাকারী জাহান্নামী, চিরদিন ভোগ করবে বর্ণনাতীত যন্ত্রণা।

কিন্তু আমাকে কি হত্যাই করা হয়েছে? কম বয়সি ডাক্তারটা আমাকে সেই যে ইঞ্জেকশনটা দিল এরপর যে আমি আর জেগে উঠি নি; একটা প্রজাপতির মতো আমার দেহকে ঘিরে উড়ে চলেছি- এ জন্য কি ডাক্তারটা জাহান্নামে যাবে আর আমি জান্নাতে?! ডাক্তারেরই বা কি দোষ, সে অবস্থা বিবেচনা করেই আমাকে চিরদিনের জন্য ঘুম পাড়ানোর ব্যবস্থা করেছে; কেননা আমার পাকস্থলি নাকি ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল, আমি জানি না, আমার শারীরিক অবস্থা নাকি দিনদিন অবনতির দিকে এগোচ্ছিল, কিন্তু আমার কাছে তা মনে হয়নি, কারণ আমার আত্মীয় স্বজনরা আমার কাছে এসেছিল, তাদের আমি ক্ষমা করে দিয়েছি; আর এরকম পেটের অসুখ তো আমার আজ প্রথম না, এর আগে, মানে আমার মৃত্যুর আগে, তিন চার মাস সুস্থ ছিলাম, তার আগে আমি তো পেটের অসুখের জন্য মরতে বসেছিলাম, সবাই ধরেই নিয়েছিল যে এ যাত্রায় আমাকে আর বাঁচানো গেল না, কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমি বেঁচে উঠেছিলাম; আর সেটাই হয়েছিল আমার মস্ত বড় ভুল; কারণ আমি ক্রমশ অনুভব করে উঠছিলাম আমার বেঁচে ওঠাতে আমার বউ খুশির বদলে একটু যেন বেজার; আমি ধারণা করতে পারি নি যে সে আমাকে সহ্য করতে পারে না, সেটা সব পরিবারেই থাকে, মুখে মুখে সবাই বিরক্তি প্রকাশ করে, তাই বলে জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় না; কিন্তু সবার বউয়ের মত আমার বউ না, সে হয়েছে আমার জীবনের কাল। সে আমার থেকে সন্তানদেরকে দূরে রেখেছে, কাছে ঘেঁষতে দেয় নি।

অতএব একাকিত্বের ভার বইতে শুরু করি আমি; নিঃসঙ্গ চিলের মতো একাকী ঘুরতে থাকি দিগ্বিবিদিক। আমি আমার নিঃসঙ্গতাকে নানাভাবে কাটাতে চেয়েছিলাম: বন্ধুদের সাথে গল্পগুজব করা কি বাজারে চায়ের স্টলে রাজনীতির আলাপ শোনা কি চায়ের দোকানে চলা টিভিতে ছবি দেখা ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু হিতে বিপরীত। এসব আমাকে আরো বিষণœ করে তোলে শেষে আমি আবার বাড়িতে থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু যেই সেই; বউয়ের প্যাচালের কোন কমতি নেই। আমি মনে করতাম বাড়িতে লোক নেই দেখে এমনটা হয়। তাই আমি মেয়ের মেয়েটাকে বাড়িতে এনে রাখি। এখানেই স্কুলে ভর্তি করে দিই। ওর সাথে আমার ভালোই ভাব জমে। কিছুদিন ভালোই চলে। কিন্তু দুই তিন মাস পর নাতনিটা আর আসে না। তো আর কি করা। ওকে কি দোষ দেয়া যাবে, অতটুকু মাসুম বাচ্চা। নিজের খেলার সাথী না পেলে কি থাকবে; আর নানিটা সাক্ষাৎ দাজ্জাল, ভাল খাবার থাকতে বাসি পঁচাধচাই দিত; আমি বললেই দিত ঝগড়া বাধিয়ে। এভাবে আর চলবে কত কাল?

আমি জানি আমার কাছে যেটা কষ্ট, সেটা আপনার কাছে কষ্ট নাও হতে পারে। আমাদের ব্যক্তিগত কোন ঘটনাই অন্যকে পীড়িত করে না, কেবল অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তোলে, যে অনুভূতিগুলো আমাদেরই একান্ত ব্যক্তিগত, যা আমরা আমাদের দুঃখের সময় অনুভব করি, তারই নিক্তিতে অন্যের ঘটনাকেও অনুভবের সীমায় আনি, আর তাই আমরা অন্যের দুঃখে কখনো কখনো দুঃখিত হই; কিন্তু সেটা কেবলই ব্যক্তিগত- অর্থাৎ আমাদের নিজস্ব বলে যা আছে তা স্রেফ যন্ত্রণা, প্রত্যেকেই আমরা আমাদের যন্ত্রণার কাছে এক অবোধ উলঙ্গ শিশু।

তাই আমার এইসব কারণ আপনার কাছে আত্মহত্যার জন্য যথেষ্ট বলে মনে নাও হতে পারে। কিন্তু দেখুন, আপনার জীবনের এমন কোন ঘটনা কি নেই যেটা অন্যের কাছে খুবই ঠুনকো; অথচ সেটাই আপনার ব্যক্তিগত উত্তেজক, যা আপনাকে বেঁচে থাকবার বরাভয় দেয়? আমি জানি, এমন কোন ব্যক্তি নেই যার কোন যন্ত্রণা নেই; আর এখানেই এই একটা জায়গায় আমাদের সবার মিল, আমাদের সবার যন্ত্রণা, যা না হলেই নয়; যা আমাদেরকে বিশাল বপু লোক সমাবেশের ভেতরও একদম নিঃসঙ্গ বানিয়ে দেয়, ফতুর হবার অনুভূতি দেয় কোটি টাকার পাহাড় থাকা সত্ত্বেও, উচু পদে সমাসীন থেকেও নিজেকে ভাবতে বাধ্য করে ক্ষমতাহীন।

অতএব আমাকে আত্মহত্যার চেষ্টা করতে হয়; কিন্তু আমি ব্যর্থ হই। এজন্য আমার অবশ্য তেমন কোন কষ্ট নেই। কিন্তু এর পরের ঘটনাগুলোই আমাকে পীড়িত করে। কারণ, আমার শোচনীয় অবস্থা জেনে সবাই একে একে দেখা করে যায়। আর সেটা ছিল তৃতীয় দিন পর্যন্ত। আর তারপর আমার আবার অবহেলা শুরু হয়। আমাকে নিঃসঙ্গ ফেলে রাখা হয় হাসপাতালে; সবার সংসার আছে, সবাই যায় তার প্রিয়জনের কাছে; কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ দুঃখ একান্ত আমার, আমি রাজা মিয়ার, আমার প্রিয়জনেরা সংসারের মায়া বোঝে, তারা আমার মায়া বোঝে না, তারা আমার দুঃখ গায়ে মাখে না, তাই তারা শসা তোলার অজুহাতে বাড়ি ফেরে, তাই তারা ঘুমানোর অজুহাতে ভাল জায়গা খোঁজে, তারা আমার মত একজন মানুষকে যে পৃথিবীতে এসেছিল অনিচ্ছায়, যে বেড়ে উঠেছিল অবহেলায়, যে সংসার পেতেছিল মায়ায়, যে সন্তান জন্ম দিয়েছিল কামনায়, যাকে রাজা বলে ডাকা হত, স্ত্রী সন্তান সংসারকে নিয়ে যার কারবার ছিল, সেই বাদশা মিয়াকে হাসপাতালের শাদা বেডে রেখে যায়, অতএব বাদশা মিয়ার কারবার একদিন সাঙ্গ হয়, সাঙ্গ করতে হয়, সাঙ্গ করে দেয়Ñ স্ত্রী সন্তান সংসার; সেই টেকো মাথার একজন রাজা মিয়া, যার উচ্চতা সাড়ে তিন হাত, মধ্যম গড়নের গরু ব্যবসায়ী লোকটা, হ্যাঁ, আমি রাজা মিয়া, আজ লাশ, আজ আমি মৃত; আজ আমি আমার ছেলের কাঁধে, আমার জামাইয়ের কাঁধে, আমার সহোদর ভাইয়ের কাঁধে, আমার প্রতিবেশির কাঁধে; অথচ আমি কাঁধে চড়তে ভয় পেতাম, অথচ আমি মরাটানা খাট দেখলে ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম, জোছনাজ¦লা হেমন্ত রাতে অথচ আমার একাকী জেগে থাকতে ভাল লাগত; কিন্তু আজ আমাকে কাঁধে তোলা হয়েছে, শোয়ানো হয়েছে খাটে, সূর্যাস্তের একটু পর আকাশে উঠতে থাকা হেমন্তের এই বিশাল চাঁদের জোছনায় একাকী ভিজতে না দিয়ে লোকজনের কান্না আর অভিযোগ, ভিড় আর আলোচনা, শোক আর মনস্তাপ আমাকে আরো একাকী বিষণ্ণ করে তুলছে, আমাকে আরো নিঃসঙ্গ বেদনাময় করে ফেলছে।