চক্রব্যুহে আটকে থাকা অবয়ব

শাশ্বত নিপ্পন

জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন গলাটা আরো একধাপ নিচে এনে জড় হওয়া এক রাশ কঙ্কালসার মানুষগুলোকে বোঝাতে লাগলেন; বললেন, দেখুন, আমাদের সরকারের ওপর তলায় একটা রিপোর্ট পাঠাতে হয়-এবং আমরা সেটা অলরেডি পাঠিয়ে দিয়েছি। সেখানে আপনাদের এই পূজার কথা বলা হয়েছে- আর এই শেষ বেলায় যদি আপনারা পুজোটা না করতে চান ...
মনোহরপুরের হরিজন পাড়ার এই দরিদ্র মানুষ গুলো যে পুজা করতে চায় না তা কিন্তু নয়। বরং, তারাই এই বার দূর্গাপুজো করতে ভীষন আগ্রহী। গ্রামের এই নিচু জাতের দারিদ্র পীড়িত, রুগ্ন মানুষ গুলোর জীবনে আনন্দ বলে কিছু নেই। সারা বছর সমাজের উঁচু তলার মানুষ গুলোর লাথি-ঝাঁটা আর করুণা নিয়ে আধ পেট খেয়ে কোন মতে বেঁচে থাকে এরা। এদের আনন্দ বলতে কোরবানী ঈদ। সেই দিন এই হরিজনপাড়া মৌ মৌ করে বিভিন্ন বাড়ি থেকে কুড়িয়ে পাওয়া মাংসের গন্ধে। পাড়ার রোগা পটকা অসুস্থ শিশুগুলো উঠানের চুলার পাড়ে গোল হয়ে বসে। ওরা চকচকে চোখে হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক। এই দিনে তারা পেট পুরে খায়। বয়স্করা সবাই মিলে গাঁজা টানে আর কাশে। প্রাণ পণে কাশে। কাশতে কাশতে ওদের চোখ গোল হয়ে যায়, দম পায় না, বুক ধরে কাশে ওরা। তারপর বুকের গভীর থেকে বিরয়ে আসে পুরনো সর্দি। থু করে উঠানের এক কোনে ফেলে ওরা; তারপর আবার কলকেতে টান দেয় নুতন উদ্যোমে। বৌ গুলো শহরে গিয়ে রাস্তা ঝাড়– দেয়। তারা কাজে যায় সন্ধ্যার পর। চুল বেধে; কায়দা করে কাপড় পরে মুখে জরদা দেওয়া পান দিয়ে দল বেধে গ্রামের ধুলো ঢাকা সরু পথ ধরে। ওরা চলে যাওয়ার পরও বাতাসে জরদার গন্ধ পাওয়া যায়। ওদের হাতে লম্বা লাঠি লাগানো ঝাঁটা। ওদের চলার ঠমক আর ছোট ব্লাউনের নিচে প্রতিবাদী যৌবন পথের চলমান লোকজনের দৃষ্টি কাড়ে। রাতে কাজের ফাঁকে অনেককে সন্তুষ্ট করতে হয় ওদের; নাইট গার্ড, বখাটে, চোর এমনকি টহল পুলিশও। বাড়তি কিছু আয় করে সকালের আলো ফোটার সাথে সাথে ওরা ফিরে আসে ভৈরব নদের ঘোলা জলে স্লান সেরে শূচি হয়; তারপর বাড়ি ফেরে ওরা। তখনো ওদের অল্পতে হাঁপিয়ে ওঠা স্বামীগুলো নাক ডেকে ঘুমায়। গাঁজার ঘোর তখনো কাটে না ওদের। এভাবেই মনোহরপুরের হরিজন পাড়ার অস্পৃশ্য মানুষ গুলোর অলস জীবন কেটে যায় জন্ম মৃত্যুর আবর্তে।

এই মানুষ গুলো এবার ঠিক করেছে দূর্গাপুজো করবে। এই পুজো হবে নেতাদের টাকায়। উদ্দেশ্য ভোট। আর মধ্যে থেকে চাঁদা হিসেবে কিছু বাড়তি পয়সা তুলতে পারলে, আর কিছু খরচ বাঁচাতে পারলেই কটা দিন নিশ্চিন্ত মনে ক’দিন বাংলা মদ খাওয়া যাবে- মূলত এই চিন্তা থেকেই এই পুজোয় তাদের এত আগ্রহ। কিন্তু শেষ মূহুর্তে পুজোটা হয়ে উঠছে না। মানে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তার কোন বিধান দিতে পারছেন না পুরোহিত ভট্টাচার্য মশায়। তিনি মুকুল দাস, জয় ভুঁঁইমালী, ভজা দাস, বাবু মেথর, লালু ভুঁইমালী’র হতবিহবল নির্বাক মুখ গুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন,
- কিন্তু, হুজুর এই পুজো সুন্দরের পুজো। দেবীর পূজা। কিন্তু সেই দেবীরই মাথা নেই। কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এমতাবস্থায় আমি কি বিধান দেব হুজুর.... তাছাড়া অঙ্গহানী বিগ্রহের পূজা শাস্ত্রে নিষেধ আছে...
ভট্টাচার্য মশায় প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে যজমানী পুরুহিত। তিনি এখানে এসেছেন নগদ পাঁচ হাজার টাকার লোভে। এসেই ফেঁসে গেছেন বড় সমস্যায়।
জেলা প্রশাসক যে অসহায় বোধ করছেন তা তার কণ্ঠস্বরেই বোঝা যাচ্ছে। তবুও তিনি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন প্রাণপণে। এই ছোটলোকের বাচ্চাগুলোর সামনে দাঁড়াতেই তার এখন ঘেন্না হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, এদের শরীর থেকে দুর্গন্ধ আসছে। তারপরও স্বাভাবিক গলায় বললেন,
- ঠাকুর মশায়, সরকার পূজার সংখ্যা বেশী দেখতে চান। তাছাড়া আমরা সকলেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে চাই। এই ঘৃণ্য কাজ যে করছে তার তদন্ত চলছে। দুর্বৃত্ত বা সন্ত্রাসী সে যে দলেরই হোক না কেন বিচার তার হবেই- কিন্তু এই শেষ মূহুর্তে পুজো না হলে- আর প্রেসের লোকেরা তো আছেই;
আপনি একটু ব্যবস্থা করুন, প্লিজ ....
সমবেত হরিজন সম্প্রদায়ের লোকেরাও চাইছে পূজা হোক। কিন্তু তাদের সমস্যা শাস্ত্রীয়। সেকারণে তারাও চুপ। তাদের ধারণা এখন এই কাজ করার অর্থ হলো মহা পাপ করা। এই অধর্ম করে গুষ্টি শুদ্ধ ওলাওঠাতে মরে কাজ নেই। অন্যদিন সামান্য আনন্দ আর হিসাব ফাঁকির পয়সায় কদিন চুটিয়ে বাংলা মদ গেলা বুঝি ভেস্তে যেতে বসেছে। তবুও ওরা চুপ। সমাজের উঁচু তলার মানুষ গুলোর মুখের ওপর কথা বলার অভ্যাস নেই ওদের। তাছাড়া পুরোহিত তো আছেনই; তিনি শাস্ত্র বোঝেন তিনিই কথা বলবেন, আর এই সমস্যার প্রথম থেকেই তিনি উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনাটা পুরোহিত মশায় দেখতে পান আলো আঁধারে। ষষ্ঠী-র রাত। মা’র বোধনের লগ্ন রাত বারোটায়। এদিকে পূজার কোন ব্যবস্থা হয়ে উঠেনি। এরা এসব বোঝেও না, আর এদের সাহায্য করতে কেউ এগিয়েও আসেনি। তিনি এখন ভাবছেন- ব্রাহ্মণী কে আনলে ভাল হত। হাতে-পাতে জোগাড়ও দিতে পারত। আর এই আনন্দ উৎসবের দিনে সেও একা একা মন খারাপ করে থাকত না। এদিকে এস.পি সাহেব আলো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত হরিজন পাড়ার মা দুর্গা আলোর বন্যায় ভাসেনি। আলোর উচ্ছ্বাস বইছে শহরের ভদ্রপাড়ার মন্ডপ গুলোতে। সেখানে ধর্ম পাগল মানুষ গুলোর মধ্যে, ভক্তি আর ভালবাসার প্লাবনে মা দুর্গতিনাশিনী ভাসছেন আহাল্লাদী হয়ে। আর এই হরিজনপাড়ার মন্ডপ অন্ধকার। ঠাকুর মশায়ের পক্ষে একা একা পূজার জোগাড় দেওয়া এই বয়সে বেশ কঠিন। দুর্গা পূজাতে উপোষ থাকতে হয় পুরোহিতকে। অবশ্য ভট্টাচার্য মশায় উপোষ নেই- ছোট জাতের পুজো, তার আবার উপোষ! পুরোহিত মশায় একা একা কাজ করেন আর গজ গজ করতে থাকে আপন মনে- “দুর্গা পূজা কি শহর কথা! এ হলো মহাযজ্ঞ! এ পূজা এক সময় করেছিল, তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ন। হাজার হাজার টাকা খরচ সেই পুজোতে; খরচ দেখে সাহেবরাও হা হয়ে গিয়েছিল- সেটা হলো পুজো!” এখন লগ্ন বয়ে যাচ্ছে; মায়ের বোধন পূজা করতে হবে, সেটায় মূল কথা। অবশ্য এই এখানকার লোকেরা লগ্ন সম্পর্কে খুব বেশী জ্ঞান রাখে না; তবুও একটা ন্যায় অন্যায় বলে কথা আছে না- সে কারণেই ভট্টাচার্য মশায় আরো ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পুজোর জোগাড় দিতে দিতে আলো আধারে হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, প্রতিমার মাথা নেই। অর্থাৎ দূর্গা প্রতিমা সহ লক্ষী সরস্বতী দেবীর মাথা কে বা কারা কেটে নিয়ে গেছে অথবা কোথাও ফেলে দিয়েছে; মোট কথা দেবীর মাথা নেই। মহা ষষ্ঠীর লগ্ন আরম্ভ হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এখন তিনি পূজা শুরু করবেন কি করে। সুন্দরের পূজা করতে এসে, সে কি অসুর পুজো করবে? হারিকেন, ছোট চার্জার আর টর্চের আলোয় আয়োজকরা সকলে দেখলো দেবীদের মাথা ভাঙ্গা। মানে, পুজো হচ্ছে না! কিন্তু সকলেই নির্বাক!
অবশ্য এরা নির্বাক-ই থাকা সব সময়। এইতো সেদিন লাটু ভুঁইমালির সোমত্ত মেয়েকে একদল বখাটে পাট ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে ...
মেয়েটা সেদিন শেয়ালে ধরা হাসের মত পাখা দাপিয়ে, চেঁচিয়ে কাউকে জড় করতে পারেনি। তারপর পাড়ার সকলে কিছুটা গো গো করে সবাই চুপ হয়ে যায় যথা নিয়মে। ক’দিন আগে হরিজনপাড়ার শ্মশান ঘাটটা দখল করে নিয়েছিল ক্ষমতাসীন দলের এক পান্ডা। গত মাসের বিষ খাওয়া লাশ নিয়ে গিয়ে ওরা সৎকার করতে পারে না। অপেক্ষা করতে হয় উঁচু তলার মানুষের হুকুমের জন্য। শক্ত লাশ আরও শক্ত হয়; দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। ক্ষোভ দানা বাঁধে ওদের মধ্যে ... তারপর একসময় চুপ হয়ে যায় ওরা। মাথা বিহীন মূর্তি ... দেখে যখন সবাই নির্বাক তখন আকন্ঠ চোলাই গিলে বাবু মেথর, বেশ সবর। চিৎকার করে গরম করে তোলে সাড়া পাড়া। বাবু খিস্তি করে বলে, “ধ্যাৎ, যে দুগ্গা নিজেকে রক্ষা করতে পারে না- সে আমার মত মেথরদের কি রক্ষা করবে- আ্যাঁ আর দুগ্গা হল শহরের। যারা সেখানে থাকে তারাও কত সৌন্দর্য আহা! ওদের পেট গুলো কি ফর্সা ...
বাবু মাতালের কথায় কেউ কান দেয় না। সকলে চুপ থাকে। কিন্তু এই মৌনতার মাঝেও শহরে নিমিষেই এই খবর পৌঁছে যায়। ডি,সি সাহেব, এস,পি সাহেব, পুলিশ, আরো বড় বড় সাহেব এই প্রথমবারের মত এই গরীব পাড়ায় স্বশরীরে এসে দাঁড়ায়। মনোহরপুরের হরিজনরা দুর্গতিনাশী দেবী দুর্গার প্রতি ভক্তিতে আপ্লুত হয়। হোক না তা মাথা বিহীন, বাবু মাতালের ভাষায় দুর্বল, ভীরু নিজেকে রক্ষায় অক্ষম- তবুও তাদের মনে হয়, এই দুর্গতিনাশিনীর কৃপাতেই এই মহারথীরা শহর থেকে এতটা পথ বেয়ে, এত রাতে তাদের কাছে এসেছেন। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার প্রসেই পুরো এলাকাটা ঘিরে ফেলেছেন। তার মধ্যে চলছে পুরোহিত মশায়ের সাথে কথা। এখন যেন ক্লান্ত বোধ করছেন জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন। এস.পি সাহেব, গিয়াস উদ্দিন এগিয়ে এলেন। বল্লেন,
ডিসি সাহেব আপনি ছাড়ুন আমাকে দেখতে দিন একটু; বলেই তিনি ওসি সাহেবকে ধমকের সুরে ডাকলেন,
- এ্যাই ওসি:
- স্যার।
- কি কর তুমি শালা, বাইনচোদ...
- স্যার।
- বাঁধ এই শালা মালোয়ানের বাচ্চাকে। প্রথমে ধোলাই কর খানিক। তারপর এই বুড়োর ছেলে থাকলে নিয়ে আস, ধোলাই কর- তারপর মূর্তি ভাঙ্গার চার্জ এনে চালান দে শালাকে-
- স্যার, ইয়েস স্যার।
ওসি আব্দুল জলিল যন্ত্রচালিত পুতুলের মত স্যালুট করে পিছন দিকে ঘুরল। আর তখুনি পুলিশ সুপার তার দামী সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে, নিজে জ্বালানোর আগে ডি,সি সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “চিন্তা নেই, কাজ হবে”। জাহাঙ্গীর সাহেব ধুমপান চলে না; তারপরও তিনি সিগারেট নিলেন কিন্তু জ্বালালেন না।
ঘটনা দেখে পুরোহিত মশাই এর অবস্থা বেগতিক। ইতিমধ্যে দুই পুলিশ তার শীর্ষ দুই বাহু চেপে ধরেছে। ভট্টাচার্য মশায়ের তলপেটে ভীষন সুড়সুড়ি অনুভব করলেন। তার মনে হচ্ছে সকলের সামনেই ‘ইয়ে’ হয়ে যাবে ... তারপরও সমস্ত শক্তি একত্রিত করে তিনি বললেন, “হুজুর, আমি যজমানী ব্রাহ্মন, হুজুর আমি! হুজুর!” - বলতে বলতে এস.পি সাহেবের পায়ে পড়লেন। সমবেত লোকেরা একজন ব্রাহ্মনের এই দুর্গতি দেখে লজ্জা আর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। ওদের মধ্যে কেউ কেউ মনে মনে ভাবল, যাক, মা দুর্গার মাথা না থেকে ভালই হয়েছে; মাথা থাকলে মা হয়তো নিজেই লজ্জা পেতেন এই দৃশ্য দেখে।
এস.পি. গিয়াস উদ্দিন সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে, উদাস হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “পুজো কি হবে? শাস্ত্রে কি বিধান পাওয়া যাবে এখনি পুজো করার?” ভট্টাচার্য মশায় এই ইশারাটা সহজেই বুঝলেই এবং দ্রুত বললেন, “আজ্ঞে হবে হুজুর, অবশ্যই হবে।” বলে তিনি চোখের জল মুছলেন। আর মনে মনে সেই শক্তিদায়িনী, জ্ঞানদায়িনী, দুর্গতিনাশিনীর পায়ে ক্ষমা চাইলেন।
হৃষ্ট চিত্তে এস.পি. গিয়াস উদ্দিন বললেন, “পূজা শেষে পুরোহিত মশায়, আমার পক্ষ থেকে দুই হাজার টাকা বকশিস নিয়ে যাবেন।” তারপর ওসিকে গাড়ি ঘোড়ানোর জন্য আদেশ দিয়ে ওয়ারলেস এ কি যেন জরুরী কথা সেরে ডিসি সাহেব কে হালকা মেজাজে বললেন,
- দেখলেন তো, বকশিস শুধু পুলিশ নয়, এদেশের সবাই, এমনকি পুরোহিত মশায়ও বকশিস খায়- যাকে দুষ্টুরা ঘুষ বলে- হা হা হা, এবার চলেন...

দুই
এরপর পুজো শুরু হতে দেরী হয় না। মাটির প্রতিমার মাথায় একথাল কাঁচা মাটির সাথে একটা করে দেবীর ছবি জড়িয়ে আর সামনে একটা ছোট মাটির ঘট বসিয়ে দিয়ে শুরু হয়ে যায় দুর্গা পূজো।
যতটা আনন্দ আশা করেছিল এই মানুষগুলো এখন আর তা বোধ করছে না তারা। পুরোহিত মশায় পুজো করতে গিয়ে বারবার হয়ে পড়ছেন বিষণ্ণ... এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তার কাজ। আজ দীঘদিন ধরে এই কাজ করে আসছেন তিনি; কিন্তু এমনটি এই প্রথম। গ্রীষ্মের দুপুরের উদাসী বাতাসে ভেসে আসা শুকনো পাতার মত উড়ে আসছে নানা চিন্তা তার মাথায়। ভট্টাচার্য মশায়ের মনে হচ্ছে হাজার বছর ধরে এই পুজো করেছে সনাতনীরা। সুন্দরের কাছ থেকে শক্তি চেয়েছে অসুন্দরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য। কিন্তু তবুও তারা এখনো এত দূর্বল কেন? কেন তারা এত অসহায়? অভাব আর দারিদ্রকে সাথে নিয়ে আপোষ করে বেঁচে থাকে...? এরূপ হাজার প্রশ্ন তার একাগ্রতাকে নষ্ট করছে। ভট্টাচার্য মশায় লক্ষ্য করলেন, সমবেত দর্শনার্থীরা সকলেই শীর্ন, হাড় জিরজিরে কঙ্কালসার দুর্বল অভাবী! জীর্ণ কঙ্কালসার শিশুগুলো সবাই অসুর টাকে দেখছে- অসুরের মাংসপেশী গুলোকে দেখছে- অসুরের পুরুষালী চেহারা আর প্রতিবাদী চাহুনী তাদেরকে বিস্মিত আর হতবাক করছে। বয়স্করাও দেবী মূর্তির কামউদ্দীপক শরীর ছেড়ে অসুরকে দেখছে। অসুরের মাংসপেশী, তার প্রতিবারদের ভাষা, লড়াই ও তার মৃত্যু সমাজের এই দলিত মানুষগুলোকে আকৃষ্ট করছে কোনো কারণ ছাড়া। তাদের মনে হচ্ছে, অসুরের মত তারাও পড়ে আছে সকলেই পায়ের নিচে; তাদের মত অসুরও অমর নয়- তারপরও অসুর কত প্রতিবাদী- সে লড়ছে। লড়ছে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও....
বাবু মাতাল, চিৎকার করে বলে বেড়াচ্ছে, “কেউ অসুরের মাথা কাটতে পারে না- অসুর কে কেউ মারতে পারে না- দুগ্গা কে মারে; তার মাথা কাটা পরে- হা হা হা.....”
বাবু মাতালের এই হাসি চারপাশের বাতাসে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। তার কথাতে কেউ কান দেয় না। মন্ডপের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ আর আনসারগুলো শুধু হাসে। কিন্তু কথাটা যেন পুরোহিত ঠাকুরের মগজের ভিতর গেঁথে যায়- বারবার একই কথা ঘুরতে থাকে পিন আটকে যাওয়া রেকর্ডের মত। তার মন্ত্র আবার এলোমেলো হয়ে যেতে থাকে। এক সময় পুরোহিত মশায় পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ান। আরতির জন্য।
পঞ্চপ্রদীপের আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। সেই আলোয় দেবীর মুন্ডুহীন শরীর চকচকে হয়ে উঠেছে। আর এই সামান্য আলোয় আরো পুরুষালী হয়ে উঠেছে অসুর মূর্তিটা। তার ঘর্মাক্ত লোমশ বুক পঞ্চপ্রদীপের আলোয় আরো চকচকে দেখাচ্ছে। আরতি চলছে অন্ধকারে নিমজ্জিত মনোহরপুরের হরিজন পাড়ার দুর্গা মন্ডপে। পুরোহিত মশায়ের বাম হাতের ঘন্টা বেজে চলেছে বিরামহীন। কিন্তু ঢাক নেই। শুধু দূর থেকে ভেসে আসছে এক হল্লা। মহাঅষ্টমীর এই আনন্দ ঘন মুহুর্তে এই মানুষ গুলো মেতেছে শুয়োর শিকারে। একটা বৃহৎ আকৃতির শুয়োরকে সকলে মিলে ট্যাঁটা, ফালা আর বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করছে। আর প্রবল আনন্দ উত্তেজনায় চিৎকার করছে।
জন্তুটা পালাতে পারছে না; কিন্তু বাঁচার জন্য লড়ছে সে প্রাণপণে। চারদিক থেকে শুয়োরটাকে আক্রমণ করছে মানুষগুলো; জন্তুটা দাঁত বের করে, গা ফুলিয়ে, অযথা গর্জন করছে আর বাঁচার চেষ্টা করছে।

ভট্টাচার্য মশায়ের মনে পড়ে যায়, এই অষ্টমী নবমী তিথিতে শ্রী রাম চন্দ্র রাক্ষস রাজ রাবনকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর সে কারণেই অষ্টমী নবমীর পূজা এত মহীমান্বিত। কুৎসিত জন্তুটা পালাতে পারছে না কিছুতেই- কিন্তু প্রাণপনে লড়ছে সে, বাঁচার জন্য। চারদিক থেকে শুয়োরটাকে আক্রমণ করছে মানুষ গুলো। জন্তুটার হিংস্র চেহারার মধ্যে লুকিয়ে আছে বাঁচার প্রবল আকুতি- কিন্তু চক্রব্যুহ রচনা করেছে ক্ষুধার লালসা অন্ধ মানুষ গুলো। এ যেন মহাভারতের ‘অভিমূন্য বধ’ বাতাসে চিৎকার ভেসে আসছে এখনো; ভট্টাচার্য মশায়ের আরতি হয়ে পড়ছে অন্তঃসারশূন্য; শুধু নিয়ম রক্ষা; একাগ্র হতে পারছেন না পুরোহিত মশায় কিছুতেই। বার বার তার চোখে ভেসে আসছে রাগী আতংকিত এক ইতর প্রাণির মুখ, যে বাঁচতে চায় এই চক্রবুহ্যের আক্রমণ থেকে ....