ফর হুম দ বেল টোলস

তমাল রায়

জীবনটা জীবনই থাকে। মাঝে মাঝে তা নির্বাসন উত্তর আকাশের মত লাল হয়ে ওঠে। হয়ত কিছু আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে। সেই তখন রামধনু।

এই যেমন তিনি। মা নেই। তাই হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন। রিডগুলো সাদা আর কালো। সাদা রিড থেকে উঠে আসা সুরের থেকে কালোগুলো কিঞ্চিৎ পেনসিভ। যেন অন্তর্মুখী। সে কথা সুর বা তাল যারা বোঝেন, তারা জানেন। কেবল মা নেই, তিনি হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন। সাদা আর কালোর সুর মিলে উচ্চারণ মিশে কোথাও যেন কুয়াশা হয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছে কোথায়? কেন, ওই যে দেখার চিত্রপটে যে পাহাড়, তার গলা ধরে ঝুলে থাকবে কিছুটাক্ষণ। তারপর তেজালো রোদ্দুর উঠলে যেমন হয়, শুষে নেবে সব। তবু তিনি হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন।

ঘরটা ঘরই। জানলাগুলো আয়তক্ষেত্র। লম্বায় যতটা, চওড়ায় তার অর্ধেকেরও কম। আগে কাচগুলো স্বচ্ছ ছিল। ভিতর বাহির উভয়তই দৃশ্যমান। দৃশ্যমানতায় আড়াল রাখাই সভ্যতা। তাই কাচগুলি পরে রঙ করা হয়। এখন অস্বচ্ছ। বাইরের আলো ভেতরে আসে না। ভেতরের রাত কাচ ভেদ করে বাইরে যায় না। দুটো ছবি, না তিনটে। একটি সামান্য ঝুঁকে বাম দিকে। পাশেরটি আবার ডান দিকে। ওনারাই বাবা মা। ঝুঁকে পরস্পরের দিকে কিন্তু মাঝে অনেকটা দেওয়াল। যাকে দূরত্ব বলে। একটু উঁচুতে একটা দেওয়াল ঘড়ি। কখনও চলত। এখন বন্ধ। পৌনে নটায়। পৌনে নটাতেই কি বাবা খেতে বসেছিলেন? তখনও কি রাত? মা'ই কি বেড়ে দিচ্ছিলেন খাবার? তারপর কি হয়? ভুমিকম্প? অতিবৃষ্টি? দেওয়াল জুড়ে অজস্র জল নামার দাগ, ছবিগুলি কি তখন ভয় পেয়ে উঠে বসেছিল খাটের ওপর? মেঝে কি তখন জল থই থই? খাটটা ময়ূরপঙ্খী হয়ে ভাসতে শুরু করেছিল? দুলে দুলে বেড়িয়ে পড়েছিল দরজা পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে, সোজা রাস্তা? রাস্তা কি সেই প্রথম নদীতে মেশে? সাথে কি ফুল আঁকা পাশবালিশটাও ছিল? আর কাঠ আলমারির আয়না? দুধসাদা বেড়ালটা? বাবা খেতে বসলেই যে থালার পাশে এসে বসত, এঁটো, কাঁটা আর উচ্ছিষ্ট ভাত, সেই পাতেই খেত। হুলো না। মিনিই ছিল হয়ত। মা অত রেগে যেতেন কেন? নদী পথেই কি হারিয়ে গেছিল সেদিন ময়ূরপঙ্খী?

জল দাগ রেখে যায়। দাগ অবশ্য মুছেও যায়, সময়ের ধুলোবালি কত কি!
যেমন তিনি। ধুলো সরিয়ে সময় খুঁজছেন। কিছুটা ধুলোও তো সময়, সে দিকে হুঁশ পড়তেই থমকালেন। ঘর পেরোলেন, চৌকাঠ। চৌকাঠ পেরোলে বারান্দা। রেলিংগুলো রেলিংই আছে। কেবল মরচে পড়েছে। আর কিছু জ্যামিতিক ছায়া। বাইরে চাঁদ। জোছনাও। সিঁড়ি পেরিয়ে তিনি চললেন নদীর দিকে। ওইখানেই নদী ছিল। নদীতে জল ছিল। তেমন বৃষ্টিতে ফুঁসে উঠতো নদী। নদী মানে জল। জল ওলোটপালট হলে, ময়ূরপঙ্খী ভেসে যায়, সে ময়ূরপঙ্খীতে কি মা'ও উঠেছিলেন? না'কি বেড়াল আর পাশবালিশ? তিনি নদী না পেয়ে বালি খুঁড়তে লাগলেন। নীচে হয়ত জল। ছলাৎ ছল শব্দ আসছে কোথা থেকে যেন। তখন সন্ধ্যা। সন্ধ্যা একটা রাগের নাম। জলের রাগে সন্ধ্যা ঘনালে, তিনি বাবার উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিলেন ধুলো,সেই যে সময়! ধুলো জড় হল। জমাট বাঁধলো। খানিকটা কচুরিপানার দলের মত পাক খেতে লাগলো। তারপর রাগ হয়ে গেল। মিশ্র রাগ যেমন হয়! তারপর ছলাৎছল।

ছাদ। ছাদই থাকে। নিরাশ্রয়, যেভাবে লোভীর মত দৃকপাতহীন তাকিয়ে। ঠিক ততটাও নয়। তবু আশ্রয়! যারপর অনেকগুলো ধোঁয়া ওঠা চিমনি। তারে তার মিশছে। পাখি দুলছে। সকাল ন'টার ভোঁ। নাইন এ এম। আর একটা ফণিমণসা। কাঁটা তাই এককোণেই। হেলেই, কিন্তু কাঁটাতো। এরপর রেল লাইন মিশছে লাইনে, দূরে কোথাও হুস...অনির্দিষ্ট! মল্লিকা এখানে বসতো। ওই যে আলসে। তার নীচে খানিকটা উঁচু মত। পা ছড়িয়ে। বাইরে বৃষ্টি এলে, শ্রাবণ। মৃতদেহ বা সাদা ফুল! যেমন সুগন্ধ। কমলা শাড়ি ঝুলছে দড়িতে, পাশে লাল সায়া। অন্তর্বাসের রঙ কালো। কালো কোনো রঙ নয়। ছিলও না। অন্তর্বাস - বর্ণহীন। রাত গভীর হলে মেলামেশা তুমুল যখন, অন্তর্বাসহীন সে সময়গুলো আসলে ছিল উপাসনাগৃহ। দাঁতের পাশে ঠোঁট। ঘাড়ের পাশে দ্রুত নিঃশ্বাস! সুগন্ধের যেভাবে জন্ম হয়! কনফেশন বক্সের সামনে রাখা থাকছে বীর্য, ফলিত ডিম্বাণু। ঘন্টা পড়ছে। চার্চ বেল। ঘন্টা পড়ছে। চেলো হাতে মধ্যযাম তখন সুরের মুর্ছনায় আঁকছে বাইরের নিঃশব্দ পথ। ঘন্টা পড়ছে। কিছু আগেও হুসহাস গাড়ি চলছিলো। তখন নিঝুম। হয়ত পুণ্য শুক্রবার। যে নেই সে জেগে উঠবে ফের। যে নেই সে জেগে ওঠে ফের?

বেহাগ রাগের মত আকাশের নীচে জ্যোতির্বিদ হওয়ার পুরনো ইচ্ছেগুলো ফিরে আসে, একটু উচ্চতায় আসলে। যদিও এ কোনো পাহাড় নয়। নিতান্তই ছাদ। ছাদ পার হলেই রাতের আকাশ। রাত অথবা আকাশ! তিনি রাতের তারা গুণছেন। তারাদের দিকে অনুসরণ করে খুঁজছেন উল্কাপাত। মল্লিকার চলে যাওয়া হয়ত কোনো ভুল নক্ষত্রপথে। তবু গ্যালাক্সি! মিল্কি ওয়ে! ভাঙা চিলেকোঠার পাশে আজও হেলে ফণিমণসা! ভেতরে শুকনো খটখটে। তবু প্রাণ আজও। হয়ত কাঁটাময়! যেমন আকাশ। বাতাস বইছে দ্রুত। আকাশের ক্ষত । যেখান দিয়ে ঢুকে পড়ছে অতিবেগুনি রশ্মি, সেদিকেই পাঠালেন ইঙ্গিত। বাতাসকে তিনি ইঙ্গিতই ভাবতেন। তার গতিপথ পালটে ক্ষতের দিকে পাঠালেন। আসলে বার্তা প্রেরণ। যারপর সর্বনাশ বা কবিতা! মাথার কাঁটা পড়েছিল ড্রেসিং টেবিলে। চুলের ফিতে। আর লাভ লিপস্টিক কেমন শ্যাবি! আলো যে পথে চলে যায়! যে কোনো পতনের গায়ে প্রজাপতি উড়ে এসে বসলে, যেমন নির্মাণ হয় নষ্ট দাম্পত্য! এ অনেকটা তেমন কিছু। হয়ত নয়। ক্ষত থেকে চুঁইয়ে পড়ত সে সব ছাদময় দিনে দুধ বা অমৃত। আজ উল্কা পতন। ওই যে প্রেরিত বার্তা বা বাতাসের সাথে ঘর্ষণ! আর রক্তপাত! এখানে ছাদ ছিলো। আছেই হয়ত! নিয়ত পরিবর্তন অথবা জ্যামিতিক শূন্যতায় আঁকা ছাদ থেকে আপাতত আলো বিনিময় হচ্ছে। ইশারায় যেভাবে গড়ে উঠেছিল অ-সুখ বা প্রেম!

উঠোন তো উঠোন। রূপকথার গল্পের মত সহজ। জাতকের মত গাঢ় অথচ রঙিন! লতাগুল্মময় আড়াল ভৈরবী। রাতুল আসা আর যাওয়ার মাঝেই স্বাভাবিক ভাস্কর্যের মত সে বিছিয়ে নিয়েছে চর। সাইকেল চলছে। পাশে হাঁস প্যাঁক প্যাঁক। মার্বেল গুলিগুলো ডাকছে আয় আয়। ওই যে কোণে খড়কুটো দিয়ে বানানো ঘর। সেখানে ভুলু থাকত। নেড়ি,কিন্তু রাতুলের সাথে দুধ ভাত খেয়ে কি নধর! কুঁই কুঁই করে পায়ে পায়ে ঘুরত। ভাদ্র মাসে এত বৃষ্টি হবে কে ভেবেছিল! তারপর জলে ভাসলো সব। রাতুল ভাসালো নৌকা। বাবাকে ডাকছে। মাকে। রাতুল ভাসলো। সাথে ভুলু। দাদুকে ডাকছে দাদাইইইইই...উঠলো হারমোনিয়াম আর সন্ধ্যা রাগ, ফণিমণসা রাগ বেহাগ। রাতুলের পিঠে রুকস্যাক। নিরুদ্দেশের পথে এ যাত্রা আদতে শুভঙ্করী অথবা কে সি নাগের মত পরিপাটি হয়েও ঝাপ্সা। তিনি উঠোন খুঁজতে এসে নেমে পড়েছেন মাটির নীচে, গুঁড়ি মেরে পেরিয়ে চলেছেন ধোঁয়াশা ঘেরা পথ! না'কি ভোরের আলো আসার আগের মুহূর্ত? একটা কুমুদিনী সকালে বেরিয়ে বিনোদিনী হাট মাঠ ঘুরে সমুদ্র উপকূল বরাবর তিনি আদতে হাঁটছিলেন একা। একার যেমন আগে পিছে আগে বা পিছে কেবল লোনা জল আর সমুদ্র মন্থন! তিনি রাতুলললল বলে ডাকতে গেলেন, স্বর বের হল না। সমুদ্রের জল তখন মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। জলের নীচ থেকে শব্দ আর কি করে বেরুবে। তাই বুদবুদ। অথবা দীর্ঘশ্বাস। পুতুলগুলো বাম হাতে, আর ডান হাতে বালি। লোনা বালি। মুঠো বন্ধ করলেও যা ঝরে যায়, সময়!

উপদ্রুত এতদ অঞ্চলে কখনও ছিল হারমোনিয়াম, ঘর, ছাদ, উঠোন ও কুয়াশাময় কিছু ফ্রেম। ফ্রেম লেসনেস। দরজার জায়গায় দরজা ছিল না। জানলার জায়গায় জানলা। তিনির জায়গাতেও তিনি কখনোই ছিলেন না। কেবল ওই ফণিমনসাই। ব্যস। আপাতত শান্ত এই সমাধিক্ষেত্র জুড়ে সামুদ্রিক জলোচ্ছাস।

এ এক যুদ্ধ ফেরত সৈনিকের না-গল্প। যার জন্য কেবল ঘন্টা বাজছে এই ভোরের স্তিমিত উদয় মুহূর্ত জুড়ে।