স্বয়ং

সত্যম ভট্টাচার্য

মাঝে মাঝে কোনোদিন বিকেলে এখন এরকম হয়।সারা আকাশ জুড়ে মেঘের চাদর যেন ভারী হয়ে আসে।মনে হয় যে কোনো সময় তা ভেঙে গিয়ে রাশি রাশি বারিধারা নেমে এসে এক্কেবারে ঝুপুস ভিজিয়ে দেবে সকলকে।আগের রাত থেকে টানা বৃষ্টি হয়েছে হয়তো।উথাল পাথাল নদীর জলও সেই মেঘের নীচে কালো হয়ে আসে তখন।উপরে কালো আকাশ আর নীচে কালো নদীর জল,আলো কমে গিয়ে তখন চারিদিকটাকে অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়।মনে হয় এযেন আমাদের প্রতিদিনের দেখা পৃথিবী না,নদী না,দুনিয়া না।এ যেন অন্য কোনো দেশ।নীচু হয়ে নেমে আসা কালো আকাশ,উথাল পাথাল নদীর জলের শব্দ,ঘোলা মেটে রঙের জল,অন্ধকার অন্ধকার ভাব-সব মিলে নিজেকে বা মানুষকে খুব ছোট মনে হয় সেখানে।
সেরকমই এক বিকেলে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে বাসে একটা অদ্ভূত ঘটনা ঘটে গেলো।যদিও অনেকের কাছে এটা সাধারণ ঘটনাই মনে হবে শুনলে পরে,আমার কাছে একটু অন্যরকম।জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখছিলাম তখন।একটা নদী পেরুচ্ছি।ততক্ষণে মুষলধারায় বৃষ্টি নেমে গেছে।ভাড়া মিটিয়ে দেবার পর দেখলাম বাসের খোলা দরজা দিয়ে জল এসে একেবারে ভিজে যাচ্ছি।প্রথমে যে শুধু চোখ মুখ ভেজাচ্ছিলো সে যখন জামা কাপড়ও ভেজানো শুরু করলো,অগত্যা সিট পালটানোর কথা ভাবতেই হোলো।বাসটাও ফাঁকাই ছিলো।জায়গা বদলে সামনে চলে এলাম।এবারে ঘাড়টা ঘুরিয়ে যখন নিজের ফেলে আসা জায়গাটাকে দেখতে গেলাম,দেখি আমার আগের সিটের উল্টোদিকেই বসে থাকা অল্পবয়সী শাড়ি পরা একটি মেয়ে আমার বসে থাকা সিট থেকে একটা পাঁচ টাকার কয়েন তুলে অল্প হেসে আমার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে।যেন অভিভূত হয়ে গেলাম।মেয়েটিকে আমি আগেই দেখেছি,মানে বাসে উঠেই দেখেছি,কয়েকবার দেখেছি,আর এটাই আমার অভ্যেস।মেয়েটি খুব সুন্দরী নয়।আবার দেখতে খারাপ বা বাজে তো নয়ই।ঠোঁটে গালে রঙ ঘষা নেই।একটি হাত নিরাভরণ।আর একটি হাতে ঘড়ি।কোলে একটি কাঁধে নেবার ব্যাগ নিয়ে সে বসে ছিলো।বয়স কুঁড়ি থেকে পঁচিশের মধ্যে।মাথার চুল বিনুনি করে বাঁধা।মাঝখানে সিঁথি।কপালে টিপ নেই।ছিপছিপে, তন্বী,ফর্সা নয়।মেয়েটির মধ্যে একটি স্বর্গীয় পবিত্রতা টাইপের ব্যাপার আছে বলে আমার মনে হোলো।
সেইরকমের একটি মেয়ে যখন আমার হাতে আমার ফেলে আসা টাকা নিজে থেকে এসে তুলে দিয়ে গেলো আমার যেন কিরকম একটা মনে হোতে লাগলো।হয়তো মনে হবার তেমন কিছুই নেই ,কিন্তু আমার মনে হতে লাগলো।বাইরে মুষলধারায় বৃষ্টি হতে থাকা মেঘলা দিনকে ভুলে গিয়ে আমি দেখলাম গ্রীষ্মকালের সুনেহরা রোদে কাশ্মীরের কোন এক উপত্যকায় চিরাচরিত কাশ্মীরী পোশাক পরা একটি মেয়ে যেন আমার হাতে ছোট্ট নরম তুলতুলে একটা ভেড়ার বাচ্চা তুলে দিয়ে বলছে-বাবুজি ফোটো খিঁচ লো।আর সেই উপত্যকার নরম সবুজ ঢালে যেখানে দূরে দূরে পাইন গাছ,আরো দূরে মাথায় বরফ নিয়ে কবে থেকে বসে থাকা সুউচ্চ পীরপঞ্জাল পর্বতশ্রেণী-কমে আসা দিনের আলো-সব কিছুই যেন কিশোরীটির অংশ হয়ে ওঠে তখন।এখানেও এই বাসের মধ্যের মেয়েটিকেও আমার খানিকক্ষণের জন্য সেরকমই মনে হোলো।ও যেন বাইরের এই দুর্মর আর দুর্দান্ত প্রকৃতির দেবী।শান্ত-স্থীতধী-স্ চ্ছ-নির্মল।
ইতিমধ্যে মেয়েটি ওর জায়গা ছেড়ে এসে গেটের সামনে বাস থেকে নেমে যাবে বলে দাঁড়িয়েছে।আমার কাছেই।আমি ওর গায়ের বা ওর গায়ে দেওয়া সুগন্ধীর খুব হাল্কা একটা গন্ধ পাচ্ছি।আমার খুব ইচ্ছে করছে যে মেয়েটির সাথে কথা বলি।কিন্তু জানি আমি তা বলে উঠতে পারবো না।মেয়েটি যদি ভাবে আদিখ্যেতা করছি,তাহলে ও কোনোদিন আর কাউকে এমন নির্মল মনে আর টাকা তুলে ফেরত দিতে পারবে না।হয়তো আর দেবেই না কোনোদিন।বাইরে বৃষ্টি এখন অনেকটাই কম।বাসটাও দাঁড়িয়ে গেছে।মেয়েটি ধীরে সুস্থে ছাতা জ্বালিয়ে নেমে চলে গেলো বাস থেকে।ওর চলে যাওয়াটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ,জানালা দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে।জানি ও আমাকে মনে রাখবে না।পাঁচটাকা ফেরত দেবার লোককে আবার মনে রাখার কি দরকার।কিন্তু আমি ওর মতো একটি দেবী প্রতিমাকে মনে রাখবো বহুদিন।হয়তো স্বচক্ষে দেখবো না।
আর অল্পদিন বাদেই পুজো।যেদিনগুলোতে রোদ ওঠে-রাস্তার ধারে,নদীর চরে,ধানক্ষেতের আলে-কাশফুল দোলা দেয় খুব।মাথা নাড়ায় বাতাসে।দূরে নীল আকাশে সাদা মেঘের তুলোর মতো দলাগুলি মাথা তুলে থাকে।সবুজ আদিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে তাকে ঢেউ খেলিয়ে চলে যায় দুর্দান্ত দামাল বাতাস।তারই উদযাপনে দেবী এসে এইমাত্র নামলেন।