নিতান্ত শূন্যতা নেই

ঈশানী বসাক

আমাদের আশেপাশে কাছের মানুষজন যখন বলেন আমাকে কেউ ভালবাসে না তখন আমরাও একবার ভাবি। এ কথাটা অনেকেই বলেন।আমরা আসলে রক্তের সম্পর্ক অথবা কাছের মানুষগুলোর কথা ভেবে একথা মনে করি। কিন্তু ভেবে দেখুন ছোট ছোট অজানা প্রেম গুটিগুটি লুকিয়ে থাকে বাড়ির বাইরে। সেগুলো সম্বল করে দেখা যায় ঝোলা নিতান্ত হালকা নয় একেবারেই।
সকালবেলা ফুল তুলতে গিয়ে দেখি উজাড় করে ছড়িয়ে শিউলি , চাঁপা, রক্তজবা। দু এক খানি নীলকন্ঠ যেন সাজির বাহার বাড়িয়ে দেয়। ফেরার পথে হঠাৎ কোনো এক বৃদ্ধ, অচেনা বটে, অভ্যেসবশত বললেন গুডমর্নিং। রোজ তার ওই গুডমর্নিং টুকু শুনতে পাওয়া একটা ভালবাসা। যেদিন শুনতে পাচ্ছিনা মনে হয় কী হল ওঁর ? শরীর খারাপ ? ছেলেমেয়েদের কাছে বুঝি। আসলে ওই একরত্তি বারান্দার গ্রিল থেকে ওঁর এইটুকু স্বাধীনতা। এইটুকু প্রেম আলাদা করে রাখেন যেন ঈশ্বরের প্রসাদ। হয়তো বা ভেবে নেন আজ হতে পঞ্চাশ বছর আগে এই বছর পঁচিশেক কে বলতাম নমস্কার মিস। বয়স মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেয় বড়ো। তার কাছে সবকটা দিন শেষ মনে হয়।
বাজারে বহুদিন ধরে যার কাছে শাক কিনি তার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। আমার নাম আছে তার কাছে। মনা আগের দিন নটে শাক নিছো। আজ সেচি দিলাম। খেয়ে দেকো। ভাল লাগবে। সবুজ শাক রক্ত হবে। খাও। এই যে বললেন কথাটা আপনারা বলবেন বিজ্ঞাপন, বিক্রির ট্যাকটিক্স। তা জানি। কিন্তু ওই যে মনে রেখেছেন আগের দিন নটে নিয়েছি। আজ অন্যকিছু খেলে মুখ বদলাবে। ওই যে মনা বলে ডাকলেন এই টুকুই। এটুকু ও একটা গাছ যেন। মাথার উপর বুলিয়ে দিচ্ছে তার ডাল।
যে কাকুটা সবজি দেয় তার কাছে সবজি কিনতে গেলেই আমাকে কখনোসখনো ফাউ ক্যাপসিকাম দেয় আর ফুলকপি। কাকু টাকা নেবে না ? না গো মণি এই যে এত চাউ , পাস্তা খাও লাগবে। আমার মেয়েটা ও পোকা। আমার বড় অভ্যেস খারাপ। এইটুকু ভালবাসা আমার বাবা হয়ে ওঠায় আমার আর ঘুরে ঘুরে বাজার করা হয় না।
মাছ কিনতে গিয়ে মাছ ওয়ালা দেখি বলছে রিং করে মাছ কাট। দিদিমণি খেতে পারবে রিং করা পিসগুলো। ও দিদিমণি এ কটা আলাদা করলাম প্যাকেটে। তুমি তো আবার গাদা খাও না। মাংস কেনার সময় শুনছি সেই দাদাটা বলছে শাগরেদ কে , এই হাড় দিস না। খাবে না। ছোট মাংসের টুকরো দে। কে বলেছে এই তো ঝোলা ভারী হচ্ছে স্নেহের।
বাসে উঠে কন্ডাক্টর যখন বলে দিদিমণি দাঁড়াও বাস থামুক। এইটুকু ভরসা কে ভেবে নিতে ক্ষতি কী ? এ ও তো ছাতা।
ভরদুপুরে ছুটির দিনে কলিংবেল। কাকিমা বললেন বাড়িতে চিংড়ি করলাম কপি দিয়ে। তোর জন্য আনলাম। ভালবাসিস তুই। অথবা যেদিন পাশের বাড়ির আন্টি শুনলেন আমার আজ নিরামিষ আর খেতে হবে ডাল তরকারি খালি। কেমন করে বুঝলেন জানিনা যে আমি অত্যন্ত মাংশাসী পাপাচারী প্রাণী। হাজির ধোঁকা কিংবা পনীর। একুনি গরম খেয়ে নাও দিকি। তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে অপুকে সর্বজয়া খাওয়াচ্ছে যত্ন করে।" মা ওদের বাড়ি হালুয়ার ঘি দেওয়া"। মায়ের সম্বল নেই তবু ভালবেসে খেয়াল করে বানিয়েছেন। বিভূতিভূষণের লেখার একটা আলাদা মায়া আছে। তাঁর লেখা চরিত্ররা দেশ বিদেশ যায় না। তবু সেই ঝড়ের দুলুনি , বাঁশেদের পাশের জমিতে ঝুঁকে পড়া। অপুর , দেখ দিদি দুটো আম কত বড় দেখ। এই যে উনি জলজ্যান্ত চক্ষুদান করেছেন আমাদের। মনে হয় সার্থক জনম আমার।
পাড়ার চায়ের দোকানে জগন্নাথ কাকু চিনি ছাড়া চা করেন না সে লিকার হোক কিংবা দুধ। আমার চিনি ছাড়া কড়া লিকার চাই। ঠিক দোকানে ঢুকলে বানিয়ে দেন। অবলীলায় বসে থাকা ক্রেতাকে বলে আপনি সরে বসুন। আমার মেয়েটা বসবে। একি কম দাবী ?
গাড়ি চালানো শেখার সময় ট্রেনার যখন বলে এই যে চলতে শিখছো এক পা করে হামাগুড়ি দিয়ে তাই তা দেখে ভাললাগে। চাকার চলাও একটা শুরু। গাড়িটা যখন এগোয় আমার মনে হয় স্টিয়ারিংটা বলছে , যাবো এবার ? তুমি আমাকে ধাক্কা দিও না কিন্তু।
আর যখন সকাল থেকে মন খারাপ থাকে , মনে হয় আমি যেন বড় অবুঝ। কখন যেন মনে হয় আমি ভুল । ছোট একটা বয়সের ডালে বসে ভাবি অভ্যেস বড় খারাপ। মানুষের কাছে অবুঝ হওয়া দোষের। ফুলের একঘেয়ে রঙে রাজকুমার বলে শুকনো ফুলের ইচ্ছেতে চিঁড়ে ভিজে না। সে তো খালি ঝরে গিয়ে ক্ষমা চায়। তখন সেই ফুলটা ও ভাবে, সাজিতে চলে গিয়ে সমাধি পাবো। মানুষের কবর আর পুড়ে যাবার থেকে ঢের ভালো এই ঈশ্বরের পা। আমরা আসলে ঘরের বাইরের এই যে লোকগুলো আমাদের চেনে তাদের দেখি না। দিনের শেষে তাই ফাঁকা ঝোলা হাওয়ায় দুলে ওঠে। আমাদের আর পুজোর ফুল দেখা হয় না।