অন্য বিসর্জন

দেবজিৎ অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়




পলিক্লিনিকের লম্বা,সরু, সবুজ চাদরের মোড়া বেডটাতে যে ছেলেটা শুইয়ে আছে- তার মা বাড়িতে ভাত নিয়ে অপেক্ষা করছে। আজও বাড়ি থেকে বেরানোর সময় বলেছিলেন,"তাড়াতাড়ি ফিরিস"। হয়তো,এখনও কোন খবর যায় নি,তাই তিনি শুধু অপেক্ষাই করছেন। পলিক্লিনিকের বাইরে দিয়ে একদল তাসা বাজাতে বাজাতে ফিরে আসছে৷ হালের গান বাজছে। যে লোকটা কোলের ওপর সিন্থেসাইজার রেখে,ভ্যানের ওপর বসে,দরদর করে ঘামতে ঘামতে বাজাচ্ছে- তাকে মাতাল মত একটা লোক এসে একশো টাকা দিয়ে গেলো। লোকটা এক হাতে বাজাতে বাজাতে বাঁ হাতে টাকাটা নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে বুক পকেটে রাখলো। তাসা চলে গেছে যখন খানিকটা দূর এগিয়ে গেছে,মধ্য ডাক্তার বাবু বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন,

- এখনও একটা অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করতে পারলে না?

ছেলেটাকে যারা এনেছিলো,তাদের মধ্যে একজন বল্লো,

- সব সালা মাল খেয়ে আউট...সব...এখানে কিছু করা যাবে না?

ডাক্তার বাবু না-সূচক মাথা নেড়ে বললেন,

- যা করার ছিল করে দিয়েছি...জ্ঞান এখনও আছে...এখনও হাসপাতালে নিয়ে গেলে বেঁচে যাবে...

ভিড়ের সবাই কাউকে না কাউকে ফোন করছে। নিজেদের মধ্যে গুজগুজ করছে। তাসা শুদ্ধু বিসর্জন সেরে ফেরা দলটা খানিক দূরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। গান বদলে যাচ্ছে ঘন ঘন। অনেকগুলো মানুষ কিলবিল করে নাচছে৷ দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে,এক থোক কেন্নোর বাচ্চা। ছেলেটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ডাক্তার বাবু দেখলেন, বুক টা হাল্কা উঠছে নামছে আর ঠোঁটের কষে একটা মাছি বসেছে। হাত দিয়ে মাছিটা উড়িয়ে দিয়ে, ভেতরে চলে যান।


মাতাল মত লোকটা এসে আবার সিন্থেসাইজার বাজানো লোকটাকে একশো টাকা দিয়ে গেলো। আবারও লোকটা একই ভাবে বাঁ হাতে নিয়ে,কপালে ঠেকিয়ে, বুক পকেটে টাকাটা রাখলো। এই নিয়ে তিনবার। লোকটার নেশা হয়ে গেছে।এরকম নেশা হয়ে যাওয়া লোক দু একটা থাকা ভালো। লোকটা গান পালটে অন্য গানে চলে যায়।


ছেলেটার মা, দরজায় শেকল তুলে, হাঁটতে হাঁটতে পাড়ার মোড়ের দিকে এসেছিলো একবার। প্যান্ডেলটা খাঁ খাঁ করছে। ফিরে এসেছে কিনা সবাই বোঝাও যাচ্ছে না৷ পাড়াটা কেমন শান্ত৷ একটু আগে অব্ধিও, কত আওয়াজ ছিল। ছেলেটাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছিলো,অথচ ছেলেটা এখনও ফিরলো না। কোথায় পড়ে আছে কে জানে...।ছাইপাঁশ গিলবে বাপের মত। তারপর কোথাও পড়ে থাকবে সারারাত। ছেলেটার মা বাড়ি ফিরে, শেকল খুলে, বারান্দায় বসে থাকেন। পাড়াটা খুব চুপচাপ যেন অন্যদিনের তুলনায়। মনটা কেমন মুচড়ে ওঠে৷ ছেলেটা এখনও বাড়ি ফিরলো না...

ঘাটের সিঁড়ির ডান দিকের গর্তটা জানা ছিল না কারোরই। আগে যারা ভাসিয়ে গেলো, বোসপাড়া, ওরাও কিছু বলে নি। আলোও কম। ভ্যান থেকে যতটা আলো আসছে,ওইটুকুই। ছেলেটা সিংহের দিকে ছিল। তার ঘেমে যাওয়া মুখের সামনে সিংহের হাঁ। মাথাটা একবার ঘুরে ওঠে। পা'টা হাল্কা নড়ে যায়। আবার ঠিকও হয়ে যায়। তারপর ওই গর্তে যখন পা'টা ঢুকে গেলো ছেলেটার,তখন টাল সামলাতে না পেরে, সিংহ সমেত পুরো চালার নিচে চাপা পড়ে যায় ৷ কেউ খেয়ালও করে নি তখন।


তাসা পার্টি বসে আছে বোসপাড়ার মুখে যে বটগাছটা আছে,তার গোড়ায়।ভিড়ের বাকি সবাই বাড়ি চলে গেছে।পুজো কমিটির লোক তাদের টাকাও মিটিয়ে দিয়েছে। দলটার কেউ বিড়ি খাচ্ছে,কেউ গাঁজা, কেউ মদ। ঘন্টা তিন টান বাজাতে হয়। হায় বলে আর কিছু থাকে না।

সিন্থেসাইজার বাজানো লোকটা পকেট থেকে টাকাগুলো বাড় করে গোনে। ১২৫০ টাকা। একবার সাড়ে তিনহাজার টাকা পেয়েছিলো। তাও অনেক বছর আগে। তখন সবে সবে এই লাইনে এসেছে। মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার একবছর বাদে। আগের দলের লোকরা বলত,তার হাতে জাদু আছে। তারপর একদিন ঝামেলা। দল ছাড়লো। এই দলটা লোকটার নিজের।


আড়াইশো টাকা একটা পনেরো ষোলো বছরের বাচ্চা মত ছেলের হাতে দিয়ে বল্লো,

- ওই দোকান থেকে দুটো বড় ঠান্ডা আর এক প্যাকেট ভালো সিগারেট নিয়ে আয় তো


এতক্ষণে একটা ভ্যান পাওয়া গেছে। ছেলেটাকে ভ্যানের ওপর তোলা হয়েছে। দেখলে মনে হচ্ছে,মরে গেছে কিন্তু বুকটা তখনও ধুক পুক করছে। জ্ঞান নেই যদিও। ভ্যানটা বোসপুকুরের মোড় পেরোচ্ছে,দলটাকে কাটিয়ে। ডাক্তার বাবু বলেছেন,দেখো কি হয়।

লোকটা সিগারেট ধরিয়ে বসে। হাতে একটা কাপড় ধরে,যেটা দিয়ে একটু আগে সিন্থেসাইজারটাকে পরিষ্কার করছিলো। বাচ্চা মত ছেলেটা লোকটার সামনে সিগারেট খায় না। আজ খাচ্ছে। লোকটা অন্যদিকে তাকিয়ে। দেখেও দেখছে না যেন৷ বাচ্চা ছেলেটা বলে ওঠে,

- মাল খেয়ে আউট৷ ভ্যানে করে বাড়ি দিয়ে আসছে।

- সিরিয়াস কেস

- আউট কেস নয় বলছো?

- রক্ত দেখলি না?

- তাহলে ক্যালাকেলি

- না৷ আরো সিরিয়াস। বাঁচবে কিনা সন্দেহ। বুঝলি? আর ক্যালাকেলি কী? মারপিট বলতে পারিস না?

- তুমি দেখেই বুঝতে পারো?

- কি জানি...মনে হয়...মনে হওয়া লেগে যায়...

-সব বার?

- হ্যাঁ

- তুমি কিন্তু ডেঞ্জার...

লোকটা ব্যাগে সিন্থেসাইজার টা ঢুকিয়ে, সিগারেটের শেষ কটা টান মেরে উঠে দাঁড়িয়ে বল্লো,

- বাড়ি যাই। তুইও যা। থাকলে তো ওদের সঙ্গে গাঁজা মদ খাবি। এবার যন্ত্রটা বাজানো শিখে নে। কবে আছি,কবে নেই। বাজাতে জানলে,এই লাইনে টাকা আছে।

ছেলেটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে বল্লো,

- আমি ডাক্তার হবো। নাহলে দালাল। ডাক্তার আর দালালদের অনেক টাকা হয়। যন্ত্র বাজানোর থেকে অনেক বেশি।

লোকটা কিছুই না বলে কয়েকপা এগিয়ে গিয়ে,তারপর "শোন" বলে ছেলেটাকে ডেকে, বুক পকেট থেকে পাঁচশো টাকা বার করে হাতে দিয়ে বলে,

- মা'কে দিয়ে দিস। এই টাকায় মদ খেলে কাল খাল খিঁচে নেবো কিন্তু।

বাচ্চা মত ছেলেটা হাতে টাকাটা নিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞাসা করে,

-তুমি বাড়ি ফিরবে না বাবা?

লোকটা খানিক চুপ করে থেকে বলে,

- ছেলেটা বাঁঁচবে না,বুঝলি তো। যা,বাড়ি তে মা অপেক্ষা করছে। বাড়ি যা।

একটা ভ্যান,একটা ধুকপুকে প্রাণ নিয়ে তখন বোসপাড়া ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে গেছে৷ হাসপাতাল অব্ধি আরো অনেকটা। ছেলেটা মা এখনও বারান্দাতেই বসে। বার বার মনটা কু ডাকছে। তাসায় বাজানো লোকটা,আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে, কাঁধে সিন্থেসাইজারের ব্যাগটা ঝুলিয়ে চলে যাচ্ছে কোথাও। এক,সেই বাচ্চামত ছেলেটা, মুঠোতে পাঁচশো টাকা ধরে, ছুট লাগালো বাড়ির দিকে।