নিহতস্বপ্নের শেষে

সাদিয়া সুলতানা

১.
-ও কীরে! এ কী কাণ্ড! নতুন দেয়ালের ধারে অশ্বত্থের চারা পুঁতেছিস কেনরে? ও গাছ তো শত্তুর! দেয়ালের ধারে কখনো কি এসব গাছকে লাই দিতে আছে? কদিন আগে গাছ গাছ করে কী কাণ্ড হলো দেখলি না?
-শত্রুর কী আছে মা? আমার পছন্দ। আমি লাগাবো।

কোথা থেকে উড়ে আসা এক ফালি আলো আজানের মুখে পড়ে ওর মুখটিকে ঝলমলে করে তোলে। চোখের পলক পড়তে না পড়তে সে আলো মিলিয়ে যায়। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সুরভির বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। দরদমাখা গলায় সুরভি বলে,
-এসব গাছ কী এমন করে বাড়ির সীমানার ধারে পুঁততে আছে! বড় হয়ে গাছ তো দেয়াল উপড়ে ফেলবে। অশ্বত্থ গাছ ধাই ধাই করে শিকড় ছড়ায়। সেই শিকড়ের বেড় দেয়াল ধসিয়ে দেয়। পাতে খেয়ে পাতে অনিষ্ট করার মতো। তুলে ফেল বাপ। শিকড় গজাবার আগেই।
-না। ছড়াক শিকড়। দেয়াল ফেলে দিক। তখন খুব ভালো হবে। দেয়াল পড়ে গেলে আমি শ্যামার সাথে খেলতে পারবো।
-শ্যামার সাথে তখন তোর খেলার বয়স বসে থাকবে? গাছের সাথে সাথে তুইও তো তরতর করে বাড়বি। তখন আর শ্যামার সাথে বৌ ছি, টুক পলান্তি আর ছি কুত কুত খেলা চলবে তোর?
সুরভি ছেলের ছেলেমানুষিতে হাসে। সেই হাসিতে প্রশ্রয় খেলা করে। মায়ের দিকে না তাকিয়ে তেরো বছর বয়সী আজান গম্ভীর মুখে সদ্য রোপণকৃত গাছে পানি দেয়।
-খুব চলবে। আমরা তখন নতুন খেলা বানাবো।
-তোর যতো কাণ্ড! এ গাছ কী টিকবে! এখনো এদিকের ইট গাঁথা বাকি, কাল সকালেই মিস্তিরিরা পায়ের নিচে ও গাছ মাড়িয়ে দেবে।
সুরভি হাসে। আজানের মুখটি ক্ষণিকের জন্য মলিন ও ফ্যাকাশে মনে হওয়ায় ওর সম্বিত ফেরে। ছেলের আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা দেবার মতো কথাটা বলা তার মোটেও উচিত হয়নি।
-বেশ গাছ লাগাবি তো সদর গেটের বাইরে লাগা। এই পাশের দেয়াল তো কাঁচা। এখনো প্লাস্টার হয়নি। মিস্তিরিরা আজ আসেনি, কাল আসলে ও আর থাকবে না।
-আমি থাকতে ওরা গাছে দিক তো এক পা, একেবারে ঠ্যাং ভেঙে দিবো না!

আজানের কচি কণ্ঠের জোর টের পেয়ে সুরভি আবার হাসে। ছেলেটা খুব পাগলাটে। এই সাতসকালে কোথা থেকে অশ্বত্থের চারা তুলে এনেছে। ওই কচি গাছের গোড়ায় এক মগ পানি দিয়েছে। ছেলেমানুষ জানে না, এ গাছ বিকেল হতেই নেতিয়ে যাবে। কিন্তু আজান আগের চেয়ে আরও বেশি মনোযোগ নিয়ে গাছের গোড়ায় মাটি সমান করে দিচ্ছে দেখে সুরভি আর কিছু বলে না। বলবে আর কী। এই এক মাস ধরে এই দেয়াল আর গাছ গাছ করে কিছু কী আর বলার বাকি রেখেছে দুই বাড়ির লোকজন। সুরভির বুক থেকে একটা নিবিড় শ্বাস বেরিয়ে আসে। এই কাঁচা দেয়াল কত পাকাপোক্ত সম্পর্কে যে দেয়াল তুলে দিয়েছে!
আজান মায়ের কাছে ছুটে আসে। ওর মুখ দেখে বোঝা যায়, সে কিছু একটা আবদার করবে মায়ের কাছে। তেরো বছরের আজান বয়সের তুলনায় হুট করে লম্বা হয়ে গেছে। কদিন হলো ওর গলার স্বরটাও ভাঙা ভাঙা লাগছে। সুরভি ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
-কিছু বলবি?
আজান চুপ করে থাকে। ওর পরনে ফ্লানেল কাপড়ের সাদা-নীল চেক ফুল শার্ট আর গেঞ্জি কাপড়ের পায়জামা। শার্টের হাতায় মাটি দেখে বিরক্তি নিয়ে সুরভি মাটি ঝাড়ে।
-মা আমি কি ও বাড়ি গিয়েও খেলতে পারবো না?
-আমি কি তোকে নিষেধ করেছি?
-পলাশ কাকা করলো যে! বললো আমরা কেউ যদি ওদের বাড়ির সীমানায় পা দিই তবে ওরা পুলিশ ডাকবে।
-তবে যাসনে।
-কিন্তু মা শ্যামাতো মন খারাপ করবে।
-করলে করুক। অত বকিসনে, যা এবার মাটিকাদা ধুয়ে আয়, ভাত দিয়েছি।
সুরভি অসহিষ্ণু হয়ে ভেতর বাড়িতে ঢুকে যায়। কাজের সময় এত যন্ত্রণা ভালো লাগে না তার।

২.
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। মেঘের ডাক নেই, বৃষ্টির শব্দ নেই। কিন্তু জানালার কাঁচের উল্টো পাশে বৃষ্টির ছাঁট লেগে ঘোলাটে হয়ে গেছে। ঝির ঝির বৃষ্টি কাঁচের ওপর নকশা আঁকিবুকি করছে। এই সামান্য দৃশ্যটা দেখে শ্যামার ছোট্ট হৃদপি-টা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। এইরকম বৃষ্টি বা কুয়াশা দিনে জানালার কাঁচে কতদিন ও আর আজান নিজেদের নাম লিখেছে। আর এখন! ও বাড়ির কারো নাম এ বাড়ির কেউ শুনতে পারে না। বড়রা কেন যে এমন করে শ্যামা ঠিক বুঝতে পারে না। ও বাবাকে এ কথা জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কেন তোমরা ছোটদের মতো ঝগড়া করো? আর আমাদের ঝগড়া তো ভাব নিলেই মিটে যায়, তোমাদেরটা মিটে না কেন?’ বাবা বলেছিল, ‘আগে বড় হ, তারপর বুঝবি; এ তো তোদের আড়ি-ভাবের ঝগড়া না।’ শ্যামাতো বড়ই হয়েছে। এইবার ক্লাস ফাইভে উঠবে। ও আজানের কাঁধ সমান। তবুও ও কেন এসব বুঝতে পারে না। ভাবনার তেপান্তরে ঘুরতে ঘুরতে শ্যামা একসময় ঘুমিয়ে যায়।

এ ঘুম বড় সুন্দর। এই ঘুমের সাথে মনোরম স্বপ্নের দেশে বেড়ানো যায়। যেখানে দেয়ালহীন তুষারশুভ্র মাঠ আর মাঠের ওপর সফেদ আকাশের প্রতিবিম্ব। সেই আকাশ এতই সুন্দর যে দেখলে মন চায় ডানা লাগিয়ে ও উড়াল উড়াল খেলে। কীভাবে আকাশে ওঠা যায় তা ভাবতে না ভাবতেই আকাশে ওঠার জন্য সবুজ পাতায় মোড়া মখমলের সিঁড়ি চোখে পড়ে। যেই সিঁড়ি বেয়ে ও আর আজান তরতর করে আকাশে উঠে যায়।

আজও শ্যামা আকাশের শরীরে পা রাখতেই সফেদ মেঘ গলিত মোমের মতো পায়ের নিচে এসে জমা হয়। এই মেঘের স্পর্শ যেন মায়ের বুকের ওম, আরামদায়ক। দেখতে দেখতে আকাশ মেঘহীন হলে একটা অর্ধচন্দ্রাকার রঙধনু আকাশের বুকে ভেসে ওঠে। তারপর খুশিতে নাচতে নাচতে শ্যামা আর আজান সেই রঙধনুতে বসে কত কী খেলা করে! এরপর একটা মিষ্টি ঝিরঝিরে বাতাস এলে ওদের দুটো হাত কুসুমরঙা ডানা হয়ে যায়। যে ডানায় ভর করে ওরা ক্লান্তিহীন উড়ে বেড়ায়। একসময় ঘুম ফুরিয়ে এলে স্বপ্নও ফুরিয়ে আসে।

আজও এমন অদ্ভুত স্বপ্নের শেষে শ্যামা ঘুম থেকে উঠে চুপচাপ শুয়েই রইল। ও বুঝতে পারছে না এখন ঠিক কটা বাজে। আবছা অন্ধকারে লেপের ভেতর থেকে মাথা বের করে মাকে ডাকতে গিয়ে ওর মনে পড়ে, মা ঘরে নেই। মা-বাবা দুজনেই বড় কাকার বাসায় গেছে। শ্যামার বড় কাকা ভুবন মিত্র এই শহরের একজন নামকরা উকিল। ভুবন মিত্রকে চেনে না তেমন মানুষ এই শহরে খুব কমই আছে। শ্যামার মনে পড়ে গতকাল রাতে বাবা ভাত খেতে বসে মাকে বলছিল, এবার ইকবাল চাচাও টের পাবে উকিল কী জিনিস, চাচার জুতোর শুকতলা ক্ষয় হয়ে যাবে কোর্টকাচারি করতে করতে। সামনের সপ্তাহে নিষেধাজ্ঞার আদেশ আনবে কোর্ট থেকে। ইকবাল চাচা কী করে দেয়ালের কাজ শেষ করে তা দেখে নেবে। বাবার এসব কথা শুনে বাবাকে ভীষণ অচেনা লাগছিল শ্যামার। ওর মনে হচ্ছিল বাবা সিনেমার ভিলেন। বাবার চিরচেনা মিষ্টি হাসিটাও বাবার ঠোঁট থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল। শ্যামার খুব মন খারাপ লাগে।

গতকাল থেকে ওর মন আরও বেশি খারাপ। বাবা অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলে ও গতকাল সকালে ঐ বাড়িতে উঁকি দিয়েছিল। ইকবাল চাচা দেয়ালের কাজ করাচ্ছেন। সেখান দিয়েই মাথা বের করে শ্যামা দেখেছে আজানদের উঠানের তুলসি ঝাঁড় উপড়ে দিয়েছে কেউ। শ্যামাই তুলসির বীজ দিয়েছিল আজানকে। সুরভি চাচী গাছটার কী যত্নই না করতেন! আজানের কদিন পর পরই সর্দি লাগে। ওর সর্দি কাশি হলে চাচী তুলসি পাতার রস মধুর সাথে মিলিয়ে আজানকে খেতে দিতেন। শ্যামাদের উঠানের মাঝখানে বেদির ওপর তুলসি গাছ আছে। মা এই তুলসি গাছের গোড়ায় সন্ধ্যা জল ও আরতি দেয়। এছাড়া মা রোজ গৃহদেবতার পূজোয় বা ভোগে তুলসি পাতা আর এর মঞ্জুরি ব্যবহার করে। শ্যামার মা বলে, সব বাড়িতেই তুলসি গাছ থাকা দরকার, এই গাছ বাড়িকে রোগশূন্য করে রাখে। তুলসি গাছকে অশ্রদ্ধা করলে ভীষণ পাপ হয়। শ্যামার ছোট বুকটা থরথর করে কেঁপে ওঠে। পাপ করলে মানুষের অনিষ্ট হয়। আজানদের কোনো অনিষ্ট হবে না তো!

এবার বৃষ্টির ঝুপঝাপ শব্দ টের পাওয়া যাচ্ছে। চোখের সামনে দপ করে বিকেলের শেষ আলোটুকু ফুরিয়ে এসেছে। বৃষ্টির আওয়াজে বোঝা যাচ্ছে, বাইরে জোরে হাওয়াও বইছে। এমন হঠাৎ করে বৃষ্টি নামলে শ্যামার ভীষণ রাগ হয়। বৃষ্টিবিকেলে বাইরে খেলতে যাওয়া হয় না। অবশ্য এমনিতেই কদিন ধরে ও বাইরে খেলতে যাচ্ছে না। ইকবাল চাচা দেয়ালের কাজ ধরার পর থেকে দুই বাড়ির মধ্যকার সংযোগ সড়কের মতো জেগে থাকা ভাঙা দেয়ালের ধারে যাবার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে।

শ্যামা এবার বিছানা থেকে ওঠে। মা তো বাড়িতে নেই। সন্ধ্যা-প্রদীপ কে জ্বালাবে! সন্ধ্যা চলে যাচ্ছে কিন্তু প্রদীপ জ্বলেনি দেখলে ঠাকুরদা রাগ করবে। শ্যামা ধীর পায়ে ঠাকুরদার ঘরের সামনে এসে পর্দার ফাঁক দিয়ে ভেতরে উঁকি দেয়, ঠাকুরদা জানালার ধারে বসে আছে। ওর ঠাকুরদা একটু রাগী ধরনের মানুষ। বছর দুয়েক আগে স্ট্রোক হওয়ার পর ঠাকুরদার ডান হাতটা অবশ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি নিজের ঘর থেকে খুব একটা বের হন না; বেশিরভাগ সময় এই জানালার ধারে চেয়ারে বসে থাকেন আর মাঝে মাঝে হুংকার দিয়ে ছেলে অথবা ছেলে বউকে ডাকেন আর শাপশাপান্ত করেন। শ্যামা ভয়ে ভয়ে বলে,
-দাদুভাই। কিছু খাবে? মা তোমার জন্য টেবিলে ফল কেটে রেখে গেছে।
শ্যামার ঠাকুরদা একবারের জন্যও পিছু ফিরে না তাকিয়ে প্রচ- বিরক্তি নিয়ে মাছি তাড়ানোর মতো বাম হাতটা শূন্যে ঝাঁকিয়ে বলেন,
-যা...যা...ভাগ, ভাগ।
ঠাকুরদার তাড়া খেয়ে শ্যামা এক ছুটে দৌড়ে গিয়ে আবার লেপের নিচে ঢুকে যায়।

৩.
এই বাড়িতে আজ দৈব দুর্বিপাকের মতো এক বিপর্যয় এসেছে। আজানের বাবা ইকবাল হাসানের কাছে আজ আদালত থেকে সমন এসেছে। হলুদ খামটা খুলতেই ঝাপসা লেখা এক গোছা কাগজ বেরিয়ে এসেছে যার শুরুতেই লেখা বাদী পলাশ মিত্র, বিবাদী ইকবাল হাসান। বিবাদীপক্ষের কেউ কোনোদিন ভাবেনি যে মিত্তির বাড়ির লোকেরা এমনি করে ওদের শত্রু হয়ে যাবে। যেই শত্রুর মুখ কোর্ট-কাচারি ছাড়া কেউ দেখবে না। এমনিতে খোলা চোখে দুই বাড়ির মধ্যকার বিরোধটা বেশ সরল। দুই বাড়ির মাঝখানের সীমানা প্রাচীরটা গেঁেথছিলেন পলাশ মিত্রের বাবা দীনেশ মিত্র। সেই সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে ইকবাল হাসানের মালিকানার আমগাছটাই যত বিপত্তি ডেকে এনেছে। প্রথম প্রথম গাছের কারণে দেয়ালে ফাটল ধরলে দুই বাড়ির কেউই কোনো গা করেনি।

দেখতে দেখতে একটা দুটো করে ইট খসে পড়তে পড়তে দেয়ালের বেশ খানিকটা ভেঙে গেলে দুই বাড়ির দুপুর-বিকেলের উঠানগল্পের দরজা হয়ে উঠেছিল এই ভাঙা দেয়ালটাই। সেখানে একটা বৃদ্ধ আমগাছ আকাশ হয়ে মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতো। একদিন ঝড়ের সাথে গাছটা কাত হতেই মিত্তির বাড়ির দেয়াল হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। পলাশ মিত্রের দাবীমতো ক্ষতিপূরণ করে দেয়াল তুলে দিতে ইকবাল হাসান কিছুতেই রাজি হলো না। বরং সে আমিন ডেকে এনে মাপজোক করে নিজেই আলাদা দেয়াল করতে শুরু করলো মিত্তির বাড়ির সীমানা ঘেঁষে। এই নিয়ে কথা কাটাকাটি থেকে মুখ না দেখা দেখির বিষয়টা এমনভাবে কোর্টে গড়াবে তা আশেপাশের দশবাড়ির কেউ ভাবেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাই হলো। ইকবাল হাসানের নামে আদালতের সমন এলো।

আজ ইকবাল হাসান দোকানে যায়নি। দোকানের একমাত্র কর্মচারি হারুনকে দোকান সামাল দিতে বলেছে। অবশ্য কদিন ধরে সে দোকানে সময় দেয় না। দেয়ালের কাজ তদারকি করতে তাকে বাড়িতেই থাকতে হচ্ছে। এখন কাজ শেষের দিকে। কিন্তু টানা তিন-চারদিন কাজের দেখাশুনা করায় আজ সকালে তার শরীরটা ভালো লাগছিল না। সকালে সুরভির তৈরি ভাপা পিঠে খেয়ে ইকবাল হাসান উঠানে পশ্চিম পাড়ে ছাতিম তলায় দাঁড়িয়ে ভাবছিল, এই সপ্তাহে দোকানে নতুন মাল আনা যাবে না। হাতটান চলছে।

বড় বাজারে বেশ বড় একটা বইয়ের দোকান ইকবালের। বাবার মালিকানাসূত্রে প্রাপ্ত দোকানটা বেশ পুরোনো হলেও এর নামে এখনো ‘নিউ বুক হাউজ।’ গল্প-উপন্যাসের বইয়ের চেয়ে স্কুল-কলেজের পাঠ্য বই আর গাইড বইয়ের বেশি চাহিদা থাকায় সেসব বই’ই বেশি রাখে সে। ডিসেম্বরের এই সময়টায় পাঠ্য বইয়ের চাহিদা থাকে না। তবু স্টেশনারি জিনিস ভালোই বিক্রি হয়। জানুয়ারিতে আবার দোকানের চাপ সামলানো মুশকিল হয়।

ইকবাল হাসান এসব সাত-সতেরো ভাবতে ভাবতে গতমাসের খরচের হিসেবটা মেলাবে বলে টালি খাতাটা বের করে উঠানে মাদুর পেতে বসেছে। মাঝখানে সুরভি এসে এক কাপ আদা চা দিয়ে গেছে। কৌতূহলী আজানও বাবার পাশে বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছে আর নানান প্রশ্ন করছে। শীতের এই সময় আজানের জন্যও তার মা আদা চা বরাদ্দ রাখে।
-বাবা, তুমি দোকানে গল্পের বই রাখো না কেন?
-ওসব আউট বই চলে কম।
-আউট বই কী বাবা?
-পাঠ্য বই ছাড়া বাকি সবই আউট বই।
-আমার আউট বই’ই বেশি ভালো লাগে। গত জন্মদিনে দিনা ফুপি রুশ রূপকথা বইটা দিয়েছিল না, সেটা আমি তিনবার পড়েছি।
-এক বই বার বার পড়তে ভালো লাগে তোর?
-পাঠ্য বই বার বার পড়তে ভালো লাগে না।
ছেলের কথা শুনে ইকবাল হাসান হাসে। বাবার মুখে হাসি দেখে আজান বাবার শরীর ঘেঁষে বসে আদুরে গলায় বলে,
-ও বাবা, এ বছর তোমার দোকানে জাফর ইকবালের বই রাখবে? আমার বন্ধুরা খোঁজ করে। আমিও নিবো কয়েকটা।
-দেখিরে, এই মাসে না হয় সামনের মাসে রাখবো।

শীতের রোদের ওমের উষ্ণতায় বাবা-ছেলে তাদের আলাপ সেরে নিচ্ছে দেখে সুরভি সুখী সুখী ছন্দে পা ফেলে বাপ-ছেলেকে এক বাটি সর্ষে তেল আর টমেটো মাখা মুড়ি দিয়ে যায়। দেখতে দেখতে বেলা বাড়ে। চোখ ঝলসানো হলুদরঙা রোদ উঠলে বাবা-ছেলে বাড়ির ভেতর চলে যায়। ওরা যেতে না যেতেই গেটের কাছে একজন রোগা লোক চিঠি হাতে হাঁক দেয়,
-কোর্টের সমন এসেছে...ইকবাল কে? ইকবাল হাসান?
কোর্টের কাগজ হাতে পেয়ে ইকবাল হাসানের খানিক আগের শান্ত সৌম্য মূর্তিটা ভেঙে যায়।
-এই জন্যই তো বলে, ওদের সাথে দোস্তি করতে নেই। এই দেখো, দেখো, কী করে বুকে ছোরা মারতে হয় তা ওরা জানে। শালা মালু...
সুরভি এসে স্বামীর মুখ চেপে না ধরলে তার মুখ দিয়ে কী কথা বের হতো তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। বাবার রাগ দেখে আজান ধীর পায়ে খাটে উঠে কম্বলের নিচে নিজের শরীর ঢুকিয়ে ফেলে। ওর ছোট বুকের তীরে আছড়ে পড়ে বিশাল একটা ঢেউ-কতদিন শ্যামার সাথে খেলে না ও, বোধহয় আর কোনোদিন খেলতেও পারবে না।

৪.
শ্যামা দেয়ালের পাশ দিয়ে মাথা বের করে ঐ বাড়ির দিকে তাকিয়ে আবার চট করে মাথাটা সরিয়ে ফেলে। যেন একটা শুশুক জলের ভেতর থেকে মাথা বের করে চকিতে জলে ডুব দেয়। দেয়াল তোলার কাজ এখন বন্ধ। কাজ এই পাশটাতে খুব বেশি এগোয়নি। তিন সারি ইট গাঁথা হয়েছে। শ্যামা চাইলেই নির্মাণাধীন এই দেয়াল টপকে ও বাড়িতে ঢুকতে পারে কিন্তু ওর সাহস হয় না। গতকাল ও শুনেছে বাবা-মা আলোচনা করছিল; ইকবাল চাচা এখন আর দেয়াল তুলতে পারবে না, শ্যামার বাবা নাকি কোর্ট থেকে নিষেধাজ্ঞার আদেশ পেয়েছে; মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাই কাজ বন্ধ থাকবে।

শ্যামা খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বাতাসে জলের বিলোড়ন তুলে ও আবার মাথা জাগিয়ে ঐ বাড়ির সদর দরোজায় চোখ রাখে, আজানকে দেখা যাচ্ছে না। আজ তো স্কুল বন্ধ। অবশ্য কদিন ধরেই তো আজান স্কুলে যাচ্ছে না। ওদের বাড়ির ঠিকে মাসি কাজল বলেছিল, বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গিয়ে আজানের নাকি হাত ভেঙে গেছে। দুদিন আগে খবরটা শোনার পর থেকে ওর বুকের ভেতরে তিরতির করে কাঁপছে। ও তো ঠিক জানতো, এমনই একটা অনিষ্ট হবে!

শ্যামা তাই গতকাল রাতেই ও বাড়ির জন্য একটা প্লাস্টিকের বোতল কেটে মাটি ভরে তাতে একটা তরতাজা তুলসি চারা তুলে রেখেছে। ভেবেছে আজানের সাথে দেখা হলেই বলবে, গাছটা ওদের উঠোনে পুঁতে দিতে আর এই গাছের কোনো অশ্রদ্ধা না করতে। শ্যামার বুক থেকে ওর বয়সের তুলনায় ভারি আর গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। ও ঘাড় কুঁজো করে মাটির দিকে তাকায়। ওর পায়ের কাছে সোনালু ফুলের পাঁপড়ি বিছানা পেতেছে। শ্যামাদের বাড়ির সৌন্দর্যটা এই গাছটাই শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ও এবার গাছটার গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়।

সোনালু গাছের সোনা রঙা ফুল ঝুমকোর মতো একে-অন্যের সাথে দোল খাচ্ছে। বাতাসের ছোঁয়া পেয়ে ফুলের হলদে পাঁপড়িগুলো সরসর করে ওর পায়ের কাছে ঝরে পড়ছে। আজানের খুব পছন্দ এই গাছটা। হঠাৎ শ্যামার মন ফুরফুরে হয়ে যায়। হাতের তুলসি চারাটা মাটিতে রেখে ফুলের পাঁপড়ি কুড়োতে থাকে; আজ আজানের সাথে দেখা হলে ওকে শ্যামা ওর প্রিয় ফুল দিবে। ফ্রকের কোচড় ভরে ফুল আর ফুলের পাঁপড়ি তুলে শ্যামা আবার দেয়ালের ধার দিয়ে ও বাড়িতে উঁকি দেয়।

সুরভি চাচী উঠোনে কাপড় মেলছে। শ্যামা এবার খুব আগ্রহ নিয়ে সুরভি চাচীর মুখের দিকে তাকায়। ভাবে একবার উঁচু গলায় ডাক দেয়, ‘ও চাচী, আজান কেমন আছে গো?’ ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ শ্যামার চোখে চাচীর চোখ পড়ে। শ্যামা মিষ্টি হেসে সুরভি চাচীর দিকে তাকায়; তক্ষুনি বিপরীতে এমনই একটা হাসি ফেরত পাবে সেই আশায়। কিন্তু ওকে দেখে সুরভির ভেতর কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। বরং মুখ গম্ভীর করে সামনে ঝোলানো সাদা শাড়িটা টান দিয়ে সুরভি ওর চোখের আড়ালে চলে যায়।

শ্যামা এবার ধীর পায়ে নির্মাণরত দেয়ালের পাশ থেকে সরে আসে। ওর লাল ফ্রকের কোচড় থেকে সোনালুর নিষ্প্রাণ পাঁপড়িগুলো ঝরে পড়ে। হঠাৎ একটা হাওয়ার ঝটকা এসে শ্যামার অবিন্যস্ত চুল আরও এলোমেলো করে দেয়। দূর থেকে এই দৃশ্যটা দেখলে অনায়াসেই যে কেউ কোনো স্বপ্নদৃশ্য বলে ভ্রমে পড়তো। যদিও তারা টের পেতো না, ঠিক এই মুহূর্তে ছোট্ট শ্যামার বুকের ভেতরে কতটা অপ্রাপ্তির অনুভব হু হু করছে। শ্যামার ঠোঁটের ভাঁজে কাঁপন দেখে মনে হয়, ও এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে। কিন্তু ও কাঁদে না।

নিহতস্বপ্নের শেষে ধুধু প্রান্তর পেরিয়ে ছুমন্তরযোগে যেমন মানুষ মর্ত্যে ফিরে আসে তেমনিভাবে শ্যামা বিচিত্র এক অনুভব সঙ্গে নিয়ে মাটির পৃথিবীতে একাকী হাঁটতে থাকে।

(রচনাকাল: ২০১৮)