অপাংক্তেয় সময়

স্মৃতি ভদ্র

ভোর রাতের সেই বিশ্রী স্বপ্নটা ছাড়া মাধুর আজকের দিনটা শুরু হয়েছে আর পাঁচটা দিনের মতই। বড় রাস্তার মোড়ের গীর্জাটায় ভোর ছ'টার বেল বেজে উঠতেই দুধওয়ালা এসেছে। দুই প্যাকেট দুধ বন্ধ দরজার ওপাশে রেখে কলিংবেল বাজিয়ে চল গেছে। এর কিছুপরেই কাগজওয়ালা দরজার নীচ দিয়ে কাগজ গড়িয়ে দিয়ে সাইকেলের রিং বাজালো দু'বার। কাগজের বিল দেবার সময় হলেই এরকম রিং শুনতে পায় মাধু। মাসের পয়লা কি আজ? মাধু লক্ষ্য করেছে ইদানিং ও দিন-তারিখ খুব একটা মনে রাখে না। বা রাখার প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র রান্নাঘরের কাজ ছাড়া অসীম মাধুকে আর কোন কাজে হাত বা মাথা গলাতে দেয় না। অসীমের একই কথা,

" এসব বুঝে কাজ নেই। আর বোঝাও তোমার কম্ম নয়।"

অসীম কিভাবে নিজের অভিজ্ঞতা বা বোধের ধার দিয়ে মাধুকে বুঝমান বানাবে। এত সময় কই অসীমের? পঁয়তাল্লিশ বছরের অসীমের দেখা জীবন বা অভিজ্ঞতার কাছে বাইশ বছরের মাধু তো রীতিমতো চুনোপুঁটি। বউকে বসে "অ, আ, ক, খ' শেখানোর সময় নেই অসীমের। বাজারের উপর "লোকনাথ শাড়িবিতান" এ তল্লাটের সবচেয়ে বড় দোকান। এই দোকানই অসীমের ধ্যান আর জ্ঞান। আর হবেই বা না কেন? বাবার সাথে দু'চারটি শাড়ির গাট নিয়ে সারাদিন হাটে বসে থেকে যার শৈশব কেটেছে তার কাছে দোকান তো ধ্যান-জ্ঞান হবেই। ওপার থেকে ঠিক কবে এপারে এসেছে তা মনে নেই অসীমের। তবে বাবার মুখে যতবার সাতবাড়িয়া পোদ্দার বাড়ির গল্প শুনেছে ততবার ইট সুরকির মোটা মোটা থামওয়ালা সাদা বাড়ি আর তাল-জামরুল গাছে ছাওয়া একটি পুকুরের আবছা ছবি চোখে ভেসে উঠেছে। তবে সে বাড়ির স্নিগ্ধ ছবি পুরোপুরি স্পষ্ট হবার আগেই টালির ঘরের তীব্র গরমের আঁচ টের পেতো অসীম। একসময় সেই আঁচটাকেই জীবন ভেবে অসীম ঠান্ডা ছায়াকে এড়িয়ে গেছে।

অসীমের মতো অবশ্য ঠান্ডা ছায়াকে এড়ানো শিখতে পারেনি মাধু। বরং তার উলটো। সব সময় সেই ছায়ার হাতছানি পায় মাধু। সেই ছায়াটুকুর আশ্রয়ে শরীর জুড়ানো যেন ওর আজন্মকালের চাওয়া। বাতাবিলেবু গাছের ছায়াটুকু যে ওর পিছুই ছাড়ে না। এ বাড়ির উঠোনের মাটি সিমেন্টের পরতে ঢাকা। মাধু তাই ছাদের উপর বড় ড্রামে কেনা মাটি ভরে একটি বাতাবিলেবু গাছ লাগিয়েছে। প্রতিদিন সকালে ছাদের কল ছেড়ে সেই বাতাবিলেবু গাছ ভেজানো মাধুর দিনের প্রথম কাজ। কিন্তু সেই বিশ্রী স্বপ্নটা মাথার মধ্যে এমনভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে যে মাধু আজ সকালে ছাদে গেলো না। নাইটি ছেড়ে ঢোলা একটি কাফতান গায়ে গলিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলো। শাশুড়ি থাকলে অবশ্য সকালে স্নান সেরে শাড়িই পড়ে মাধু। শাশুড়ি তাঁর মেয়ের বাড়িতে যাওয়াই মাধু বেশ স্বাধীনতা ভোগ করছে। সকালে তেমন কাজ থাকে না রান্নাঘরে। নরম ভাতে ঘি,আলুসেদ্ধ আর এক কাপ করে চা। খুব অল্প সময়েই কাজ শেষ হয়ে যাবার কথা। কিন্তু ভোররাতের সেই স্বপ্নটা মাথার মধ্যে রিনরিন করে বেজেই চলেছে। চা বানাতে গিয়ে দু'চামচ চা পাতার জায়গাতে তিন চামচ দিয়ে দিলো। নরম ভাতের জল শুকিয়ে দলা পেকে গেলো। অসীম এমনিতে খুব একটা রাগ-বাগ করে না। কিন্তু দলা পাকানো ভাত গজরাতে গজরাতে শেষ করে। অন্যদিন হলে দুপুরে নিজের জন্য এই দলা পাকানো ভাত বরাদ্দ করে আবার দু'মুঠো চাল বসিয়ে দিতো অসীমের জন্য। কিন্তু আজ মাথায় সে বুদ্ধি আসার জায়গাই পেলো না। স্বপ্নটা সেই থেকে জাল বিছিয়েই যাচ্ছে।

" কাগজের বিল রেখে দিলাম শো-কেসের উপর। দুইশ কুড়ি টাকা পঁচাত্তর পয়সা। দেবার আগে আরেকবার গুণে দিও।"

অসীম বলে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলো। ভাতের থালায় ঘি ঢেলে টেবিলে রেখে মাধু কাগজের বিলটা হাতে নিলো।

বসাক ব্রাদার্স
দৈনিক সমাচার.....২৮ কপি
মোট মুল্য ....... ২২০.৭৫ রুপি

নীচে পরিশোধ লিখে অসীমের স্বাক্ষর। তারও নীচে তারিখ।

১২-০২-২০১৮

১২-০২ ঠিক এই জায়গাতে চোখ আটকে গেলো মাধুর। পাড়ার ছেলেগুলোর হুটোপুটি, গলির মুখের গাড়ির আওয়াজ একটু আগেও মাধুর কানে আসছিলো। কিন্তু এখন চারপাশে শুধু গুটিকয়েক শব্দের অনবরত হইচই ছাড়া বাকি সবকিছু আবছা।

" মালাউনের বাচ্চা, শালা হিন্দুর বাচ্চা, নেংটিগুলারে ধর"

তখনি যন্ত্রণা শুরু হলো মাধুর মাথায়। কুঁকড়ে যেতে লাগলো ও। সবকিছু ছত্রখান হয়ে যেতে লাগলো। চারপাশে শুধু হাহাকারের শব্দ। সবকিছু টুকরো টুকরো হয়ে যাবার শব্দ। শব্দগুলো মাধুকে ঠেলে ক্রমাগত অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে চায়। একটা দমকা হাওয়া এসে মাধুকে ফেলে দেয়। মাধু হিস্টিরিয়া রোগীদের মতো কাঁপতে শুরু করে। অসীম বাথরুম থেকে বেরিয়ে উদভ্রান্ত্রের মতো কাঁপতে থাকা মাধুকে দেখে ছুটে আসে। পাঁজাকোলা করে বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দেয়। মাধুর মাথায় হাত বুলিয়ে আরাম দেবার চেষ্টা করে।

" ভয় নেই মাধু, আমি আছি। শান্ত হও। চোখ খোলো, দেখো।"

মাধুর খুব কাছে গিয়ে বলে অসীম। এরকম সময়ে মাধুকে এভাবেই শান্ত করতে হয়। আস্তে আস্তে মাধু শান্ত হতে থাকে। একসময় কাঁপুনি বন্ধ হয়ে মাধু পোকায় খাওয়া লতার মতো নেতিয়ে পড়ে।

"কি হয়েছিল ? এখন তো কোন স্বপ্ন দেখো নি। তবুও এমন হলো!"

অসিমের কথার জবাবে ক্লিষ্টতা জড়ানো কন্ঠে মাধু বলে,

" কি যে হলো হঠাৎ করে? খুব ঠান্ডা হাওয়া এলো যেন কোথা থেকে?"

"থাক এগুলো নিয়ে আর চিন্তা করার কাম নেই। আপনিই ঠিক হয়ে যাবে।"

অসীম বললো বটে,তবে দিনে দিনে উপসর্গটাকে নিয়মিত হতে দেখে মনের মধ্যে একটা কাঁটা বিঁধতে লাগলো।

প্রায় রাতেই ঘুমের মধ্যে মাধু স্বপ্ন দেখে এমন করে। খুব অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখে মাধু।

একটা চিল তীক্ষ্ণ কন্ঠে চিৎকার করতে করতে মাধুকে তাড়া করে। মাধু ভয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বিরান এক ভুমির খালি ইঁদারার কাছে এসে দাঁড়ায়। আর তখনি সেই খালি ইঁদারার অতল থেকে ভেসে আসে " পালিয়ে যা, পালিয়ে যা"।

এ পর্যন্তই। এরপর মাধুর স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। নিজেকে পায় অসীমের বাহুতে। অসীম তখন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় বা ওকে সাহস যোগাতে থাকে। অসীম যতই সাহস দিক না কেন মনে মনে খুব বিব্রত আর অপ্রস্তুত হয় মাধু। প্রতিবার প্রার্থনা করে এই স্বপ্নটা যেন আর না দেখে।

বিয়ের পরপরই মাধুর কিন্তু এই উপসর্গটা দেখা দেয় নি। তখন দিনগুলো অন্যরকম ছিল। খাট, কাঠের আলমিরা, ড্রেসিংটেবিল সহ আরোও অল্পবিস্তর আসবাব দিয়ে গোছানো এই বাড়িকে নিজের সংসার হিসেবে ভাবতে খুব বেশী সময় লাগেনি মাধুর। রোদ মিইয়ে এ বাড়ির ছাদে যখন বিকেল নামতো তখন তা ভাগাভাগি করে নিতে অসীম না থাকলেও মাধুর খারাপ লাগতো না। কিন্তু সংসারের এসব আয়োজনের সাথে সাথে আরোও কিছু নিয়মের সুক্ষ্ম বীজ লুকানো থাকে। নিয়মিত যত্নে যা পত্র আর পুষ্পে সংসারের সৌরভ ছড়ায়। আর ঠিক সেই যত্নের জায়গাতেই মাধু খুব আড়ষ্ট। সেই আড়ষ্টতার চাই ভেঙে অসীম মাধুর কাছে আস্তে আস্তে যেতে লাগলো আর দেখা দিতে শুরু করলো এই উপসর্গ। দিন যত গেলো ততই এই উপসর্গ নিয়মিত হতে শুরু করলো।

এতদিন তা রাতের সীমানায় আবদ্ধ আর স্বপ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত ছিল। আজই প্রথম স্বপ্ন ছাড়া দেখা দিলো উপসর্গটা।
মাধু ধাতস্থ হবার পর অসীম দোকানে চলে গিয়েছে ঠিকই তবে যাবার আগে বেশ খুঁতখুঁত করছিলো।

" তোমার ঠিক কি হচ্ছে, কি ধরণের অসুবিধা বা কি অসুখ, আমাকে বলো। তোমাকে একা ঘরে এভাবে রেখে গিয়ে আমি খুব চিন্তায় থাকবো।"

কোন উত্তর ছিল না মাধুর কাছে। কিছু শব্দ ছাড়া আর কিছুই তো মনে নেই ওর। সে শব্দগুলোও খুব ভাসা ভাসা। মাধু প্রায় জোর করেই মনে আর দেহে শক্তি এনে অসীমকে দোকানে পাঠিয়ে দিয়েছে।

গলির মধ্যে বাচ্চাগুলোর হট্টগোল ফুরিয়ে গেছে। ঘড়িতে দশটা বেজে সতেরো। সকাল নয়'টার বেজে ওঠা গীর্জার বেল আজ মাধুর কান এড়িয়ে গেছে। মাধু জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির ডালিম গাছে চড়ুই পাখিদের আনন্দ দেখে। কিন্তু ওর মনে একটা রোদছায়া মাখা অস্থিরতা তির তির কাঁপছে। এক'পা দু'পা করে ছাদে বাতাবিলেবু গাছের কাছে যায় মাধু। আড়াই হাত লম্বা গাছের আর ছায়া কি? মাধু গাছটার পাশে বসে। আজকের তারিখ নিয়ে ভাবতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। আর ঠিক তখুনি ওর চারপাশ শব্দমুখর হয়ে ওঠে।

একটা ঘুঘু ডেকে ওঠে। শীতের বাতাসে শুকনো পাতার খসখস শব্দ। একটি কাঠবিড়ালি দৌঁড়ে বেয়ে ওঠে প্রকান্ড এক বাতাবিলেবুর গাছে। গাছটাতে সবে ফল এসেছে। কাঠবিড়ালিকে তাড়া করা কিছু বাচ্চার হৈ চৈ। বাতাবিলেবু গাছ লাগোয়া রান্নাঘরে কিছু নারীকন্ঠের সাথে কড়াই-খুন্তার শব্দ। একটি একান্নবর্তী বাড়ি। বড় উঠান। উঠানের একপাশে একটি বাঁধানো ইঁদারা। ইঁদারা ঘেঁষা বেড়ার গায়ে কিছু ভেজা কাপড় মেলা।

" মাধবী, আবার তুই গাছে উঠেছিস? নেমে আয়। পড়ে হাত-পা ভাঙবি।"

" আরে, খেলুক না বউ। আর কয়দিনই বা খেলবি। বড় হইয়া গেলো তো।"

" হু, সে তো খালি হাতেপায়েই বাড়ছে। বুদ্ধিতে তো না! নেমে আয় মাধবী।" মায়ের হাক শুনে গাছ থেকে নেমে ঠাকুমার গা ঘেঁষে বসে মাধবী।

মা ফিরে গেছে আবার উনুনের পাশে। একটু পরেই দোকানের কর্মচারীরা আসবে। নিজেরা খেয়ে বাবা-কাকাদের দুপুরের খাবার নিয়ে যায়।এলুমিনিয়ামের টিফিন বাটির সাথে কাঁসার হাতার ঠোকাঠুকির শব্দ ক্রমাগত বাড়ছে। মাধবীর পাশ দিয়ে একটি টিকটিকি নিঃশব্দে চলে গেলো। একটা অদ্ভুত হিল্লোল তুলে টিকটিকিটা কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে থামলো। পেতল রঙের চোখটা খুব চকচক করেছে টিকটিকির। একটা কাক কর্কশ শব্দে ডেকে উড়ে যেতেই টিকটিকি লুকিয়ে পড়লো ঠাকুমার ধুয়ে রাখা পূজার বাসনকোসনের স্তুপের মধ্যে।

সদর দরজা খোলার আওয়াজের সাথেই বাবা-কাকাদের হন্তদন্ত হেঁটে আসার আওয়াজ পাওয়া গেলো।

" রতন আইলি? অহন থ্যাইকা দুপুরে আইবি নাকি? আমি তো তোরে সেই কবে থ্যাইকাই কইছি দুপুরে তোরা আমার সামনে না খাইলে আমার প্যাট ভরে না।"

বাবা নিরুত্তর। মুখের ভাঁজে ভাঁজে চিন্তা আর ভয়ের চিহ্ন। মা উনুন ছেড়ে উঠোনে এসে দাঁড়ায়। বাবা খুব ফিসফিসিয়ে মাকে কিছু বলে। মায়ের ফর্সা মুখটা পেল হয়ে যায়। কাকারা রান্নাঘরের বারান্দায় বসে থাকে। অগ্রহায়ণের দিন। মিইয়ে পড়া রোদে বাতাসের হিম মিশিয়ে বেলা পড়ে আসে। বাবা সেই থেকে ঠাকুমার ঘরের বারান্দায় ঠায় বসে আছে। রাত নেমে এলো। বাতাবিলেবু গাছের মাথায় চাঁদ ঝুলে আছে। ছোট কাকা রেডিওতে চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একবার বিবিসি আরেকবার ভয়েস অফ আমেরিকা ধরছে। খবর শুরু হলো। গমগমে কন্ঠ ভেসে আসলো রেডিও থেকে।

" শুভেচ্ছা। শুরু করছি আজকের সংবাদ। আজকের প্রধান প্রধান খবর......আজ ভারতের অযোধ্যায় তিনশত বছরের অধিক পুরোনো ঐতিহ্যবাহী বাবরি মসজিদ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিয়েছে "কর সেবক" নামের একটি দল। আর এর সাথে সাথে ভারতসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয়েছে সাম্প্রদায়িক সংঘাত।"

" ও রতন কি কয়? আবার দাঙ্গা লাগলো? এবার কি সারাজীবনের লাইগ্যা দ্যাশ ছাইড়্যা যাইতে হইবো?"

ঠাকুমার হইচই-এ রেডিও'র সেই গমগমে আওয়াজ চাপা পড়ে যায়। বাবা এখনো সেই আগের মতোই নিরুত্তর। মা আর সব কাকিদের চোখে চিন্তা আর ভয়ের দাগ। রাত গভীর হয়। ঠাকুমার অনুরোধ আর ভয়ে একঘরে মাটিতে বিছানা পেতে নেয় সবাই। রান্নাঘরে আঢাকা রুইমাছের ঝোলে তখন সেই তামাটে চোখের টিকটিকিটা ডুবসাঁতার কাটছে।

ধবল চাঁদ বাতাবিলেবু গাছের পাতায় এখন আড়াল নিয়েছে। মাঝরাত তখনো আসে নি। অনেকগুলো পা শুকনো পাতা মারিয়ে উঠোনে এসে থামে।

" দরজা খোল। শালা নেংটির বাচ্চারা। বাইরে আয়।"

দুমদাম আওয়াজ। ঠাকুমা আঁকড়ে ধরে মাধবীকে।

" ক্যাডা রে? এত রাইতে বাঁদরামি করতে আইছোস। চেয়ারম্যান রে বিচার দিমু কইলাম।"

ঠাকুমা খুব চেঁচিয়ে বলে। কিন্তু গলা কেঁপে ওঠে।

দুমদাম আওয়াজ বেড়ে যায়।

" ওই মালাউনের জাত বাইরে আয়। ইঁদুরের মতো গর্তে ঢুকলি হক্কলে মিইল্যা" অজস্র কন্ঠে হাসির শব্দ।

উপায়হীন সবাইকে দেখে ঠাকুমা গিয়ে দরজা খুলে। পিছনে পিছনে বাবা আর কাকারা।

" এত রাইতে কি চাস তোরা? ওই তুই কেরামতের পোলা না? তোর বাপ এই বাড়ির খাইয়া বড় হইছে।"

" ওই বুড়ি থাম্। তোর জাতভায়েরা মুসলমান গো ধইরা ধইরা কাটতাছে ওই দ্যাশে। তোরা তো এখনো জিন্দা আছোস। তোগো এই দ্যাশে থাকার দিন ফুরাইছে।"

বাবা এগিয়ে যায়।

" কি চাও তোমরা?"

" সোনা-টাকা যা আছে বাইর কর্"

মেজো কাকা কিছু বলতে যায়। বাবা থামিয়ে দেয়।

চাদরে মুখ ঢেকে কয়েকটি লোক ঘরে ঢোকে। তলা ক্ষয়ে যাওয়া ধুলোমাখা জুতার দাগ পড়ে মাটিতে পাতা বিছানায়। ঠাকুমার একটা সাদা থানে কিছু টাকা কতক গয়না বেঁধে বেরিয়ে যাবার কালে মাধবীর দিকে তাকায় ওরা।

" এত অল্পে কি পোষাইতে পারবি তোরা? নাকি কিছু বাড়তি নিবি?"

কেরামতের ছেলে মাধবীর দিকে তাকিয়ে হাসে। খুব কদর্য সেই হাসি। মা এসে মাধবীর হাত টেনে পিছনে নেয়।

সে রাত শেষ হলো কিন্তু ফুরিয়ে গেলো না। ছোপ ছোপ অন্ধকার এই বাড়ি আর তার মানুষগুলোকে ঘিরে রইলো। বহুদিনের আপন মানুষগুলোর কাছে নিত্যদিন অপমানিত হয়ে বেঁচে থাকা ক্লান্তিকর হয়ে গেলো। মাধবী এদিনগুলোতে শুধু বাতাবিলেবু গাছের ঘন ডালের ছায়ায় বসে কাঠবিড়ালির খেলা দেখে।

অগ্রহায়ণের শেষ দিন। সন্ধ্যা থেকে শীতের জার বেড়েছে। ঠাকুমা ঘন্টা আর শাখবিহীন পূজায় বসেছে। উনুনে ভাতের হাড়িতে মা কয়েকটা আলু ফেলে দেয়। হঠাৎ কয়েকটি অচেনা পায়ের আওয়াজ। মা চকিত হয়। মাধবীকে হ্যাঁচকা টানে ইঁদারার পিছনে জমাট অন্ধকারে লুকিয়ে ফেলে।

উঠোনে শীতের শুকনো পাতায় স্যান্ডেলের ক্রমাগত ঘর্ষণের শব্দ প্রলম্বিত হলো। হিদুর বাচ্চা, নেংটির জাত, আমরা চইল্যা যামু ওপারে, মার শালা মালাউন গো, রতন রে আর মাইরো না--- অজস্র শব্দ রাতের পরতে পরতে জমা হয়।

ইঁদারার ওপাশে জমাট অন্ধকারে মাধবী। ওর গা বেয়ে উঠে আসে সেই তামাটে চোখের টিকটিকি। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিশ্রী হিল্লোল তুলে ঘুরে বেড়ায়। ঘাড় থেকে পেট এরপর লেজের ডগা অব্দি অবিরাম কদর্যতা। দেখে ঘৃণা হয় মাধবীর। ভয় হয়। শব্দহীন চিৎকার রাতের অন্ধকারে ভাসিয়ে দেয় মাধু।

" মাধু, এই মাধু, দেখো আমি আছি এখানে। ভয় নেই।"

ছাদের সেই ড্রামের বাতাবিলেবু গাছ ঘেঁষে পড়ে আছে হিস্টিরিয়া রুগীর মতো মাধু। অসীমের অভয়েও এখন পুরোপুরি ধাতস্থ হতে পারছে না।

উপসর্গের এই বারবার ফিরে আসায় বেশ চিন্তিত অসীম।

ছোপ ছোপ আঁধার জমছে এই দু'টো মানুষের মধ্যে।