অহনাকে আমি কিছু বলি নাই

মাহরীন ফেরদৌস



অহনা আর আমি আমরা দুই বান্ধবী পাশাপশি বাসায় থাকতাম। পাশাপাশি মানে একই বিল্ডিং এ না। অহনারা থাকত আমাদের পাশের বিল্ডিং এর তিনতলায়। আমরা থাকতাম একতলায়। মাঝে একটা ছোট্ট ফাঁকা মাঠের মত ছিল। সেখানে শীতকালে ছেলেপিলেরা ব্যাডমিন্টন খেলত। আমাদের বারান্দা ভর্তি ছিল গাছ আর গাছ। একপাশে ক্যাকটাস গাছেরা প্রেমিক-প্রেমিকার মত জড়াজড়ি করে থাকত তো অন্য পাশে তিন রকমের বাগান বিলাস বন্ধুদের মত আড্ডা দিত। মাঝে অহংকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত কিছু গোলাপ গাছ। দেশি আর বিদেশি দুই রকমের গোলাপ গাছ ছিল। বেশিরভাগ মানুষ গোলাপকে রঙ বিচার করেই নাম দেয়, যেমন লাল গোলাপ, সাদা গোলাপ, কিন্তু গোলাপের আসলেই জাত আছে। যেমন দেশি গোলাপের জাতের নাম হল পিয়ারী, ভাসানী, ফাতেমা ছাত্তার, শিবলী। বিদেশি গোলাপের নাম রানি এলিজাবেথ, ব্ল্যাক প্রিন্স, মিরিন্ডা, পাপা মিলা, জুলিয়াস রোজ এমন আর কি। গোলাপ নিয়ে এত কথা বললাম বলে কেউ ভেবে বসবেন না আমি মহা জ্ঞানী। আমার আম্মার বাগান বিষয়ক আর গোলাপ বিষয়ক আগ্রহের ছিটেফোঁটা আমি পেয়েছি বিধায় এটুকু জানি।

সে সময় প্রতিদিন সকালে ক্যাকটাস গাছের ঝোপে আমার জন্য একটা করে চিঠি থাকত। প্রেমপত্র ভাববেন না। এটা ছিল বন্ধুপত্র। অহনা ও আমি একে অন্যকে রোজ রোজ চিঠি লিখতাম। বুদ্ধিটা আসলে ওর মাথাতেই এসেছিল। সে সময় মোবাইল আর ফেসবুকের যুগ শুরু হয় নাই। কর্ডলেস ল্যান্ড ফোন যাদের বাসায় থাকতো আমরা তাদের কে বড়লোক মনে করতাম। কারও নিজেদের একটা গাড়ি থাকলেই তাকে ভাবতাম বিরাট ব্যবসায়ী। মোটকথা বয়সের সাথে সাথে জীবন নিয়ে হিসাব নিকাশও কম ছিল। তাই প্রতিদিন বান্ধবীর কাছ থেকে চিঠি পাওয়া কিংবা তাকে চিঠি লেখা ছিল প্রচণ্ড রোমাঞ্চকর ঘটনা। আপনারা পড়তে পড়তে ভাবতে পারেন দুই বান্ধবীর চিঠি ক্যাকটাস গাছের ঝোপে লুকিয়ে রাখার কী কারণ? কারণ অবশ্যই ছিল, আমাদের এই বন্ধুপত্রের মাঝে হিমালয় সমান দুইটা বিশাল বাঁধা ছিল। সেই বাঁধা হল আমাদের আম্মাজানেরা। তাদের ছিল আমাদের লেখাপড়া, জামাকাপড়, খাওয়াদাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা। আর আমাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অবাধ আগ্রহ। যে বছরের কথা বলছি সেবার আমার চাচাতো বোন মিথিলা ঈদের ছুটিতে আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিল। তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে সামনের বাসার হিমেল ভাই একটা খুব সুন্দর চিঠি লিখেছিলেন। তারপর আমাকে ধরেছিলেন আমি যেন মিথিলা আপাকে সেই চিঠিটা দেই। আমি গাইগুঁই করে না করে দিয়েছিলাম। প্রেম-ট্রেম আমার অসহ্য লাগে। আর ছেলেরা শুধু ছেলেদের সাথেই টেবিল টেনিস, ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টন খেলবে, মেয়েরা মেয়েদের সাথেই কানামাছি, গানের কলি, চোর পুলিশ খেলবে এই নিয়মগুলোও আমার আরও বিরক্তকর লাগে। তাই হিমেল ভাই বয়সে বেশ বড় হবার পরেও আমি তাকে বলা যায় একদম মুখের উপরই না করে দিয়েছিলাম। কিন্তু দুই দিন পর তিনি যখন আমাকে সেরা সত্যজিৎ ও হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস সমগ্র উপহার দিয়ে বসলেন তখন আমি আসলেই মোমের মত গলে গেলাম। আমি যে খুব বইপোকা। এত দারুণ দুইটা বই আমি ফিরিয়ে দেই কিভাবে? উনারা দুজনেই আমার খুব প্রিয় লেখক। আমার কাছে উনাদের কোন সমগ্র নাই। সব চিকন চিকন বই। সমগ্রের লোভে আমি রাজি হয়ে গেলাম। মিথিলা আপু দিন তিনেকের জন্য তার এক আত্মীয়ের বাসায় থাকতে গিয়েছিল। সেখান থেকে আমাদের বাসায় আসবে, এরপর একদিন থেকেই আবার বাড়ি চলে যাবে। তাই মিথিলা আপু আসার আগ পর্যন্ত আমি হিমেল ভাইয়ের চিঠির জন্য নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে থাকলাম। আমার আম্মার কারণে বাসায় কোন জায়গাই আসলে আমার জন্য নিরাপদ না। তাই অনেক চিন্তা-ভাবনা করে এরপর বুঝলাম আমার স্কুল ব্যাগ হল সবচেয়ে নিরাপদ যায়গা। এই একটা জায়গাই আম্মাকে কখনও ধরতে দেখি নাই। স্কুল ব্যাগের ভেতরের পকেটে চিঠি লুকিয়ে ফেললাম। এদিকে অহনা সব ঘটনা শুনে সেই চিঠি পড়ার জন্য পাগল হয়ে গেল। আমি কঠিনভাবে না করে দিলাম। নিজেকে কিছু কিছু জায়গায় অতিরিক্ত রকমের সাধু সাজাতে আমার ভালো লাগত। সেই চিঠি পড়ার জন্য আমার মনও যে কম উসখুস করেছে তা না। কিন্তু তাই বলে অন্যের ব্যক্তিগত চিঠি পড়ে নিজের কাছে ছোট হবো না। সে জন্য অহনার উৎসাহে ঠান্ডা না রীতিমত বরফপানি ঢেলে দিলাম। দুই দিন ভালোয় ভালোয় কেটে গেলো। তৃতীয় দিন সকালে স্কুলে ছোটখাট একটা পরীক্ষা ছিল। রাত জেগে পড়ালেখা করে বেশ দেরিতে ঘুমিয়েছিলাম। ক্লান্তিতে বেশ গাঢ় ঘুমই এসেছিল। সকালবেলা ঘুম ভাঙল বিশাল এক ঝাঁকুনিতে। চোখ খুলে দেখলাম আম্মা আমাকে শক্ত হাতে ধরে ঝাঁকাচ্ছেন আর কী কী যেন বলে চেঁচাচ্ছেন। এক পলকের জন্য মনে হল আমার হাত-পা, চোখ-মুখ, গলা-পেট ইঞ্জিনের নাট-বল্টুর মত খুলে আসবে। ঝাঁকুনির চোটে প্রথমে অনেকক্ষণ আমার কানেই আসলো না উনি আসলে কী বলছেন। তারপর আস্তে আস্তে শুনতে শুরু করলাম। ঝাঁকুনির জন্য উনার কথা প্রতিধ্বনিত হয়ে যাচ্ছে। কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমি এমতাবস্তায় শুনতে পেলাম উনি বলে যাচ্ছেন,

‘আআআআআআ…জজজজ...কেকেকেক ে...তোতোতোতো…মেমেমেমে… রেরেরেই…ফেফেফেফে...ললল ল…বোবোবো…‘

এরপরে উনি আরও অনেককিছু বললেন। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। বহু কষ্টে রীতিমত ধ্বস্তাধস্তি করে নিজেকে উনার হাত থেকে ছাড়ালাম। আমার ধাতস্থ হতে সময় লাগল। এবং তার আগেই উনি একখানা রামচড় মেরে আমাকে মাটিতে ফেলে দিলেন। এরপর আমি শুনতে পেলাম উনি উচ্চস্বরে পড়ছেন,

‘তোমাকে দেখার পর থেকে বার বারই মনে হয়েছে আমাদের এ বিষয়ে কথা হওয়া দরকার। বেশ কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করেও পারি নাই। অথচ আমি দেখেছি তুমি বিকেলবেলা বারান্দায় বসে গল্পের বই পড়ো, গাছে পানি দাও। মাঝে মাঝে ছাদেও ওঠো। তারপর কেমন জানি উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকো। তোমাকে দেখে তখন একজন মায়াবতী মনে হয়।

মেয়ে তুমি কি আমার মায়াবতী হবে?’

উত্তরের অপেক্ষায় Him-L’

আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। সর্বনাশ! আম্মা চিঠি পেয়ে গিয়েছেন। তারমানে আমার স্কুল ব্যাগও আসলে নিরাপদ না। এত চিন্তা করে বের করে শুধুই এইটাকে নিরাপদ ভেবেছি? হায় হায়! এখন মিথিলা আপু আর হিমেল ভাইয়ের কী হবে? যেভাবেই হোক আমার মিথিলা আপুকে বাঁচাতেই হবে। আম্মা যদি এই ঘটনা এখন চাচিকে বলে দেন তাহলে হাবিয়া দোজখ নেমে আসবে আপুর জীবনে। না, না। এ হতে দেওয়া যায় না। আমি মনে মনে মিথিলা আপুকে বাঁচানোর জন্য কী বলব ভাবতে থাকলাম। ঠিক করলাম প্রয়োজনে আম্মার পা চেপে ধরব। যে কোন কিছুর বিনিময়ে হলেও চাচির কাছে খবর যেন না যায়। উনার মত ভয়ংকর মানুষ আমাদের পরিবারে খুব কমই আছে। আমি আম্মার দিকে কাঁদো কাঁদো চোখে তাকালাম। তারপর কিছুটা ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে বললাম, ‘আম্মা প্লিজ, তুমি এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বইলো না।‘ আমার কথা শেষ হবার আগেই আম্মা রীতিমত আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, খপ করে আমার হাত ধরে রক্ত জমাট কণ্ঠে বললেন, ‘কতদিন ধরে এই রাস্তার ছেলের সাথে প্রেম করতেছিস?’

আমি বোবা হয়ে গেলাম। প্রথম কথা আম্মা ভুল অভিযোগে আমাকে অভিযুক্ত করেছেন। ঘটনা ছিল মিথিলা আপু আর হিমেল ভাইয়ের। আমি কেবলই বার্তাবাহক। সেখানে আমি কেন অপরাধী হলাম ঠিক বুঝলাম না। আর দ্বিতীয় কথা, হিমেল ভাই মোটেও রাস্তার ছেলে না। তার বাবা ইঞ্জিনিয়ার। মা আমাদের এলাকার সবচেয়ে সুন্দরী আর বিনয়ী মহিলা। আমার আম্মার সাথেও তার বেশ খাতির। হিমেল ভাই ঢাকা শহরের সবচেয়ে নামকরা কলেজে পড়েন, দারুণ গিটার বাজান, এবং যথেষ্ট স্মার্ট। এতদিন আম্মাও তাকে ভদ্র ছেলেই বলতেন। কিন্তু যেহেতু আম্মার ধারণা হয়েছে আমার সাথে হিমেল ভাইয়ের প্রেম সেহেতু তিনি এখন নিমিষেই রাস্তার ছেলে হয়ে গিয়েছেন। অবশ্য হিমেল ভাই কোন ছার, ধরা যাক নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে অবতরণ করে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন, সারা পৃথিবীতে তার জয়জয়কার। তিনি আমাকে কোন কারণে পছন্দ করেছেন। সেই নীল আর্মস্ট্রংকেও আম্মা ভ্রু কুঁচকে চশমা ঠিক করে বলবেন- ‘রাস্তার ছেলে। চাঁদে হেঁটে বেড়ায়। এরা একদম ভদ্র হয় না।‘ আমি কি আপনাদের কে আম্মার ব্যাপারে ধারণা দিতে পেরেছি? এই পর্যন্ত পড়ে ধরে নিবেন না আমি মহা সুন্দরি, আলতা রঙা পায়ে নূপুর পরেছে ধরণের কেউ। বরং প্রচলিত সৌন্দর্যের কিছুই আমার মধ্যে নাই। নাই মানে নাই। আমার চেয়ে মহা সুন্দরি হল অহনা। দম আটকে আসবে, বুক ধক ধক করবে এমন ধরণের সুন্দরি ও। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। আম্মার চোখে আমার আশেপাশে আসা যে কোন ছেলেই রাস্তার ছেলে। নিজের প্রচলিত অর্থে অসুন্দর মেয়েকে আশেপাশের কুনজর থেকে বাঁচাতে তিনি বদ্ধ পরিকল্পনা নিয়েছেন। যেখানে নীল আর্মস্ট্রং কিছুই না হিমেল ভাই সেখানে চুনোপুঁটি না রীতিমত কাঁচকি মাছ। আম্মা কেন সহ্য করবেন তাকে? লাভের মাঝে লাভ হয়েছে চিঠিটা পড়ার যে অদম্য কৌতূহল ছিল তা মিটে গেছে। আমি জেনে গিয়েছি চিঠিতে কী লেখা আছে। আমাকে অন্যের ব্যক্তিগত চিঠি খুলতে হয় নাই। আমি নিষ্পাপই আছি। অহনাকে এখন বলা যাবে চিঠিতে কী লেখা। দারুণ ব্যাপার! ভাবতে ভাবতে ভাবের জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ যাবত কিছু বলছি না দেখে এবার আম্মা একটা চাপা হুঙ্কার দিলেন, ‘কবে থেকে হচ্ছে এসব?’

আমি চুপ। মিথিলা আপার কথা বলে তাকে বিপদে ফেলব নাকি নিজের ঘাড়েই সব দোষ নিয়ে নেব বুঝতে পারছি না। চিঠিতে প্রাপকের নাম লেখা নাই সে জন্য আম্মা ভাবছে চিঠি আমার। ধুর ছাই, মায়াবতী-ছায়াবতী এসব কিছু হল নাকি? কেন যে এমন ন্যাকা ন্যাকা কথা লিখতে গেছেন হিমেল ভাই। উফ অসহ্য!

- ‘কবে থেকে এই রাস্তার ছেলের সাথে প্রেম পিরিতি করছিস?’

আমি আবারও চুপ।

- ‘শুধু রাস্তার ছেলে না, খ্যাতের খ্যাত। নাম কীভাবে লিখেছে দেখো, Him-L. ছিঃ যেমন চেহারা তেমনি হাতের লেখা। এসব সস্তা কথা পড়ে আমার পেটের সন্তান এমন গলে যাবে আমি জন্মেও ভাবি নি।‘

এবার আমার বেশ খারাপ লাগল। এতদিনে আম্মা আমাকে এই চিনলেন? ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর থেকেই আম্মার এই পাগলামি শুরু হয়েছে। সারাক্ষণ ছোঁক ছোঁক করা, সন্দেহ সন্দেহ ভাব। যেন এই আমি কারও প্রেমে পড়ে গেলাম, এই কেউ আমার প্রেমে পড়ে গেল। এই আমি ক্লাস ফাঁকি দিলাম, এই স্কুল থেকে দেরি করে আসলাম। আমি বুঝি উনি আমাকে নিয়ে ভয়ে থাকেন, চিন্তায় থাকেন বলে এমন করেন। আমিও তাই মেনেই নিয়েছিলাম। কোনদিন প্রতিবাদ করি নাই। আব্বাকেও বিচার দেই না। কিন্তু যেখানে আমি নিজেই প্রেম পিরিতি পছন্দ করি না সেখানে আমাকে ভুল বুঝে এত বড় কথা উনি বলতে পারলেন? হঠাৎ কেমন কান্না চলে এলো আমার। আমি এবার ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকাতে চেষ্টা করলাম। আমি শক্ত মেয়ে। লুতুপুতু দুর্বল মেয়েদের মত কান্নাকাটি করা আমাকে শোভা পায় না। কাঁদা যাবে না। আর এখন কাঁদলে আম্মা মনে করবে অপরাধ করেছি বলে কাঁদছি। এমন কিছু তো আরও করা যাবে না। আমি প্রাণপণে কান্না ঠেকাতে লাগলাম।

আম্মা শীতল চোখে আমার দিকে প্রায় দুই মিনিট তাকিয়ে থাকলেন। সেই দুই মিনিটকে আমার মনে হল দুইশ বছর। আমি বহু কষ্টে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতে করতে নিচু অথচ দৃঢ় স্বরে বললাম, ‘চিঠিটা আমার না। অন্য একজনের। আমাকে রাখতে দিয়েছিল। তোমার অন্তত বোঝার কথা আমি এমন না।‘

হয়ত আমার কণ্ঠে আসলেই সত্যতা ছিল, আম্মা কী বুঝলেন কে জানে? আরও এক মিনিট শীতল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে চিঠিটা নিয়ে ঘর থেকে চলে গেলেন। আমি হাঁফ ছাড়লাম। এখনও বুক কাঁপছে। এ কেমন দিন শুরু হল? শনিবার দিনটায় আসলেই শনির দশা লেগে থাকে নাকি?

সে ঘটনার পর আম্মা আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। মিথিলা আপু ফিরে আসলে আমি তাকে সব ঘটনা খুলে বললাম। সে তখন প্রায় দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলল। আম্মার কাছে সরাসরি গিয়ে পুরো ঘটনা বলে দিলো। আম্মা গম্ভীরভাবে সব শুনলেন, কিছুই বললেন না। শুধু রাতে খেতে বসার সময় আমার আর মিথিলা আপুর প্লেটে দ্বিগুণ পরিমাণে মুরগির মাংস তুলে দিতে থাকলেন। মিথিলা আপুর বিস্মিত নজর দেখে আমি তাকে ইশারায় বুঝালাম, আম্মা তার ভুল বুঝতে পেরেছেন। এখন নিজের অনুতপ্ত ভাব ঢাকার জন্য আদর শুরু করছেন।

শুধু তাই নয়, গভীর রাতে টের পেলাম কেউ একজন এসে আমাকে বিছানার ভেতরের দিকে ঠেলে জায়গা করার চেষ্টা করছে। ঘুমের ঘোরে রীতিমত পাগল পাগল অবস্থায় ছিলাম। হালকা চোখ খুলে দেখলাম হাতে বালিশ হাতে আম্মা দাঁড়িয়ে থেকে ঠেলাঠেলি করছেন। আমি পাশ ফিরে জায়গা করে দিলাম। আম্মা পাশে শুয়ে শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। হাতের এই আঁতকা চাপে আমার ঘুম প্রায় ছুটেমুটে গেলো। কিন্তু তাও আমি ঘুমের ভান করে তাঁর সাথে লেপটে শুয়ে থাকলাম।

পরেরদিন সকালে মিথিলা আপু চলে গেলো। আমাদের বাসা আবার আগের মত ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গেলো। এদিকে হিমেল ভাই সকাল সন্ধ্যা আমাদের বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করা শুরু করেছেন। বেচারা তো জানে না মিথিলা আপু কতদিনের জন্যে এসেছিল। বা কবে চলে গিয়েছে। সে হয়ত ভাবছে আপু এখনও এখানেই আছে। আর ওদিকে আম্মা আজকাল বারান্দায় যাওয়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনিই গাছে পানি দেন, তিনিই বারান্দায় বসে গল্পের বই পড়েন। তিনিই বাসার কাজের মেয়েটার সাথে শুকনা কাপড় আনতে ছাদে যান। আর কোনক্রমে হিমেল ভাইয়ের ঘুরাঘুরির সময়ে তার সাথে চোখাচখি হয়ে গেলেই দাঁত বের করে একটা প্রশস্ত হাসি দিয়ে আম্মা বলেন, ‘বাবা হিম-এল, ভালো আছো তো? তোমার আব্বা-আম্মা ভালো তো? পড়ালেখা করছ তো ঠিকমত? বাইরে বাইরে এত ঘুরবে না এতে শরীর আর মনোযোগের ক্ষতি হয়।‘

আপনারা লক্ষ্য করে দেখেন আম্মা ‘হিম’ বলে একটা ছোট্ট বিরতি নিয়ে ‘এল’ বলেন। স্নেহের সাথে বাঁশ মেরে দেওয়া কি আসলে একেই বলে? আমি এসব দেখে মুখ টিপে হাসি। দৈনন্দিন ঘটনা নিয়ে মাঝে মাঝে অহনাকে চিঠি লিখি। কোচিং থেকে ফেরার পথে ক্যাকটাসের ঝোপ থেকে সে চিঠি নিয়ে যায়। সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে সে রাতে লেখা চিঠি রেখে যায়। সবকিছু অল্প দিনেই স্বাভাবিক হয়ে যায় ঠিক আগের মত। শুধু পরের শনিবার সকালে আম্মা আবার চিৎকার করে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আমার শরীরের অদৃশ্য নাটবল্টু খুলতে থাকে। আমি ঘোরলাগা ঘুম ঘুম চোখে স্তম্ভিত হয়ে আম্মার দিকে তাকাই।

আম্মার একহাতে সেরা সত্যজিৎ আর অন্যহাতে হুমায়ূন আহমেদ সমগ্র। যে দুইটা বই হিমেল ভাই আমাকে ঘুষ হিসেবে দিয়েছিল। বইগুলো আমি এনে রেখেই দিয়েছিলাম। পড়ার সময় পাই নাই। ভেবেছিলাম এই সপ্তাহ থেকে পড়া শুরু করব।

- ‘এটা নিয়ে আবার কী হল?’ বিস্মিত স্বরে জানতে চাইলাম আমি।

আম্মা কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে পরপর দুইটা বইয়ের পাতা উল্টালেন। দুইটা বইয়ের প্রথমদিকেই লাল কালিতে গুটিগুটি অক্ষরে তারিখ দিয়ে লেখা,

‘অমর একুশে বইমেলা
হিমেল’

ব্যাটা হিমেল ঘুষ হিসেবে আমাকে নিজের পুরানো বই দিয়েছে। আর আমি কিনা ভেবেছিলাম আমার জন্য নতুন গল্পের বই কিনেছে। বিনিময়ে বেচারার চিঠিটা পৌঁছে দেই। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো আমার। আম্মা এবার গায়ে রীতিমত কাঁটা ধরিয়ে দেওয়ার মত স্বরে বললেন, ‘হিম-এল এর বই তোমার কাছে কিভাবে আসলো সেটা কি আমি জিজ্ঞেস করতে পারি?’

আমি অযথাই ঢোঁক গিললাম। আম্মার এবার আমাকে একটা বইয়ের সূচিপত্র থেকে একটা নাম পড়তে ইশারা করল। আমি আক্কেল গুড়ুম অবস্থায় দেখলাম সমগ্র তে কী কী উপন্যাস আছে এটা সেটার সূচিপত্র। একটা উপন্যাসের নাম, ‘একজন মায়াবতী’। হায় খোদা! হিমেল ভাই চিঠিতে ‘মায়াবতী’ লিখেছিল। আম্মা এখন ইঙ্গিত করছেন চিঠিটা আমার জন্যই ছিল কিনা! কী বলব খুঁজে পেলাম না। নিজেকে কষে কতগুলো ঘুঁষি মারতে ইচ্ছে করছিল। লম্বা একটা দম নিয়ে আমি আম্মার দিকে সরাসরি তাকিয়ে গম্ভীরভাবে বললাম, ‘আম্মা শুনো...’

কিন্তু কথা শেষ করতে পারলাম না। ঘরের দক্ষিণ দিকের জানালা খোলা ছিল। হঠাৎ হুড়মুড় করে ঠান্ডা বাতাস এসে পড়লো। টেবিলে রাখা সেরা সত্যজিৎ আর হুমায়ূন সমগ্র খোলাই ছিল। বাতাসে বইয়ের পাতাবদল হতে থাকল। আর পাতার ভাঁজ থেকে টুপ করে একটা চিরকুট পড়লো মেঝেতে। তাতে লেখা,

‘অহনার বান্ধবী,

চিঠিটা ভুলেও মিথিলাকে দিও না। ওটা এমনি এমনি বলা। এই বইয়ের পাঠক আর চিঠির পাঠক একই।

ইতি
Him-L’

আমি বজ্রাহতের মত চিরকুটের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আম্মা সরু চোখে তীর নিক্ষেপ করার মতো আমার দিকে তাকালেন।

আমি এখন কী করবো?

পালাবো?

হৃদযন্ত্র থেমে গেছে এমন ভান করে অজ্ঞান হয়ে যাব?

আম্মার পায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব?

নাকি আম্মা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় নিজেকে বাঁচাব বলে প্রস্তুত রাখব?
মনে মনে কাউন্টার ক্লক চালু করলাম।

টিক টিক, টিক টিক, টিক টিক......