খান্ডব দাহন ?

অর্পিতা বাগচী

পর্ব-১)
“ অনন্তর লক্ষণ চিতা প্রস্তুত করিলেন । তৎকালে সুহৃদজনের মধ্যে রাম উপবিষ্ট , সীতা তাঁহাকে প্রদক্ষিণ করিয়া জ্বলন্ত চিতার নিকটস্থ হইলেন এবং দেবতাগণ অভিবাদনপূর্বক কৃতাঞ্জলিপুটে অগ্নি সমক্ষে কহিলেন , যদি রামের প্রতি আমার মন অটল থাকে তবে এই লোকসাক্ষী অগ্নি সর্বোতভাবে আমায় রক্ষা করুন । রাম স্বাধী সীতাকে অসতী জানিতেছেন । যদি আমি সতী হই তবে এই লোকসাক্ষী অগ্নি সর্বোতভাবে আমায় রক্ষা করুন ।
এই বলিয়া জানকী চিতা প্রদক্ষিণ পূর্বক নির্ভয়ে প্রদীপ্ত অগ্নিমধ্যে প্রবেশ করিলেন । আবাল বৃদ্ধ সকলেই আকুল হইয়া দেখিল জানকী দীপ্ত চিতানলে প্রবেশ করিতেছেন । সেই তপ্তকাঞ্চনবর্ণা , তপ্তকাঞ্চনভূষণা সর্বসমক্ষে জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবিষ্টা হইলেন । মহর্ষি , দেবতা ও গন্ধর্বগণ দেখিলেন , চিতানলের উত্তাপে তাঁহার মাল্য ও অলংকার ম্নান হয় নাই । সর্বসাক্ষী অগ্নি ঐ সর্বাংসুন্দরীকে রামের হস্তে সমর্পণপূর্বক কহিলেন , রাম ! এই তোমার জানকী । ইনি নিষ্পাপী ! এই সচ্চরিত্রা বাক্য , মন , বুদ্ধি ও চক্ষু দ্বারাও চরিত্রকে দূষিত করেন নাই । যদবদি বলদৃপ্ত রাবণ ইঁহাকে আনিয়াছেন , তদাবধি ইনি তোমার বিরহে দীনমনে নির্জনে কালযাপন করিতেছিলেন । ইনি অন্তঃপুরে রুদ্ধা ও রক্ষিতা । ইনি এতদিন পরাধীন ছিলেন । কিন্তু তোমাতেই ইঁহার চিত্ত , তুমিই ইঁহার একমাত্র গতি ।
তখন ধর্মশীল রাম অগ্নির এই কথা শুনিয়া অতিশয় প্রীত হইলেন ।“

পর্ব-২)
মহাভারত আদিপর্ব
অগ্নিদেবের অনুরোধে পরতন্ত্র হইয়া , কৃষ্ণ ও অর্জুন সুবিস্তৃত খান্ডবঅরণ্য দগ্ধ করিয়াছিলেন । পঞ্চদশ দিনে খান্ডবদাহন সম্পন্ন হয় এবং সেই প্রবলানলে অশ্বসেন , ময়দানব ও চারিটি পক্ষীশাবক ব্যতীত তত্রত্যযাবতীয় জীবজন্তু বিনষ্ট হইয়া যায় । অগ্নিদেব কৃষ্ণার্জুনের সহায়তায় সফল মনোরথ পরিতুষ্ট হইয়া প্রত্যুপকার স্বরূপ শ্রীকৃষ্ণকে সুদর্শণচক্র এবং অর্জুনকে গান্ডীব ধনুক অক্ষয় তূনীরদ্বয় এবং কপিধ্বজ রথ প্রদান করিয়াছিলেন ।

পর্ব-৩)
যেদিন অগ্নিপ্রয়োগে জতুগৃহ ও তৎসহ পুরোচনকে ভস্মসাৎ করিবার আয়োজন হইল সেদিন পঞ্চপুত্র সমভিব্যহারে এক নিষাদী তথায় আগমন করিয়াছিল । প্রচুর পানভোজনে অবসন্ন হওয়ায় , তাহার সেদিন স্থানান্তর গমনের ক্ষমতা ছিল না । যথোপযুক্ত সময়ে ভীমসেন প্রম...... পুরোচনের গৃহে ও তদন্তর ভবনের অন্যান্য অংশে অগ্নিসংযোগ করিয়া জননী অ ভাতৃগণসহ পূর্বকথিত গহবরমধ্যে প্রবেশ করিলেন । নিশার অন্ধকারে এই অগ্নিকান্ড জনিত আলোকরশ্মি চতুর্দিকে সমাকীর্ন হইয়া পড়িল । বারনাবতবাসী প্রকৃতিপুঞ্জ শয্যাত্যাগ করিয়া শোকস্থিমিত নয়নে এই নিদারুণ কান্ড সন্দর্শন করিতে লাগিল ।

পর্ব-৪)
ব্রাহ্মণ আরণ্যক উপনিষদ –
বৈদিক কালে যাগ যজ্ঞাদি সমস্ত ধর্ম কর্ম অগ্নির সাহায্যে সম্পাদিত হইত । সেই ধর্মকর্মই স্বর্গলাভের হেতু অতএব অগ্নিকেই স্বর্গপ্রাপ্তির হেতু স্বরূপ বর্ণনা করা হইয়াছে । সফল শ্রোতার উদ্দেশ্যে অগ্নিতে আহুতি প্রদান করা হইত । কারণ অগ্নিই সফল শ্রোতার মুখ ।

Mistake – 1 )
খান্ডব্দাহন পর্বে যে অগ্নিকে আমরা পাইলাম , তার য বিনিষ্টকারী রূপ সে আমাদের দেখাইল , সর্বোপরি অর্জুনকে গান্ডীব , শ্রীকৃষ্ণকে সুদর্শনচক্র প্রদান এর ... , কারণ আমরা দৃষ্ট হইলাম অগ্নির ন্যায় বোধ নিয়ে একটু হলেও প্রশ্ন থাকিয়া যায় ।

Mistake-2)
নিপার অন্ধকারে অগ্নির আলোকরশ্মি চারিদিক আলোকিত করিয়া তুলিলেও এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দেয় , যে নিষাদী সেদিন জতুগৃহের অগ্নিতে পুড়িয়া মরিল তাহাকে পুড়াইয়া মারিতে যে অগ্নিশিখা এতটুকু কাঁপিল না , সেই অগ্নির বিশ্বাসযোগ্যতাই বা কতটা ?

Mistake-3)
যজ্ঞাদি ধর্মকর্ম অগ্নি ব্যতিরেকে সম্ভব নয় । যে অগ্নি স্বর্গপ্রাপ্তির হেতুস্বরূপ তারই এই পূর্বে বর্ণিত কার্যকলাপ কেমন যেন গোল পাকায় মাথার মধ্যে । প্রশ্ন জাগায় অগ্নির এই দ্বিচরিত্রগত
বৈশিষ্ট্য নিয়ে ।
তাহলে কি রামায়ণে রাম জীবনে ... ভয়ংকর Mistakeই করিয়া ফেলিলেন ? নিজের প্রেয়সীর প্রতি তার মনে কেনই বা প্রশ্নের উদয় হইল ? যাকে হারাইয়া তাঁহার বর্ণনা এই – “আমার মন বিষণ্ণ ও দেহ একান্তই অবসন্ন , চক্ষুঃস্পন্দিত হইতেছে বোধহয় সেই সীতা আর নাই ; হয় , কেহ হরণ করিয়াছে , নয় তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে । কিংবা তিনি পথে পথে ভ্রমিতেছেন” , যে তিনি নিজেকে এমতবস্থায় পাইয়াছিলেন সেই তিনিই প্রেয়সীর প্রতি দৃঢ়তা রাখিতে অক্ষম হইলেন । এবং যাহাকে মাঝে বসাইলেন , সেই অগ্নির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় যুগে যুগে ।
লিখতে বসে এতটা লেখার পরই সীতার হাত চলে যায় কপালে , বিবাহিত হওয়ার দরুন বেশ বড় সাইজের লাল বিন্দি পরার অধিকার সে অর্জন করেছে , বেশ কয়েকদিন যাবৎ সেই স্থানে একটি তীব্র যন্ত্রণা । বড় বিন্দির ভার থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য লেখাটি শেষ করে বারান্দায় গিয়ে বিন্দিটি ছুঁড়ে ফেলে দিতে গিয়েও তা সম্ভব হল না তার আঠালো বৈশিষ্ট্যের জন্য । ডাক্তার দেখাতে হল শেষ পর্যন্ত । মাথা ব্যথার হাজার একটা কারণ তার মধ্যে একটা , তিনি বললেন – কোনো কষ্টকে বহুদিন ধরে নিজের মধ্যে লালন করার ফল । ডাক্তার ভদ্রলোক জানতেন , এটির কোন বিজ্ঞানসম্মত কারণ নেই , তবুও সেই সীতার কথাতেই সেই অর্জিত লাল বিন্দি না পরাতে সে ব্যথা কম অনুভব করে । আজকাল তার কপালে আর লাল বিন্দি দেখা যায় না । ব্যাথা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে যাতে স্মৃতিও বিভ্রান্ত । ডাক্তারের কাছে যাওয়া বাড়িয়েও কোন লাভ হচ্ছে না । বাড়ির ছোটখাটো কাজেও তার যে ভুল হচ্ছে তার পরিণাম মারাত্মক হতে পারে । কাল সারারাত্তির .................. খেলা ছিল । সকালে চা বসাতে গিয়ে দেশলাই জ্বালানো মাত্র আবার এক খাণ্ডবদাহন পর্ব শুরু হল ।
সীতা জানে ...... দিলে খাণ্ডবদাহন পর্ব সম্পন্ন হবে ।