মায়া

সেঁজুতি বড়ুয়া

মায়া

শিমুল ছায়া, ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে-
বুকের ভেতর উপচানো খামে
মায়া বাড়াচ্ছো খুব!


ঐশ্বরিয়ার মায়াবি ঠোঁটের হাসি
সিনেরোলে তার কী সে প্রাপ্তি, সর্বোচ্চ মুকুট
কোচিংয়ে- শ্রীপর্ণার মেধাবী ইতস্তত চোখ
সেপথ মাড়াতে গিয়ে মেঘলার সর্পবেণীর ছোবল
- পৃষ্ঠাজুড়ে সরল স্বীকারোক্তিতে
এতো বিষ, মলিন বিষাদ ছড়িয়েছো যে
এসব আর নেয়া যাচ্ছে না!


ক্যান্টিনে ঝাঁ-ঝাঁ রোদে পেপসি খাচ্ছি
তাও বললে- ঐশ্বরিয়ার এক বোতলে
নায়কও এভাবে একচুমুকে কোক খেয়েছে
মুহূর্তেই পেপসির ঢাকনাটা বন্ধ করে
তোমার চোখে সরাসরি তাকিয়েছিলাম...


সত্যি বলছি, সর্বস্বান্ত হতে আমার ভালো লাগে না
অন্তরীক্ষে নিমগ্ন হয়ে আমি শুধু আকাশ দেখি
অহরহ গহীন বালুচরে কিংবা গর্তেও পা পিছলে পড়ি না


ট্রেনটা ছেড়ে দিলে ভেবেছিলাম-
তোমার জন্যে সূর্যমুখীর পাপড়িগুলো মেলে ধরবো
শ্রীপর্ণা কিংবা মেঘলার বদলে তাতে জমবে শুধু ভালোবাসার স্তুপ
তার আগেই তুমি ছুঁড়ে দিচ্ছো প্রচণ্ড শব্দময় দৃশ্যের পর দৃশ্য
সরে যাচ্ছো, ছুটছো ঘোড়সওয়ারির ছায়ায়- দ্রুত প্লাটফর্ম থেকে!
...........



বিরহ উদযাপনের দিনে


বিদ্যাপতি, পৃথিবীর কপট সংসারে আমি প্রেমসিক্ত অগভীর জলধারা যেন
আকাশে এমন গুরুগুরু ঘনকৃষ্ণ মেঘ গর্জায়, আমার চিত্তচাঞ্চল্য বাড়ে
বিরহী যক্ষ এমন দিনেই প্রাণাকুল মেঘ পাঠিয়েছে রামগিরি থেকে অলকাপুরিতে?
ঝাঁকে ঝাঁকে মোহনরূপে সে চূর্ণমেঘ পাশে এসে দাঁড়ালে- লজ্জ্বা ও বিভ্রমে থাকি
ভেজা জল আগুন ধরায় ভয়ংকরী বাণে, করুণ আর্তিতে আমি এতোটুকু হয়ে যাই!
জলভারানত আকাশ তখন আমাকেই বিরহী ভেবে তার প্রকাণ্ড বড়শিতে গাঁথে
সে বড়শির দোলকে দুলে দুলে আমি বৃষ্টির মনভূমি থেকে প্রমত্ত বর্ষাকে দেখি
দুর্যোগের লাল নিশানা উড়িয়ে হুইসেল বাজাচ্ছে তখন যক্ষবংশীয় কোনো মেঘ
না হিজল গাছ, না জলেভেজা বিল, না সোঁদাগন্ধ মাছ- নিষেধ মানছে না কেউ
দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত তাহারা। আহা, কুলকুল জলে আমারও শুকনো বিল ভরে যাচ্ছে
বর্ষার স্নানে স্নিগ্ধ প্রকৃতিতে মশগুল হয়ে- আমি যখন নিজেই ভিজে আর্দ্র হয়ে উঠি
পাল্টে যায় আকাশ...ইছামতি কিংবা ধলেশ্বরী কূল আমাকে নিয়েই দৃশ্যান্তরে ছোটে
এ দুর্যোগকালে বাঁচায় মেরিন ড্রাইভ রোড, আমাকে লুকিয়ে রাখে জলরঙ মেঘ
সেই দুঃসাধ্য ভ্রমণে পূর্বমেঘের সমাদরে আমি নিজের বর্ষাস্নাত অলকাপুরিতে নামি
পাথরের চোখে সেখানে কাঁদে না কেউ, সঙ্গী হয় না জলভরা দিনে, ইচ্ছেপূরণে...
এমন কপট সংসারে আমি- কোনো এক মেঘমন্দ্র বৃষ্টির অপেক্ষায় প্রণয়সুখে কাঁপি!
......................


সাদাসিধে জিভের আড়ালে


কেউ কী জানে সাদাসিধে জিভের আড়ালে
উত্তাল হাতুড়ি কিংবা শান দেয়া ছুরি থাকতে পারে?


নিরপরাধ পাঁজরের ভাঁজে যতক্ষণ তীরঘেঁষা সুরম্য শরীর
বসে থাকে স্নানের আয়েশে, তার চোখে থাকে বন্যতা, ঘোড়ার চাহনি
যেন প্রাণের প্রণয়ী তুমি, পোশাকের অন্তিম ঘামে তাকে ঘরবন্দী করছো


ততক্ষণে মর্মর ফেনিল সঙ্গীতে সে তোমার চারদিকে তুলে ফেলছে
শব্দমুখর একেকটি অতল বালিয়াড়ি, ঝোপঝাড়ঘেরা পুরু রাতের বিছানা
সে তার স্বাভাবিক ঢংয়ে- উপাদেয় রঙ্গরসিকতা আর আলাপচারিতায়
কীভাবে অস্তগামী সৈকতে জাহাড় ভিড়িয়ে ভিনদেশী তৃষ্ণার্ত নাবিকেরা
বন্দরের সমস্ত মানুষ আর গাছের ছায়া শুষে নেয়, সে গল্প শোনায়...


এভাবে খেলতে খেলতে সে তোমাকে আহবান জানায় সামুদ্রিক তরল পানীয়ের
তোমার কী তখন মনে হতে পারে না-
জীবনে অতীত বলে আসলে কিছু নেই, সবই আসলে বর্তমান
কোনো ধ্বংস নেই, কোনো মৃত্যু নেই, সবাই আসলে এভাবেই বেঁচে আছে


কথায় কথায় রাত গভীর হচ্ছে, তার ব্যূহও ছোট হয়ে আসছে
ছটফটে হরিণীকে যেমন রক্তপিপাসু বাঘ ঘাড় মটকায় ঠিক সেভাবে
সে তার ঠোঁট এগিয়ে দিতে দিতে অস্ফুটস্বরে বলে: আজ পৃথিবীর সবকিছু শুভ!


তোমার তখন শরীরজুড়ে কাঁপুনি দিয়ে ঘাম ছুটছে...
চারদিকে এতো পানি...এক অাঁজলা পানির জন্যে বুকটা হাঁসফাঁস করছে...
চুলে একটা অদৃশ্য হাতের ননস্টপ স্পর্শে লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে...




হাতটা আরো নিচে, গলা পেরিয়ে কাঁধের কালো তিলটা পেরোনোর আগেই
যেই তুমি ঘর্মাক্ত শরীরটা ঠেলে নিজ উদ্যোগে দাঁড়ালে, সে তোমাকে শাসায়
সদ্য ধরা শিকারের ঝলসানো মাংস খেতে না পেরে সে আচমকা গর্জে ওঠে


তুমি ততক্ষণে তোমার ক্ষতে ব্যান্ডেজ লাগিয়েছো
কোঁকড়া চুলের রাশি, কমনীয় দেহ নিয়ে ব্যূহ থেকে টলতে টলতে বেরিয়েছো
দু-একটা রাতজাগা পাখিও ভীতসন্ত্রস্ত্র হয়ে এলোমেলো পাখা ঝাপটাচ্ছে


সে তোমাকে সুবিস্তৃত মুখে গিলে খাবার জন্যে লকলকে জিভ বাড়িয়ে দিয়েছে
কষা মাংসের ঘ্রাণে উত্তাল ঠোঁট ভীষণভাবে কামড়ে ধরেছে
নিজের ব্যূহে ফেরাতে কত শত জ্যান্ত বাক্যে আপ্রাণ তোমাকে পুড়িয়ে মারছে


সেই সাদাসিধে স্বপ্রাণ জিভ কীভাবে হয়ে গেল উত্তাল হাতুড়ি, শান দেয়া ছুরি!


এ্ইসব অনর্থ হুংকারে কান না দিয়ে তুমি আলোর স্বচ্ছতার নিচে গিয়ে দাঁড়ালে
কানে ফুল গুঁজে চপল হরিণীস্বভাবে ছুটতে থাকলে সমুদ্রের ভীষণ উদ্যামে