কিওরিও শপে একদিন

সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়

কিওরিও শপে একদিন

কিওরিও শপের দরজায় দাঁড়িয়ে খুঁজি হারানো বোতাম
সূর্যরশ্মির মধ্যে পাক খেতে খেতে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া পূর্বজন্ম -
অচেনা স্টেশনে তাকে বিষন্ন ওয়েটিং রুমে দেখেছি আমি আজ
চলাচল কতটা এডিট করলে ক্ষতস্থানে ফুল ফুটে ওঠে
তা নিয়ে অদৃশ্য সম্পাদক আমাকে কিছু জানাননি কখনো
উদাসীন পার্ক-বেঞ্চ, ভাঙ্গা গ্রামাফোন, গোধূলির ফেরিঘাট
কুর্গের বৃষ্টিস্নাত কফির বাগান -
সকলেই তোমার কথা বলে , এই বোতাম-হারানো অঞ্চলে
নীলচে অবিশ্বাস মিশে আছে হাওয়ায় হাওয়ায়…

মুছে যাওয়া মেহফিল বুকে নিয়ে আজ কিওরিও শপে
আমি ব্রিটিশ পিয়ানো আর প্রাচীন বুদ্ধের মাঝখানে
খুঁজছি আমাদের স্ট্যাচু, চরাচর ঢেকে যাচ্ছে কুয়াশায়।

---------

অনেক জোনাকি হল

কত সহস্র দিন তারাপথে , ধুলোঝড়ে, স্মৃতিজলে
কেটে গেছে
কত বিষাদের মত আলো আর সত্যির মত অন্ধকার
কত দেবদারু-পথ আর ছাতিম-সরণি , কত মায়া
কতসব রয়ে যাওয়া ছায়া , মিথ্যে বিশল্যকরণী
কত সব ক্ষত আর কত শত কেটে যাওয়া ঘুড়ি
কত ক্র্যাশ করা প্লেন আর ডুবে যাওয়া জাহাজ
কত কথা, ছেঁড়া গান, ভেসে আসা হাসি -
আমাদের মধ্যে আজ ফাঁদ হয়ে ঢুকে গেছে ভাবি ...
অনেক জোনাকি হল, এইবার ঠিক
নতুন লিপস্টিকে প্ররোচিত হয়ে মরে যাবো।

--------

শহরে মার্চ মাস

অনেকদিন আগে দেখা হয়েছিল, যখন শহরে মার্চ মাস মানে ছিল এলোমেলো হাওয়ার সমুদ্র , পুরোনো বাড়ির ছাদ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া যখন পাশের বাড়ির ছাদে নুইয়ে পড়া রাধাচূড়ার ঠোঁটে চুমু খাবার জন্যে দু-বার ভাবতোনা , ওলা- উবের আসেনি, মন্দারমনির বিচে উপচে পড়েনি অবৈধ উইকেন্ড ভিড়। দেখা হয়েছিল তখন। হাত-পা-চোখ-নাক-ঠোঁট ছাড়াও তখন কাঁধে লাগানো ছিল ডানা , যে ডানায় ভর দিয়ে বাইপাস থেকে প্রাচীন কফিশপে উড়ে উড়ে আঁকা যেত ফিউচারের স্বরলিপি , জন্মদিনে উপহার দেওয়া যেত মিলান কুন্দেরা , খনি-নগরীর কারখানা-সাইরেন পেরিয়ে হাসিমুখে খেয়ে নেওয়া যেত আদিবাসী বেকারির কেক। অনেকদিন আগে সেসব , যদিও অনেকদিন মানে ঠিক কতদিন - মনে নেই , নিশ্চিত অনেক, অনেক দিনই হবে ; তবুও দেয়ালে ছায়া সরে যায় ফাল্গুন দুপুরে , আর কোথাও বেজে ওঠে বাতিল হারমোনিয়াম। তখনও , কবিতারা ফেক হয়ে যায়নি - প্রথম বই , প্রথম প্রেমের মত প্রিয় হয়ে লেগে আছে বুকপকেটে ; ইস্ট- ওয়েস্ট মেট্রোর কাজ শুরু হয়নি , কলকাতা বইমেলা সবেমাত্র ছেড়ে গেছে ময়দান এলাকা , অর্কুট থেকে ফেসবুক অবধি চালু হয়েছে স্পেশাল বাস সার্ভিস , আর খসে পড়েনি মুখোশেরা । গোধূলির প্রিন্সেপ ঘাটে দেখা হয়েছিল , অচেনা মাঝির নৌকায় এসে পড়েছিল জ্যোৎস্না। এখন , লুপ্ত শহর থেকে মাথা তোলে স্মৃতিগাছ , এই মার্চ রোবটের মার্চ-পাস্ট হতে পারে , কিন্তু আর কোনো মেমোরিজ রাঁধতে পারেনা। জলের তলায় এক অদ্ভুত সাবমেরিনে আলো জ্বলে , তার ভেতর একা বসে 'জলে যে আগুন জ্বলে' লিখে চলেন হেলাল হাফিজ। খুদা হাফিজ, পূর্বজন্ম ; মনে রেখো , দু-একটা পালক আরও পুড়ে যাওয়া ছাড়া , আমার আর কিছুই হারানোর নেই ....