প্রতিবিম্ব

সোমনাথ ঘোষাল



তুষা একটা কফিশপে বসে। সঙ্গে দেবায়ন। কোল্ড কফিতে চুমুক দিয়ে, তুষা বলে, কাল বিকেলে চলে যাবে। বাবা মা’র কাছে। দেবায়ন কোন উত্তর দেয় না। বাইরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরায়। কফিসপের কাঁচ দিয়ে, তুষা দেবায়নকে দেখতে থাকে। সাদা টি-সার্ট নীল জিনস। কাঁচে মুখ লাগিয়ে তুষা দেবায়নকে দেখে। বাস্প জমে কাঁচের গায়ে। আবছা হয়ে আসে দেবায়ন। আঙুল দিয়ে স্পষ্ট করে নেয় তুষা। দেবায়ন সিগারেট শেষ করে এসে বলে, তাহলে আমার কি করব? তুই তো ওখানে থাকবি। দেখাও হবে না। আমাদের সম্পর্কটার কি হবে? তুষা কোন উত্তর দেয় না। বাইরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরায়। দেবায়ন কাঁচ দিয়ে দেখতে থাকে... আবছা।

এমনিতেই খুব কম কথা বলে তুষা। নিজের সঙ্গেই থাকতে ভালবাসে। বন্ধু বলতে একজন। নাম বৃতি । কিন্তু স্কুলের কোন কথাই মনে নেই তুষার। বৃতি যা বলে, সেটাই বিশ্বাস করে। সেই ভাবেই একদিন বৃতি বলেছিল, দেবায়ন না কী তুষাকে খুব ভালোবাসে। সেই স্কুলের সময় থেকে। দু-তিনবার একসঙ্গে বেড়িয়ে ছিল। কিন্তু তুষার কিছুই মনে নেই। বৃতি দেবায়নের বিষয়টা জানানোর পর থেকেই, তুষা এখন দেবায়নের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করে। পাঁচ বছর বয়সে তুষা ভোরবেলা অন্য একজনের গলায় “কে যাবি পাড়ে” রবীন্দ্রনাথের এই গানটা গেয়ে ওঠে। মা বাবা তখন পাশেই ছিল। তুষাকে জড়িয়ে ধরে আবার ঘুম পারিয়ে দেয়। তারপর যা হয়, পুজো, মন্ত্র, জ্যোতিষ, সেই সঙ্গে ডাক্তার। বই পড়ে কিছুই মনে রাখতে পারত না। স্কুলে যা শুনত সেটাই মনে রাখত। বাড়িতে এসে মায়ের কাছে বইয়ের পড়াগুলো শুনে মনে রেখে, পরীক্ষায় পাশ করে যেত। এখন শুধু স্কুলের নাম মনে আছে। আর বৃতি। স্কুলের বাকি কোন কথাই তুষার মনে নেই।

আটবছর বয়সে তুষা ভোরবেলা রেললাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে গেছিল। পাড়ার লোকেরা বাড়িতে দিয়ে যায়। ঘুম ভাঙার পর, কিছুই মনে ছিলনা তুষার। সেদিন রোববার। চাউমিন নিয়ে, টিভিতে কার্টুন দেখচ্ছিল। সেই ঘুমের জড়তা আজও লেগে আছে। চোখে চোখ রেখে, কথা না বলে অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলে। এখন তুষা তেইশ। দেবায়ন আর একটা কফি নিলো।
দেবায়ন- তোর কী মনে হয়, একটা সম্পর্ক যেখানে খুশি থেমে যেতে পারে!
তুষা- হ্যাঁ, নিজের সঙ্গেও একটা সম্পর্ক হয়। যখন শরীরটাও থেমে যায়।
দেবায়ন- আর মন?
তুষা- ওটা খুব মজার জিনিস। অনেকটা আমার জানলার মতন… কখনও খোলা আবার কখনও বন্ধ। তাই আধখোলা অবস্থায় রেখেছি। যাতে আলো আর বাতাস খেলতে পারে। আমি যেমন ডায়রি জমাই। কিন্তু কিছুই লিখি না। কারণ লিখলে, ডায়রির পাতাগুলোর গায়ে খুব লাগবে। কষ্ট হবে। আমার হাতের লেখা খুব খারাপ!
দেবায়ন চুপ করে যায় । কিছুই বুঝতে পারে না। বাইরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পরছে। রোদও আছে। একটু রোদের তলায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায়। তুষা আবার দেবায়নকে দেখতে থাকে। কফিসপের কাঁচ দিয়ে। দেবায়ন ভিজে যাচ্ছে। আলোজলের নিচে। তুষা কাঁচের বাস্পটা আঙুল দিয়ে মুছে দেবায়নকে স্পষ্ট করতে চায়। তুষার একটা আঙুল কাঁচে আটকে থাকে। আঙুলটা এবার নিজের মতই দেবায়নকে স্পষ্ট করছে। তুষা একটু দূর থেকে নিজের আঙুল দেখতে থাকে। ডানহাতের প্রথম আঙুল যেখানে বুদ্ধর মুখ আঁকা একটা আংটিও আছে। কাঁচের স্পর্শে আংটিটাও শব্দ করতে থাকে। তুষা আঙুলটা কাঁচ থেকে টেনে নিয়ে, সাদা রুমাল জড়িয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে।

ফাস্ট ইয়ারে পড়াকালীন তুষা আবার রেললাইন ধরে হাঁটতে শুরু করেছিল। মিনিট চারেক। সেই ট্রেনের শব্দ আজও কানে লেগে আছে। তাই তুষা সেইদিনের পর থেকে আর ট্রেনে ওঠে না। বাড়ি থেকে সবাই মিলে পুরী যাওয়ার কথা হয়। যেহেতু ট্রেনে যেতে হবে, তাই তুষা রাজি হয় না। শেষমেশ দিঘা যাওয়া হয়। গাড়ি করে। আসলে তুষা কাউকেই বিশ্বাস করতে পারে না। আসলে ঠিক বিশ্বাসও নয়। মনে রাখতে পারে না। সেটা সবাই বিশ্বাস ভেবে ফেলে। কাউকে কিছু দিতেও পারে না। নিতেও পারে না। অতএব তুষা ভুল! সবার কাছেই ভুল। বৃতি ফোন করে।
তুষা- হ্যালো… বোল…
বৃতি- কি রে কী করছিস? দেবায়ন কখন এলো?
তুষা- এই একটু আগে।
বৃতি- কি বলছে মালটা?
তুষা- সেই এককথা!
বৃতি- কোথায় এখন দেবায়ন?
তুষা- বাইরে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সিগারেট খাচ্ছে।
বৃতি- ওকে, কি বলল, জানাস। পরে কল করবো। আর তুই চাপ নিস না। আমি আছি।

দেবায়ন আসে। বলে কিছু খাবার বলতে। তুষা, চিকেন স্যান্ডউইচ আর চিকেন মেয়নিস অমলেট দিতে বলে। দেবায়ন খেতে শুরু করে। তুষা ওয়াস্রুমে যায়। টয়লেট করে, বেসিনে মুখ ধুতে থাকে। প্রায় তিন চারবার ধোয়ার পর, কানের পাশে একটা নীল পোকা না কী! দেখতে গিয়ে নখ দিয়ে তুলতেই মুখের অনেকটা চামড়া উঠে আসে। পাতলা গোলাপি রঙের আস্তরণ। তুষা বাকি আস্তরণটা মুখ থেকে তুলে নেয়। তুষার মুখটা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। আস্তরণটা ভাল করে বেসিনে ধুয়ে টিসু পেপারে ভাঁজ রেখে দেয়। এর আগেও এমন হয়েছে। তাই তুষা প্রতিবারই এই পাতলা নরম গোলাপি মুখের আস্তরণটা অ্যাকোরিয়ামে সাজিয়ে রাখে। গোল্ড ফিসগুলোর খুব প্রিয় খাবার। তুষা আসে। দেবায়ন তুষার জন্যে কিছুটা খাবার রেখেছে। তুষা খেতে শুরু করে। দেবায়ন বলে, তাহলে তোর স্কুলের চাকরিটা কি হবে। তুষা বলে, ছেড়ে দিয়েছি। দেবায়ন আর কোন কথা বলে না। অনেক রাত হয়েছে। দেবায়ন ঘড়ি দেখে, বেড়িয়ে যায়। তুষা আবারও দেবায়নকে কফিশপের কাঁচ দিয়ে দেখে। কুয়াশায় ঢাকা পাইনবনের পথ দিয়ে দেবায়ন মিলিয়ে যেতে থাকে। এই কফিশপটাও আবছা হয়ে আসে। সকালে একটা পাহাড়ি বাচ্চাদের স্কুলে পড়াত। দুপুর থেকে এই কফিশপে তুষা বসে থাকে। বই পড়ে। গান শোনে। রঙ তুলি নিয়ে আঁকিবুঁকি করে। তুষার ভাবনায় এখন শুধু দুটো চরিত্রই বেঁচে আছে। বৃতি আর দেবায়ন। বাবা মা এখন শুধু পুরনো অ্যালবামের ছবি… এই নির্জন পাহাড়ে শুধু পাইনের কথা কান পেতে শোনে। আর রোজ একটা করে গল্প বানাতে থাকে তুষা। আবারও কফিশপের কাঁচে বাস্প জমেছে। তুষা ব্যাগ থেকে আঙুলটা বের করে, বাইরের দৃশ্য স্পষ্ট করে নেয়…