নিখোঁজ ডায়েরী

রুবানা ফারাহ আদিবা ঊর্মি

ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটি মেসেজ “ চিনতে পারছো?”
মুহূর্তের মধ্যে কয়েক আলোকবর্ষ পেছনে চলে গেলাম যেন। ব্রেন সেল, নিউরন গুলো ইলেক্ট্রিকাল ইম্পালস পাঠাতে শুরু করলো শরীরজুড়ে। রক্ত কণিকারা কোরাস গাইল, “চিনি, চিনি, খুব চিনি”। কাঁপা কাঁপা আঙ্গুলে কিবোর্ডে টাইপ করলাম , “হ্যাঁ”।
আর ভেবে পেলাম না কি লিখবো, শুধু লিখলাম “ এখন একটু ব্যস্ত, পরে কথা হবে”।
দরজা ঠেলে বাইরে ব্যাকইয়ারডে বসলাম অনেকদিন পর আজ । আশ্বিনের শুরুতে গরমের ভাবটা একটু কমে এসেছে। বিকেল থেকেই হালকা হালকা ইলশেগুড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। এখন প্রায় ধরে এসেছে। সন্ধ্যের আবছা আলোয় একটা অদ্ভুত ঘোর। আকাশে ধুসর মেঘের ওড়না গেছে সরে, সফেদ জ্যোৎস্নাকারিকুরিসমে তডানামেলেছেসবুজঘাসের শরীরে।কিছুমুহূর্তআছে যেমন, সুনসান সন্ধ্যে, নিশ্ছিদ্র নির্ঘুম রাত, একাকী আলসে কাক ডাকা দুপুর, এই অদ্ভুত সময়গুলোতে নিজেকে ঠিক টের পাওয়া যায়, তখন কিছু কথা একলা জলভেজা হয়। সেই ছিল হয়ে যাওয়া “একদিন” আর সেই একা হয়ে যাওয়া কথার সাথে চলে প্রলাপ বিনিময়।
হালকা হিম হাওয়ায় রডোড্রেন্ডন এর হলদে শুকনো পাতাগুলো ঝরে পড়ার ঝুপ ঝুপ আওয়াজ এর সাথে পাল্লা দিয়ে আমার বাম অলিন্দে এখন লাব ডাব লাব ডাব, ক্রমেই দ্রুততর থেকে দ্রুততম হচ্ছে। আজকের ফোটা গন্ধরাজ ফুলগুলোর জলে ভেজা পাপড়িগুলো খসে পড়ে আমার আঙ্গুলের স্পর্শে। জমে থাকা কষ্টের সাপ দুমড়ে মুচড়ে আমাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়। পুরোনো ডায়রীর মলাটটা খুলে গেলে, কিছু হলদেটে পাতা, কিছু ঘটনা দুর্ঘটনা, আর একরাশ নিঃসঙ্গতা জড়িয়ে ধরে মৃদু মন্থর পায়ে।
তখন আমার সতের। অকারনেই মনখারাপ নামের গোপন এক পুকুরের জল উপচে পড়ে যখন তখন। আবার অসময়ে খুশির বে নি আ স হ ক ক লা ছেয়ে যায় দ্রাঘিমা রেখায়। তখন আমার জানালার ও পাশে কখনো ভেসে ওঠে বাস্প বাষ্প একটা মুখ। অনেক চেষ্টা করেও কখনই তাকে চিনতে পারিনা। এমনি একান্ত ক্ষন গুলো বুকে করেই আমার আমির দিনগুলো বয়ে চলেছিল। সেদিন, বাড়ির বারান্দায় বসে চোখ বুলোচ্ছিলাম দুর্বোধ্য ক্যালকুলাসে। সামনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। আমাদের একতলা বাড়ির পাশে একটা ছোট্ট বাগান। তার মধ্যে বারান্দার সাথে লাগোয়া একটা কদম ফুলের গাছ ছিল আমার সবচাইতে প্রিয়। বর্ষাকালের বিকেল, প্রাণপণে চেষ্টা করছিলাম বুঝতে এ বি এবং সেই সাথে মাঝে মাঝে সি ও এসে জুটে যায়, এক সাথে এত জটিল সূত্র সৃষ্টি কি আসলেই এত জরুরী ছিল। মন বসছিলনা এই অপাঠ্যে। কদম ফুলের সুগন্ধিতে মন উচাটন একদিকে, আর অন্যদিকে অর্থহীন অ্যালজেব্রার পাকদন্ডীতে ঘুরে ঘুরে মরছি। একসময় পড়বার বই বন্ধ করে উঠে পড়লাম। বাড়ি থেকে বেরিয়েই একটা মাঠ। বর্ষায় ঘাসগুলো নচনচে হয়ে উঠেছে, খালি পায়ে হাঁটবার সুখই অন্যরকম। আহ, সেদিনকার সেই মাটির সেই সোঁদা গন্ধটা আজো পেলাম যেন । হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে পৌছেছিলাম মাঠে। কোণার দিকে একটা শিমুল গাছ ছিল, সময়ে অসময়ে আমার নির্জন হয়ে যাওয়ার একান্ত নিজস্ব জায়গা। কিন্তু বসবার জায়গাটা সেদিন ছিল অন্য একজনের দখলে, আরো কাছে যেতে দেখলাম কোনো একটা গানের সুর গুনগুন করছে সে। জলপাই রঙা গায়ের রঙ, জিন্স, হালকা হলুদ টিশার্ট, কাঁধ পর্যন্ত হালকা কোঁকড়া মত চুল নেমে এসেছে আর হাতে নিকোটিন স্ফুলিঙ্গ । একে আমি দেখেছি কোথাও। বারান্দায় পড়ার সময় চোখে পড়েছে, রিমির বাড়ির ছাতে। সামনে যেতেই ধোঁয়া তাড়িয়ে হেসে বললো, “তুমি রুপু, সামনের বাড়িতে থাকো। এসময়টা রোজ দেখি তোমায় বারান্দায় পড়তে। আমি শুভ, রিমির কাজিন, ঢাকা থেকে এসেছি বেড়াতে।“ ক্যামেরা তার সাবজেক্ট খুঁজে পেল যেন, টোল ভাঙ্গা হাসিটায় লেন্সের ফোকাস স্থির। ক্লিক ক্লিক ক্লিক। গভীর রাতের আকাঙ্খিত সেই মুখাবয়ব আর আবছা নেই, মনে হলো এইতো এইই, খুব পরিচিত। রদেঁভু, এটাই রদেঁভু। সর্বনাশা দৃষ্টি সে চোখে। “বোসো”। ঠিক অনুরোধ না আদেশ, বুঝবার আগেই আমিও সম্মোহিতের মত বসে পড়েছি তার পাশে। আমার সম্পর্কে মোটামুটি তথ্য সংগ্রহ শেষ। ঘন্টাখানেক বসেছিলাম। জানলাম সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যে শেষ বর্ষের ছাত্র।
শুভ......।।হ্যা, এর পর থেকে সে আমার বিকেল বেলার বুকে চোরা অস্থিরতা। বাড়ির সবার চোখ এড়িয়ে তার চোখের আগুনে পোড়া। তার অবাধ্য চঞ্চলতায় আমার নিষিদ্ধ ভাললাগা, নীল রঙ্গা আকাশ বদলে গিয়ে ফিরোজা হয়ে যাওয়া। বয়ে যায় একের পর এক দিনগুলো- ভাললাগার চকলেটের মত, যেন মুখে দিলেই গলে যাচ্ছে নিমেষে। আবার নতুন আরো একটা বাক্স খুলে চুরি করে নেয়ার সুযোগের অপেক্ষা করা।
বৃষ্টির পর আকাশজোড়া মেঘ ভাঙা অপরূপ রোদ একদিনের সেই দুপুরে। জানালার কাঁচে মাখামাখি তার সোনাঝুরি আলোর কণা, শার্সিতে গাল লাগিয়ে চোখ বুঁজে আলো মাখছি। ঘরের ভেতর হালকা পায়ের শব্দ, বাতাসে তার পরিচিত গন্ধ। আমার কাঁধে চেনা স্পর্শে, ঘোর লাগা দুপুরে বলেছিলাম “তুমি কে?”। আমাকে কাঁপিয়ে দিয়ে সে বলেছিল,
“পদ্মপাতায় জলের বিন্দু হ’য়ে
জানি না কিছু-দেখি না কিছু আর
এতদিনে মিল হয়েছে তোমার আমার
পদ্মপাতার বুকের ভিতর এসে।
তোমায় ভালোবেসেছি আমি, তাই
শিশির হয়ে থাকতে যে ভয় পাই,
তোমার কোলে জলের বিন্দু পেতে
চাই যে তোমার মধ্যে মিশে যেতে
শরীর যেমন মনের সঙ্গে মেশে।
সেই নিশ্বাস যেন হাতুড়িতে ভাংছে বুক। একটা দুরন্ত নদী, তার বুক জুড়ে একটাই পাল তোলা নৌকো। মনে হয়েছিল, এখন আমরা মরে গেলেও মরে যেতে পারি।
সেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছিল। ঘর থেকে বেরোতে ইচ্ছে করেনি। কিন্তু শাসনগুলো তখন আমার ঘরে ঢূকে পড়েছে। চিৎকার, চেঁচামেচি, আর আমার পড়ার টেবিলের বইগুলো তখন বারান্দায় স্তূপ।
“ছিঃ রুপু ছিঃ ?”
সাইক্লোন এর পর যেমন সব শান্ত হয়ে আসে, তেমন অসহ্য রকম নিশ্চুপ সব, শুন্যতাগুলো মাল্টিকালার পোলকা ডটের মত। ঢাকায় ফিরে যাবার দিন শুভ এসেছিল। বাড়ির সবাইকে অগ্রাহ্য করে বেয়াড়া পায়ে আমার ঘরে ঢূকে আমাকে দেয়ালে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি যাবে কিনা আমার সাথে শুধু একবার বলো”। আমি নিরুত্তর ছিলাম। আমার ভালোবাসার মানুষকে আমি কোনো জবাব দিতে পারিনি সেদিন।
সময় চলে গেছে নদীর স্রোতরেখা ধরে আর আমিও ভেসে ভেসে কখন চলে গেছি গভীর ঘূর্ণি জলের ঠিক মধ্যেখানে। আমার সেই ফিরোজা আকাশ সংকুচিত হতে হতে এখন পাঁচ হাজার স্কয়ার ফিটে এসে ঠেকেছে। লোডশেডিং আর জোনাকি মফস্বল থেকে সোডিয়াম আলোর এই ব্যস্ততম শহরে এখন আমার সংসার, একটা সুদৃশ্য খাতার পাতায় সেই সংসারের রোজনামচা লেখা হয় প্রতিদিন যত্ন করে নির্ভুল ভাবে।
ফোন বাজছে অনেকক্ষন। সবুজ ঘাসের ওপর লেপ্টে থাকা সফেদ জ্যোৎস্নাএখনগড়িয়েগড়ি য়েতারঅবস্থানপাল্টেছে ।ঘরেরভেতরেফোনবেজেচলে ছে, অনীকের আসার সময় হয়ে এলো। দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে এলাম, কাউন্টার টেবিলের টাইম পিসে সময় রাত সাড়ে নয়টা।
ল্যাপটপের নীল বাতিটা টানলো কাছে।
শুভ লিখেছে,
“জানি আমি তুমি রবে-আমার হবে ক্ষয়
পদ্মপাতা একটি শুধু জলের বিন্দু নয়।
এই আছে, নেই-এই আছে নেই-জীবন চঞ্চল;
তা তাকাতেই ফুরিয়ে যায় রে পদ্মপাতার জল
বুঝেছি আমি তোমায় ভালোবেসে “
আরো লিখেছে,
“রুপু, সেদিন এলে না কেন, আমাকে জানতেই হবে”।
সেই সব অকপট দিনগুলো থাকে বলেই এমন সব ঘটনা ঘটে যায়, যদিও তারা জায়গা করে নেয় ডায়েরীর হলুদ পাতায় ঠিকই কিন্তু পরিক্রমা রয়ে যায় জীবনভর। মেসেঞ্জারের একটা নোটিফিকেশন নজরে এলো, চিরচেনা কারো কাছ থেকে নতুন করে বন্ধু হবার অনুরোধ।
আকাশ থেকে শিউলিফুলের মতো নক্ষত্রপুঞ্জরা ভীড় করে নেমে এলো নীচে, কানের খুব কাছে, ফিসফিস করে বললো, “ও রুপু – “বেঁচে ওঠো, নিয়মের বাইরে বেরিয়ে এসে নিজেকে মুক্ত করো”।