ঢেকুর ও আর তিন অনু গল্প

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

ঢেকুর

উবু হয়ে বসে আলখাল্লা, কিছুটা বিপজ্জনক আঁধার কুড়িয়ে চলে গেল।
গরীবের নাম অযত্ন, তাই দূর থেকে দেখছিল -
ঘুণধরা বাঁশে ঠেস দিয়ে খিদের মত রাত নেমে আসে।
দাঁতের ফাঁকে শুকনো মুড়ি মিইয়ে যাওয়ার পর মনে পড়ে-
চালের বস্তা কেটেও এমন আলখাল্লা হয়। ঠিক যেমন আলখাল্লা পরে ছোটবেলা সাইকেলের টায়ার গড়িয়ে নিয়ে যেতো পানা-পুকুরের পার ধরে। পুকুরগুলোতে এখনও টায়ার ভাসে। নষ্ট জল, নষ্ট চামড়া... পচে গেছে, বোঝা যায়।
মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা মুড়িগুলো হাওয়ায় পালিয়ে বেড়ায়। ছুঁড়ে দেওয়া খইয়ের কথা মনে পড়ে তাদের দেখলে, যেগুলো পথে উড়ে উড়ে যায়, কোনও নিকটজনের ঠাণ্ডা দেহর স্মৃতি নিয়ে। তাদের কুড়নোও অনেকটা অন্ধকার কুড়নোর মতই। অথচ, অতটাও বিপজ্জনক নয়।
তবুও কুড়োতে কিংবা আলখাল্লা পরতে ভয় হয় অযত্নের। আজকাল আর ছোটবেলার মত জাম কিংবা টগর কুড়োনোর ব্যাপার নয়। কুড়োতে কুড়োতে পিঠ ধনুক হয়ে গেছে। পায়ের বুড়ো আঙুল আর নাকে একটা ছিলা বেঁধে শাঁ করে একটা বিষাক্ত তির ছুঁড়ে দেওয়া যায়। কিন্তু সে কায়দা জানা নেই। এমনিতেই গরীব, তার ওপর নাম অযত্ন। বিপজ্জনক কোনও কিছুতেই হাত দেওয়ার সাধ্য নেই।
যে লোকটা লম্বা আলখাল্লা পরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ছবির ফ্রেমে... তাকেও ওই ছবিতে চন্দন আর মালা দিয়েই কপালে হাত ঠেকায় সবাই। নাম যতই অযত্ন হোক, বাঁধানো ছবি অথবা সাদা-কালো হ'তে মন চায় না। থালাটা টোল খাওয়া হলেও এখনও খানিক মুড়ি আর তলানিতে চানাচুড় আছে... শেষ করতে হবে। তারপর একটু জল খেলে... ঠিক ঢেকুর উঠবে। পেটচুক্তি ঢেকুর।

অতল নৈঃশব্দে এমন ঢেকুরের শব্দ শুনেছো কখনও? সত্যি বলো তো... বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে না?




অন্যের গল্প


রাস্কিন বণ্ডের একটি গল্পে একটি বিশেষ অংশে সেই অঞ্চলের মদের কথা বলতে গিয়ে লেখা ছিল -
শোনা যায়, এই অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা মদ তৈরীর একটি ট্যাঙ্কে একবার একজন খুন করে তার লাশ ফেলে দেওয়া হয়। সেই লাশের আর কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ বলে, সেই লাশ সেই ট্যাঙ্কের ভেতরেই পচেছে, তার নির্যাস বছরের পর বছর ধীরে ধীরে মিশেছে মদে। এই অঞ্চলের মদে বিশেষ স্বাদ বা ফ্লেভারের গুণ নাকি ওই নির্যাস থেকেই। স্থানীয় মানুষ নিজের অজান্তেই সেই মদের প্রতি আসক্ত হ'তে হ'তে ক্রমে হয়ে উঠেছে নরখাদক। তারা জানেই না, মদের প্রতি তাদের স্বাভাবিক আসক্তি ব অনুরাগ... আসলে নরমাংসের প্রতি আসক্তি। নেশাটা মদের নয়, সেই পচে যাওয়া শবের নির্যাসের।
- কিন্তু এটা তো অন্য গল্প... তোমার গল্প কই?
- ওইরকমই একটা ব্রিওয়ারীর ভেতর... আমি আর আমার গল্প...
- ম্‌-মানে?
- আসুন, এই পথে একটু এগিয়েই পানশালা। একবারও পেছন দিকে না ফিরে সোজা এগিয়ে যান। শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার নাটুকেপোনাটা আমার একেবারেই আসে না।



কাজের জিনিস


- ঘর ভর্তি জিনিস... পুরনো জিনিসও অনেক।
- হ্যাঁ।
- তার মধ্যে এমন অনেক কিছুই আছে, যা কোনও কাজে লাগে না।
- হ্যাঁ, তা আছে।
- সেগুলো রেখে দাও কেন?
- সব জিনিস তো চাইলেই ফেলে দেওয়া যায় না। বাবা কথায় কথায় ফেলে দেওয়ার, বেচে দেওয়ার অভ্যেস ছিল। মা রাগ করত। বলত - "ফেলে দিতে এক সেকণ্ড লাগে। কিন্তু দরকারের সময় তা আর ফিরে পাবি না। "
- কিন্তু এখানে তো বলছ - দরকার লাগে না, কাজে লাগে না...
- যদি কখনও দরকার পড়ে? তখন? এখন থেকে জানব কী করে কখন হঠাৎ দরকার পড়বে?
- দাঁড়াও। তোমাকে হেল্প করছি। যেগুলো দরকারের জিনিস নয় সব কিছুর একটা লিস্ট করো আগে। তারপর সেগুলো লিস্ট মিলিয়ে জড় করো এক জায়গায়। তারপর ভাবো... তার মধ্যে সত্যিই কী কী এমন জিনিস আছে, যা আর কোনও কাজে লাগানো সম্ভবই না। মানে - একেবারে ফালতু! বুঝলে?
- তারপর সেই ফালতুদের কী করব?
- কী আর করবে? ফালতু জিনিস কি কারও কাজে লাগে? এমনিতেই দিয়ে দিও... নাহ'লে আপদ বিদেয় করো। ঘরটায় একটু হাওয়া বাতাস খেলুক! উফ!
- তাহ'লে করি... লিস্ট?

--- --- ---

- ওষুধের নাম লিখে রেখেছো তো, রাংতাগুলো ফেলে দাও!
- রাংতা গুলো বাসন মাজতে লেগে যায়।
- রদ্দি হয়ে যাওয়া জামা-কাপড়গুলোকে বাইরে নিয়ে গিয়ে রাখো। ওই ভাঙা বালতিটায় ঢুকিয়ে দাও।
- ন্যাতা, ঘর মোছা... ও ঠিক কিছু না কিছু কাজে লাগিয়ে নেয়। পুরনো কাপড়-জামা দিলে বাসনকোসনও তো দেয়।
- ওই টেবিল পাখাটা ফেলে দাও। ওর আর কিছু নেই।
- ভেবেছিলাম লোহা-লক্করকে বেচে দেবো। দেবো দেবো করেও হয়ে ওঠেনি... পঞ্চাশ বছর আগের জিনিস, বাবা কিনেছিল। ওই টেবিল ক্লক আর পাখা, দুটোই অকেজো। কিন্তু...
- দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর কী করবে, মিউজিয়াম বানিয়ে ফেলো ঘরটাকে।
- দেখুন না, যদি আর কিছু ফেলা যায়।
- বালতি, গামলাগুলোতো ফেটে গেলেও ফেলবে না, মাটি দিয়ে গাছ লাগাবে, তাই তো?
- না না... ওগুলো ফেলেই দেবো ভেবেছি। কিন্তু ওগুলোতে একটু পুরনো কাপড় দিয়ে রাখতে হয়... শীতকাল এলে মনা, কালু, গোপাল, ওরা একটু আরামে শুতে পারে। কীই বা করতে পারি ওদের জন্য। দুবেলা যা বাঁচে, ওই খায়।
- ফালতু ধুলো পড়া ফাইল-পত্র, কাগজ, বিল, ফর্দ, প্রেসক্রিপশন... রাজ্যের আবোলতাবোল কাগজের মধ্যে যে ধুলো গিজগিজ করছে। দেখেছো কখনও ঠিক করে?
- ওরে বাবা, ও যে সব দরকারী কাগজ পত্র। সব অরিজিনাল আর জেরক্স ফাইলে ফাইলে রাখা। সব লোনের কাগজ, লোন মিটিয়ে দেওয়ার কাগজ। পলিসির কাগজ। অসুখ-বিসুখের রিপোর্ট, প্রেস্ক্রিপশন। ফেলে দিলে তো পরে দরকার লাগে কেলেঙ্কারী হবে!
- দরকারী বুঝলাম, কিন্তু সব? তিন বছর আগের ফর্দ, বিল... ওসব আর কোনও কাজে লাগে?
- না না, বেশি পুরনো হয়ে গেলে ফেলে দিই... মানে, দিয়ে দিই ছেলে-মেয়েদের। ওরা ওই কাগজ কেটে খেলে। কীসব বানায়। রঙ করে। খবরের কাগজওয়ালাকে বেচে কিছু লাভ হয় না। বেকার।
- অবাক করলে নিরঞ্জন, ঠাসাঠাসা করে একটা ঘরে পড়ে আছো ছেলে-মেয়ে নিয়ে... আর এত রদ্দি জিনিসের মাঝেও একটা ফেলার জিনিস নেই?!

নিরঞ্জনের ওপর একরকম বিরক্ত হয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে দেখলাম ওর মেয়েটা ছোট ছোট কাগজের নৌকো বানাচ্ছে। আর ছেলেটা বাড়ির সামনের খোলা নর্দমায় ফেলে দিচ্ছে সেগুলো। নর্দমার জলে ভেসে যাচ্ছে এক এক করে। দুলে দুলে এগিয়ে, স্ল্যাবের নিচের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। হাত থেকে দুটো নৌকো নিয়ে কাগজগুলো খুলে দেখলাম। একটা অনেক পুরনো ইলেকট্রিকের বিল। আর একটা - বই থেকে ছেঁড়া কবিতা লেখা কাগজ। মাস ছয়েক আগে আমিই বইটা দিয়েছিলাম, আমার একটা কবিতা ওতে ছেপে বেরিয়েছিলো বলে। অসহ্য!



দু’টো পাতার কথা

এক পাশে জলঢাকা আর এক পাশে মূর্তি, এই দুই যুবতী সঙ্গিনী নিয়ে এখনও রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে চাপড়ামারি অভয়ারণ্য। হ্যাঁ, অভয়ারণ্য এখন বলা হয়, যেমন স্বাধীন দেশে রাজবংসের বর্তমান বংশধরদের এখনও কেউ কেউ বলে 'হিজ-হাইনেস'। এক কালে ঘণ অরণ্যই ছিল, যেমন সেই রাজবংসেরও পুরনও কথা শোনা যায়... এই পাহাড়ি জঙ্গলেরও তেমনই শোনা যেত বই কি! জলঢাকা বৃষ্টির জল পেয়ে ফুঁসে উঠলে তাতে হাতিও যেতে চাইত না। শীতের দুপুরে তার কাছাকাছি দেখা যেত চিতাবাঘদের। দোনলা বন্দুক আর একদল লোক নিয়ে 'শিকার শিকার খেলা' করে বীরত্ব দেখানো সেই সব অঞ্চলে তখনও শুরু হয়নি। মাঝে মাঝে পড়ন্ত দুপুরের রোদ পোয়াতে পোয়াতে কিছু অতিবৃদ্ধ গাছ হঠাৎ করেই পুরনো দিনের এইসব কথা ভেবে যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে... তার সঙ্গে কিছু শুকিয়ে আসা পাতাও ভেসে চলে যায় জঙ্গলের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে। ভেসে যায় নদীর থেকে। নদীর নুড়ি ছড়ানো জমিতে টুপ করে। কখনও পাথর আটকে থাকে, কখনও ভেসে যায়।
দূর থেকে ভেসে আসা এমনই একটা বড় মাপের হলদে হয়ে আসা পাতা অনেকক্ষণ পাথরের হাঁটু ছুঁয়ে পড়েছিল। অনেকটা শিরীষ গাছের পাতার মত ঝিরিঝিরি পাতা। হঠাৎই একটা শিশু গাছের পাতা এসে ঠেকল তার গায়ে। আশ্চর্যের কথা সেই শিশু গাছের পাতাটা কিন্তু সবুজ, যেন কিছু পাতাটা ডাল থেকে ছিঁড়ে ভাসিয়ে দিয়েছে জলঢাকার স্রোতে। হ্যাঁ, স্রোত আছে তখনও বর্ষা শেষ হয়ে এলেও স্রোত আছে। পাতারা গায়ে গা লাগিয়ে ডুবো পাথরের ফাঁকে আটকে রইল এক প্রহর, দুই প্রহর, তারপর সন্ধে নেমে এলো। রাতে হঠাৎ পাহাড়ী জোলো হাওয়া বয়ে এলো শনশন করে ডালপালায় শিরশির কাঁপুনি ধরিয়ে। তারপরেই তুমুল বৃষ্টি, আর মেঘের ডাক। দু তিন বার বাজ পড়ল, বন্দুকের শব্দের মত। আর তারপর কোথাও কোথাও গাছের ডাল, কিংবা আস্ত গাছটাই ভেঙে পড়ার শব্দ। অভ্যেস থাকে... অরণ্য, নদী, আরণ্যক, এইসব শব্দের অভ্যেস তাদের হয়েই যায়। আর অভ্যেস থাকে বলেই, অন্য রকম শব্দগুলোও চিনতে ভুল হয় না।
সকালবেলা আর পাতা দুটো দেখা গেল না। রোদের আলোয় শ্যাওলাহীন ডুবো পাথর ঝিলমিল করে হেসে উঠল, পাতারা চলে গেছে। রাতের স্রোতে ভেসে গেছে। গেছে, কিন্তু কোথায়?... জানা নেই।

--- --- ---

নদীর যেমনই সুনাম-দুর্নাম থাকুক, হড়পা বান না এলে মানুষের লাশ বেশি দূর বয়ে নিয়ে যেতে পারে না। একটা ছেলে আর একটা মেয়ের লাশ দেখেই - ভোরবেলা নদীর ধারে জঙ্গলে আসা কাঠকুরুনিরা পুলিশে খবর দিয়েছিল। এখন একটু ভিড় জমেছে। ভিজে চুপচুপে লাশ, ভিজে চুপচুপে জ্যাকেটের ওপর রোদের আলো ঝিকমিক করছে। জামায় রক্তের দাগ। জল লাগছে বলে জমাট বাঁধছে না। দুজনেরই মুখটা দেখার চেষ্টা করছে লোকজন উঁকি ঝুঁকি দিয়ে। একজন মেয়েমানুষ বলল মেয়েটা বোধহয় মরেনি! তারপর থেকে আরও হইচই। না, যারা উপুর হয়ে পড়ে আছে, তারা এদিকের কেউ নয়। কোথা থেকে ভেসে এলো, কেন রক্তের দাগ... জলঢাকাকে জেরা করে লাভ নেই।