পতনের শব্দ

শতাব্দী দাশ

চৌখুপি ঘরটায় ঢোকার আগে পর্যন্ত বাবলু ভেবেছিল, পাসওয়ার্ড জানা আছে। কিন্তু কার্ড পাঞ্চ করতে মেশিন যখন চারটি সংখ্যা জানতে চাইল , আশ্চর্য ব্যাপার, কিছুই মনে পড়ল না তার! মগজে একদম শুনশান, সন্নাটা! মাথার মধ্যে খোঁড়াখুঁড়ি চালাল সে সেকণ্ড ত্রিশেক। তারপর টক্ টক্ করে টিপল চারটি বোতাম। রং পাসওয়ার্ড!


সামান্য বিব্রত হল বাবলু । টাকা দরকার আজ। ছয় বাই আট চৌখুপিটার শীতলতার ঠিক বাইরে সেপটেম্বরের ঘর্মাক্ত গড়িয়াহাট। দোকানমুখী মানুষের স্রোত। ভিড়ে চোখ রেখে বাবলু ভাবল, পুচকির জন্য জামা কিনতে হবে ৷ কাঁচের দরজার বাইরে,সিকিওরিটির ছেলেটার গায়ে নীল প্যান্ট আর আসমানি জামা, যেমন আসমানি রঙ হওয়ার কথা ছিল শারদাকাশের । বহুদিন হয়নি! ছেলেটির ঈষৎ ঝুঁকে বসার ভঙ্গিতে গ্রীষ্মের হাসপাতালের মতো কিছু আছে।


ছেলেটি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। অপ্রস্তুত চোখ সরিয়ে নিয়ে আবার একবার মেশিনের দিকে ঘুরে দাঁড়াল বাবলু। কার্ড পাঞ্চ করল। আবার মগজের তাক হাতড়ানো। একদুইতিনচারপাঁচছয়সাত আটনয়...চার অঙ্কের হাজার হাজার সংখ্যা-সম্ভাবনা মাথার মধ্যে ফাটছে। খট্ খট্ খট্ খট্ । আবার চারটে বোতাম। আবারও ভুল!


এসি-র মধ্যেও বিজবিজ করে ঘামছে সে এবার। একবার রগ চেপে ধরল। সে কি ক্লান্ত? স্ট্রেসড? নাম কি তার? মেয়ের ভালো নাম? বাড়ি কোথায়? এ'সব অবশ্য মনে পড়ল একে একে।


এবার লেভেল টু চ্যালেঞ্জ রাখল সে নিজের সামনে৷ ইমেইল পাসওয়ার্ড মনে করার চেষ্টা করল। ফেসবুক পাসওয়ার্ড। হোয়াটস্যাপ কোড। বাবার ফোন নাম্বার। নিজের নাম্বার। সব কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল । কিছু মনে পড়ছে,কিছু পড়ছে না৷ গুপ্ত যত সংখ্যা-বর্ণ-সংকেতের মেইজে সে দিশেহারা বোধ করল। তৃতীয়বার বোতাম টেপার আগেই জানা ছিল, ভুলই হবে।


আকাশরঙা জামা পরা ছেলেটি উঠে এসেছে । ‘কোনো প্রবলেম স্যার?’ বাবলু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল, ‘সব ভুলে যাচ্ছি৷’ বলতে বলতেই উদ়্ভ্রান্তর মতো চতুর্থবার কীবোর্ডে হামলে পড়ল সে। এবং শেষবারও ভুল। মেশিন ঘোষণা করলঃ ‘সরি। টুউ মেনি রং অ্যাটেম্পটস। ইয়োর কার্ড হ্যাজ বিন লকড ফর আ ডে।’


পুচকির জামা কেনা আর হল না আজ৷ কনফিডেন্স হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল - বাবলু শব্দ পেল তার । মাস-মাইনের টাকা। স্বোপার্জন। তাতে তার কোনো অধিকার নেই আপাতত। আবার ধরা যাক সম্পর্ক। অর্জিত সম্পর্কই। তাকে ধরে রাখার পাসওয়ার্ড তার জানা নেই ৷ আপাতত মেশিনকে ‘বাঞ্চোদ’ বলে বেরিয়ে এল সে। পার্স হাতড়ে দেখল, কত আছে। মহার্ঘ্য একটা পুজোর জামার পক্ষে বড় কম। পুচকির মা, বাবলুর প্রাক্তন বউ স্মিতা এক বেসরকারি ফার্মে চাকরি জুটিয়েছে। যতই টানাটানি হোক, সে-ও জামা দেবে একমাত্র মেয়েকে। স্মিতার দেওয়া জামাটার থেকে ঝিংচ্যাক হতে হবে বাবলুর উপহার। ছাপিয়ে যেতে হবে। মেয়ের মুখ চক্ চক্ করে উঠবে। মায়ের মুখে দু পোঁচ কালি। এরকম চিত্রনাট্য শূন্য মগজে ঘুরপাক খায় বাবলুর৷


অগত্যা খুচরো কুড়িয়ে-বাড়িয়ে জামা কেনার ইচ্ছে ত্যাগ করল সে । বরং মোড়ের মাথায় নিজের জন্য কিনল একমাসের মতো ফিল্টার, ওসিবি পেপার। আর কিনেতে হবে ঘুমের ওষুধ। মায়ের পুরোনো প্রেসক্রিপশন ঝেঁপে দিয়েছিল ক’মাস আগে৷ এখানে-সেখানে ওটা দেখিয়ে ঘুমের ওষুধ কেনা যায়। এক এক ডোজের অ্যালজোলামের এক এক রঙ। গোলাপি, নীল, হালকা সবুজ...রঙ জমায় সে। আত্মহত্যাও একটা দুরূহ গন্তব্য। ল্যাধ হয়। কোনো একদিন, আশ্বিনের কোনো শারদপ্রাতে হয়ত…স্মিতা কি হাঁফ ছাড়বে? মেয়েটা এত ছোট, ভুলে যাবে কিছুদিনে। এমনিতেও পুচকির জীবনে সে একটা পিতৃপরিচয় মাত্র। বাবলু আর লেট ধীরাজ চক্কোত্তিতে কতটুকু ফারাক?


***********


রয় মেডিক্যালের দরজায় বেণীর সঙ্গে দেখা। বেণী একটা ডাবল এক্সএল হাগিজের প্যাকেট কিনেছে। বেণীর শাশুড়ি বেড-রিডেন৷ বেণী কি এখনও বীমা এজেন্ট?বেণী পালিয়ে বিয়ে করেছিল এহ্সানকে। এহ্সান বাবলুর ছোটবেলার বন্ধু। এহ্সানের ছোটখাটো মণিহারি দোকান ছিল বেহালা ট্রাম-ডিপোয়। শাশুড়ির রোগ, মেয়ের কিণ্ডারগার্টেন, নাচের স্কুল- সব কুলোতে বেণী ‘রোজ ভ্যালি’ করত। ক্রমে এহ্সানের টালির বাড়িতে ছাত পড়ল। এহ্সান বিলিতি খাইয়েছিল ছাত পড়ার দিন । বেণীকে আগে দূর থেকে দেখেছিল বাবলু৷ সে রাতেই ভালো করে আলাপ হল । বেণীর লুঙ্গি পরা মোটা বর চার পেগের পর লুটিয়ে পড়তেই সে বাবলুর কোল ঘেঁষে বসেছিল। তার শিফন শাড়ি অবাধ্য হচ্ছিল। ‘একটা ইনশিয়োরেন্স করাও না গো! বউ-মেয়ের নামে!’ বেণী কি সত্যি জানত না বউ-মেয়ে তাকে ছেড়ে গেছে? এহ্সানের দিকে আড়চোখে তাকিয়েছিল বাবলু। তার নাক দিয়ে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ শব্দ হচ্ছিল । লুঙ্গির খানিকটা উঠে গিয়ে রোমশ পা বেরিয়ে পড়েছিল। থলথলে শরীরটাকে কাত করে পাশ ফিরিয়ে দিয়েছিল বাবলু । ঘুমের মধ্যে পাশবালিশ জড়িয়ে ধরেছিল এহসান শিশুর মতো । দু কামরার বাড়ি ওদের। পাশের ঘরে এহসানের মা,মেয়ে ঘুমুচ্ছিল। বেণী তাই বাবলুর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেছিল বারান্দায়। পূর্ণিমার রাত ৷ সেফটপিন না আঁটা থাকায় বেণীর আঁচল খসে পড়েছিল সহজে। সেই সময় একটা দশহাজারি বীমা করিয়েছিল ধীরাজ চক্কোত্তি। দশ না পনের? আবারও স্মৃতি হাতড়ালো বাবলু । বণ্ড-টা ফেলে দিয়েছে ‘রোজ ভ্যালি’ চৌপাট হওয়ার পর। বাবলু সরকারি কর্মচারী ৷ মাস মাইনে মন্দ নয় । শাঁসালো মক্কেল,তাই বেণী তার সঙ্গে সিনেমা দেখতে যেত। অন্ধকারে তার হাতের ওঠানামায় খিলখিল করত। বাবলু চতুর ভাবে দশ বা পনের হাজারের একটা টোপ দিয়ে বলেছিল, পরে আরও বড় ইনশিওরেন্স করাবে। কিন্তু বেণীর কাম্পানি লাটে উঠল৷ ছাত ফেলা বাড়ি ফেলে লা-পাতা হয়ে গেল পরিবারটা। এসব নিয়ে কোনো ত্যানা ছিল না বাবলুর। স্মিতার পর কাউকে না কাউকে তার লাগতই৷ বেণীকে সহজে পাওয়া গেছিল। মাছ যেচে-পড়ে বঁড়শি থেকে দানা খেতে এসেছিল। অবশ্য যখন জানত না বেণীর কাম্পানি লাটে উঠবে, তখন ইনশিওরেন্সটা সে পুচকির নামেই করেছিল, স্মিতাকেও নমিনি ক’রে।


************


চলে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই, স্মিতা খুব ঠাণ্ডা মেরে গেছিল৷ ঠাণ্ডা চোখের চাউনি, ঠাণ্ডা কথাবার্তা, ঠাণ্ডা শরীর। যেন কোল্ড স্টোরেজে বাস করছে, মনে হত বাবলুর। ঘুষি মেরে বরফ ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করত । শুরুর দিকে কলকল করত খুব। এই নালিশ, সেই অভিযোগ। শাশুড়ি খোঁটা দিয়েছে খাট-বিছানার কোয়ালিটি নিয়ে, শ্বশুর তার হাতে চা খেল না...নানা বায়নাক্কা! বাবলু ‘হ্যাঁ’ ‘ হুঁ’ করত। আসলে শুনতে ইচ্ছে করত না। মেয়েলি ক্যাচাল কার ভাল লাগে ভরসন্ধ্যায়? অফিসে হাজার হ্যাঙ্গাম, পলিটিক্স, ম্যানেজরকে সমঝে চলা, প্রোমোশনের ফাইলটা এগিয়ে দেওয়া হাত কচলে...এসবের পর বাড়ি ফিরে পুরুষমানুষ আশ্রয় চায়। গা এলিয়ে দেবে সোফায়, বউ চা নিয়ে এলে কোমর জড়িয়ে ধরবে- এ’জন্যই তো মানুষ বিয়ে করে!


তাও শুরুতে একটা মোটামুটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল ৷ গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে স্মিতা শান্ত হত। বুকে মুখ গুঁজে দিত। বলত, ‘তুমি ছাড়া এখানে আমার কেউ নেই।’ ব্যালেন্স খেলায় চামচে থেকে মার্বেলকে পড়ে যেতে না দেওয়ার জন্য শিশু যেমন সতর্ক চেষ্টা করে, দাম্পত্যের শুরুতে তেমন চেষ্টা করত বাবলুও। সে জানত, স্মিতা ভালো নেই। অনাদরে নেতিয়ে আছে। কিন্তু স্মিতার মধ্যে অবাধ্য ঘোড়ার একটা রোখ ছিল, যাকে ভয় পেত সে। ক্রমে বাবলু বুঝল, তার হয়ে তার মা স্মিতাকে দাপে রাখলে, তার সুবিধেই হয় । সে নিশ্চিন্দি বোধ করে। মার্বেলকে কৌটোয় পুরে ফেলা জরুরি মনে হত, যাতে সে গড়িয়ে এদিক-ওদিক না যায়। শিশু মার্বেল হারাতে ভয় পায়।


বিয়ের বছর তারা বেড়াতে গেল নেতারহাট। স্মিতার হাত ধরে দুদিকে সর্ষে আর ভুট্টার খেতের মাঝে একটা পাহাড়ি রাস্তায় সে হেঁটেছিল। তারপর একসময় লোকালয় কমে এল। রাস্তার দুপাশে বড় বড় গাছের চাঁদোয়া। গাছের আড়ালে-আবডালে শরীর ছোঁয়াছুঁয়ি ছিল,যেমন থাকে । কিন্তু পথটা এমনই অন্তহীন, হেঁটে যাওয়াটাও এমনই অমোঘ- যে গাড়লের মতো সেদিন তার মনে হয়েছিল, স্মিতাকে ছাড়া সে বাঁচবে না৷ তারপর এদিক ওদিক ঘুরে, প্রায় ঘণ্টা দুই হেঁটে হঠাৎ একটা ব্লাইণ্ড ফ্যাগ এণ্ড! অনেকগুলো ইউক্যালিপ্টাস পথ আটকে দাঁড়িয়ে ছিল৷ তাদের ওপারে একটা খাদ৷


এরপরেও বারকয়েক বেড়াতে গেছে তারা৷ নেতারহাট থেকে ফেরার সময়…শিলং বা জলদাপাড়া বা দার্জিলিং থেকে ফেরার সময়... প্রতিবারই স্মিতা অবুঝের মতো নিঃশব্দে কাঁদত। বলত, বাড়ির বাইরে এলে নাকি খুব ভালো থাকে। বলত, ওই বাড়িটা তার নয়। বলত, দম বন্ধ লাগে। এইসব হাবিজাবি! টাকা খরচ করে এসি ট্রেনের টিকিট কাটো, হোটেল বুক করো, গাড়ি...তারপর এই ছেনালি! মা বলত, মেয়েছেলের বহুত সহ্যশক্তি থাকতে হয়! কোথায় কী! পরের পুজোয় পোয়াতি স্মিতাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ভাইজ্যাগ গেছিল সে । খুব হল্লা হয়েছিল। খুব নেশাভাঙ। স্মিতা অবাক হয়েছিল। কষ্ট পেয়েছিল কিনা জানতে চাওয়া হয়নি। আসলে বাবলু কষ্টই দিতে চেয়েছিল৷ শাস্তি দিতে চেয়েছিল। সে বুঝেছিল, হাঁকপাকই সার। স্মিতার তাকে ছেড়ে যাওয়ার আর মুরোদ নেই৷


ভাইজ্যাগ থেকে ফিরে স্মিতার ঠাণ্ডা মেরে যাওয়াটা প্রথম লক্ষ্য করল বাবলু৷ নালিশ নেই, অভিযোগ নেই। দম দেওয়া পুতুলের মতো সারাদিন কাজ করে, বকা খায়। বাবলুকে এড়িয়ে যায়, চা পাঠায় কাজের মেয়ের হাতে। অনেক রাত ক’রে ঘরে ঢুকে আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়ে। বাবলু দেখল, ঘরটা আস্তে আস্তে দুটো খুপরিতে ভেঙে যাচ্ছে। সে মিটিয়ে নিতে চাইল এবার। শুধু শরীর নয়,অন্য উষ্ণতাও দরকার ছিল তার। শীত করত কোল্ড স্টোরেজে। মিটিয়ে নিতে চেয়ে এক রাতে বাথরুম সেরে এসে সে খুট করে বেড ল্যাম্প জ্বালল। স্মিতার পাশে এসে বসল। কী কী বলবে, তা ভেবেই রেখেছিল। যেমনঃ ‘মেয়ে হলে নাম রাখি বাতাসিয়া? সেই যে দাজ্জিলিং-এ তুমি বাতাসিয়া লুপ ভালোবেসেছিলে?’ গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেই তো সব ঠিক হয়ে যেত আগে। স্মিতার পিঠে হাত রাখল সে।


ছ্যাঁকা খাওয়া কুত্তির মতো ছিটকে উঠল স্মিতা। এমন একটা ঘেন্না নিয়ে ফিরে তাকাল যে নিজেকে ধর্ষক মনে হল বাবলুর।


*************


এরপর বাড়ি ফিরে বাবলু প্রায়ই শুনত মায়ের কাছে, পেট নিয়ে মাঝে মাঝে বেরিয়ে যায় স্মিতা। ‘বারমুখো মেয়েমানুষ’। বাবলু এমনকি প্রতিবাদও করল দু-একবার৷ মেয়েলি ঝগড়ায় ঢুকল, স্ত্রৈণর মতো স্ত্রীর হয়ে গলা ফাটালো। স্ত্রীর হয়ে গলা ফাটালো? নাকি নিজের আঁতে লেগেছিল? ‘ব্যাটাছেলে বউ সামলে রাখতে পারিস না!’ -মা বলেছিল।


স্মিতাকে জিজ্ঞেস করত বাবলু, কোথায় যায় সে। ‘বাবার বাড়ি’ বা ‘বন্ধুর বাড়ি’ -সংক্ষিপ্ত উত্তর পাওয়া যেত। মা বলত, ‘পাত্তা না দিলে রস শুকিয়ে যাবে। গুমোর ভাঙবে।’ পাত্তা না দিতে গিয়ে বাবলু চেক-আপের দিনগুলোও জানতে পারত না। সে অফিস বেরোলে স্মিতা নিজের ভাইকে ডেকে ডাক্তারখানায় যেত। বাবলুও ক্লাবে যেতে শুরু করল অফিসফেরত। তাস পিটে, হালকা নেশা ক’রে, রাত ক’রে বাড়ি ফিরত৷ এরকম এক রাতে ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট ভঙ্গিতে স্মিতা জানাল, প্রেগন্যান্সির ছ’মাস হয়ে গেল। এবার সে বাপের বাড়ি যাবে। অনেক জায়গায় অ্যাপ্লাই করেছে এই ক'দিনে। আর শরীরে কুলোচ্ছে না। বাপের বাড়ির লোকেদের সাহায্য দরকার। আর কিছু হোক না হোক, বাপের বাড়ির পাড়ায় যে নতুন স্কুলটা হচ্ছে, বেসরিকারি, সেখানে এম.এসসি, বিএড চায়। ওখানে হয়েই যাবে। যে কদিন বেটার অপর্চুনিটি না পাওয়া যাচ্ছে, সে কদিন ওই চাকরিটাই করবে।


বাবলুর রাগ হল। তার বউ চাকরি খুঁজেছে এতদিন হন্যে হয়ে! ওর বাপেরবাড়ির লোকগুলোও ষাঁটে আছে! অথচ সে জানেই না! উত্তেজনা চেপে তা-ও সে বলল ‘আমি তো আছি! তোমার কী দরকার ওসব পাঁচ-সাত-হাজারি চাকরির?’


স্মিতা কেটে কেটে বলেছিল-'তুমি। কোথাও। নেই।’


এবার আর পারেনি বাবলু। ক্রোধ-ক্ষোভ-পৌরুষ দু’বাহুতে জমা হয়েছিল। শীতল স্মিতার কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলেছিল- ‘নেই মানে? আমি নেই! সালা! আমি নেই তো পেট হল কোত্থেকে? অন্য কোনো নাগর করে দিল? লাগছে? লেগেছে? বলো দেখি কী করে লাগল? কে খামচে ধরেছে? নেই?’


স্মিতা চোখে মৃত্যুভয় নিয়ে পেট চেপে সন্তানকে আড়াল করছে-এইটা দেখে মিনিটখানেক পর থেমে গেছিল সে। বিছানায় ধপ করে বসে পড়েছিল। সেই মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল, তার চূড়ান্ত পরাজয় সম্পন্ন হয়েছে। সেই মুহূর্তে আয়নার দিকে তাকালে সে সত্যি আর নিজেকে দেখতে পেত না। অন্য কাউকে দেখত কি? যে শ্বাপদের দন্ত-নখরের সামনে তার স্ত্রী-সন্তান নিরাপদ নয়? সেই মুহূর্ত থেকে সে সত্যিই ‘নেই’ হয়ে গেছিল।


*************


বেণী বলল, ‘ভালো আছ?’

আগের সেই চটকমটক নেই চোখে । ক্লান্ত দেখায় এহ্সানের বউকে। ধীরাজ মাথা নাড়ল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে একপাতা ওষুধ সংগ্রহ করে যখন বাইরে এল, তখনও বেণী ঢাউস হাগিজ হাতে দাঁড়িয়ে আছে৷ বলল, ‘দু'মিনিট কথা বলা যাবে?’

‘বলো।’

‘একটা কোনো কাজ জুটিয়ে দাও৷ আর চলছে না।’

‘এ্হসান কী করে আজকাল?’

‘মণিহারি দোকানটা তুলে দিয়েছে পার্টির লোক। বারুইপুরে খাবারের দোকানে যায় এখন। যাহোক একটা কাজ জুটিয়ে দাও। ধরো বাচ্চা দেখাশোনার…’

‘দেখি। বলব। কোনদিকে ফিরবে?’

‘কসবা।’

‘এস তবে। আমি ট্যাক্সি নিয়ে নেব এখান থেকে।’


তখুনি বেণীর ফোন বেজে ওঠে। ফোন ধরেই বিস্ফারিত চোখে বেণী ‘আঁ আঁ’ করতে থাকে।

‘তুমি ভালো আছ? তুমি ভালো আছ?’ -আউড়ায় বারবার। জানা গেল, বারুইপুরে ব্রিজ ভেঙে পড়েছে, এহ্সানের দোকানের ঠিক পাশে। মৃত এক, আহত তিন। ফোন রেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফ্যালে বেণী। এই প্রথম বেণীর জন্য মায়া হয়৷ এই প্রথম নিষ্কাম ভাবে বেণীর হাত ধরে বাবলু। রাস্তা পার করে দেয়। অটোয় তুলে দেয়। বলে, ‘সাবধানে যেও। নিজে পৌঁছে আর এহ্সান ফিরলে আমায় একটা করে মেসেজ করে দিও।’ বেণীর অবাক দৃষ্টি দ্রুত দূরবর্তী হয়।




*********


ট্যাক্সিতে গা এলিয়ে বাবলু ভাবতে থাকে, বাড়ির পাশে মাঝেরহাট ব্রীজ ভাঙার দিন সে কোনো ফোন পায়নি। ভাঙা মাঝেরহাট সেতুর পাশ দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্যাক্সিটা যাবে৷ এই ফ্লাইওভার তার কৈশোরে দশাসই ছিল, পরাক্রম আর শক্তির এক আশ্চর্য প্রতীক৷ অথবা হয়ত ছোটবেলায় সবকিছুকেই খুব বড় আর বলশালী দেখায়। মাঝেরহাট সেতুর বুক দিয়ে গাড়ি যেত যখন, বিদেশ বিদেশ মনে হত। তখন কলকাতায় এত ফ্লাইওভার কই? কল্লোলিনীর সারা গায়ে পুরুষকারের এত বিজয়চিহ্ন ছিল না৷ অথচ বিজয়চিহ্নদের ‘নেই’ হয়ে যেতে দু'মিনিট লাগে ।


এখন সব কিছুই ক্ষীণ, ভঙ্গুর মনে হয়। ব্রীজ, স্মৃতি, সত্তা,সম্পর্ক। ব্রীজ ভেঙে পড়ার দিন তাকে কেউ ফোন করেনি,আবারও মনে পড়ল। স্মিতা- না৷ পুচকি- না৷ তার বিপদ সম্ভাবনা ভেবে কেউ কেঁদে ফ্যালেনি বেণীর মতো। বাবা-মা বৃদ্ধ হয়েছে। খবর শোনে না আর সন্ধ্যাবেলা,তাই টের পায়নি৷ মায়ের সে তেজ নেই, আধিপত্যবোধ নেই, ঈর্ষা নেই। স্মৃতি হারিয়েছে। চিন্তাশক্তি অস্তাচলে । চলৎশক্তিও নেই বললেই চলে । শুধু তাসের আড্ডা থেকে মদ গিলে বাড়ি ফিরলে, নিজের ঘর থেকে হাঁক পাড়ে একবার- ‘খোকা এলি?’

‘হুঁ'-টুকু শুনে ঘুমিয়ে পড়ে।


রাতের মৃদু বাতাসে একটা মন-কেমন সুর শুনে ট্যাক্সির জানালা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে বাবলু দ্যাখে,এক রিক্সাওয়ালা। প্যাডেল মারতে মারতে, হ্যান্ডেল ছেড়ে দিয়ে বিপজ্জনক ভাবে বাঁশিতে ফুঁ দিয়েছে। এ’দিকে রাস্তা শুনশান হয়ে এসেছে। তাও রিক্সাওয়ালার আগুপিছু গাড়ি-ঘোড়া আছে কিনা দেখে নেয় বাবলু। ওর বাড়ি ফেরা জরুরি। সেই মুহুর্তে তার মনে হয়, এই রিক্সাওয়ালার বউ-এর নাম সুখলতা। তার বাতাসিয়া নামে একটা মেয়ে আছে। তাদের ভারি সুখের সংসার। সেই মুহূর্তে তার মনে হয়, কাল পাসওয়ার্ড মনে পড়ে যাবে ঠিক। পুচকির জামা কিনবে। স্মিতার দেওয়া জামাটা যেন বেশি সুন্দর হয়, ঠাকুর!


স্মিতার সাথে পথ হাঁটা খাদের ধারে শেষ হয়েছিল। কিন্তু পুচকিকে নিয়ে ভালোপাহাড়ে যাওয়া যাবে হয়ত কোনোদিন।

এইসব আশা নিয়ে ভাঙা ফ্লাই-ওভারের পাশে মানুষ রঙ জমায়, তবু সব অ্যালজোলাম এক-ঢোকে গিলে ফ্যালে না।