ভুল

অমলেন্দু চন্দ

কাক্কেশ্বর খেপেছে । ব্যাটা কোকিল কোন ফাঁকতালে কুকম্ম টা সেরে কেটে
পড়েছিল , এতদিন ধরে আমি ম্যাও সামলালাম , আর এখন কিনা শুনতে
হচ্ছে কু উ উ।
জীবনটা তো হল আজ এসেছি কাল চলে যাব আর তার মধ্যে দু দিনের নাড়া ঘাঁটা , আর এই সুমুন্দির পো কিনা – এমন ঝারি দিল । একবার বাগে পেলে – কখন যে নবান্ন উৎসব সেরে কেটে পড়েছে , আর আমি কি না এতকাল ভেবে এলাম আহা কি ফলন ই না হয়েছে গো – শেষে কি না - ব্যাক্তিত্ত্ব আর মর্যাদার মারাত্মক ক্রাইসিসের ফেস্টুনটা পত পত করে উড়ছে কাক্কেশ্বরের মাথার ওপর । যাপনের সংস্কৃতির ফ্যাসন শো একেবারে – আমি কি না মাচায় নেচে কুদে গেয়ে বেড়ালাম আর যত কৃতিত্ত্ব ওই সেই মঞ্চের পেছনের কোরিওগ্রাফারের । কোরিওগ্রাফার কোন ফাঁকে যে হ্যামলেট হয়ে উঠল কে জানে কাক্কেশ্বর উইংশের দিকে তাক করে ডায়ালগ ছাড়ল দেয়ার আর মোর থিংস ইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ হোরেশিও ... বেহারের লোক কাঁকন প্রসাদ , সবাই ডাকত এক সময় ঈশ্বর বলে , ডাক নাম , সেটা যে কি করে কবে থেকে ... দেয়ার আর মোর থিংস
অরিন্দম ট্যাক্সি চালায় । একলা মানুষ । বাঘাযতীনের রেলপাড়ে ছোট এক কামরার ফ্ল্যাট । শিলিগুড়ির ছেলে , সে শহরের পাট তুলে দিয়েছে আজ বছর দশেক । বাবার ছিল কাপড়ের দোকান । দাদা দোকানে আর ও কলেজে , এরকম একটা ব্যবস্থা চালু ছিল । সাহিত্যের ছাত্তর ছিল , মন্দ মেধা না হলেও মধ্য মেধার থেকে বেশী কিছু না , তাই ।
ঘুম ভাঙল কলিং বেলের আওয়াজে । বুকের ওপর উইলিয়াম নেসবিট এর শেক্সপিয়ার’স স্টোরিজ খোলা অবস্থায় ওলটানো ছিল । রাতে হ্যামলেট পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিল । ও জানে এখন সরলা এসেছে। সঙ্গে ওর চার বছরের ছেলেটা থাকবে । সরলা ওর রাঁধুনি কাম কেয়ার টেকার কাম বাজার সরকার কাম হোয়াট নট । সকালের ব্রেক ফাস্ট সেরে ও ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে যায় , ফেরে সেই রাতে । সরলা সারাদিন ওর ফ্ল্যাট সামলায় আর নিজের গেরস্তালি । সেটাও পাশেই। সরলা কাক্কেশ্বরের ঘরনী । কাক্কেশ্বর রেল ফটকের পাশে একটা মাঝারী মাপের চায়ের কাম দুপুরের কাম রাতের খাবারের দোকান চালায় ।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অরিন্দম খবরের কাগজটার মাঝের পাতা খুলে ফেলল । এটা ওর একটা অভ্যেস । কাগজটা ও মাঝখান থেকে পড়তে শুরু করে রোজ । ডান দিকে কলামে চোখ পড়ল একটা বাসে অ্যাকসিডেন্টের খবর । উত্তরবঙ্গের রাস্তায় ।
দোকান থেকে ফিরতে রোজ অনেক রাত হত সত্যপ্রসন্নর । অরিন্দম আর দাদা রোজই বলত একটু তাড়াতাড়ি করে ফেরার অভ্যেস কর আর মা খোঁটা দিত , করবে না ওর চরিত্তির বলে কিছু আছে নাকি । আধা মাতাল বাবার তাতে বিশেষ হেল দোল হয়নি কোনদিন । দু পুরুষের বাসিন্দা সত্যপ্রসন্ন , অরিন্দম দের নিয়ে তিন পুরুষ , দোকান বন্ধ করার পর একা একাই । বাবার মদ খাওয়া নিয়ে মায়ের চরিত্তিরের খোঁটার কারন অরিন্দম ঠিক ভাল করে কোনদিন ঠাওর করে উঠতে পারে নি । শুধু একদিন চাপা গলায় মায়ের তীব্র স্বর শুনতে পেয়েছিল , ও পাশের ঘরটায় থাকত , তোমার লজ্জা করে না মেয়েটার দিকে যখন তাকাও । মেয়েটার নাম রাধা , ওদের বাড়িতে মায়ের ফাই ফরমাশ খাটতে আসে , কাছেই থাকে , মেয়েটা প্রায় অরিন্দমের বয়েসি । অরিন্দম বুঝে উঠতে পারে নি তাকালে লজ্জা পেতে
হবে কেন !
সেই বাবা একদিন একা একাই রাতে দোকানে পড়ে ছিল । রাত বারোটা বেজে যাওয়ার পরেও ফিরছেনা দেখে দু ভাই দোকানে এসে বাবাকে তুলে নিয়ে যায় হসপিটালে । একদিন ছিল । শেষ মুহুর্তে নাকি ক্ল্যারিটি ফিরে আসে। বলেছিল তোদের মাকে খুব কষ্ট দিয়ে গেলাম রে। একটা ভুল । না সে পারল কোনদিন ভুলতে না আমি পারলাম ভোলাতে । তোরা রাধাকে দেখিস । বাবা সেই যে চোখ বুজেছিলেন আর খোলেন নি ।
কাগজ থেকে মুখ তুলে তাকাল অরিন্দম । ছেলেটা টেবিলের উল্টো দিকে বসে ড্রইং করছে রঙ পেন্সিল গুলো টেবিলে ছড়ানো । একটু পরেই ওর দিদিমনি আসবে ওকে পড়াতে । মা ও বেশী দিন বাঁচেনি । বাবা র অনেকগুলো লাইফ ইন্সিওরেন্সের পলিসি ছিল লাখ বিশেক টাকার , সেগুলো পাওয়ার পরেই মা চলে গেল । যাওয়ার সময়ে ওর হাত ধরে বলেছিল তোরা রাধাকে দেখিস । অরিন্দম শিউরে উঠেছিল। তারপর দাদা যখন রাধার নামে পাঁচ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট করে দিয়েছিল অরিন্দম আর শিলিগুরিতে থাকতে সাহস করেনি । আসার সময় দাদাকে দোকান আর বাড়ির স্বত্ব লিখে দিয়েছিল আর দাদা ওকে পনের লাখ টাকা দিয়ে দিয়েছিল ।
ছেলেটা খুব শান্ত । একদিন কাক্কেস্বর নেশার ঘোরে বলছিল জান সরলা কেমন যেন বদলে গেছে । আগে কত জোরে জোরে কথা বলত , রেগে গেলে গালাগালি করত ,
আজকাল – ছেলেটাও যেন কেমন , যেন আমার মত নয় । ও যেদিন ট্যাক্সি বার করে না সেদিন রাতে ওরা দুজন বোতল খুলে বসে । অরিন্দম পাঞ্জাবী টা গলাল , আজ কাক্কেস্বরের সঙ্গে বসবার দিন।