ভাগাড়

ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়


প্রথম দিন লোকটাকে দেখেই মনে হয়েছিল – ঠিক যেন একটা শকুন। যদিও শকুনকে খুব কাছ থেকে কখনও দেখেনি অতসী, তবুও লোকটার হাঁটু মুড়ে কুঁজো হয়ে বসে থাকার ভঙ্গি, লিকলিকে হাত-পা, সরু কণ্ঠা বেরোনো গলা বাড়িয়ে সামনে সামান্য ঝুঁকে আসা মাথা আর খাড়া নাক দেখে ওকে শকুন ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারা যায় না যেন। ওরকমই তীব্র, তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি। আর গায়ে যেন ভাগাড়ের গন্ধ।
দিন দশেক হল লোকটা এসে বসেছে অতসীর বাড়ির গলির মুখটাতে। একটা ট্যারাবেঁকা পাকা বাঁশের লাঠি, একটা নোংরা পুঁটলির ভেতরে কিছু দলাপাকানো ছেঁড়া ন্যাকড়া, একটা তোবড়ানো হিন্ডেলিয়ামের বাটি আর একটা প্লাস্টিকের মিনারেল ওয়াটারের বোতল, সম্পত্তি বলতে এই। কে বা কারা যেন তাকে খাবার দিয়ে যায় মাঝে মাঝে।
আজ ছেলের জন্য একটা চিকেন রোল কিনে বাড়ি ফিরল অতসী। ক্লাস এইট হল এবার। কয়েকটা নম্বরের জন্য ফার্স্ট হতে পারে নি। এবারও প্রথম সেই সায়ন। ছেলেটাকে ভালই চেনে অতসী। বাবার ধরাবাঁধা কোনও চাকরি নেই। মাও কি যেন একটা ছোটখাটো কাজ করে সেলস এ। মোটকথা, বাবানের মত এতগুলো প্রাইভেট টিউটর নেই তার। তবু যে ছেলেটা কি করে প্রতিটা পরীক্ষায় এরকম নম্বর পায়, ভেবে পায় না অতসী। ইস্কুলের টিচারদের কোনও পক্ষপাতিত্ব কাজ করে কিনা কে জানে! এ বছর টিচার্স ডে তে ক্লাস টিচারের জন্য একটা দামি গিফট পাঠিয়েছিল অতসী, সাবজেক্ট টিচারদের জন্য ভাল পেন। ছেলে পড়াশোনাও করেছে ভালই। তবু কিছুতেই ফার্স্ট হতে পারছে না।
টিফিন টাইমে মধুমিতা গায়ে পড়ে খানিক জ্ঞান দিয়ে গেল। দোষের মধ্যে মনের উদ্বেগ মুখে প্রকাশ করে ফেলেছিল অতসী। ছেলের ওপর নাকি বড় বেশি চাপ দিচ্ছে সে। তুই বুঝিস টা কি? আধবুড়ি মেয়েমানুষ, বিয়ে থা করার নাম নেই এর ওর সঙ্গে ঢলিয়ে বেড়াচ্ছে। মুখে তো বলে অসুস্থ বাবা – মা, বেকার ভাই আর হ্যান্ডিক্যাপড দিদি আছে বাড়িতে। তাদের দেখাশোনার জন্যই নাকি বিয়ে করছে না। তাহলে কথায় কথায় অমন হেসে হেসে ঢলে পড়া কেন? আর পুরুষমানুষগুলো হয়েছেও তেমনি। ওই খুকিপনা দেখে গলে গলে পড়ে সব। ক’বছর হল চাকরিতে ঢুকেছে, এখনি অতসীর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। আর একটা প্রোমোশন হলেই টপকে যাবে তাকে।
ছেলে রোল দেখেই নাক সিঁটকোলো।
- চিকেন? আবার ওইসব ভাগাড়ের মাংস নিয়ে এসেছ তুমি?
ভাগাড়ের মাংস নিয়ে হইচই এর পর তাদের বাড়িতেও এ সমস্ত রান্না করা মাংস ঢোকা বন্ধ হয়ে গেছিল। সে প্রায় বেশ কিছুদিন হল। অতসী বলল,
- না রে বাবা না! এত কাণ্ড হল, এখন ওসব বন্ধ হয়ে গেছে। সকলেই তো খাচ্ছে। কিছু হবে না।
ছেলেটা তবুও মুখে তুলল না। নাকে চাপা দিয়ে বলল,
- কি বিশ্রী দুর্গন্ধ!
দুর্গন্ধ একটা পাচ্ছিল অতসীও! কে জানে, বাইরে থেকে আসছে হয়ত! ছেলে খেল না বলে অতসীরও আর খেতে ইচ্ছে করল না। অনির্বানের তো এসব খাবার প্রশ্নই ওঠে না। হাই কোলেস্টেরল। চিকেন রোলটা তবে দিয়ে দেবে মতিকে। আজ একটু হাত পা টিপিয়ে নেবে মতিকে দিয়ে।
বাড়ি ঢোকার একটু পরে এল মতি। দুপুরের বাসনগুলো মাজবে আর রাতের রুটিটা করে দিয়ে যাবে। আসলে এই কাজটা করে মতির মা। সে আজ সপ্তাখানেক হল জ্বরে কাবু। তাই ওর বছর বারোর মেয়েটাই এসে কাজ করে দিচ্ছে দুবেলা। প্রথম দিন সুব্রত বলেছিল,
- এত্তটুকু একটা মেয়ে কাজ করছে, যাই বল, কেমন একটা লাগছে যেন। ও তো আমাদের তুতুর থেকেও ছোট।
অতসীর বোনের মেয়ে তুতু। ক্লাস টেন। ছোট বলে কিছু সুবিধেও আছে। কিছু এক্সট্রা কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। এই তো কেমন বাথরুমটা পরিস্কার করিয়ে নিল কাল। টুকটাক বাজার-দোকান তো রোজই করিয়ে নিচ্ছে। ওর মা হলে করত এসব? তবে, মায়াদয়া কি আর অতসীর শরীরে নেই? তুতুর দুটো পুরনো জামা চেয়ে রেখেছে বোনের কাছ থেকে, মতিকে দেবে।
বাবান বলেছিল,
- এ তো চাইল্ড লেবার! তোমাকে তো পুলিশে ধরবে মা!
যত বড়বড় কথা। অমন আইন কানুন দেশে অনেক থাকে। থাকলেই যদি মানতে হত, তাহলে আর ভাবনা ছিল না। মন্ত্রিসান্ত্রিরাই আইন মানে না, আমরা তো চুনোপুঁটি।
এবার পুজোয় দিন পনেরোর একটা ইউরোপ ট্যুরের প্ল্যান ছিল তাদের। আজকাল আর একটা বিদেশ ভ্রমন না হলে মান থাকছে না। অনির্বাণ অবশ্য একটু দোনামনা করেছিল প্রথমে। ফান্ড আসবে কোথা থেকে? ফ্ল্যাটের লোন চলছে, তার ওপর গাড়িটা বদলাতে হল। আবারও কিছু লোন।
অনির্বাণের এহেন প্রশ্নে গা-মাথা জ্বলে যায় অতসীর। আজ এত বচ্ছর রেভিনিউ ডিপার্টমেন্টে চাকরি করে কি করে কি হবে তা কি বুঝিয়ে দিতে হবে অনির্বাণকে? যেমন করে রাজস্থান ট্যুর হয়েছিল, যেমন করে কাশ্মীর হয়েছিল তেমন করেই হবে। হ্যাঁ, তবে এবার একটু বড় স্কেলে। ইউরোপ তো! তা, অফিসার হিসেবেও তো পদোন্নতি হয়েছে অনির্বাণের। বিশেষত, মীনাক্ষীরা পর্যন্ত সার্ক কান্ট্রিস ঘুরে এল। কত জুনিয়ার ওর বর অফিসে অনির্বানের থেকে! আদিখ্যেতা করে হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পরে হাত ধরাহরি করে কত্তা-গিন্নি ছবি পোস্টালো ফেসবুকে! কত যে প্রেম ওদের জানতে বাকি নেই অতসীর।
দিন দুয়েক আগে অনির্বাণ বাড়ি ফিরেছে মুখ কালো করে। একদিনের নোটিসে তার একেবারে একটা শুকনো জায়গায় পোস্টিং হয়েছে। বড়সাহেব নিজে ডেকে বলেছেন,
- বাড়াবাড়ি কর না অনির্বাণ। দিনকাল ভাল নয়, ডিপার্টমেন্টাল প্রসিডিংস শুরু হলে সামলাতে পারবে?
এই মুহূর্তে আর কোনভাবেই তাহলে ইউরোপ ট্যুর সম্ভব নয়। ভাগ্যিস টাকাগুলো এডভান্স করে ফেলে নি!
অনির্বান সে রাতে বাড়ি ফিরল মুখ কালো করে।
- যদি আমার সাস্পেন্সন হয়ে যায়! তোমার চাকরিটা তো আছে! একেবারে জলে পড়ব না কি বল!
অতসী আঁতকে উঠে বলেছিল,
- কি বলছ কি তুমি?
অনির্বাণ শুকনো মুখে বলে,
- কে যে আমার এই উপকারটা করল তাই ভাবছি! হাতি যখন পাঁকে পড়ে...! আচ্ছা! আমিও দেখছি!
অতসী মরিয়া হয়ে বলে,
- হাত গুটিয়ে বসে থেকো না। দেখ কাকে ধরলে রেহাই পাবে! কিছু টাকাপয়সা দিতে হলে দিয়ে দাও!
অনির্বাণ এমন করুণ হাসি হেসেছিল, দেখে বুক শুকিয়ে গিয়েছিল অতসীর। অনির্বানের হাই প্রোফাইল জবের কাছে তার প্রাইভেট কম্পানির ছোট চাকরি যে কিছুই নয়! তার বুটিকের শাড়ি, পার্লারের খরচ, কিটি পার্টি, ছেলের গাদাগাদা টিউশন ফি – কোনটাই যে তার চাকরি থেকে আসে না!
গন্ধটা রয়েই গেল বাড়িতে। অতসী আর অনির্বাণ মিলে খাটের তলা, আলমারির কোণ, রান্নাঘর, বাথরুম সব খুঁজে ফেলল। কিছুই পাওয়া গেল না। দিনের আলোয় ভালো করে খুঁজে দেখবে, হয়ত ইঁদুর মরে পড়ে আছে কোথাও।
রাতে ঘুম আসছিল না অতসীর। এপাশ ওপাশ করছিল। একসময় চোখ মেলে দেখল, বাবান এসে দাঁড়িয়েছে বিছানার পাশে।
- কি হল রে বাবা? ঘুমোস নি এখনও?
ছেলের চোখেমুখে কেমন চাপা উত্তেজনা।
- এবার পরীক্ষার ঠিক আগের দিন সায়নকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ডেকে নিয়ে আসব বাড়িতে। তুমি এমন একটা কিছু খাইয়ে দিও যাতে ওর শরীর খারাপ হয়ে যায়, আর পরীক্ষা দিতেই না পারে। তাহলে তো ফার্স্ট প্রাইজটা আমার জন্যে বাঁধা!
ছেলের মধ্যে অদ্ভুত এক ছটফটানি।
- সায়নকে দেখে নেব! ওকে মেরেই ফেলব আমি!
অতসী ভয় পেয়ে গেল। চোদ্দ বছরের ছেলে তার। এসব কি বলছে? অনেক কষ্টে ছেলেকে শান্ত করে, মাথায় হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে ঘুম পাড়িয়ে দিল অতসী। ঠাণ্ডা মাথায় ছেলের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এ তো ভালো কথা নয়!
আবার সেই বিশ্রী গন্ধটা। এতক্ষণ চাপা ছিল! আবার তেড়েফুঁড়ে উঠেছে। ঘরে টেঁকা যাচ্ছে না। ছাদে উঠে এল অতসী। আজ বুঝি পূর্ণিমা! আকাশময় জ্যোৎস্নায় চাঁদের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। কতদিন পর!
বিশ্রী গন্ধটা তবু কিছুতেই যেন পিছু ছাড়ছে না। আলসে দিয়ে সামনে ঝুঁকতেই দেখতে পেল, কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে তার দরজার সামনে। কে? সামনে কুঁজো হয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা যেন একটা বিশালাকায় শকুন। গলির মুখের সেই পাগলটা! অতসী চেঁচিয়ে উঠল,
- কি করছ তুমি এখানে? এত রাতে?
লোকটা যবে থেকে এসে বসেছে এখানে, কিসের যেন ছায়া এসে পড়েছে অতসীর রোজকার জীবনযাত্রায়। একের পর এক সাজিয়ে রাখা ঘুঁটিগুলো কেঁচে যাচ্ছে। অন্ধকারে লোকটার চোখ দেখতে পাচ্ছে না অতসী। কিন্তু তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির হল্কা যেন এসে লাগছে তার গায়ে। সেই সঙ্গে তীব্র দুর্গন্ধ।
চাঁদের মরা আলোয় কেমন অশরীরি চারপাশ। চেনা বাড়িঘর কেমন অচেনা। প্রাগৈতিহাসিক জন্তুদের মত তারা ঘাপটি মেরে রয়েছে। মিহি কুয়াশার চাদরে ঢাকা। ক্রমশ গন্ধটা আরও তীব্র হচ্ছে। যেন একটা ভাগাড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে অতসী। পালিয়ে যেতে পারছে না। তার আর নড়ার ক্ষমতা নেই। আদিগন্ত ভাগাড়ের মধ্যে পড়ে থাকতে থাকতে অতসী টের পেল, তার দিকে নির্ভুল লক্ষ্যে একটু একটু করে এগিয়ে আসছে শকুনটা।