স্বপ্নের কয়েকটি অধ্যায়

সুবন্ত যায়েদ

রোজ রাতে স্বপ্নে দেখি মৃতের এক ময়দান। যে ময়দান দেখা যায় কমলালেবুর মতো গোল কিংবা আমাদের পৃথিবীর মতো। তার পরে আর কিছু দেখা যায় না ঠিক এমনি অন্ধকার। সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কিংবা ময়দানের মৃত যা কিছু তার দিকে তাকিয়ে আমি সমস্ত ময়দান ঘুরি। বুঝি সারারাত, কিংবা স্বপ্নটা কখন এসে আমার ঘুমের জগতের সমস্তটা দখলে নিয়ে নেয় আমার জানা হয় না কোনোদিন। হাঁটতে হাঁটতে কিংবা দৌড়াতে দৌড়াতে মৃতের ময়দানে মৃত কোনো অনুষঙ্গে পা বেঁধে হোঁচট খেতে খেতে ঘুম ভাঙলে রোজ মনে হয়, সারারাত যেনো মৃতের ময়দানে দৌড়ে বেড়িয়েছি। দীর্ঘদিন হলো কেন যে এমন হচ্ছে রোজ রোজ। আমার ঘুমের অধ্যায়ের সবটা যেনো হয়ে গেছে এক চরিত্রের থিয়েটার। আমার এই বয়সেই শুধু নয় বরং সেই শৈশব এবং তার পরের কথা যদি ভেবে থাকি, তখনো আমি যেনো রোজ রাতেই, এক চরিত্রের স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু তখনকার সবকিছু কেমন মায়াময় ছিলো যাপনের সমস্তটাজুড়ে। স্বপ্নেও বুঝি তার ছায়া পড়তো। যদিও একা, আমাদের পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম দিনের প্রথমভাগ। সূর্যটা তখন নতুন হাঁটতে শেখা শিশুর মতো গুটি গুটি পায়ে পুকুরে নেমে সাঁতার কাটতো। তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতাম অন্ধকার, সেখানে আর কোনো সূর্য নাই। যে সূর্য মর্তে নেমে আসে তার আলো বুঝি আকাশে পৌঁছায় না। তারপর কোথায় কোথায় চলে গেছি। আমার দাদার হাতের নারিকেল সুপারি বাগানে। সাদা সরু পথের বাইরে সবটুকু জুড়ে ঘন আগাছার সবুজ উৎসব। আমিও কি তাদের উৎসবে একাত্ম হই? যে দুইজোড়া টুনটুনির উড়ে যেতে দেখি ঘন আগাছার সবুজ উৎসব থেকে, আমার তো তাদের মতো প্রস্তুতি নাই। এসব নিয়ে দুঃখ বুঝি হয় না কিংবা হয়, নারিকেল গাছের খোড়ল থেকে হঠাৎ একটা বদমেজাজি সাপ ফুঁসে এলে পেছনে ফেরার অবসরটুকু আর পাই না। তখন ঘুম ভেঙ্গে গেলে দারুণ শীতেও শরীর বেয়ে ঘামের তরল ছুটতে দেখি। না এভাবে আর দুঃস্বপ্নের রাজ্যে চরে বেড়ানো যায় না, ভেবে ঘুম তাড়ানোর জন্য আগামী দিনের খেলাধুলো বিষয়ক প্রকল্প খুলে বসি। কিংবা হঠাৎ তখন হাসি হাসি যুথীর ছবিখানা সামনে এসে সকল আয়োজন প- করে দেয়। তখন প্রেম বুঝি না কিংবা যা কিছু শরীরী, তবু হাসি হাসি এই মুখখানা কেনো যে সামনে চলে আসে। তবু কোথায় যেনো কিছু হয়। এভাবে, একটু একটু করে আবার ঘুমের ঘোর এসে জড়ো হয়। দেখি পাখির কয়েকটি সাদা পালক উড়ে যেতে যেতে মিলিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। আর খুব ভোরের মতো কয়েকটা ছবি, দেখি ঘুলঘুলি দিয়ে সকালের রোদের মতো আলো এসে আমার চারপাশে শিশুর মতো খেলছে। আবার ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্নও এসে উপস্থিতির খেরোখাতা খুলে ধরে। এবার আমাদের ঝিরিঝিরি নদীর পাশ দিয়ে হাটি। এখানে ওখানে নতুন জেগে ওঠা চর আর দেখা যায় না। বরং দুকূল উছলে বয়ে যাচ্ছে কেমন টলোমলো জল। তার ভেতরে অনেক দূরে দূরে ছায়ার মতো কালো কালো জেলে নৌকা দুলছে। হঠাৎ এই নদীটা যেনো অনেক বড়ো হয়ে গেছে।
তারপর চোখের সামনে পড়ে ছোটো ছোটো ঘর। আঙ্গিনায় কড়া রোদের ওপরে মেলে দেয়া ছোটো বড়ো জাল। এটা যে কতো বছরের গড়ে ওঠা জেলেপল্লি। বাবার গল্পে একাত্তরের আগে এখানে অনেক জেলেপল্লি ছিলো; তখন এই গল্প আমার একদম মনে পড়ে না। আমি যেনো অনন্তকাল ধরে এই পল্লির ঘনিষ্ট পথ ধরে হেটে যাই। তারপর আমি সেই জেলেপল্লি ছেড়ে, আরো একটা পাড়া যে পাড়া আমার কাছে নতুন মনে হয় সে পাড়া ছেড়ে একটা মরা বাগানে এসে থির হই। এই গাছগুলো কেনো যে মরে গেছে, মাটির সাথে বুঝি তাদের আর সখ্য নাই। তখন আমার মৃত্যুর কথা মনে আসে, যখন আমি মরবো তখন আসলে আমার কিসের সাথে সম্পর্ক হারাবে। আমি প্রাণের কথা শুনেছি সে নাকি দেহ ছেড়ে যায়। তার মানে প্রাণের সাথে দেহের সখ্য হারালেই আমি মরে যাবো। তারপর আমি দুঃখিত হয়ে কবিতার মতো কিছু বানাই।
দেহটা আমার প্রাণের কাছে হাত পেতে আছে আরেকটু মেয়াদ বাড়িয়ে নিতে,
নাকি প্রাণ দেহের কাছে হাত পেতেছে এই জেনে, সেখানে দানা বেঁধে উঠেছে
গভীর এক অসুখ...
জীবিত এক দেহ নিয়ে বেশি সময় মৃত ভাবনাখেলা আর খেলা যায় না। আমি মৃত বাগান থেকে সবুজের ভেতরে ফিরতে চাই।

তখন আমি ফিরবো বলে কয়েকটা মৃত গাছকে পেছনে ফেলে আসি। কিন্তু সামনের একটা গাছ দেখি সবুজ পাতায় ভরে উঠেছে হঠাৎ। আমি বোধ হয় একটু একটু অসুস্থ বোধ করি। মনে হয় মাথার ভেতরে কিসের যেনো ভার। আর চোখের সামনে ঝুলে আছে থোকা থোকা সবুজ ছায়া। আমি চুলের ভেতরে চারটে আঙ্গুল চালাই কিংবা চোখ কচলাই। না ওই একটাই গাছ যে মরা গাছ হঠাৎ সবুজ পাতায় ভরে উঠেছে। মানুষের মতো প্রকৃতিও জাদু জানে কিনা, ভাবতে ভাবতে আমার ভুল ভাঙ্গবে এমন ঘটনা ঘটে যায়। দেখি সবুজ পাতার মতো সহস্র সবুজ পাখি ওই গাছ থেকে উড়ে যাচ্ছে। খুব বিস্ময়ে আমার ভেতরে কেমন যেনো অনুভূতি হয়। ফেরার পথ ভুলে আমি মৃত বাগান জুড়ে আবার হাটতে থাকি। সবুজ পাতার মতো সবুজ সহস্র পাখি ফিরে এসে মৃত গাছে সবুজ পাতা ভরানোর খেলা খলবে, অপেক্ষায় থাকি।

দুই
আমার অপেক্ষা বুঝি শেষ হয় না কিংবা সবুজ পাখিরা আর ফিরে আসে না, তার আগেই স্বপ্নের চোখে অন্ধকার এসে সমস্ত দৃশ্য গিলে ফেলে। আমি জেগে উঠি হয়তো আধো আধো চোখে কিংবা নতুন স্বপ্নে বদলি হয়ে যাই। এবার হয়তো আমার আর গ্রামে নয় ঝিরিঝিরি নদীর কূলে নয়, আমি হেটে বেড়াই পুরাণে। নবী সুলাইমানের প্রাসাদে কিংবা আদম হাওয়ার মাঠে, গন্ধমের বাগানে। সেখানে সবুজ সাপ স্বর্গের গন্ধ শুঁকে ছয় পায়ে শুধু দৌড়ে চলে। আমার তখন অভিশাপের গল্প মনে পড়ে থাকবে কিংবা আদতে সে গল্প আমার মনে পড়ে না। আমি হয়তো কবে কার মুখে শোনা সে গল্প মনে মনে হাতড়ে ফিরি শুধু। কার অভিশাপে যে সাপের পাগুলো খসে গিয়েছিলো আর আত্মার ঘনিষ্ট যে বুক, সে বুকে ঘসে চলতে শুরু করেছিলো। কিংবা আমার পাশের বাড়ির কারামত মৌলবির কথাও মনে পড়ে থাকবে। বুড়ো বয়সে যার দুপায়ে বল ছিলো না বলে বিলাপ করতে করতে হাতে আর বুকের উপর ভর দিয়ে সারা উঠোন মাড়িয়ে বেড়াতো। তার উপরে যে কিসের অভিশাপ তার ধরণ ধারণও আমরা জানি না। কিন্তু সে যাই হোক, গন্ধমের বাগানে আমি আদম হাওয়াকে খুঁজি। মলিন ফসলের মাঠজুড়ে তাদের যাপনের চিহ্ন তালাশ করি। কিন্তু এই সব কিছু এতো বিরান, তারপর সবুজ সে সাপও আমার আর চোখে পড়ে না। তারা সবাই সবকিছু নিয়ে, তাদের যাপনের চিহ্ন সমেত হয়তো স্বর্গেই চলে গেছে মহান ঈশ্বরের কৃপায় ফিরতি টিকিট পেয়ে। বুঝি বিতাড়িত শয়তানও এদিকটা আর মাড়ায় না তাই আমার ভেতরে কোনো কুমন্ত্রণা আসে না। অথচ গন্ধমের বাগানে কাচা পাকা সবুজাভ ফল ঝুলে আছে। তার সৌন্দর্যটুকুই আমার ভালো লাগে। হয়তো তখন আমার ক্ষুধার কথা মনে আসে না কিংবা কোনো প্রবৃত্তি কাজ করে না। আমি ফিরে আসি আবার প্রান্তরে, মাঠে ঘাটে বিরান পথে। বুঝি কিছু খুঁজি আমি গোপন চোখে। তখন মনে আর আদম হাওয়া নয় কিংবা ছয় পায়ে চলা সবুজ সে সাপ নয়। আমি বুঝি আমার ঘর খুঁজি এবং সে পথ খুঁজতে খুঁজতে বাদশা সুলেমানের রাজপ্রাসাদে চলে আসি। কিন্তু বিরান ভূমির মতো এখানেও কোনো প্রাণের সাড়া পাওয়া যায় না। পুরোটা প্রাসাদও কেনো যে আমার চোখে পড়ে না, মনে হয় থিয়েটারের মতো একটুখানি আলোর ভেতরে দৃশ্য দেখি। তার চারপাশ জুড়ে আধো অন্ধকারের মতো ধোয়াশা। তখন বুঝি ক্লান্তি আসে নাকি ভীত হয়ে পড়ি যেনো, আমি শুধু বের হয়ে আসতে চাই। কিন্তু পথ হঠাৎ জটিল মনে হলে কেমন অশুভ গন্ধ লাগে। হয়তো স্বপ্ন তখন ছুটে যাবার আগে, হঠাৎ আলোয় গন্ধমের বাগান জেগে উঠলে বিতাড়িত শয়তানকে কামনা করি। আমাকে সে কুমন্ত্রণা দিক আমি আবার গন্ধমের বাগানে যাবো। আমার ভেতরে প্রবৃত্তি আসুক, ক্ষুধা আসুক।

তিন
কোন বয়সে যেনো, তখন মেঘলা আকাশ দেখলেই আমার ঝড়ের কথা মনে আসে। সে ঝড় হয়তো আমি কোনো দিন দেখি নাই তাই ঝড়কে কামনা করি, তাই ঝড়ের কথা শুধু মনে হয়। কিন্তু চরাচর জুড়ে শুধু বৃষ্টি নামে। ঘরের পেছনের ডোবায় সাপের মুখ বাঁচিয়ে কয়েকটা ব্যাঙ ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ডাক ডেকে চারপাশ উত্লা করে। আমি হয়তো তখন অন্ধকারের সাথে জড়াজড়ি করে শুয়ে হঠাৎ জলো বাতাসে মোমের বেপথু শিখাটির দিকে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু বেপথু শিখাটি একেবারে পথ হারিয়ে দপ করে নিভে গেলে আমি এক রঙের পৃথিবী দেখি। তখন চোখের উপরে ঘুমের পর্দা নেমে এলে, কে যেনো ঘোষণা দিয়ে যায় সন্ধে বেলা আজ নাকি ঝড় হবে। আমার স্বপ্নের অধ্যায়ে সেই বুঝি প্রথম, একক চরিত্রের বদলে অনেক চরিত্রের থিয়েটার চরিত হয়। আমরা সকলে মিলে সেদিন সন্ধে বেলা ঝড়ের অপেক্ষা করতে করতে দেখি, বিশাল এক মঞ্চে চরিত্র ভাগাভাগি হচ্ছে। কেউ পায় ভাল্লুকের চরিত্র, কেউ বান্দরের, বাঘের, গিরগিটির, আরো কতো কিসের চরিত্র সব। কিন্তু আমাকে কেনো যে দেয়া হলো মানুষের চরিত্র, সেই দুঃখে সারা মঞ্চ ঘুরে ঘুরে আমি কাঁদি। কাঁদতে কাঁদতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামে বুঝি, আমি মঞ্চ ছেড়ে কোথায় যে আসি, সমস্ত জগত অচেনা লাগে। তখন মনে পড়ে, আমরা যে ঝড়ের অপেক্ষায় সন্ধ্যার প্রত্যাশা করে ছিলাম, সেই ঝড় তো আসলে আসে নাই। এভাবে, কিছুই কি আসলে আসে না! তবে কেনো এমন প্রত্যাশা করে থাকি। তারচে বরং, ইচ্ছে মতো মনের ভেতরে সবকিছু বানিয়ে বানিয়ে নিই। যেহেতু, এখানে কোনো নিষেধের দেয়াল খাড়া হয়ে থাকে না। এখানে কোনো অসম্ভবের হা চোখের পরিহাস থাকে না। এভাবে ভাবতে গিয়ে, কিংবা মনে মনে কিছু বানাতে গিয়ে মনে হয়, আসলে আমরা যাকে সন্ধ্যা বলি, কিংবা দুপুর, সেসব আদতে সন্ধ্যা কিংবা দুপুর বলে কিছু না। আমরা আসলে বিভিন্নতা পছন্দ করি বলে সন্ধ্যা বানাই, সূর্য ওঠাই, রাত্রি নামাই। আবার কখনো অন্ধকারের বিপরীতে জোসনা এনে মায়া মায়া খেলা খেলি। আমিও তেমনি এক খেলা খেলবো বলে আলোর উপরে অন্ধকার টেনে দিই। দারুণ রকমের একা হয়ে গেলে ভাবি তখন, ঈশ্বর কতোটা নিঃসঙ্গ হলে একক ও অদ্বিতীয় হয়।

চার
আমার স্বপ্নের অধ্যায় আসলে একক চরিত্রের থিয়েটার। সেখানে সারারাত আমি আলোর দিকে মুখ করে অন্ধকারে ডুবোডুবি করি। আমার দাদার লাগানো সুপারি বাগানে, কল্পিত করমচা বনে। আদম হাওয়ার মাঠে, গন্দমের বাগানে। আরো আরো কতো সব লৌকিক অলৌকিক লোকেশানে। এভাবে, আমার যাত্রা এখন মৃতের ময়দানে। কোনো কোনো স্বপ্নে আমি দারুণ ভীত হই। পথ বুঝি খুঁজি না তবু এসব থেকে বের হবো বলে আকুল হই। মৃতের ময়দানে কেনো যে আমি এক প্রাণ। নাকি, আমিও মৃতের অতীত কোনো চরিত্র নই কিনা। তাই মৃতের ময়দানে ঘুরি। কিন্তু আমি এখনো একটি ঝড়ের কথাই ভাবি। যদিও এখন আকাশ মেঘলা দেখলেই ঝড়ের কথা আর মনে আসে না। তবু, এখনো আমি ঝড়ের কথাই ভাবি কারণ ঝড় আমার অস্তিত্বে। যে ঝড় আসলে আমি কখনো দেখি নাই। যে ঝড় এসে আমাকে অভিজ্ঞতার পাঠদান করে যায় নাই। তেমনি ঝড়, আমার স্বপ্নে বন্যহাতির তা-ব নিয়ে আসুক। রক্তের প্রতিটি কণিকায় উন্মাদনা ছড়িয়ে আসুক। আমার আকাশে তারপর, সাদা সাদা বকের সার পেজা পেজা মেঘ হয়ে ভাসুক। এভাবে প্রাণের নৈকট্যে, সবকিছু ভরে উঠে মৃতের ময়দান থেকে একা একটি প্রাণ বের হয়ে আসুক।