এপ্রিলের দেবতা

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়


দুদিকে পিছল আর মাঝখানে অবতল খাদ
করুণ প্রপাত থেকে মানবিক হাসি অনন্তে গড়িয়ে যায়

তবে এই দেহের পচন, গলিত লাক্ষাদেশ—
খিদের দুদিক জুড়ে ঘাম, ক্লেদ, ভোরের সর্বনাম?

যে কোনও নবীন দিনে তোমার বিবাহ হবে নুসরাত
চোখের বাষ্পগুলি গর্ভিনী মেঘ হবে
প্রতিটি বাসস্টপ জানে তেমন সময় এখনও আসেনি

সমস্ত রাত্রি পেরিয়ে তোমাকে দেখি--
ছায়ার শেকল খুলে উড়িয়ে দিচ্ছ একান্ত রোদ্দুর
হাসির শৈশব, ব্যক্তিগত চিঠিদের জন্মদিন

হারিয়ে যাওয়া গল্পের উষ্ণতা নিয়ে
একদিন ঘুমিয়ে পড়বে তুমি
অসীম নিদ্রা পেরিয়ে নেমে আসবেন নিঃসঙ্গ দেবতা
তোমার ঘুমের পাশে রেখে যাবেন তাঁর উজ্জ্বল সোনালি টুপি




প্রতিটি শব্দমাংস ছেড়ে তোমার বসে থাকা দেখি
শান্ত জানলা থেকে এইসব আর্তনাদ আর ভালো লাগে না
ভালো লাগে না ফ্যাকাসে ক্যালেন্ডার থেকে খসে পড়া বুধবার

একটা মুহূর্তের বমি থেকে উঠে আসছে ঘুঙুর
ক্রমশ ভারী হচ্ছে তলপেট
যন্ত্রণা নামতে নামতে গোড়ালি অব্দি ঝিম্‌

নুসরাত, তোমার একান্ত তুলো আর ব্যান্ডাজের গল্প বল
বল সেই ঝকঝকে রক্তের কথা
লম্বা করিডর আর ঠান্ডা ডিসেম্বর পেরিয়ে ভেসে আসা প্রার্থনাসঙ্গীত

যা শেষ হবার আগেই ভেঙে পড়বে তীব্র বেঁকে যাওয়া একটা সন্ধে
আর আমরা বেরিয়ে পড়ব ব্যক্তিগত মুখোশের খোঁজে




যখন দেয়ালই তোমাকে ব্যঙ্গ করছে—
এই হাঁটু মুড়ে বসে থাকা মানায় না আর

তোমার দুই কাঁধ থেকে উঠে গেছে টলমলে ঘোরানো সিঁড়ি
পায়ের পাতা ভিজে যাচ্ছে ক্রমশ

দুঃখ কোরো না নুসরাত, একদিন ঠিক নেমে আসবেন
এপ্রিলের দেবতা তাঁর নিজস্ব ইস্তেহার নিয়ে
নিজের শরীর কেটে দেখাবেন যকৃত আর অগ্ন্যাশয়ের অবস্থান

সেইসব দিনে তোমার অসমাপ্ত কচি ভ্রূণ
আলগোছে তুলে আমরা উৎসব করব
আগুনে ঝলসে নেব টাটকা ভেড়ার মাংস

টিকে থাকার জন্য যা কিছু কালোবিদ্যা আয়ত্ত করেছি আমরা
তোমার কবরের পাশে সাজিয়ে
উৎসর্গ করব আমাদের ঘন ঋজু আত্মা




এইসব পরিত্যক্ত রেললাইন, ভাঙাচোরা কামরা তোমার কেউ না

তোমার জীবনে ছিল অজস্র পামগাছ আর মৃদু ফসলের দেশ
মনে কর ছায়াজীবন, পালকপিতার দেওয়া বালিঘড়ি
বাতিল হারপুন, পুরোনো টেবিলের জন্মদিন

তুমি কি ডাকবে না—সালভাদোর সালভাদোর...
ক্রমাগত বৃষ্টি আর অসহ্য শীত পেরিয়ে
তুমি কি গরম নিশ্বাসের কাছে ফিরে যাবে না কোনোদিন

প্রশ্নগুলো কেবলই উড়ে চলেছে নুসরাত
যে কোনও মঞ্চ থেকে সরে যাচ্ছে দূরে

মুচড়ে ওঠা আলো পেরিয়ে নাসপাতি রঙের সকাল
একটা ভাঙাচোরা দিনের আস্তরণ খসে পড়বে এবার

তোমার রঙচটা গল্প নিয়ে হয়তো ফিরে যাবেন এপ্রিলের দেবতা




লাল রবারের হাসি, এইসব ধারালো সকালে
তোমার পিচ্ছিল জিভের কথা মনে পড়ে
মনে পড়ে সেই পরিত্যক্ত এরোড্রাম, সাদা শীতল সরীসৃপ

হে আমার এপ্রিলের দেবতা, মৃত কুকুরের মুণ্ডু নিয়ে
তুমি কি এখনও বসে আছ
বিকেল হলেই পায়ের ব্যান্ডেজ খুলে অশ্লীল ইঙ্গিত করছ
খুচরো পয়সার শব্দে তোমার চেরা জিভ ভরে উঠছে আঠালো লালায়

সন্ধে নামার আগে বাতাসে অজস্র হ্রেষা
আর তুমি বাতিল ঘোড়ার পেটে ভরে দাও যাদুমুদ্রা
হলুদ নোংরা দাঁতে গেথে নিচ্ছ লাল রবারের হাসি

আমি একদিন ঠিক তোমাকে ঘৃণা করব
মরচে পড়া রাত্রি আর পিচ্ছিল অন্ধকার ছেড়ে
বালিপোড়ার গন্ধে ঘুমিয়ে পড়ব

কালো চশমা সামনে রেখে
গোলাপি ফ্লাইওভারের নীচে একদিন ঠিক
তোমার গলিত আঙুল কুড়িয়ে কুড়িয়ে শোকসভা করব আমি