লোবানগন্ধি দিন

মঈনুল হাসান

সরু গলির শেষ প্রান্তে প্রশস্ত ফুটপাথের ধার ঘেঁষে ঝলমলে ক্যাফেটি দাঁড়ানোÑ রঙিন শার্সিমোড়া যার ভেতরটা বাইরের চেয়েও ভীষণ চাকচিক্যময়। দূর থেকেও জ্বলজ্বলে নামটি দেখে যে কারুরই চোখ আটকে যাবে সেদিকেÑ ‘রোমিও : দ্য মিউজিক ক্যাফে’। তিনতলা শরীরের পুরোটাতে লাল-নীল-হলুদ-সবুজ নানা বাহারি রঙের ক্ষুদ্র বাতির কারসাজি বেশ যত্ন করে ঠাসা। সামনের সরু রাস্তায় পাথরের কুচি বিছানো; ছিটকে আসা আলোগুলো তার শীর্ষের ওপর পড়ে প্রতিদিনের মতো দারুণ উন্মাদনায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ভেঙে পড়ছে। কালো পিচঢালা রাস্তার অন্যপাশটায় ছোপ ছোপ নীলচে ছায়াঘন অন্ধকার। ওদিকে শহরের আকাশটা সন্ধ্যা নামার আগে আগে বেগুনি মেঘের ঘোলাটে অন্ধকার নিয়ে আরও কালো হয়ে নামছিল সরু গলিটার উপর। তবে ক্যাফের ভেতরের উজ্জ্বল আলোকসারির বিস্তৃত অংশের অনেকটাই এখন আলোকিত করে রেখেছে বাইরের ফুটপাথ, এমনকি ফুটপাথে দাঁড়ানো উৎসুক মানুষগুলোকে।
ক্যাফের বিচিত্র আলো প্রতিদিনের মতোই দারুণ বিভ্রান্তিপূর্ণÑ যা তার নতুন খদ্দেরদের কৌতূহলভরা একজোড়া চোখকে ধাঁধিয়ে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। সপ্তাহের অন্য আর সব দিনের মতোই অভ্যাসবশত নিয়ন আলোয় মোড়ানো নামফলকের দিকে তাকিয়ে শরীরের শূন্য খোলসের ভেতর একটা বাড়তি রোমাঞ্চ নিয়ে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করে সামিন। সন্ধ্যার রাস্তায় দীর্ঘ আঁকিবুঁকির মতো রোমাঞ্চিত খদ্দেরদের ছায়া আরও গাঢ় হয়ে উঠলে সেগুলো মাড়িয়ে ভেতরে প্রবেশের প্রস্তুতি নেয় সে।
ক্যাফের নিচতলাটা বেশ খোলামেলা-পরিপাটি; শুধু অভ্যর্থনা আর খদ্দেরদের অপেক্ষার জন্যে। দোতলায় মূল লাউঞ্জÑ বিকেল ও সন্ধ্যার পর যেখানে মানুষের আগমন বেড়ে যায়; তবে রাত নয়টার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কিংবা ভোরের মধ্যবর্তী সময়ে একেবারে পাল্টে গিয়ে ভিন্ন চেহারা দখল করে মাঝে মাঝে। সামিন কখনও তিনতলায় ওঠেনি; তবে সেখানে আংশিক চিলেকোঠা আর ছাদবাগানসহ রুফটপ বারবিকিউ বুফের বিশাল আয়োজন রয়েছে। দেশ-বিদেশের লোভনীয় নানান খাবারের গন্ধে ম-ম করা যাবতীয় আয়োজন ‘রোমিও’কে ব্যতিক্রম ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে হাঁপিয়ে ওঠা শহরের বুকে। প্রত্যেক তলার রঙ-স্বাদ-গন্ধ দারুণভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ। সামিন তার ইন্দ্রিয়কে সে বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ ও আস্থায় রেখে ভেতরে যখন প্রবেশ করে সেখানে তখন ধীর লয়ে চলছিল পাশ্চাত্য কোনো জ্যাজ সংগীতের অপরূপ মূর্ছনা। সান্ধ্যকালীন সে মূর্ছনায় পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগেই একটা যান্ত্রিক আওয়াজ তাকে থামায়।
‘গুড ইভনিং স্যার’। ম্যানিকিনের মতো আঁটসাঁট পোশাকে আবৃত বোধহীন এক পুতুল মানুষের ঈষদুষ্ণ অভ্যর্থনায় একটু দাঁড়িয়ে পড়ে সামিন। গলার স্বরে কোনো তারতম্য নেই; শুধু ঠোঁট আর চোখের পাতা দুটি স্বভাবমতো কাঁপছিল। মুখে বরাবরের মতো ঝুলে থাকা হাসির সাথে কৌতূহলভরা চোখের চাহনি। দ্বিতীয় তলার গভীর রাতের খদ্দেরদের এরা চেনে। তাই এদের হাসিতে একটা অর্থপূর্ণ ব্যাপার লেপটে থাকে।
কিছু বলবে না ভেবেও সামিন মুখে যথাসম্ভব হাসি এনে উত্তর দেয়, ‘ইভনিং’। আর তখনই ব্রাজিলিয়ান কিংবা কলম্বিয়ান সতেজ ‘অ্যারাবিকা’ কফির একটা উষ্ণতাতাড়িত মিষ্টি গন্ধের ঝাপটা তাকে ঘিরে ধরে চারপাশ থেকে। সাথে আরও মিশে ছিল তরুণ-তরুণীদের উষ্ণ নিঃশ্বাসের প্রেমোদ্দীপক আবেগময় ছোট ছোট বাষ্পকণাÑ বাতাসে ওড়া ইতস্তত ত্রসরেণুর মতো। শিহরিত সে রগরগে গন্ধ যথাসম্ভব পাশ কাটিয়ে চোখ ধাঁধানো আলো সাঁতরে সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উপরে উঠে যায় সে।
বিকেলের পর থেকে শহরের বুকে বৃষ্টি হবার কথা ছিল। হয়েছেও বোধ হয় কোথাও। কিন্তু গলির এধারে কী এক অজানা কারণে জমাট মেঘ সরে গিয়ে আর বৃষ্টি হলো না। কয়েকদিন ধরেই ব্যাপারটি ঘটছে। আর সেজন্য দিনশেষের স্তব্ধ হাওয়া একটা ভারী শীতল অনুভূতি নিয়ে সাঁই সাঁই করে এখন ধেয়ে বেড়াচ্ছে শহরের আনাচ-কানাচে। ‘রোমিও’র কাচঘেরা শরীরে প্রবেশের সুযোগ না পেয়ে এলোমেলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সৌখিন গাছ-গাছালির ওপরÑ ফুটপাথের চারদিকে।
বাইরের গুমোট আবহাওয়া থেকে গা বাঁচিয়ে দোতলার এক কোণে পছন্দসই একটি টেবিল বেছে শীতাতপ যন্ত্রের কাছাকাছি গিয়ে বসে সামিন। এখান থেকে অদূরের গলির দিকটা আর ক্যাফের প্রবেশমুখ দুটোই স্পষ্ট দেখা যায়। দোতলায় ভিড় একেবারেই নেই। শুধু সিঁড়ির কাছাকাছি একটি টেবিলে একজন মধ্যবয়সী খদ্দের কারও জন্যে অপেক্ষায় বসে আছে। তবে রাতের দিকে মানুষের ভিড় বেড়ে গেলে অনেকে রুদ্ধশ্বাসে রুফটপে ছুটে গিয়ে আলোময় শহরের ধোঁয়াটে আকাশ দেখে। প্রাণহীন বাতাসের দম বুকে ভরে নিয়ে প্রাণ ফিরিয়ে আনার যথাসাধ্য চেষ্টা করে।

২.
‘রোমিও’র ঝকঝকে কাচের ভুবনে সামিন নতুন নয়। তার নিয়ম করে আসার শুরুর মাসখানেক আগে থেকে তরুণীটিকে মাঝে মাঝে এখানে দেখেছিল সে। সামিনকে দেখে চোখাচোখি হতেই সে হাস্যোজ্জ্বল মুখে এগিয়ে আসে। জমকালো সাজের কারণে তাকে অন্যদিনের চেয়েও কেমন বেমানান লাগছিল আজÑ মাথার বেশ উঁচুতে দৃঢ় খোঁপাবদ্ধ চুল, শরীরে খুব কৌশলে গুছানো আঁটসাঁট শিফনের শাড়ি এবং সাথে অন্যান্য সাজ-প্রসাধনে কোথাও পরিমিতি নেই। তার পেশাদারিত্ব মাখানো হাসিটি বেশ বিস্তৃত, কথা বলার ভঙ্গি অভ্যস্ততা মেশানোÑ তবে আন্তরিক নয়। কমলা রঙের ফিনফিনে শাড়িতে তাকে খুব উজ্জ্বল দেখালেও শরীরের কড়া পারফিউমের গন্ধ তার চেয়েও ঝাঁঝালো। সে ঘ্রাণ শরীরের গন্ধ পুরোপুরি ঢেকে দিয়ে খদ্দেরদের স্নায়ুকে সম্পূর্ণ অবশ করে দিতে পারে; এমনটাই মনে হয় সামিনের। কেমন বুনো ঘোটকীর গায়ের গন্ধের মতো উৎকট লাগছেÑ কী মেখেছে সে? ‘প্রাডা’ নাকি ‘ডলসি এন্ড গাবানা’?
হ্যালো স্যার, ‘গুড ইভনিং’। কিছু দেব?
আমি অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণ পর জানাব।
ওকে স্যার। তবে ভেতরে আমাদের ‘ইলুজন’ কক্ষ ফাঁকা রয়েছে। চাইলে ওখানে গিয়ে বসতে পারেন স্যার।
‘ইলুজন’ কক্ষগুলো ‘রোমিও’র প্রাণ। এখানে সময় কাটাতেই তরুণ-তরুণীরা বেশি আসে, বেশ পছন্দও করে। কৃত্রিম আলো সেঁটে দেয়া ছোট্ট গণ্ডির ভেতর আলো-আঁধারির মতো বিভ্র্রম জুড়ে রাখা আছে। মাঝে মাঝে সামিনেরও ইচ্ছা হয়, এ ‘ইলুজন’ কক্ষকে তার স্টুডিও এপার্টমেন্টের এক কোণে নিয়ে যেতে। একটা দীর্ঘ মায়াবী রাত্রির বিভ্রমে ডুবে যেতে। তরুণীটির আবেগময় ইঙ্গিত শুনে যে কারও অন্যরকম ভাবনা আসতে পারে। তবে ব্যাপারটি পারস্পরিক সমঝোতাপ্রসূত। কামতাড়িত মধুপের মতো শরীরে ভিন্ন ব্যঞ্জনা তৈরি হলে গভীর রাতের প্রান্তে এ বিভ্রম কক্ষের প্রয়োজন হতেও পারে। কোনো প্রণয় আখ্যান রচনার ভাবনা তার নয়; সাময়িক সে সঙ্গের আস্বাদ খোঁজা থেকে সামিন অনেক বাইরে।
তরুণীটির লাফিয়ে চলার ভঙ্গি তাকে ঘোটকীর সাথে তুলনায় বা সে ভাবনায় এগিয়ে নিতে সামিনকে প্রলুব্ধ করে। কিছু লাগবে না বলার পরেও তরুণীটি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পোরসেলিনের ট্রেতে বরফকুচি দেয়া ব্ল্যাকবেরির জুস আর হিমশীতল মিনারেল ওয়াটার সাজিয়ে পরিবেশন করে তাকে। সামিনের পছন্দ সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত সে। যদিও আজ তার তেমন কিছুই গ্রহণ করতে ইচ্ছা করছে না। ফিরে এসে সামিনের বেশ কাছ ঘেঁষে দ্বিতীয়বার হাসির দমক ছড়িয়ে এ পরিবেশনের মৌন সম্মতি আদায় করে নেয় একবার। টেবিলের কাছটায় বিছিয়ে রাখা হলুদ-লাল রানারের উপর খুব আলতো করে রেখে দেয় সাজিয়ে আনা ট্রে।
দুপুর থেকে ভর করা চাপা অস্থিরতা বিষণ্নতায় রূপ নিয়ে বিকেলের দিকে সামিনের শরীরে চেপে বসেছে। তাই প্রথমে পানি ঢেলে গলা শীতল করে নেয়Ñ তারপর বরফ দেয়া ব্ল্যাকবেরি জুসের গ্লাসে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। ওটাও তার কাছে বিস্বাদ ঠেকে। ‘রোমিও’র আলো-হাওয়ায় কিংবা চারপাশের কৃত্রিম গন্ধে অস্থিরতার কিছুটা প্রশমন হলো কিনা কে জানে? আর ঠিক তখনই কী মনে করে যেন তরুণীটি তার রাজকীয় সোফার হাতলের উপর এসে বসে। তার ঝাঁঝালো প্রসাধনের গন্ধ সামিনের করোটি ছেদ করে একেবারে ভেতরে ঢুকে সবকিছু অসাড় করে দেয়। এ গন্ধে কি মাদক মেশানো? তবে এমন লাগছে কেন? গ্লাস হাতে নিশ্চুপ বসে সোফার গায়ে হেলান দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকে সে। তরুণীটি একবার শুধু বলে, শরীর খারাপ লাগছে স্যার? কিছু লাগবে আপনার?
নিরুত্তর সামিন তখন ‘রোমিও’র পরিচিত চেনা জগৎ থেকে বিচরণ করছিল অনেকটা দূরে। তার শরীর ডুবে গিয়েছিল কাচঘেরা উজ্জ্বল আলোর সুগন্ধ মেশানো অপার্থিব এক ভুবনে। আর ঘোরগ্রস্ত মনটাও। তরুণীটির শরীরের গন্ধে অথবা উৎকট মেয়েলি সুগন্ধির জোয়ারে ভাসতে ভাসতে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল সামিন কে জানে! আসলে হাজারো গন্ধের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়ার কারণে আজ মানুষের সত্যিকার গন্ধও সে ভুলে গেছে। ঘ্রাণটা একসময় সামিনের পরিচিত হয়ে আসে আর ঝিমঝিম করা মাথা নিয়ে খুব মনে করার চেষ্টা করে যায় নামটা।

৩.
শহরের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সাজিদ আনোয়ারের দেশে-বিদেশে বিস্তৃত ব্যবসা রয়েছে। একমাত্র সন্তান হিসেবে সামিন এ বিশাল ব্যবসার যোগ্য উত্তরসূরী। তার ব্যবসায়িক বন্ধু শিহাবকে সাথে নিয়ে সে মূলত তাদের ‘এসএ ফ্যাশন এন্ড টেক্সটাইল’ অংশটাই দেখে। এজন্য মাঝে মাঝে তাকে দেশের বাইরে ব্যবসায়িক ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং করতে হয়। তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের প্রমোশনে আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনারে যাওয়া, ফ্যাশন শো আয়োজনসহ ট্রেড ফেয়ারেও অংশগ্রহণ করতে হয়। এই তো গেলবারের ট্রেড ফেয়ারে ইউরোপ থেকে যে বিশাল অর্ডার পেয়েছিল তার নেগোসিয়েশন থেকে শুরু করে শীপমেন্ট পর্যন্ত পুরো কাজটি সে একাই সামলেছিল। এটা তার জন্য ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এদিকে দুবছর হলো সামিন নিজে বিদেশি নামী সব ব্র্যান্ডের পারফিউম ইমপোর্ট করে আলাদা বিজনেস সাজিয়েছে একদম নিজের মতো করে। শহরের বিলাসবহুল ব্যস্ততম এক বিপণিতে এটা তার নিজস্ব ‘সুগন্ধি রাজ্য’। বলা যায়, সুগন্ধি এ বাণিজ্য ঘিরেই তার একান্ত নতুন জীবন। বাবা সাজিদ আনোয়ারও বুঝেছিলেন ব্যবসায়িক জ্ঞানে সামিনের পেছনে তাকানোর কোনো সুযোগ নেই। সেই থেকে শুরুÑ আর এখন প্রতিনিয়ত নিজেকে ঝালিয়ে নিচ্ছে অর্জিত অভিজ্ঞতায় শান দিয়ে।
মাত্র কয়েকদিন হলো সামিন ফিরে এসেছে ভিয়েতনামে সদ্য শেষ হওয়া ‘ইন্টারন্যাশনাল পারফিউম ফেস্টিভ্যাল’ থেকে। সপ্তাহখানেকের জন্যে সে গিয়েছিল হ্যানয়ের ‘পারফিউম প্যাগোডায়’। প্রাচীন সে মন্দির ঘিরে পৃথিবীর তাবৎ বড় বড় সব লাক্সারি ও সিগনেচার ব্র্যান্ডের সুগন্ধির সমাহার ঘটেছিল। সুগন্ধি উৎসবের এমন জমকালো আয়োজনের ফাঁকে লোভনীয় নানা স্বাদ-গন্ধের খাবারের আস্বাদন ও অসাধারণ সব সুগন্ধের রাজত্বে নিমগ্ন ডুবে থাকার জন্যে কয়েকটা দিন মোটেও যথেষ্ট ছিল না। এদিকে দেশে ব্র্যান্ডেড পারফিউমের সবচেয়ে বড় বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে একচেটিয়া জায়গা করে নেয়াটাও বেশ চ্যালেঞ্জের ছিল; যা বর্তমানে সুগন্ধিদ্রব্যের মতোই একটু একটু করে সুনাম ছড়াচ্ছে চারদিকে। নিজ চেষ্টায় এ অর্জন নিয়ে তার গর্বও হয় খানিকটা। মাত্র দুবছরে এতখানি সে আশা করেনি। আর এখন? দেশে-বিদেশে কোথাও আমন্ত্রণ পেলে কিংবা ফ্যাশন বা পারফিউম নিয়ে কোনো ধরনের প্রদর্শনী হলেই সামিন উড়ন দিয়ে বসে।

সন্ধ্যার ঘড়ির কাঁটা রাতের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে। আবীর আর মিহির কেউই আজ আসবে না তাকে জানিয়েছে। দুপুর থেকে অস্থিরতার কারণ খুঁজে না পেয়ে একবার ভেবেছিল সেও আসবে না। তবে সপ্তাহে কমপক্ষে চারদিন এখানে না এলে তার কেমন যেন শূন্যতা বোধ হয়। অনেক ভেবে তাই জোর করেই শিহাবকে আসার জন্য অনুরোধ করেছে আজ। ওদিকে শাশ্বতদা চলে এলেই আপাতত তিনজনে মিলে ‘রোমিও’র দীপ্তিমান ভ্রান্তিবিলাসে ডুবে যেতে পারবে।
মাথার উপর ঝোলানো কাচকাটা ঝাড়বাতির সুদৃশ্য ঝালরে পালিশ করা নানা রঙের শেড। সে কারণে ঠিকরে আসা আলোগুলো দোতলার পুরোটা জায়গায় মোহনীয় এক আবেশ তৈরি করে রেখেছে। দেয়ালের রঙগুলোও আজ ভীষণ চড়া মনে হচ্ছে সামিনের। ব্ল্যাকবেরি জুসের তলানি এখনও গ্লাসে পড়ে আছে। তার ঝিমঝিম নেশা লাগা ভাবনাটা সুগন্ধি হাওয়ার মতো তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দুবাই, কখনও ইতালি কিংবা প্যারিসের ঝলমলে নগরীতে। আজ তো সে অন্য কিছু ছোঁয়নিÑ তবে এমন ঝিমঝিম নেশা লাগছে কেন? তবে কি সেই ঘোড়ামুখো তরুণীটির চারপাশে রেখে যাওয়া বাতাসের তীব্র মেয়েলি প্রসাধনের এক টুকরো গন্ধ থেকেই এমন বোধ হচ্ছে?
ঘ্রাণটা এবার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। এটা কি ‘জুপ’ নাকি ‘গুচি’? সেঁজুতি কি এমন পারফিউম মেখেই তার সাথে শেষ ফ্যাশন উইকে দুবাই গিয়েছিল? এখন আর ঠিক মনে পড়ছে না। একবার জিজ্ঞেস করবে নাকি তাকে? আজ থাক, অন্যদিন না হয়...শাশ্বতদা চলে আসার আগে আবারও ভালো করে চোখ রগড়ে মুখে পানি ছিটিয়ে আগের জায়গায় এসে বসে সে।
সামিন নিজেকে বোঝায়, চারদিকে যে নানা ধরনের সুবাস ছড়ানো সেখানে এক আড়াল লুকিয়ে আছেÑ এ যে শুধুই রঙভরা ভ্রম, চিন্তার বিভ্রম। পরিশ্রমী মানুষের গায়ের ঘামের গন্ধ নাকি অনেক বেশি দামীÑ শাশ্বতদা সাথে থাকলে তা সহজে বোঝা যায়। শাশ্বতদার এসব ‘মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্ট’ দেখে সে আহত হয় মাঝে মাঝে। এ নিয়ে তাদের তুমুল তর্কও চলে। কিন্তু তারপরেও কী করে যে এই মানুষটা তার এত প্রিয় হয়ে গেল সামিন জানে না। সপ্তাহে অন্তত তিন-চারদিন তার সাথে না বসলে কেমন যেন অপূর্ণতা কাজ করে মনের ভেতর। তাই সে বারবার তাকায় নিচতলার এন্ট্রি পয়েন্টের সীমানায়, সেখান থেকে চোখ ফিরিয়ে আনে উপরে ওঠার সিঁড়ির দিকে। একটা পরিচিত গন্ধের লেশ পাওয়ামাত্র সে তাকিয়ে দেখে সেই সুদীর্ঘ মানুষটি।

৪.
কীরে তোকে এমন বিষণ্ন দেখাচ্ছে কেন? আমাকে রেখে আগেই শুরু করেছিস্? শাশ্বতদার প্রশ্ন।
কই না তো? তোমার এত দেরি হলো কেন? সেই বিকেলে কথা হলো। কখন থেকে একা একা বোর হচ্ছিলাম।
রাস্তায় যে জ্যাম। তোর মতো তো আর পাজেরো হাঁকিয়ে আসিনি। তাছাড়া তুই ভালো করেই জানিস্ ‘রোমিও’র এ লোকেশনটা আমার বাসা থেকে একেবারে উল্টো দিকে। ওদিকে একটু বৃষ্টি হতেই সিএনজি সব বন্ধ...তাছাড়া বাসা থেকে ফিরে...
হয়েছে হয়েছে। এবার বাদ দাও ওসব। কী নেবে আজ? স্কচ হুইস্কি? জিন না ভদকা?
সামিন খুব ভালো করেই জানে শাশ্বতদার স্কচ না হলে চলে না। তবে মাঝে মাঝে ভদকাও সই। অর্থের প্রাচুর্য দিয়ে সে আসলে সময় কিনে নেয় পছন্দের মানুষগুলোর কাছ থেকে। ওদিকে অন্যরাও একটু আভিজাত্যের উপকরণগুলো নাড়াচাড়া করে সাময়িক বিলাসিতার আড়ালে হারিয়ে যাবার চেষ্টা করে।
নূপুর এসেছিল নাকি? ঠিক দেখছি না ওকে।
কে নূপুর, শাশ্বতদা ? ঘোড়ামুখী ওই মেয়েটা নাকি? তোমার ফিঁয়াসে?
আরে ধুর। সেরকম কিছু না। তবে মেয়েটা শালা একটা মাল। শরীর দেখেছিস্? আর বুকটা? সবসময় পাতলা ফিনফিনে শাড়ি পড়ে বুক দেখাবার চেষ্টা করে। আর ক্যাফের আলো-আঁধারিতে ওরকম একটা খাসা মাল না হলে ঠিক জমেও না, বুঝেছিস্? তবে শালা কঠিন জিনিস। ওর গায়ের গন্ধটাও জোশ।
তোমার এ ছোঁক ছোঁক স্বভাবের কথা বৌদি জানে তো? ছিলো তো এতক্ষণ আশেপাশে। যাক গে, বাদ দাও।
আরে তোর বৌদির গায়ের গন্ধ-বুক-শরীরের অলিগলি সবই তো পুরনো হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে...
তোমার সবটাই মুখে মুখে। একদিনও তো গভীর রাত পর্যন্ত থাকতে চাইলে না। তখন আবার বৌদির ছুতো তুলে লেজ গুটিয়ে বাড়ি চলে যাও।
হুঁম... ওখানেই তো মধ্যবিত্তের মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন, জীবনের জটিল সমস্যা। তোদের মতো অত সহজে সবকিছু করতে পারি না। শুধু মুখে মুখেই রাজা উজির মেরে যাই। এসব দর্শনতত্ত্ব বাদ দিয়ে কাউকে ডাক এবার।
একটা হুইস্কি ভালো করে সোডাজল দিয়ে বানিয়ে দিতে বলি? আর সাথে টমেটো জুস আর কিছু চিকেন উইংস। ওদের ‘বারটেন্ডার’ আছে। ও ভালো করে বানিয়ে দেবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা পরিপাটি ছেলে ট্রেতে করে স্কচের রঙিন বোতল, সোডাজল, টমেটো জুস, দুটা স্বচ্ছ কাচের গ্লাস, বরফকুচির পাত্র আর লাল তাবাস্কো গুঁড়ো নিয়ে এগিয়ে আসে। তারপর যথেষ্ট পারদর্শিতায় সবকিছু প্রস্তুত করে স্মিত হেসে বলে, স্যার, এবার আপনারা শুরু করুন। ফ্রাই আর সালাদ এখনই নিয়ে আসছি।
ঠিক আছে, তুমি যাও। তোকে এমন মনমরা লাগছে কেন রে? কী হয়েছে? শাশ্বতদা জিজ্ঞাসা করে।
জানি না ঠিক। আজ দুপুরের পর থেকেই মনটা কেমন অস্থির লাগছে। কোনো কাজেই মন বসছে না। দুদিনের কথা বলে গফুর চাচাও বাড়ি গিয়েছে অনেকদিন। কিন্তু, তুমি তো জানো সে এখন বড় অবলম্বন হয়ে গেছে আমাদের। বাবা আর আমার অনেক বড় নির্ভরতা। এদিকে দেশে ফিরে শুনি চাচা নাকি ভীষণ অসুস্থ।
ও, এই ব্যাপার? তবে ঘুরে আয় গ্রাম থেকে। শুনেছি সেই তো কোলেপিঠে করে তোকে বড় করেছে। তোর সব। তবে এত ভাবনা কীসের?
সন্ধ্যা থেকে বাবা দুবার ফোন করেছিলেন। আমি একবারও রিসিভ করিনি।
ধরলি না কেন? কিছু হয়েছে?
না, তেমন কিছু হয়নি। কেন জানি ইচ্ছা করল না। দেন হি সেন্ড মি এ শর্ট মেসেজ। ‘ইটস আর্জেন্ট। ট্রাই টু কাম হোম আরলি’। তারপর থেকেই ভীষণ নার্ভাস লাগছে। শেষবার বিদেশ যাবার আগে বাবা যেতে নিষেধ করেছিলেন আমাকে। আমি বারণ শুনিনি। আজ কেন জানি মনে হচ্ছে কোনো খারাপ সংবাদ অপেক্ষা করছে আমার শোনার জন্যে। একটা সঙ্কোচ, ভয় ভেতর থেকে টেনে ধরছে বারবার।
আরে অত ভাবছিস্ কেন? সব ঠিক আছে। তোর ভালো না লাগলে আজ দরকার নেই। অন্যদিন হবে। মিহির, আবীর ওরা কেউ আসবে?
না। তোমার কথা চিন্তা করে শিহাবকে জোর করেছি আসতে। ও হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে। রাত তো তেমন হয়নি। এগারোটার কাছাকাছি বাজে। আমার কেন জানি বুক ধকধক করছে শাশ্বতদা। মনে হচ্ছে... কোথাও খারাপ কিছু একটা হয়েছে। শরীরটা খুব দুর্বল ও বিষণ্ন লাগছে। শিহাব আসা পর্যন্ত তোমাকে আরও কিছুক্ষণ সঙ্গ দিই। তারপর...
সামিন আর শাশ্বতদার নিজস্ব জগতের মধ্যে আর কেউ তখন প্রবেশ করতে পারে না। হঠাৎ করেই দুজন একদম চুপ হয়ে গেলে একটা মানানসই নির্জনতা চেপে বসে সেখানে। শাশ্বতদা একটার পর একটা পেগ শেষ করে নেশায় ডুবে যায় একাÑ একটা আপাত শূন্যতার ঘোরে। সামিনও হারিয়ে যায় সেদিনের মতো। ওদের চারপাশে জেগে থাকা কিছু মানুষের স্বপ্নমুখর কোলাহল, টুংটাং আওয়াজ, পাশ্চাত্য জ্যাজের মূর্ছনা সবকিছুই নিরাপদ দূরত্বে থেকে হোঁচট খায় শুধুÑ নিছক অনুষঙ্গের মতো।
‘রোমিও’র কাচঘেরা দুর্লভ বিভ্রম থেকে বের হবার পরেও রাস্তার উপর লাল-নীল-হলুদ ডোরাকাটা দীপ্তিমান আলোর ছটা কেমন ঝকমক করে জ্বলছিল আর নিভছিল। শহুরে জোনাক পোকার মতো এ আলো সহজে হাতের মুঠোয় ধরা যায়, চাইলে পাওয়াও যায়। শিহাব এসেছিল শেষের দিকে, অনেকটা দেরি করে। শিহাব আর শাশ্বতদাকে আলোছায়ার রোমাঞ্চে ডুবিয়ে রেখে ধাঁধানো রঙিন জগৎ থেকে সিঁদ কেটে বেরিয়ে সেদিনের মতো নিষ্কৃতি মেলে সামিনের।

৫.
রাস্তায় নেমে গাড়িতে স্টার্ট দিতেই সামিনের মনে হয় শহরের বাতাসটা কেমন প্রাণহীন, দুর্গন্ধময়। জীপের ভেতরের পরিবেশটাও শহরের মতো দমবন্ধ ঠেকছে যেন। বেশ কয়েকবার ‘এয়ার ফ্রেশনার’ স্প্রে শেষে গন্তব্য ঠিক করে বনানীতেÑ তার নিজস্ব স্টুডিও এপার্টমেন্টের দিকে। সেখানে মা-বিহীন বাবা আর গফুর চাচাকে নিয়ে অনেকগুলো বছর সত্যিই কাটিয়ে দিল সে। মায়ের কথাটা মনে হতেই একটা আবছামতো চেহারা মনে ভাসে তার। আর সাথে শেখানো সেই প্রিয় গন্ধের সুরভি। দূরে রাখা পারফিউমের খোলা শিশি থেকে যেমন হালকা গন্ধ উপচে আসে, ঠিক তেমনিভাবে আজ অনেকদিন পর একটা কোমল সতেজ ঘ্রাণ তার নাকে এসে লাগতে থাকে।
সামিনের বয়স কত হয়েছে ভাবার আগে বলতে হয় এর মধ্যেই পৃথিবীটা তার আবর্তনে কম করে হলেও পঁয়ত্রিশবার চক্কর খেয়েছে। যদিও লম্বা, সুদর্শন, গ্রীক ভাস্কর্যের মতো সুঠামদেহী সামিনকে তার চেয়েও কমবয়সী দেখায়। আবীর ও মিহির ওর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। তবে শিহাবের সাথে ওর ঘনিষ্ঠের গভীরতা ব্যবসায়িক সূত্র ধরে। কাজপাগল মানুষ বলে বাবার ব্যবসা আর নিজের একান্ত সুগন্ধি জগতের বাইরে এখন পর্যন্ত কোনো তরুণী সঙ্গের প্রতি আসক্তি হলো না তার। তার ইন্দ্রিয়গুলো সচেতনভাবেই রিপুর বাধ্যগত নয়Ñ তীব্র এক ইচ্ছাশক্তির অনুগত হয়ে কাজ করে কেবল।
ছোটবেলা থেকেই এক আশ্চর্য ঘ্রাণশক্তি নিয়ে বড় হয়েছে সে। এ শক্তি এখন তার মজ্জাগত উপাদান হয়ে গেছে বোধহয়। মা চলে যাবার অনেক পরে সামিন যখন একটু একটু বুঝতে শিখেছে গফুর চাচা মায়ের শাড়ি বা ব্যবহার্য জিনিসপত্র সামনে মেলে ধরে বলতেন, ‘খোকা, এখানে তোমার মায়ের শরীরের গন্ধ লেগে রয়েছে’। মায়ের অবর্তমানে এভাবে গন্ধ শুঁকে শুঁকে মায়ের অস্তিত্ব বুঝতে শিখে গেছে সে। গফুর চাচার ক্ষেত্রেও উপলব্ধিটা তাই। সারাদিনের কাজের শেষে তিনি যখন সামিনের কাছ ঘেঁষতেন তার শরীরের নোনা গন্ধও সে ঠিক বুঝতে পারতো। আজ এতগুলো বছর ধরে সামিনের ইন্দ্রিয় শক্তি ভালো-মন্দ বিচারের চাইতেও ব্যাপারটিকে একটা নির্ভরতার জায়গায় নিয়ে গেছে। সেই অভ্যস্ততায় ক্ষণিকের ছেদ তাকে বড় বেশি বিচলিত করে তুলছে।
তিনতলা ‘রোমিও’র বিলাসিতায় ডুবে সামিনসহ তার পরিচিত মানুষগুলো একটি নতুন অভ্যস্তের জায়গায় মিলিত হবার চেষ্টায় হাবুডুবু খায়। তাদের নিজস্ব অলীক ভুবন সাজিয়ে জীবনকে এগিয়ে নিতে চায়। এতে সাময়িক দুঃখবোধের উপশম হয়তো হয়, কিন্তু ঘোর কেটে গেলে মানুষগুলো আবার পুরনো আবর্তে আবদ্ধ হয়ে পড়ে বিছিন্ন কষ্টের মতো। তাদের প্রত্যেকের ইন্দ্রিয় শক্তি আলাদা, তার স্বরূপ ভিন্ন। সামিনও এ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আর সেজন্যে বহুদিনের সম্পর্কের ঘেরাটোপে মেলামেশা করা প্রতিটি মানুষের শরীর ও মনে যে আলাদা প্রকরণ মিশে আছে তা তার চেনা। সে সম্পর্কের কোথায় পবিত্রতা আর কোথায় আবিলতা আছে তা সে বুঝতে পারে এখন তার ইন্দ্রিয় শক্তির বিচারে। তারপরও নির্ণয়হীন সেসব সম্পর্কের তারতম্য পেছনে ফেলে সে সবাইকে এক ভুবনের বাসিন্দা হবার আমন্ত্রণ জানায় এক অপরিচিত অভ্যস্ত খোলসে বন্দি হবার জন্যে। সামিনের মন ও শরীরের প্রকরণে বৈচিত্র্য খেলা করে বলেই সে হয়তো বহুগন্ধি জগৎ সাজিয়ে মৃৎগন্ধি মানুষের ঘ্রাণ ভুলে থাকতে চায় অভিমানে।
এপার্টমেন্টে ফেরার পরই বাবা ডেকে পাঠায় তাকে। ব্যবসা সংক্রান্ত আলোচনা কিংবা তার ছন্দহীন জীবনের পথনির্দেশ যে কোনো কিছু নিয়েই তাদের কথোপকথন হতে পারে আজ। সেসব কিছুর মুখোমুখি হবার আগে নিজেকে যথাসম্ভব প্রস্তুত করে সামিন সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বসার ঘরেই অপেক্ষা করছিলেন তিনি। সামিনকে দেখে কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলে ওঠেন, পলাশগঞ্জ থেকে খবর এসেছে।
হঠাৎ বুঝতে না পারলেও সে চুপ করে তাকিয়ে থাকে বাবার গম্ভীর মুখের দিকে।
গফুর নেই।
সামিন আঁতকে উঠে বলে, নেই মানে?
নেই মানে বেঁচে নেই। দুপুরের পর একটা ম্যাসিভ হার্ট এটাক হয়েছে। আমি জেনেছি বিকেলের দিকে। অফিসে খোঁজ নিয়ে জেনেছি তুমি বেরিয়ে পড়েছ দুপুরের পরে। তারপর থেকেই বার বার ফোনে রিচ করার চেষ্টা করছিলাম। বাট ইট ওয়াজ সুইচড অফ।
গ্রীক ভাস্কর্যের আশ্চর্য মূর্তির মতো সামিন নিরুত্তর দাঁড়িয়ে থাকে। বিলাসবহুল সে এপার্টমেন্টে অনেক বিলাসী দ্রব্যের মাঝে গফুর চাচাই ছিলেন একমাত্র ব্যতিক্রম যে কিনা ছায়ার মতো অনুসরণ করতো তাদের প্রাত্যহিক প্রয়োজনে। সামিন বড় হবার পর থেকেই তাকে এ বাড়িতে দেখেছে। মা যখন বেঁচে ছিলেন গফুর চাচাকে ভীষণ সমীহ করতেন। বাবাও তাই। অনেকদিন বাদে পলাশগঞ্জ গিয়েছিল কী এক জরুরী কারণে। কিন্তু আর ফেরেনি। শুনেছিল অসুস্থ। ব্যস, এতটুকুই জেনেছে। ব্যস্ততার ফাঁকে আর কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি।
আসলে...তোমাকে কিছু বলা দরকার। যদিও বাড়ি যাবার আগ থেকেই গফুর বলছিল তার অসুস্থতার কথা। আমি সময় দিতে পারিনি। তুমিও নয়। গফুরকে শুধু বলেছিলাম, ঠিক আছে, কিছুদিন বাড়ি থেকে আস। সামিন ফিরে এলে না হয় আবার...
এটুকু বলে গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাবা একটু থামেন। কেমন একটা ইতস্তত বোধ নিয়ে আবার বলতে শুরু করেন, গফুর এবার বাড়ি যাবার আগে তোমাকে খুব করে দেখতে চেয়েছিল বারবার। তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছিল। বিষয়টি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল বেশ।
দিনশেষের অস্থিরতা আরও গভীর অবসাদগ্রস্ত হয়ে ঘরজুড়ে নেমে আসে। সে অনুভূতির অদ্ভুত দীর্ঘ ছায়া মুহূর্তে সামিনকে গ্রাস করে নিলে সে টের পায়, পাথরের মতো সুঠাম শরীরের ভেতরে মোমগলা শীতল বেদনাস্রোত বইছে। প্রাণের অন্তঃপুর জুড়ে সুগন্ধি নিয়ে উঁকি দেয়া ভাবনাগুলো তার কাছে নিরর্থক ঠেকছে এখন। হঠাৎ তীব্র একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গেল যেন কেউ শরীরে-মনে। তার গায়ের নিজস্ব গন্ধের আড়াল থেকে একটা পুরাতন পরিচিত গন্ধ হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার মতো শূন্য একটা বোধ তাকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে রাখছে। বোধশূন্য এ অনুভূতি তাকে চলৎশক্তিহীন করে ঠেলে দিচ্ছে আরও গভীর কোনো শূন্যতার ভেতরে।

৬.
ঘরের আনাচ-কানাচে সর্বত্র গফুর চাচার উপস্থিতি পাগলের মতো খোঁজার চেষ্টা করে সামিন। সারাদিনের গুমোট আবহাওয়ার মতো সবকিছু কেমন স্তব্ধ, থমথমে। সামিনকে একা ফেলে সন্ধ্যাশেষের হাওয়া এ ঘর থেকে তার প্রিয় সব গন্ধ তাড়িয়ে নিয়ে গেছে অনেক অনেক দূরে। মুহূর্তেই সে উপলব্ধির আচ্ছন্নতা, অনাগত এক অনভ্যস্ততার অনুভূতি প্রবল ধাক্কা দিয়ে তার সম্বিৎ ফিরিয়ে আনে।
ঘর বন্ধ করে নীল শেডের ল্যাম্প জ্বালিয়ে দিয়ে বাথটাবের শীতল জলে নিজেকে অনেকক্ষণ ডুবিয়ে রাখে সামিন। নিজেকে আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব লাগছে তার। সারাদিনের ঘামেভেজা ক্লান্তি ভালো করে ধুয়ে ফেলে একটা শীতল অনুভূতি নিয়ে বের হয়ে আসে চুপচাপ। তারপর ক্লজেট খুলে হালকা রঙের নাইট গাউন পরার আগে নিজের পছন্দের পারফিউম একটার পর একটা খুঁজে নেয় সে। হুগো বস, আরমানি, ফেরারী, বারবারি, ল্যাকোস্টে এমন কী নেই সেখানে? সুদৃশ্য রঙিন শিশির সুগন্ধিগুলো এতদিন তার শরীরের রসায়ন বা ইউনিক স্টাইলের সাথে মানিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ... কথাগুলো বোকার মতো ভেবে নিজেকে নিয়ে উপহাস করে যাচ্ছিল সামিন।
সবকিছু ছাপিয়ে এক আশ্চর্য মোহনীয় ঘ্রাণ তার নাকে এসে লাগলে একটা শূন্য অনুভূতির তীব্র স্থবিরতা নিয়ে সামিন উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারপর বিনা কারণে পাগলের মতো স্প্রে করতে থাকে হাতে, বুকে, গ্রীবায়, বগলের নিচেÑ ঘরময় স্প্রে করে শূন্য শিশি আছড়ে ফেলে একে একে। তারপর উচ্চস্বরে কেঁদে উঠে বিছানায় গড়িয়ে পড়ে। রাতটা তখন অকারণে অন্যদিনের চেয়েও আরও দীর্ঘ হবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
বাবার সামনে থেকে চলে আসার আগে শেষ কথাগুলো তিনি কী বলছিলেন? খুব ঠাণ্ডা স্বরে বলেছিলেন, তোমার কাল সকালেই পলাশগঞ্জে যাওয়া উচিত। আমি চাই গফুরের শেষ যাত্রায় তুমি থাকো। তার শেষ আয়োজনে তুমি নিজে উপস্থিত থেকে সকল বন্দোবস্ত কর। আফটার অল, ওটাই তোমার মূল ঠিকানা।
শেষ কয়েকটা শব্দ বলতে গিয়ে বাবা অমন অস্থির হয়ে উঠেছিলেন কেন? এ শব্দগুলোর মানেই বা কী? বাবার কণ্ঠের শীতলতা এখন অচল পাহাড়ের মতো ভারী মনে হচ্ছে। কয়েকদিন পরেই বাবার সাথে একটা আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দেয়ার কথা রয়েছে সামিনের। বাড়ির গফুর চাচার জন্যে এতটা? সবকিছু এমন আমূল বদলে যাবে তার জন্যে? কানে লেগে থাকা শেষ কথাগুলো সবকিছুর ঠিকানা বোধ হয় পাল্টে দিয়েছে। নতুন করে সবকিছুর হিসাব কষছে সে। সম্পর্কের সংজ্ঞা কিংবা পরিচিত শরীরের গন্ধ।
ঘরের সব আলো নিভে যাওয়ার পর সামিনের মনে হয়, সুগন্ধভরা শিশিগুলো আজ বিদ্রোহ করে উঠেছে। সমস্ত ছিপি খুলে গিয়ে একটা মিশ্র গন্ধের মতো ভাষাহীন অনুভূতি নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ঘরময়। সেই মিউজিক লাউঞ্জের তরুণীটির গায়ের গন্ধ তাতে মিশে আছে; কিংবা আবীর, মিহির, শিহাব বা শাশ্বতদার। মায়ের গন্ধও আছে তাতে। আচ্ছা বাবার গন্ধ কি সে পাচ্ছে এখানে?
দীর্ঘদিনের তামাদি হয়ে যাওয়া সম্পর্কটা নতুন করে শুরু করার কথা ভেবে সারারাত নির্ঘুম কাটে সামিনের। বাইরে ভোরের আলো ঠিকমতো ফুটে ওঠার আগে জানালার পর্দার ফাঁক গলে একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত মিহি সুবাস হানা দিয়ে যায় ভেতরে। বাতাসের ঘ্রাণটা কেমন পবিত্র মনে হয় তার কাছে। আতর-লোবান-আগরবাতির ধোঁয়া ওঠা ঘোরলাগা এ বিশুদ্ধ গন্ধের অপেক্ষাতেই ছিল যেন সে। জ্বালাধরা চোখ খুলে সামিন তখনই তার ঘুমিয়ে থাকা সকল ইন্দ্রিয়কে প্রাণপণে জাগাবার চেষ্টা করে।


চাঁদপুর
১৯ মে ২০১৮