মাইন

অভিষক ঝা

এইসব ঝোরা মত নদীর জলে রোদ পড়ে কবে থেকে তা মনে পড়ে না অনেক দূরে অথচ জোর কদমে হাঁটলেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে ভ্রম তৈরী করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলোর । কিন্তু তারাও জানে জলে রোদ পড়লেও চিকচিকায় বেশিরভাগ সময়, তেমন মওকা আর মুহুরত না মিশলে কিছুই হয় না । জল বয়ে চলে যেমন করে জল বয়ে চলার কথা । কিন্তু জলেরই বা সবসময় যেমন করে বয়ে চলার কথা তেমন করে বয়ে চলতে ইচ্ছা করবে কেন? অশোক কর্মকার মরে গেছে ,পনেরো বছর পার হয়ে গেল । কিসু ইন্দুয়ারও তাই। তারা জানতেও পারবে না আর কোনোদিন জারুল গাছের তলার ছোট্ট চায়ের দোকানটার দোরমার বেড়া ওফোঁড় করে যে রোদগুলো বয়ে চলা জল থেকে ঠিকরে এসে মাটির দেওয়ালটাই ছোট বড় বিভিন্ন মাপের আলোর বৃত্ত দিয়ে যে নকশি কাটত সেখানে সব রোদ আসলে রোদ ছিল না । আসল রোদেরা চলে গেলেও তারা এখনও থেকে যায় সেইরকম দিনগুলোতে । সন্ধ্যার পরেও । কোথাও জলের বয়ে না যাওয়া থাকলেও। এখান থেকে এখন দূরে হয়ে যাওয়া চা বাগানে গভীর রাতে যখন পাতায় বসে থাকা জোনাকীদের প্রেম করাকে বিঘ্নিত না করে কী করে পাতা তোলা যায় এ চিন্তায় বিভোর থাকে এথেল কুজুর, তখন পড়ে থাকা চায়ের দোকানটার উত্তর পূর্ব কোণের দেওয়ালে না-যাওয়া রোদের বৃত্তগুলো ডেকে নেয় ফিসফিস করে যে কথাগুলো ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে সেই কবে থেকে তাদের । কুচোনো লঙ্কা , রূপোলি বোরলি, ইনবক্সে নিঃশ্বাস নেওয়া প্রেম, দামি হুইস্কিতে নিজেকে আইসবার্গ ভ্রমে মুগ্ধ বরফের টুকরো, ফোন-সেক্সে নিমগ্ন থাকা শীৎকার , মধ্য পঞ্চাশের দাঁতে আপাতত শুয়ে থাকা ক্যানসার, ইনবক্সে শুয়ে থাকা ভালোবাসার মৃতদেহ... এ সমস্ত ফিসফিসের চেয়েও সুগভীর যেসব ফিসফিসানি তারা এক হতে থাকে যতটা পরিধি অবধি না-যাওয়া রোদের মত ঠেকা অথচ না-রোদ বৃত্তগুলো নিজেদের ছড়াতে পারে ।
ব্যালকনিতে বসে দূরের আলো জ্বলা পাহাড়গুলো দেখছিল সে। বর্ষায় মেঘ না থাকলে এই অপার বিস্তারের শেষে চাঁদার মত ঝুলে থাকা আলোরেখার লোভ এখানে তার বাসা বাঁধার দ্বিতীয় কারণ। তৃতীয়টি তার কাজের জায়গা থেকে দূরত্ব। প্রথমটি মাত্র ১৮০০ টাকা স্কোয়ার ফিট। সে একা মানুষ। এবং একা থাকতে ভালোবাসা মানুষ। তাই মূল শহর থেকে এই ৮-৯ কিমি দূরত্বটা তার কাছে উপভোগ্য। তার ধারণা এখানে যারা থাকে তাদের সবার কাছেই উপভোগ্য। জাস্ট একটা চারচাকা লাগে রাতের ট্রেনে ফিরলে বা খুব ভোরে ট্রেন ধরতে হলে। ফ্লাইট এখানে বেলা দশটার আগে একটিও নেই। আর বাদবাকি জীবনের জন্য যা প্রয়োজন আইফোন স্টোর, ফ্যাব ইণ্ডিয়া, ম্যাকডোনাল্ডস, আইনক্স, সুলা স্টোর, এবং মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল সবই রয়েছে এখানে আড়াই থেকে তিন কিমির পরিধিতে। জায়গাটার অথেন্টিসিটি ধরে রাখতে ঢেউ খেলানো জমির জিরেতকে একইরকম রাখা হয়েছে। একটা পাহাড়িয়া এসেন্স যোগ হয় খুব কুয়াশার সকাল বা খুব জোর বৃষ্টির রাতে হাঁটতে বেরোলে। তার মনে হয় কেবল বয়ে চলা একটা ছোট্ট নদী থাকলে এর পাশে জীবনের কাছে সে আর কিছুই চাইত না। কিন্তু এই না থাকাটি তাকে আরো অনেক কিছু চাইতে বাধ্য করে। একটি চারচাকার পর তার একটি রয়্যাল এনফিল্ডের দরকার হয়। ছুটির দিনে সে এনফিল্ড চালিয়ে ছোট ছোট নদীর কাছে যায়। স্বচ্ছ জলের তল দিয়ে বয়ে চলা রঙিন মাছের মিহি ঝাঁক তার আইফোনে ধরে রাখে। নদীর শব্দ, শান্ত জঙ্গলে বসন্তে পাতা পড়ার শব্দ, কাঠঠোকরার ঠুকরানো, হঠাৎ ডেকে ওঠা ময়ূর সে ধরে নেয় তার ডিক্টাফোনে। পথফিরতি কোনো নামহীন পানশালায় শূয়োরের খুট্টা সহযোগে রক্সিতে ভাসতে ভাসতে সে তার হেডফোনে ডুবে যায়। অতল এক খাদের স্বর নিয়ে কোহেন গাইছেন হালেয়ুল্লাহ...হালেয়ুল্ লাহ...
ট্যাপ খুলে রেখেছে নাকি? ফিরে এসে স্নানের পর শাওয়ার বন্ধ করেনি? পাশের ফ্ল্যাটে কি কেউ জল খুলে ভুলে গেল তবে? বালিশের তল থেকে! ওহ। এই অ্যাপলিকেশন থেকে রাতে শোওয়ার আগে মাঝে মাঝে হরেক শব্দ শোনে সে। ঘুম আসতে সুবিধা হয়। ‘টিনি স্ট্রিম’ এর শব্দ উগলে যাচ্ছে তার ফোন। একমাসে এই শব্দ নিয়ে ন’বার তার ঘুম ভাঙল তারপর। আনইন্সটল্ড। সব ঠিকঠাক বেশ কিছুদিন। ফেসবুক, ইন্সট্যা, টিন্ডার... সব স্বাভাবিক। ট্যাপ খুলে রেখেছে নাকি? ফিরে এসে স্নানের পর শাওয়ার বন্ধ করেনি? পাশের ফ্ল্যাটে কি কেউ জল খুলে ভুলে গেল তবে? বালিশের তল থেকে! ওহ। তার ডিক্টাফোন থেকে ফোনে নেওয়া নদীর শব্দ। ফোনের স্টোরেজে চাপ পড়ে একটা ছোটোখাটো নদী বয়ে যাচ্ছে তার বালিশের তল দিয়ে।একমাসে এই শব্দ নিয়ে ন’বার তার ঘুম ভাঙল তারপর। ডিলিটেড। মোবাইলের স্টোরেজে পড়ে থাকল শুধু ছবি, বই আর গান। সেইসব গান যেখানে নদী বয়ে যাওয়ার শব্দ নেই। সব ঠিকঠাক বেশ কিছুদিন। ফ্ল্যাটের ই এম আই, মেডিক্লেমের কিস্তি, মিউচুয়াল ফাণ্ড... সব স্বাভাবিক। মোবাইল অফ করে , টেবিলে রেখে শোয় সে এখন।
---- “বাঞ্চোৎ! ট্যাপ কেন খুলে রেখেছিস?”
----- “ বোকাচোদা! ফিরে এসে স্নানের পর শাওয়ার বন্ধ করিস নি?”
---- “ পাশের ফ্ল্যাটের চ্যাংচোতগুলো নিশ্চয় জল খুলে ভুলে গেছে।”
আস্ত একটা ঝোরা বয়ে যাচ্ছে তার খাটের তল দিয়ে। তার বালিশের তল দিয়ে। তার কানের ভিতর দিয়ে। তার রগের ভিতর দিয়ে। তার মাথার ভিতর দিয়ে। তার শিরদাঁড়ার ভিতর দিয়ে। তার রক্তের ভিতর দিয়ে। বয়েই চলেছে...
জীবনে সে ভাবেনি বাপ-মা মরার পরে আবার তাকে দশকর্মা ভাণ্ডারে আসতে হবে কখনও। একটা কাগজের লিস্ট বের করে নির্বিকার মুখে বসে থাকা লোকটার দিকে এগিয়ে দিয়ে পকেট থেকে ফোন বার ব্যস্তসমস্ত গলায় বলে উঠল, “ হ্যাঁ মা, আমি দশকর্মা ভাণ্ডারেই। আর কি কিছু আনতে হবে লিস্টের বাইরে? ওকে।” “ ছয় গ্রন্থি দিব, না, বারো?” , “ছয়, ছয়।” বাইন্ডিং ফোটোর দোকানের সামনে সে নামে রয়্যাল এনফিল্ড থেকে। ফোন কানে আবার ,“ হ্যাঁ মা। তাহলে বাবা লোকনাথ আর সন্তোষী মা নেব তো খালি?”। বাড়ি ফিরে সে পরস্পরের দিকে মুখ করে চেয়ে থাকা কার্ট কোবেন, আর চে গুয়েভারার প্রমান সাইজের ছবি দুটো নামিয়ে দেয়। বাবা লোকনাথ ও সন্তোষী মা পরস্পরের দিকে পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকে। স্নান সেরে গামছা পরিহিত অবস্থায় সে গুনে গুনে ছয়টি গ্রন্থির প্যাঁচ থেকে পৈতাটিকে বার করে এনে “ ওঁ ভূরভূবস্য” আওড়াতে আওড়াতে কড় গুনতে থাকে। পরনের গামছাটি ঝপ করে খুলে পড়ে। সে আওড়েই চলেছে ধীমোয়ী ধীয়ো...
সব ঠিকঠাক বেশ কিছুদিন। সকাল সন্ধ্যা সন্তোষী মা ও বাবা লোকনাথকে প্রণাম-জল-বাতাসা-ধূপকা ঠি-প্রণাম , মঙ্গলশনি নিরামিষ, বালিশের নিচে ইণ্ডিয়ামার্ট অনলাইন থেকে কেনা মহাকালী কবচ। বালের লোকনাথ, বালের সন্তোষী মা, বালের কালী । কুলকুল করে নদী তো আবার খাটের তল দিয়ে, বালিশের তল দিয়ে, কানের ভিতর দিয়ে বয়েই চলেছে। সাইক্রিয়াটিস্টের কাছেই যেতে হবে। যায়। ওষুধ খায়। সব স্বাভাবিক। আবার বালের সাইক্রিয়াটিস্ট। আবার কুলকুল করে বয়ে চলা একটি ছোট্ট নদী।
লজ্জার মাথা খেয়ে সে তেনাকে সব খুলে বলে। তিনি এই ব্লকের রেসিডেন্ট কমিটির শুধু মাথাই নন, এই টাউনশিপের গোড়াপত্তন থেকে জড়িয়ে থাকা একটি মোটা শেয়ারহোল্ডার। তাঁর সাথে এই তার প্রথম একান্ত আলাপ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আধঘন্টা হিন্দী প্র্যাক্টিস সেরে এসেছিল সে। তাঁর ঝরঝরা বাংলা তার চোয়াল ঝুলিয়ে দেয়। লোকটাকে বড় আপন ঠেকতে থাকে।একথা সেকথাতেই চা চলে আসে। আর সময় নষ্ট করা ঠিক নয় ভেবে... “স্যার, এখানে বোধায় ভূত আছে” । “বোধহয় নয়, নিশ্চিত আছে”, তিনি নিরুত্তাপ। “সবাই এক বছরের ভিতর আসে, আপনি দুই বছরের মাথায় আমার কাছে এলেন। আসলে ফেসবুকে আপনি প্রায়ই জয় বাস্তার, জয় কোবাড গান্ধী, সোনি সোরি তু আগে ব্যর, লং লিভ কিষান মার্চ করেন দেখে আমি ভেবেছিলাম ওরা আপনাকে ছাড় দিয়েছে। ভেবেছে ওদেরই দলেরই লোক যার খানিক টাকাপয়সা আছে। কিন্তু দেখেন কী হারামী! ওদের হয়ে এত ফেসবুকে বলেন, তাও শালা জ্বালালো! বেসিক সত্যিটা শুনুন স্যার, বেশি পরিশ্রমের বেশি টাকাপয়সা দেখলেই এদের ঝাঁট জ্বলে ”, তিনি কাপটা রাখলেন। “চিন্তা করবেন না, এই রেসিডেন্সিয়াল ব্লকের নিজস্ব অঘোর এক তান্ত্রিক আছেন। দশ বছর ধরে উনিই এসব দেখেন। আপনাকে কোনো ফিস দিতে হবে না। দিস ইজ এ কমপ্লিমেন্টারি সার্ভিস অন আওয়ার বিহাফ”, তাঁর পাছা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। “ কিন্তু স্যার সমস্যাটা...” “ জানি তো। বলতে হবে না। কমবেশি সবারই হয়েছে”।
এটা অঘোর তান্ত্রিক?! এ ও সে খুব ভালোভাবে পরিচিত। ডেনড্রাইটের সাথে ধুতরার বিচি মিশিয়ে হেভি একটা ককটেল বেচে এই মাল। কোর্ট চত্বরে বিভিন্ন তেল আর ওষধির পসরা নিয়ে বসে। সে কিনে আনে মাঝে মাঝে। এটা অঘোর তান্ত্রিক!? দু’জন দুজনের কাছে অপরিচিত হয়ে যায়। “পায়খানাটা দেখব। মাগী নিয়ে আসলে কোন জায়গায় লাগান সেটা দেখাবেন। আর মাগী না আনলে কোথায় খিঁচান সেটা দেখাবেন”, নির্বিকার মুখে অঘোর বলে। “মাগী আনি, মগা আনি, খিঁচিও --- তাতে কী?” “ কিছু না। ওগুলো জায়গাতে আর পায়খানাতেই দেখতে পাচ্ছেন নিশ্চয়? নেশাভাঙের জায়গাতেও কি?”, “ কী!”,“ দু’টা মানুষ বসে বসে বিঁড়ি ফুকছে” , “কোনোদিনও না”, “ধ্যার! এই ব্লকের সবার কেস তো এই। জি ব্লকে দুটা মানুষ হাত মুঠা করে স্লোগান দিচ্ছে হাগতে বসে দেখেতে পায় লোক। হাগা ছেড়ে ওঠা যায় না বলে পুরা শ্লোগান শুনতেও হয়। ডি ব্লকে তো আরও ঘ্যামা ব্যাপার। ওখানে বাড়িতে ফূর্তিটূর্তি হলেই বাড়ির মালিক দেখে তীরধনুক নিয়ে দুটা মাল দাঁড়ায় আছে। এ ব্লকটায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কেউ শালা ব্যালকনিতে বসে স্কচ হাতে রাতের আলো জ্বলা পাহাড় দেখতে বসেছে। হঠাৎ করে ব্যালকনির কোণার অন্ধকারে দুটা রক্তঝরা মানুষ । ভদ্রলোকদের বাস এখানে, শহরের কোনো উটকামো নাই আর শালা কিছু ভূত এসে বিগড়ে দেবে সবকিছু! আমরা আছি কী করতে? এখানকার অঘোররা সব’কে টাইট দিয়ে দিয়েছি। কোনো ঝামেলা নেই আর। নিশ্চিন্তে হাগা, ফূর্তি, পাহাড়ের আলো দেখা সব হয় ।নতুন মালিক এলে বাড়িতে আবার ঝামেলা হয়, তখন আবার আসি” , নাক উঁচু করে গন্ধ শুঁকার ভঙ্গিতে ঘরময় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে অঘোর বলে। “ এরকম কোনো সমস্যাই আমার নাই। আমার ঘরের তল দিয়ে, খাটের তল দিয়ে, বালিশের তল দিয়ে, কানের তল দিয়ে কুলকুল করে নদী বয়”, দু’টা সিগারেট বার করে একটা অঘোরের দিকে এগিয়ে দিল সে। অঘোর উজবুক বিজ্ঞের মত তাকিয়ে থাকে। এতক্ষণে অঘোর ও তাকে পূর্বপরিচিতের মত দেখাচ্ছে। অঘোর সিগারেট ধরিয়ে নরম গলায় বলে, “ একটু ভালো চা খাওয়াবেন দাদা?” । “ মনে হয় আপনার কানে জল হয়েচে”, সে নিরুত্তর। “ যত নেশাভাঙ করেন, ফুসফুসে জল না হলেই ভালো”, সে নিরুত্তর। “ আচ্চা আসি দাদা, এই শনিবার তক্ষকের ল্যাজের গুঁড়া পেতে পারি, আপনাকে জানাবো নে, দশ গ্রাম হাজার টাকা”, সে নিরুত্তর। “ভাই আপনি তো আমার নিজেরই ছোটো ভাই, আপনাকে আমি লোকাল গুনীনের সুলুক দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের বেণারসী বিদ্যা এই বাউদের দেশের সব ভূতকে এখনও জানে না”, সে চোখ তুলে তাকাল।
জারুল গাছের তলার ছোট্ট চায়ের দোকানটার দোরমার বেড়া ওফোঁড় করে কিছু রোদ পড়ে চলেছে। বিড়িতে শেষ টান দিয়ে গলার কফকে জিভে তুলে এনে থুঃ শব্দে যেন সারা দুনিয়াজাহানের উপর রাগ ঝেড়ে দেয় বয়সের কোনোই আন্দাজ না দেওয়া এই গুনীন। একে সে চেনে না। “উয়ারা খালি ভাবে যে মানষিলা ছাড়া আর কিছু ভূত হয় না। আরি বাবা, সবেরই তো আউ আছি, নাকি? এই যে জারুলের গাছ, হুই পাহাড়, রাতিবেলা তারা সবাই ভূত হয়”, আবার দুনিয়াজাহানের উপর রাগ করি কফ ফেলি দিল। “ দেহ বাউ, ঝোরা একখান বয়ত। ইয়া সিধা বাত। উ ঝোরার ধারের ই দোকানে আব্দুল হামিদ, কানু আর তা্দের মানষিলাগুলান জড়োও হত। পঁচাশ বছর হতি চলল তাও।অশোক কর্মকারও ই দুকানেই বসত গুলি খাওয়ার আগে। গুলি চলল দুটা মানুষ মরল, ন্যাতা এল, জজসাহেব ইল... ইসবের মাঝি ঝোরা উবি গেল। উবি গেল কত্ত মানুষ, ই তো কেবল একটা ঝোরা” , কত কফ যে বুড়া সঞ্চয় করে রেখেছে কে জানে। “ মুই বিরিক্ষভূত, পাথরভূতকে বুঝাইতে পারি, কিন্তু ঝোরাভূত না পারিব। ই তল্লাটে একজনাই পারিত। কিন্তু সে তো অশোক কর্মকারের সাথেই গুলি খেয়ে মরল, বেফালতু ঝামিলার মাঝখানে পড়ি। কিসু ইন্দুয়ার” , আবার একদলা কফ।
কোথাও কোনো ঝোরা সে খুঁজে পেল না। বিশ বছরের পঞ্চায়েতের রেকর্ড তন্নতন্ন করে ঘাঁটল। নেই। ১৯৩৫ গেজেটিয়ার । নেই। ১৯০৭ গেজেটিয়ার। নেই। ১৮৬৯ গেজেটিয়ার । নেই। সরকারি দপ্তরের গেল। কেউ জানে না। এই টাউনশিপ প্ল্যানিং-এর আর্কিটেক্টদের কাছে গেল। কেউ জানে না। কেউই কিছুই জানে না। কোনো রেকর্ডই কোনো কিছু রেকর্ড করে না। কেউ কিচ্ছুটি না জানলেও সে জানে ঝোরাটি ঝোরাভূত হয়েই এখানে রয়ে গেছে। নিশির ডাক দিয়ে যাচ্ছে ফিসফিস করে। দেখা দিব কিন্তুর ভয় দেখাচ্ছে। এই ফিসফিসানি থেকে বাঁচতে গেলে ফিরে যেতে হবে সেই ফ্রেমে যেখানে এগুলি নেইঃ একটি বসন্তের শেষ বিকেল + ঢেউ খেলানো পাহাড়কে দিগন্তে ঠেলে রাখা চা-বাগান + পাথর আর তীর ধনুক হাতে চায়ের ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসা অজস্র মানুষ + চিরসরলগতিতে ছুটে চলা মালিকানাহীন বুলেটরাজি।
-------------------------------