আয় ঘুম আয়

অলোকপর্ণা


বিছানায় ছিটকে উঠে বসে তিন্নি । একটু আগে ঘুমের মধ্যে আবার মরে গেল সে । দরদর করে ঘামতে ঘামতে তিন্নি স্বপ্নটা মনে করবার চেষ্টা করল ।
গলির ঠিক সেই মোড়টায় এসে সে থেমে গিয়েছিল, যেখান থেকে ঘুম শুরু হয় । খুব সাবধানে এইবারে ডান দিকে না ঘুরে ঠিক বাঁদিকেই পা বাড়িয়েছিল । কিন্তু ভুল , ভুল হয়ে যায় বারবার ... কি মনে হতে চোখ বুজে তিন্নি পা বাড়ায় ,

আর ঘুম !

ঘুমটা ঠিক যেন ওঁত পেতেছিল গলির মুখে , মোড় ঘুরতেই তিন্নিকে একদম
গিলে ফেলল ।




বিয়েতে কে যে একটা টর্চ গিফট্‌ করেছিল খেয়াল করতে পারে না তিন্নি । পুরোনো ব্যাগ গোছাতে গিয়ে সেটা হাতে পড়ে যায়। খুলে দেখে , ভিতর ঠিক গুণে গুণে দুটো গুলি রাখা , দেওয়ালের দিকে টর্চটা তাক করে ট্রিগার টেপে তিন্নি , দেওয়ালে আলোর বল আছড়ে পড়ে । স্যুইচ অফ করে শক্ত মুঠোয় টর্চ আঁকড়ে বসে তিন্নি কিসব যেন ভাবতে থাকে ।

“ ওর নাম রাখবো আলো ”
“ ব্যাক ডেটড , ... আর যদি ছেলে হয়? ”
“আলো – ই ”
“ ছেলের নামও আলো ?! ”
“ আলো তো আলোই , তার আবার জেন্ডার কি ! ”
“যা ভালো বোঝো , ” তিন্নির পেটে হাত রেখে আশমান ঘুমিয়ে পড়ে , তিন্নি ঘুমোতে পারে না , সে দেখে তার পেটের ওপর রাখা আশমানের হাত আলোয় আলো হয়ে যাচ্ছে , তীব্র আলোয় চোখ রেখে তিন্নির ঘুম আসে না ।


প্রথম দিন তার হাতে একটা লাটাই ছিল , ঘুড়িটা উড়ছিল পত পত করে , গলি দিয়ে দৌড়ে আসছিল তিন্নি , সামনেই একটা মোড়। রাস্তা চলে গেছে দুই দিকে । কেন জানি ডানদিকেই পা বাড়াল তিন্নি । আর দুম করে ঘুমের মধ্যে ঢুকে এল । অন্ধকার ঠান্ডা একটা ঘুম , পায়ের তলায় আর রাস্তা থাকলনা , গলিটা কোথায় যেন গুম হয়ে যায় । লাটাইটাও কোথায় চলে গেল , ... এক অন্ধকারের মধ্যে তিন্নি ঘুড়ির সুতো ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে। সুতো সোজা উঠে গেছে ওপরে । ঘুড়িটা সেখানে স্থির দাঁড়িয়ে আছে তিন্নির মতই , অন্ধকারে । সুতো ছেড়ে দেয় তিন্নি , সুতো সহ ঘুড়িটা স্থির হয়ে অন্ধকারে ঝুলতে থাকে । তিন্নি বোঝে এখানে কিচ্ছু নেই , আলো নেই , হাওয়া নেই , সময়ও না । তিন্নি বোঝে সে মরে গেছে , অথবা জন্মায় নি ।

সুতো ছেড়ে অন্ধকারে হাঁটতে শুরু করে তিন্নি । সামনে কিছু নেই । কোথাও কিছু নেই ।





মেঝেতে একরাশ পেঁয়াজ নিয়ে বসেছে তিন্নি , একেক করে খোসা ছাড়াচ্ছে , পেঁয়াজের পালক উড়ে উড়ে যাচ্ছে ঘরের কোণায় কোণায় । তিন্নির চোখ লাল , টপ টপ করে জল ঝরে পড়ছে ছুড়ির গায়ে , মসৃন গা বেয়ে জল নেমে যাচ্ছে পেঁয়াজের টুকরোতে । বিছানায় আধশোয়া আশমান বলে ওঠে
“ কেন এমন হয় তিন্নি ? ”
মুখ তুলে তাকায় সে , তার চোখ জলে ঝাপসা , আশমানের মুখটা প্রচন্ড
কালো , - অন্ধকার মনে হয় তার ।
“ কি হয় ? ”
“ পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে রোজ বেশি করে কেঁদে ফেলো ! ”
তিন্নি কিছু বলে না , কারেন্ট চলে যায় । অন্ধকার ঘরে ছুরি হাতে বসে সে , কিছু দূরে আশমান শুয়ে আছে । পাশেই রাখা টর্চ জ্বালায় তিন্নি , দেশালাই খুঁজবে বলে । এদিক ওদিক দেখে তিন্নি আশমানের মুখে টর্চের আলো ফেলে । আশমান ভুরু কুঁচকে বলে ,
“ কি হল ? ”
“আলো খুঁজছি ... ”
“ আলো দিয়ে ? ” ভুরু কুচকেই হাসে আশমান ।
তিন্নিও অল্প হাসে ।




আজ গলি দিয়ে টর্চ হাতে দৌড়চ্ছে তিন্নি , সামনেই সেই মোড় , বাঁ দিকে পা বাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও সে আবার ডান দিকেই ঢুকে পড়ে । ... এবং সেই অন্ধকার । কিন্তু তিন্নি ভয় পায় না , টর্চের ট্রিগার টিপে ধরে ।

আলো কোথাও পড়ে না , অন্ধকারের মধ্যে টর্চের আলো হারিয়ে যায় । তবু আলো জ্বেলে জ্বেলে তিন্নি এগিয়ে চলে , এগিয়ে যায় , অনেকক্ষণ চলার পর দেখে মাটিতে এক বিরাট নল পড়ে আছে । নলের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় তিন্নি , সেখান থেকে টপ টপ করে আলোর কণা কালো মেঝেতে পড়েই মিলিয়ে যাচ্ছে । হঠাৎ নলটা নড়ে উঠে তিন্নির নাভির সাথে আটকে গেল ... আর অন্ধকারে কোথা থেকে যেন জল নামতে লাগল , পিচ্ছিল দুর্গন্ধযুক্ত জল জমে জমে তিন্নিকে ডুবিয়ে দিতে লাগল ।
তিন্নি বুঝল সে তার মায়ের গর্ভে ফিরে এসেছে। তিন্নি ডেকে উঠল, “ মা ! ”
অন্ধকার কাঁপিয়ে একটা বাচ্চা যেন তাকে ভেঙিয়ে ডাকল , “ মা ! ”
একবার নয় , বারবার , “ মা মা মা মা ” , অনবরত ডেকেই চলল বাচ্চাটা মা বলে ।
তিন্নি বুঝল , ওটা আলোর গলা । তার মা নয় , নিজের সন্তানের গর্ভে , আলোর গর্ভে ঢুকে পড়েছে তিন্নি ।

ছিটকে ঘুম থেকে বেরিয়ে এসে তিন্নি বিছানায় উঠে বসে ।
“ কি হল ? ”
“ আশমান ,

ওর তো আলো হওয়া উচিত ছিল , ও এত অন্ধকার !

এত অন্ধকার কেন আশমান ! কেন অন্ধকার ! ”

তিন্নির মাথায় হাত বুলোতে থাকে আশমান, “ শুয়ে পড়ো , কাল স্কুল আছে ...
শুয়ে পড়ো ”




স্কুল থেকে ফেরার পথে ক্লিনিকের সুধাদির সাথে দেখা হয়ে যায় তিন্নির ।
“ ভালো তো ? ” মহিলা তিন্নির চোখে চোখ রেখে জানতে চান ।
তিন্নি হাসে ।
“ বাড়ি ফিরছো ? ”
“ হ্যাঁ ”
“ চলো , আমিও যাবো ওইদিকে ”
সুধাদির সাথে নিশ্চুপ চলতে থাকে তিন্নি ।
“ আশমান বাড়িতে ? ”
“ না ”
“ অফিস খুলেছে ওর ? ”
“ হ্যাঁ খুলেছে ”
সুধাদি কি যেন ভাবতে থাকেন ,
“ ডিসেম্বরের শুরুতেই খুলেছে ” তিন্নি বলে ।
“ সেকি ! তুমি তো নভেম্বরের শেষে ক্লিনিকে এসেছিলে , না ? ”
“ উনত্রিশে নভেম্বর ” আর কিছু বলে না তিন্নি। সুধাদিও চুপ করে হাঁটতে থাকেন। বটতলায় এসে সুধাদি বললেন, “ এবার আমি বাঁ দিকে যাবো , তিন্নি , ভালো থেকো । ”
“ সুধাদি , ”
সুধাদি ফিরে দাঁড়ান , “ বলো ... ”
“ ওই অবস্থায় সুধাদি ... আশমান নভেম্বরেও বাড়ি বসে ... আলোকে পৃথিবীতে আনা ওই অবস্থায় অসম্ভব ছিল সুধাদি ” তিন্নির গলা আটকে আসে ।
সুধাদি এগিয়ে এসে তিন্নির কাঁধে হাত রাখেন, “ ভুল হয়েছে তিন্নি , বড় ভুল হয়ে গেছে , কিন্তু তার জন্য দায়ী তুমি নও,- সময়। ”
তিন্নি মুখ তুলে তাকাতে পারে না, “ আমি আসি তিন্নি , ভাল থেকো ”
সুধাদি চলে যান ।

গলি দিয়ে হাঁটতে থাকে তিন্নি , সুধাদি একটু আগেই বাঁদিকে হেঁটে গেছেন । জেনে বুঝে তিন্নি ডানদিকে ঢুকে আসে , অন্ধকার মেঝেতে স্কুলের ব্যাগ নামিয়ে রাখে । ঘুড়িটা এখনও সেইখানেই ঝুলছে যেখানে সে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল ।
আরো কিছুটা এগিয়ে নাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় তিন্নি । তার সামনে মেঝেতে শুয়ে পড়ে সে , নাড়িটা এসে তিন্নির নাভিতে লেগে যায়। অন্ধকার মেঝেতে বুকের কাছে পা মুড়িয়ে আলোর গর্ভে শোয় তিন্নি । কি কারণে যেন তার খুব কান্না পেয়ে যায় ।

তিন্নির চোখ জলে ঝাপসা হয়ে মেঝেতে সেই জল জমতে শুরু করে , তার আবছা দৃষ্টির পিছনে অন্ধকার পাতলা হতে থাকে ।
একসময় তিন্নি বোঝে অন্ধকার আর নেই , তার চোখে এখন শুধুই আলো ঢুকে আসছে ।